আজ শুক্রবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৮ ইং, ১৪ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বাংলাদেশের প্রথম নারী কারাতে জাজ পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক লতা পারভিন

Published on 29 November 2017 | 1: 12 pm

নারীরা এখন শুধু ঘরে বসে থাকেন না। তাঁরা নানা কাজে ঘরের বাইরে ব্যস্ত সময় পার করেন।কিন্তু কিছু বখাটে আছে যারা তরুণী কিংবা নারীদের ইভটিজিং করে। নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে। এর মাধ্যমে নারীদের অসম্মান করা হয়। এটা সমাজের নেতিবাচক দিক।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পুলিশ আইনি ও সামাজিক গণসচেতনামূলক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। তারপরও ইভটিজিং পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় নারীদের আত্মরক্ষার কৌশল রপ্ত করাতে চান একজন নারী। এই নারী মনে করেন, নারীরা আত্মরক্ষায় কৌশলী এবং পারদর্শী হলেই ইভটিজিংসহ নানা ধরনের উত্ত্যক্ত করা থেকে নিজকে আত্মরক্ষা করা সম্ভব। একই সঙ্গে শারীরিকভাবে ফিটনেস ধরে রাখা যাবে।নারীদের আত্মরক্ষার কৌশল শেখানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করা এই নারীর নাম লতা পারভীন। তিনি বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনীর সদস্য। সহকারী উপ-পরিদর্শক পদে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে কর্মরত আছেন।

শুধু একটুই তাঁর পরিচয় নয়। তাঁর পরিচয়ের বিস্তৃতি আরো কিছুটা দীর্ঘ।লতা পারভীনকে বলা হয় বাংলাদেশ পুলিশের ‘কারাতে কন্যা’। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী কারাতে জাজ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছেন। কারাতে প্রশিক্ষণ শেষে ব্ল্যাক বেল্ট প্রাপ্ত এই নারী কারাতে এখন নিজেই প্রশিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তাই ভবিষ্যতে চট্টগ্রামের নারীদের আত্মরক্ষার কৌশল রপ্ত করানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।কালের কণ্ঠের কার্যালয়ে বসে লতা পারভীন তাঁর স্বপ্নের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘নারীদের পথে-ঘাটে নানাভাবে হেনস্তা হতে হয়। এটা অগ্রহণযোগ্য। এই অবস্থা থেকে সহজেই উত্তরণ সম্ভব, যদি নারীরা আত্মরক্ষায় কৌশলী হন।

আর নারীদের আত্মরক্ষার কৌশল বিষয়ে আমি প্রশিক্ষণ দিতে চাই। তবে সেটা অবশ্যই পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত থেকে এবং সেবার উদ্দেশ্যে। ’তিনি আরো বলেন, ‘পুলিশ কমিশনার মহোদয় যদি উদ্যোগ নেন, তাহলে চট্টগ্রামের নারীদের আত্মরক্ষার কৌশল প্রশিক্ষণের বিষয়টি সহজ হয়ে যাবে এবং পুলিশ যে জনসাধারণকে প্রকৃত সেবা দেয় সেটা জনসাধারণ বুঝবে। ফলে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বাড়বে। ’লতা পারভীনের স্বামী কাউছার আহমেদও একজন কারাতে প্রশিক্ষক। তিনি চিটাগাং কারাতে অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান কোচ। স্বামী-স্ত্রী দুজই মানুষের সেবায় নিজদের নিয়োজিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

লতা পারভীন জানান, ২০১০ সালে তিনি পঞ্চগড় জেলা পুলিশ লাইনে কনস্টেবল পদে যোগদান করেন। কনস্টেবল পদে নিয়োগের পর তাঁর প্রথম কর্মস্থল হয় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ ইউনিট। ওই সময় ৮২ জন নারী কনস্টেবলকে প্রথমবারের মতো কারাতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। দামপাড়া পুলিশ লাইন মাঠে চারমাস প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় লতার ডানপিটে স্বভাবের বহির্প্রকাশ ঘটে। স্কুল জীবনেও ডানপিটে স্বভাবের এই মেয়ে অন্য মেয়েদের চেয়ে বেশ পারদর্শিতা প্রদর্শন করে কারাতে প্রশিক্ষণ ও দৌঁড়ঝাঁপে।

২০১০ সালে কারাতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর লতা পারভীনকে আর পেছনে ফিরে দেখতে হয়নি। তিনি নিজের যোগ্যতা বলেই দেশ-বিদেশে সুনাম-সুখ্যাতি কুড়িয়েছেন। পুলিশ বাহিনীর মধ্যে ‘কারাতে কন্যা’ হিসেবে নিজের পরিচয় গড়ে তোলতে সক্ষম হন।

লতা পারভীন পুলিশ বাহিনীর প্রথম নারী সদস্য হিসেবে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশন থেকে ব্ল্যাক বেল্ট পান। ২০১৪ সাল থেকে পরপর তিনবার পুলিশ বাহিনীর বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় কারাতে ইভেন্টে প্রথম হন। পাশাপাশি জাতীয় কারাতে প্রতিযোগিতায় ২০১৪ ও ২০১৬ সালে পান রৌপ্যপদক।

আন্তর্জাতিক কারাতে প্রতিযোগিতায় ২০১৫ সালের জুলাই মাসে প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে গিয়ে জাতীয় দলের হয়ে ভারতের কলকাতায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন। এতে নারীদের ৬৮ কেজির বেশি ওজন শ্রেণিতে স্বর্ণপদক পান। এ প্রতিযোগিতায় ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ ছয়টি দেশ অংশগ্রহণ করে। পরের বছরও এই প্রতিযোগিতায় ৬৮ কেজি ওজন শ্রেণিতে স্বর্ণপদক লাভ করেন লতা। এতে সিঙ্গাপুর, জাপান, ভারত ও নেপালসহ আটটি অংশ নিয়েছিল।

লতা পারভীনকে পুলিশ বাহিনীর সম্পদ আখ্যায়িত করে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) মাসুদ-উল-হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লতা পারভীন পুলিশ বাহিনীর সম্পদ। সে নিজের যোগ্যতা বলেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হয়েছে। এটা পুলিশ বাহিনী ও দেশের জন্য গৌরবের। তাঁকে অনুসরণ করে অনেক নারী পুলিশ সদস্য কারাতে শিখতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। এটা ইতিবাচক দিক। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে লতা পারভীন কারাতে জাজ হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছেন। এতে পুলিশ বাহিনীর সুনাম বেড়েছে। ’

লতা শুধু কারাতে ছাড়াও বক্সিং, কুস্তি, ভলিবল খেলায় পারদর্শী। গত বছর পুলিশ বাহিনীর সেরা নারী খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পেয়েছেন। এ বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে সাহসিকতার জন্য পুলিশ বাহিনী তাঁকে ‘মেডেল অব কারেজ’ পুরস্কার পেয়েছেন।

বাংলাদেশের প্রথম মহিলা কারাতে জাজ হিসেবে এশিয়ান কারাতে ফেডারেশনের লাইসেন্স পান লতা। গত ৩-৬ আগস্ট শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে সাউথ এশিয়ান কারাতে ফেডারেশনের আয়োজনে এশিয়ান কারাতে ফেডারেশনের জাজ/রেফারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ওই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জাজ নির্বাচিত হন লতা পারভীন। ওই পরীক্ষায় বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভারত, নেপাল, ভুটান ও পাকিস্তানের ক্রীড়াবিদরা অংশ নিয়েছিলেন।

পঞ্চগড়ের ড. আবেদা হাফিজ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০৭ সালে এসএসসি পাস করেন লতা। পরে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন। তার বাবা আজিজুল হক কৃষিজীবী। একটি বেসরকারি স্কুলে কর্মরত আছেন মা। লতা-কাউছার দম্পতির পাঁচ বছরের এক সন্তান আছে।(সুত্র: কালের কন্ঠ)

 


Advertisement

আরও পড়ুন