আজ রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ ইং, ১০ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



বুড়িমা ও আমার আজীবনের অনুশোচনা

Published on 17 November 2017 | 11: 21 am

:: মো: শাহাদাত হোসেন ::


১৯৯১ সনের জানুয়ারিতে চাকুরিতে যোগদান করলেও ফেব্রুয়ারিতে ভোলা জেলায় সহকারি কমিশনার হিসেবে যোগদান করি। বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করা সদ্য টগবগে যুবক। এর উপর ম্যাজিস্ট্রেটও বটে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তজুমদ্দিন উপজেলার একটি ইউনিয়নের সবগুলো কেন্দ্রের দায়িত্ব। উড়ন্ত ডাইনোসরের মত জাল ভোট প্রতিরোধে এক কেন্দ্র হতে আর কেন্দ্রে ছোটাছুটি। এক কেন্দ্রে গেলে আর এক কেন্দ্রে জাল ভোটের খবর আসে। পড়ন্ত বেলায় জাল ভোটের প্রবণতা খুব বেশী। মেজাজও বিগড়াতে থাকে। অভিযোগ পেয়ে এক কেন্দ্রে গেলাম। বেসামাল অবস্থা ! উপচে পড়া মহিলারা চরম বিশৃংখলা সৃষ্টি করে জাল ভোট দিচ্ছে। আমাদের সম্মানিত জনপ্রতিনিধিদের ক্যাম্প থেকে এজেন্টরা অন্যের স্ত্রী কে আর একজনের স্ত্রী বানিয়ে ভোট কেন্দ্রে পাঠায়। মেয়েদের বুথে প্রবেশ করলাম। সে এক অভাবনীয় প্রতিযোগিতা! শুরু করলাম জিজ্ঞাসাবাদ। ১৪ বছরের মেয়ের ৫৫ বছরের
স্বামী! আবার ৭০ বছরের বৃদ্ধার ২৮ বছরের স্বামী। এ ধরনের চরম বিশৃংখলা। ভাবছিলাম কিভাবে এটা রোধ করা যায়। হঠাৎ কঠিন সিদ্ধান্ত নিলাম। ধরে ধরে সব মহিলাদেরকে মাঠের কোণে জড়ো করতে লাগলাম। উদ্দেশ্য ভীতি প্রদর্শন। যাতে আর কেউ জাল ভোট দিতে না আসে। পদক্ষেপে কিছুটা আশাব্যাঞ্জক ফল পাচ্ছিলাম। বুথে নিজেই চেক করছিলাম। মনে হচ্ছিলো আমি সবার প্রতিপক্ষ!
এবার একজন সত্তরোর্ধ বৃদ্ধাকে ধরলাম। দারিদ্র্যতার কারনে একেবারেই থুরথুরে বুড়ি। শরীরের চামড়াগুলো কুচকে গেছে! সমান বিচার দেখাতে গিয়ে তাকেও মাঠের কোনে ইতোমধ্যে জড়ো করা মহিলাদের মধ্যে নিয়ে আটকালাম। হাতে বাঁশের একটা লাঠি নিয়ে ভর দিয়ে খুব ধীরলয়ে হাঁটিয়ে নিয়েছিলাম। তার চোখে মুখে কোন অভিব্যক্তি লক্ষ করিনি। মনে হয় তিনি কিছুই বুঝতে পারছিলেননা। বা বুঝার মত স্মরণ শক্তিও তার ছিলোনা। ভোটের সময় শেষ হওয়ার পর আমি বৃদ্ধার কাগজখানা নিয়ে সংশ্লিষ্ট এজেন্টকে ধরলাম। জানলাম বৃদ্ধার এ পৃথিবীতে কেউ নেই। ভিক্ষা করে এই দেহখানা নামমাত্রে বয়ে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে অন্য একটি কেন্দ্রে গেলাম। চোখে ভাসছিলো ভাবলেশহীন জাবর কাটা সে বুড়ি মার অসহায় করুন মুখ খানা। আবার ফিরে গেলাম সে কেন্দ্রে তাকে দেখার জন্য। ক্ষমা চাওয়ার জন্য। ১০/-টাকা দেয়ার জন্য। কিন্তু গিয়ে আর পেলামনা। বুকে কষ্ট নিয়ে ফিরলাম। যতক্ষণ ঘুম আসেনি, ততক্ষণ ছটফট করেছি। গোপনে চোখের জল ফেলেছি। সাদা ময়লা শাড়ী পরিহিতা বিধবা হিন্দু বুড়িমা তুমি আজও আমার স্মৃতিতে ভাস্বর। তোমাকে দেয়া কষ্ট আমি আজো বয়ে বেড়াচ্ছি। আজো সময়ে সময়ে চোখের জলে ভাসি। জানি তুমি বেঁচে নেই। সে বছরও ছিলে কিনা সন্দেহ।
বুড়িমা, তুমি কি পরপার থেকে দেখতে পাও সেদিনের সে তেজী রগ চটা মহা শক্তিশালী ম্যাজিস্ট্রেটকে! যে ন্যায় বিচার করতে গিয়ে তোমার প্রতিও শক্তি প্রয়োগ করেছিলো! জানো বুড়িমা, সে ক্ষমতাবান ম্যাজিস্ট্রেট এখন জীবনের প্রান্তিক সময়ে এসেও তোমাকে কষ্ট দেয়ার গ্লানিতে কাঁদে।
ক্ষমা করে দিও মা। আমার এক ফোঁটা জলও যদি হৃদয়ের অন্তক্ষরণ হয়ে থাকে ;তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিও বুড়িমা।
ভালো থেকো বুড়িমা ; সেই অজানা দেশে 


লেখক : পরিচালক, এনজিও এফেয়ার্স ব্যুরো, প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়, ঢাকা, [যুগ্ম সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার]।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন