আজ বৃহঃপতিবার, ১৬ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০১ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



গাছুয়া এ. কে. একাডেমীর ইতিহাস

Published on 13 November 2017 | 7: 53 am

:: ড. সারোয়ার জামীল ::


বঙ্গোপসাগরের নীল জলে বিধৌত সাগরকন্যা সন্দ্বীপের প্রত্যন্ত গ্রাম গাছুয়াতে গড়ে উঠে সন্দ্বীপের প্রথম দ্বিতল ভবন বিশিষ্ট বিদ্যালয়। বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে যেটা গাছুয়া এ.কে. একাডেমী নামে পরিচিত। গাছুয়া পাঠশালা নামের ক্ষুদ্র একটি চারাগাছ কালের ঝড়ঝঞা আর প্রতিকূলতা উত্তরণ করে আজ ফুলেফলে বিকশিত গাছুয়া এ,কে, একাডেমী নামক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। কালের বিবর্তনে অনেক চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে এ,কে, একাডেমী আজ এই পর্যায়ে এসেছে। এই স্কুলের রয়েছে বহু বছরের গৌরবান্বিত ইতিহাস। ১৮৮৫ সনে গাছুয়ায় এই পাঠশালায় জন্ম হয়।

No automatic alt text available.

তৎকালীন গাছুয়ার আলীগড় মাদ্রাসায় শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্ব মৌলভী আমিন উদ্দিন তাঁর গ্রামের দরিদ্র অশিক্ষিত মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো বিস্তারের উদ্দেশ্যে আকবর হাট রোডের দক্ষিণ পাশের্^ তাঁর বাড়ির পুকুর পাড়ে পাঠশালাটি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু চাকুরির সুবাদে মৌলভী আমিন উদ্দিন কোলকাতা অবস্থানের কারনে তিনি নিজে শিক্ষকতার দায়িত্ব নিতে পারেননি। এটা দিয়েছিলেন চর বদুর এক বিজ্ঞ পন্ডিতকে। কিন্তু পারিবারিক কারণে এবং উন্নততর চাকুরি লাভে পন্ডিত মহাশয় ১৮৯০ সনে স্কুল ত্যাগ করেন। শিক্ষকরে অভাবে এবং মৌলভী আমিন উদ্দিন সাহেবের প্রত্যক্ষ তদারকির অনুপস্থিতিতে ১৮৯২ সনে স্কুলটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

১৯০৩ সনে মৌলভী আমিন উদ্দিন সাহেবের সুযোগ্য পুত্র আহাম্মদ মিয়া কোলকাতা হতে এন্ট্রাস, গুরু ট্রেনিং (জি,টি) এবং নোয়াখালী হতে পান্ডিত্য অর্জন করে গ্রামে ফিরে এসে নিজ এলাকার দরিদ্র এবং অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে আধুনিক ও যুুগোপযোগী শিক্ষার প্রসারের জন্য তাঁর পিতার সৃষ্ট গাছুয়া পাঠশালা পুণরায় চালু করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর এই আগ্রহ ও উদ্যমে মুদ্ধ হয়ে তাঁর শ^শুর একই গ্রামের হাদিয়ার বাড়ির আবুল হোসেন তালুকদার নিজ বাড়ির সম্মুখে বড় পুকুরের পাড়ে রাস্তা সংলগ্ন স্থানে একটি গৃহ নির্মাণ করে জামাতাকে স্কুল চালানোর জন্য আহবান করেন। শ^শুরের উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় আহম্মদ মিয়া ১৯০৩ সনে নতুনভাবে গাছুয়া আদর্শ স্কুল প্রতিষ্ঠা করে একক শিক্ষক হিসাবে শিক্ষাদানে ব্রতী হন।

কিন্তু শুধু ছাত্রদের দেওয়া বেতন ও কিছু সচ্ছল গ্রামবাসীর আর্থিক আনুকূল্যে একটা স্কুল সুষ্ঠুভাবে চালানো একটা দুরূহ কাজ বলে আহাম্মদ মিয়া পন্ডিত এটাকে একটা সরকারি মঞ্জুরী প্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। স্কুলে শিক্ষাদান, শিক্ষার্থী সংগ্রহ ও স্কুল ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি তিনি তৎকালীন নোয়াখালী শিক্ষা বোর্ডে সরকারি মঞ্জুরীর প্রত্যাশায় তদবির শুরু করেন। তাঁর দৃঢ় প্রত্যয় ও একাগ্রতায় মুগ্ধ হলেও এত স্বল্প সংখ্যক ছাত্র ও খেলার মাঠবিহীন ক্ষুদ্রাকারের স্কুলগৃহ সরকারী মঞ্জুরী পাওয়ার উপযুক্ত নয় বিধায় শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় যে সুপরিসর স্কুল গৃহ এবং খেলার মাঠসহ স্কুলের অন্তত ৮ গন্ডা অর্থ্যাৎ ০.৬৪ শতাংশ জমি থাকতে হবে।

এমতাবস্থায় আহাম্মদ মিয়া পন্ডিত গ্রামের সর্বস্তরের মানুষের কাছে ধর্ণা দিয়েও শর্তানুযায়ী প্রয়োজনীয় জমি সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হন। কিন্তু তিনি তাঁর এই উদ্দ্যোগে ছিলেন অদমনীয়। এলাকার অন্যান্য গণ্যমান্য লোকদের সঙ্গে নিয়ে তিনি তাঁর পিতা মৌলভী আমিন উদ্দীন সাহেবের শরণাপন্ন হন এবং শর্ত্ত মোতাবেক প্রয়োজনীয় জমিদান ও সুপরিসর স্কুল গৃহ নির্মানের প্রস্তাব করেন। মৌলভী আমিন উদ্দিন নিজের প্রতিষ্ঠিত গাছুয়া পাঠশালার নবরূপে আবির্ভাব ঘটাতে ছেলের নিরলস প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়ে গ্রামবাসীদের প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করেন। তিনি নিজ বাড়ির সম্মুখে বর্তমান স্কুলের স্থানে ৮ গন্ডা বা ০.৬৪ শতাংশ জমি দান করে সেখানে গৃহ নির্মাণ করেন।

আহাম্মদ মিয়া শ^শুড় বাড়ির সামনে গাছুয়া আদর্শ স্কুল তাঁর নিজ বাড়ির সামনে পিতার দানকরা জমিতে নির্মিত নতুন ভবনে স্থানান্তরিত করেন এবং গাছুয়া পাঠশালার সঙ্গে একত্রিভূত করে ১৯০৬ সনে গাছুয়া স্কুল নামে নতুন বিদ্যালয় চালু করেন। সেই বছরেই নোয়াখালী শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক গাছুয়া বোর্ড স্কুল (১ম-৪র্থ শ্রেনী পর্যন্ত) নামে স্বীকৃতি পেয়ে সরকারী মঞ্জুরী লাভ করে এবং আহাম্মদ পন্ডিত প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক হিসাবে রেকর্ডভুক্ত হন। সেই সময়ের অনেক নাম না জানা সহযোগী শিক্ষকদের মধ্যে মাষ্টার আবদুল হক মোল্লা, মাষ্টার গফুর এবং মাষ্টার মোজাক্কের আহম্মদ চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

No automatic alt text available.

বোর্ডস্কুলের ৪র্থ শ্রেণী সমাপনের পর ছাত্রছাত্রীদের অধিকতর শিক্ষা গ্রহণ সহজলভ্য ও ত্বরান্বিত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আহাম্মদ মিয়া পন্ডিতের ছোট ভাই মুন্সী মজিবল হক সাহেব গ্রামের অন্যান্য শিক্ষানুরাগী ফখর মাষ্টার, নুর ইসলাম মুন্সী, মৌভলী জয়নাল, জুলফিকার মুন্সী, হাজী জহির আহম্মদ, মৌলভী আবদুল খালেক, সেরাজুল মাওলা চৌধুরী, ফয়েজ আহম্মদ চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম মুন্সী, মফিজ মোক্তার, জহির মুন্সী, হাজী নুরুল হক, চোখধন মিয়া, মোঃ জুলফিকার প্রমূখ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করে ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেনী পর্যন্ত পড়ানোর জন্য মাইনর স্কুল প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেন। গ্রামের মানুষের দাবী ও সার্বিক সহযোগিতায় মুন্সী মজিবুল হক সাহেব নিজস্ব তহবিল ও এলাকায় চাঁদা সংগ্রহ করে গাছুয়া বোর্ড স্কুল বরাবর দক্ষিণ পাশের্^ একখানা ছাপড়া ঘর নির্মান করে ১৯৪৫ সনে গাছুয়া এম,ই, স্কুল (মাইনর স্কুল) চালু করেন।

শ্রেণী ক্রমবিন্যাস, পদ্ধতিগত শিক্ষাদান, সুষ্ঠু পরিচালনা এবং ভবিষ্যত উন্নয়ন স্বার্থে ১৯৪৮ সনে গাছুয়া বোর্ড স্কুল ও গাছুয়া এম, ই, স্কুল একত্রিভূত হয়ে গাছুয়া এম, ই, স্কুল (এটাচ্ড প্রাইমারী) হিসাবে ১ম – ৬ষ্ঠ শ্রেনী পর্যন্ত শিক্ষাদান কার্যক্রম শুরু করে। মহান শিক্ষাগুরু আহাম্মদ মিয়া পন্ডিত প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্বরত থাকা অবস্থায় ১৯৪৯ সনে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে স্কুল পরিচালনায় বিরাট শূন্যতায় সৃষ্টি হয়। তার দুই পুত্র শফিকুল হক ও আনসারুল হক কিছুদিন স্কুলের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সনে আনসারুল হক সাহেব স্কুলের কাজে ইস্তফা দিয়ে কুমিল্লা চলে যান। পরবর্তিতে বিভিন্ন সময়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন বাউরিয়ার মোজাহেরুল ইসলাম মাষ্টার, হরিশপুরের মুর্শিদ মিয়া মাষ্টার, কাঠগড়ের মাকসুদুল আলম মাষ্টার, হুদ্রাখালীর এনামুল হক মাষ্টার এবং গাছুয়ার সামসুল আলম মাষ্টার।

নানা প্রতিকূলতায় ১৯৫২ সনের পরে স্কুলে স্থিতিশীলতা ছিল না। এই টানাপড়নের মধ্যে ৪ বছর কেটে যায়। তৎকালীন স্কুল পরিচালনা পর্ষদের সেক্রেটারী আনসারুল হক সাহেব নতুন মুখের সন্ধান করছিলেন, যিনি হবেন উদ্যমী টগবগে যুবক, যার শিক্ষা পদ্ধতি হবে যুগোপযোগী, প্রশাসনিক ক্ষমতা হবে বলিষ্ঠ, ধারাবাহিক উন্নয়ন কর্মকান্ড হবে গঠনমূলক। তিনি খুঁজেও পেলেন সেই আকাঙ্খিত মুখ। সন্তোষপুর নিবাসী মুন্সী সেরাজুল হক সাহেবের সুযোগ্য সন্তান মাষ্টার মোয়াজ্জেম হোসেন। মাষ্টার মোয়াজ্জেম হোসেন সম্পর্কে আমার চাচা। আমার বাবার আপন জেঠাতো ভাই। সে সময় তিনি সন্তোষপুর জুনিয়র হাইস্কুল কর্মরত ছিলেন। তাঁর বন্ধু হাদিয়ার বাড়ির মাষ্টার নোমানুল হক সাহেবের অনুরোধে এবং মধ্যস্থতায় ১৯৫৬ সনের জানুয়ারী মাসে মাষ্টার মোয়াজ্জেম হোসেন গাছুয়া এটাচ্ড প্রাইমারী স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৫৮-৫৯ পর্যন্ত যথাক্রমে মাষ্টার আলী আকবর, মাষ্টার খালেদ বেলাল এবং মাষ্টার হেদায়েত হোসেন এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসাবে রেকর্ডভুক্ত হলেও মোয়াজ্জেম মাষ্টার কার্যত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।

মোয়াজ্জেম মাষ্টার স্কুলে যোগদানে করে দেখলেন স্কুলের অবস্থা খুবই করুণ। তিন কক্ষ বিশিষ্ট একটি জরাজীর্ণ টিনের ছাপড়া ঘর। বৃষ্টি আরম্ভ হলে ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে ছাতা মাথায় দিয়ে ক্লাস করতে হয় আসবাবপত্র প্রয়োজনীয় টুল টেবিল কিছুই ছিল না বললেই চলে। ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ছাত্র সংখ্যা ছিল ২৫/৩০ জন। তখন স্কুলে কোনো ছাত্রীই ছিল না। স্কুলের ফান্ড শূন্য। শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার মতো অবস্থা ছিল না। স্কুলের সেক্রেটারী আনসারুল হক সাহেব তাঁর ব্যবসায়ের কারণে কুমিল্লা চলে গেছেন। কিন্তু মোয়াজ্জেম মাষ্টার দুর্বিপাকে পড়লেও দিশাহারা হলেন না। স্কুলকে অবলুপ্তির কবল থেকে মুক্ত করার জন্য তিনি স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের দ্বারস্ত হলেন। এদের মধ্যে ছিলেন জনাব ফয়েজ আহম্মদ চৌধুরী, মুন্সী মজিবুল হক, মৌলভী আবদুল খালেক, হাজী জহির আহমদ ও মুন্সী জুলফিকার প্রমুখ। একটি নতুন স্কুল পরিচালনা কমিটি গঠন করা হল। মুন্সী মজিবুল হক সাহেবকে এই কমিটির সেক্রেটারী বানানো হল।

স্কুল গৃহ পুননির্মাণ, শ্রেণী কক্ষ বৃদ্ধিকরণ, এম, ই, স্কুল আপগ্রেডকরণ ইত্যাদি কাজের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। এলাকার কিছু মহৎ ব্যক্তির কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করা হলো। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় এই টাকা ছিল অপ্রতুল। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হল আহাম্মদ পন্ডিত সাহেবের সুযোগ্য পুত্র সন্দ্বীপের একজন কৃতি সন্তান তৎকালীন গণপূর্ত বিভাগে কর্মরত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রফিকুল হক সাহেবের কাছে আর্থিক সাহায্যের প্রস্তাব করা। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রফিকুল হক সাহেবের চাচা মুন্সী মজিবুল হক সাহেবকে উনার কাছে পাঠানো হল। ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল হক সাহেব ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সৎ ছিলেন এবং কখনও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতেন না। একজন ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী প্রকৌশলী হলেও তাঁর নিজস্ব সম্পদ খুব বেশি ছিল না। তবুও তিনি স্কুলের জন্য ১ টন (১৯ বান) ঢেউটিন জোগাড় করে দিলেন। প্রকৌশলী রফিকুল হক সাহেবের দেওয়া টিন ও এলাকা থেকে আদায়কৃত চাঁদার টাকা নিয়ে বহু কষ্টে ৮০ হাত লম্বা দক্ষিণমুখী একটি টিনের ঘর করা হল, একই সঙ্গে শ্রেণীকক্ষও বৃদ্ধি পেল। শুরু হল স্কুলকে জুনিয়র হাই স্কুলে উন্নীত করার কার্যক্রম। এলাকার গণ্যমান্য বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী লোকদের পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষা বিভাগের ১৯৫১ সনের এক আইন মোতাবেক ১৯৫৭ সনে গাছুয়া জুনিয়য় হাইস্কুল নামে ৭ম – ৮ম শ্রেণী চালু করা হয়। কিন্তু নতুন সুপরিসর স্কুল গৃহ, উৎসাহী ছাত্রছাত্রী এবং নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের নিয়ে এই স্কুলের প্রকৃত স্বীকৃতি মেলে আরও দুই বছর পরে ১৯৫৯ সনে। ইতিমধ্যে মোয়াজ্জেম মাষ্টার প্রয়োজনীয় উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে ১৯৬০ সনে পূর্ণ মর্যাদার প্রধান শিক্ষকের পদ অলংকৃত করেন।

২/৩ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর স্কুলের ভাগ্যে নেমে এল এক বিরাট বিপর্যয়। হঠাৎ সাইক্লোনের তান্ডবলীলায় নব নির্মিত স্কুল গৃহটি লন্ডভন্ড হয়ে পাশের ডোবায় নিমজ্জিত হয়ে গেল। স্কুলের ভিটা ছাড়া আর কোনে কিছুরই অস্তিত্ব রইল না। প্রধান শিক্ষক মোয়াজ্জেম মাষ্টার এবং স্কুল কমিটির সেক্রেটারী মুন্সী মুজিবুল হক সাহেব দিশাহারা হয়ে গেলেন। কিন্তু তাঁরা সাহস হারালেন না। স্কুলের কার্যক্রম বন্ধ হতে দিলেন না। ক্লাস চলতে থাকল মুন্সী মুজিবুল হক ও আনসারুল হক সাহেবদের বাড়ির বৈঠক খানায়। দারুণ হতাশাগ্রস্থ মোয়াজ্জেম মাষ্টার হঠাৎ আশার আলো দেখতে পেলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আর্থিক সাহায্যের জন্য তিনি তাঁর চাচাত ভাই অর্থাৎ আমার বাবা জনাব ওবাইদুল সাহেবকে অনুরোধ করবেন। কিন্তু একা এগুতে সাহস পাচ্ছিলেন না এই ভয়ে যে আমার বাবা ছিলেন প্রচন্ড কড়া মেজাজের মানুষ এবং দুকথা শুনিয়ে তাঁকে বিফল মনোরথ করতে পারেন। অগত্যা তিনি মুন্সী মুজিবুল হক সাহেবের শরণাপন্ন হলেন। মুন্সী সাহেব ছিলেন আমার মায়ের আপন খালু। মোয়াজ্জেম মাষ্টার ভাবলেন আমার আব্বা খালু শ^শুরের কথা সহজে ফেলতে পারবেন না।

যেই কথা সেই কাজ। মুন্সী মজিবুল হক সাহেব মোয়াজ্জেম মাষ্টারসহ আমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে রাজী হলেন কিন্তু সঙ্গে গাছুয়ার চেয়ারম্যান মৌলভী ফয়েজ আহম্মদ চৌধুরী, মৌলভী আবদুল খালেক, হাজী জহির আহম্মদকেও সাথে নিয়ে নিলেন। পরের ঘটনা আমার স্পষ্ট মনে আছে। তাঁরা চট্টগ্রামের নাসিরাবাদে আমার বাবার সরকারী বাসস্থানে হাজির হলেন। আমার বাবা তখন হাউজিং এন্ড সেটেলমেন্ট ডিপার্টমেন্টে এস, ডি, ও, হিসাবে কর্মরত ছিলেন। প্রসঙ্গগত উল্লেখ করি ঐ চাকুরীতে থাকাকালীন সময় আমার বাবা হালিশহর আবাসিক এলাকা যেটা এখন সন্দ্বীপবাসীদের প্রধান আবাসস্থল তার উন্নয়ন কাজে নিয়োজিত ছিলেন। বাসায় সবাই উঠলেন বটে কিন্তু ভয়ে আমার বাবাকে কেউ তাঁদের আসার কারণ বলতে পারলেন না। গ্রাম থেকে হঠাৎ এত লোক এসে যাওয়াতে আমাদের বেশ অসুবিধাই হচ্ছিল। আমরা কয়েক ভাই রাতে পাশের বাড়িতে গিয়ে ঘুমাতাম। ২/৩ দিন পরে খাওয়ার টেবিলে ফয়েজ আহম্মদ চৌধুরী স্কুলের তৎকালীন দুর্দশার বর্ণনা দিয়ে আমার আব্বার কাছে স্কুলটি পাকা করে দেওয়ার প্রস্তাব করলেন। কিন্তু স্কুল পাকা করে দেওয়ার মতো টাকা-পয়সা আমার বাবার কাছে কোনো কালেই ছিল না। গাছুয়া স্কুলের সৌভাগ্যে দৈবক্রমে ঐ সময় আমার বাবার হাতে কিছু পয়সা এসে গেল। সেটা একটা ইতিহাস।

চাকুরীর ফাঁকে ফাঁকে ও ছুটির দিনগুলোতে আমার বাবা অলসভাবে সময় না কাটিয়ে শহরের অনেক ধনী লোকদের বাড়ির ডিজাইন, প্ল্যান, এস্টিমেট এবং তদারকি করে কিছু পয়সা সঞ্চয় করে ১৯৫৪ সনে নাসিরাবাদের একটা দুর্গম এলাকা যেটা এখন জি.ই.সির মোড় হিসাবে পরিচিত সেখানে জমি কিনে ১৯৬০ সনের দিকে একটা বাড়ি বানিয়েছিলেন। কিন্তু এশিয়ান হাইওয়ে বানাবার জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আমাদের বাড়িটা হুকুম দখল করে আমার বাবাকে বেশ কিছু ক্ষতিপুরণ দেন। ঐ টাকা দিয়ে আমার বাবা তখন তাঁর কয়েকজন বন্ধুসহ ঢাকায় পাকিস্তান সিরামিক ইন্ড্রাষ্ট্রি করার জন্য বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করছিলেন। গ্রামের দরিদ্র, অবহেলিত ও বঞ্চিত দুঃখী ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য গ্রামের শিক্ষানুরাগী গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অনুরোধ তিনি ফেলতে পারলেন না। সিরামিক ইন্ডাষ্ট্রির শেয়ার কেনার টাকা থেকে একটা বিরাট অংশ তিনি গাছুয়া স্কুলের জন্য দান করতে সম্মত হলেন। শুধু তাই নয় স্কুল ভবনের ডিজাইন, এস্টিমেট, ঠিকাদার ও মিস্ত্রী নিয়োগ থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম শহরের বিত্তবান ব্যক্তিদের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য সংগ্রহ এবং বিল্ডিং তৈরির কাজ তদারক করার ভারও নিজে নিলেন।

আমার বাবার এই বদান্যতায় অভিভূত হয়ে স্কুল কমিটি এবং গ্রামবাসী তাঁর নামে স্কুলের নামকরণ করার প্রস্তাব করলেন। কিন্তু আমার বাবা জনাব ওবাইদুল হক সাহেব কিছুতেই তাঁর নামে স্কুলের নামকরণ করতে সম্মত হলেন না। অবশেষে স্কুলের পরিচালনা কমিটি স্কুলের পূবর্তন নাম গাছুয়া জুনিয়র হাই স্কুল পরিবর্তন করে ওবাইদুল হক সাহেবের পিতা মুন্সী আবদুল খালেকের নামে আবদুল খালেক জুনিয়র হাই স্কুল নামকরণ করার প্রস্তাব করেন। ১৯৬৩ সনে স্কুলের কার্যকরি সভায় এই প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে ও সানন্দচিত্তে এই প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।

১৯৬৪ সনে ১৪ কক্ষ বিশিষ্ট স্কুলের দ্বিতল ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। এটাই সন্দ্বীপের প্রথম দ্বিতল বিশিষ্ট স্কুল ভবন। স্কুল কমিটির উৎসাহ ও উদ্দীপনা আরও বেড়ে গেল। ১৯৬৫ সনে স্কুল পরিচালনা কমিটি স্কুলটিকে হাইস্কুল করার নিমিত্তে মানবিক শাখায় নবম শ্রেণী চালু করে। সে মতে বোর্ড শর্তাধীনে অনুমতিও দান করে। এ, কে, জুনিয়ার স্কুল হাই স্কুলে উন্নীত হল। স্কুলের নতুন ভবনের উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা স্কুল পরিদর্শক। আবারও স্কুলের নামকরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হল এবং সভা থেকে জনাব ওবাইদুল হক সাহেবের নামে স্কুলের নামকরণ করার জোর দাবী উঠল। কিন্তু তিনি এতে আবার বাধা দিলেন এবং আগের মতোই তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় রইলেন। অবশেষে স্কুল পরিদর্শক নিজেই আমার পিতামহের নামে স্কুলের নাম আবদুল খালেক একাডেমী রাখার প্রস্তাব করেন। সভায় এই প্রস্তাব সর্বান্তকরণে গৃহীত হয়। তখন থেকে সংক্ষেপে স্কুলের নাম হয় এ, কে, একাডেমী।

Image may contain: one or more people, sky, grass, house, outdoor and nature

১৯৬৭ সনে এ,কে, একাডেমী থেকে প্রথমবার ১০ জন ছাত্র-ছাত্রী কুমিল্লা বোর্ডের এস.এস.সি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে। ছাত্রছাত্রীরা সবাই ভাল ফলাফলের সাথে উত্তীর্ণ হল। এটা স্কুলের জন্য বয়ে আনল সাফল্যের ফল্গুধারা। ছাত্র-শিক্ষক সবাই আনন্দে উদ্বেলিত। গাছুয়াবাসী খুশীতে আত্মহারা। খবর সন্দ্বীপে ছড়িয়ে পড়ল। অগ্রগতির সাথে বিজ্ঞান ও পর্যায়ক্রমে বাণিজ্য শাখা খোলা হল। সন্দ্বীপের অন্যান্য অঞ্চল এমনকি সন্দ্বীপের বাহির হতেও ছাত্র আসা শুরু হল। ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে স্কুলের পরিধি বাড়ানো, খেলার মাঠ এবং ছাত্রাবাস নির্মাণ অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ল। নিজের জায়গা না থাকায় মুন্সী মজিবুল হক তাঁর ভ্রাতুষপুত্র থেকে স্কুল সংলগ্ন একটি জমি খরিদ করে সেটা স্কুলকে দান করেন। খেলার মাঠ নির্মাণের জন্য গাছুয়ার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি জনাব ফয়েজ আহম্মদ চৌধুরী স্কুলের অনুকূলে ৯ গন্ডা বা ০.৭২ শতাংশ জমি ক্রয় করে দেন। সন্দ্বীপের প্রাক্তন এম.পি. মরহুম মোস্তাফিজুর রহমান সাহেবের আর্থিক সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয় স্কুলের ছাত্রাবাস।

১৯৯৭/৯৮ সনের দিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এতই বৃদ্ধি পেল যে স্কুলে ক্লাস চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। তাছাড়া যুগোপযোগী শিক্ষা পদ্ধতি চালু করার জন্য কম্পিউটার চালু করার প্রয়োজনও অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। এ সব আমার বাবার দৃষ্টিগোচর হলে তিনি সন্দ্বীপে তাঁর যে নিজস্ব ভূমি সম্পত্তি ছিল তার সমস্ত বিক্রি করে স্কুল গৃহটিকে ত্রিতল ভবনে উন্নীত করেন। আমার বাবার অসুস্থতা এবং মৃত্যুর পর আমার অনুজ সারোয়ার হাসান জামীল স্কুলের দায়িত্বভার গ্রহণ করে। বর্তমানে তার সুষ্ঠু পরিচালনায় এবং সন্দ্বীপের আপামর ও সেবাব্রতী ব্যক্তিদের সহায়তায় স্কুলের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প চলছে।

Image may contain: 11 people, people standing


লেখক : ড. সারোয়ার জামীল। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা এবং সন্দ্বীপের এ. কে. একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা মরহুম ওবাইদুল হক’র জেষ্ঠ্য পুত্র। (স্থায়ীভাবে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত)।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন