আজ রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ ইং, ১০ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



নিসর্গের কবি আসাদ মান্নান

Published on 04 November 2017 | 6: 43 am

 

:: মোসলেহ্ মহসিন ::


সমুদ্রের নোনা জলে বেড়ে উঠেন কবি আসাদ মান্নান। জন্ম ৩ নভেম্বর ১৯৫৭ সালে সাগর বিধৌত সন্দ্বীপের সাতঘরিয়া গ্রামে। পিতা আসাদউল হক এবং মাতা ফয়েজা খাতুন। সমুদ্রচিলের ডানার স্বপ্নে, নদীর এঁকে বেঁকে যাওয়া নর্তকীর মাতাল নৃত্যে, বালির চিকচিক সোনা রোদে শব্দনিয়ে খেলতে খেলতে বেড়ে উঠা তাঁর। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক সম্মান সহ স্নাতকোত্তর। কর্মজীবনে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসিন। ব্যক্তিগতজীবনে দুই মেধাবী পুত্রকন্যার জনক।

চর্যাপদের আদি কবি মিন নাথ এবং ষোড়শ শতকের কবি আবদুল হাকিমের জন্মস্থান যে সন্দ্বীপ বলা হয় সে সন্দ্বীপের সমুদ্রের নোনা জল যে গায়ে মেখেছে সেও কবি হয়ে উঠে। আসাদ মান্নান সেখানে এখন শক্ত উপমা। শৈশবেই সহচর্য পেয়েছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রথম কন্ঠ সৈনিক আবুল কাসেম সন্দ্বীপের।

৬ষ্ঠ শ্রেনিতে পড়া অবস্থায় স্কুলবার্ষিকীতে ‘নতুন চাঁদ’ কবির প্রকাশিত প্রথম কবিতা। কবির কাব্যগ্রন্থ সমূহের মধ্যে সূর্যাস্তের উল্টোদিকে (১৯৮১), সৈয়দ বংশের ফুল (১৯৮৩), তুমি মৃত অজগর কোথায় পালাবে (১৯৯০), দ্বিতীয় জন্মের দিকে (১৯৯৩), ভালোবাসার আগুনের নদী (১৯৯৫), সুন্দর দক্ষিণে থাকে (২০০৪), কাফনের ছায়ালিপি (২০০৪), তোমার কীর্তন, নির্বাচিত কবিতা (২০০৪), যে-পারে পার নেই সে-পারে ফিরবে নদী, প্রেমের কবিতা, হে অন্ধ জলের রাজা, মরুভূমি স্বপ্নে দ্যাখে জল, জলের সানাই উল্লেখযোগ্য।

আসাদ মান্নান স্বভাবে রোমান্টিক, চরিত্রে আধুনিক কবি। এছাড়া কবি ‘তোমার কীর্তন’ কাব্যে বৈষ্ণবীয় ভাবকে আধুনিক ভঙ্গিতে রচনা করতে দেখা গেছে।

আধুনিক বাংলা কবিতার দুই শেষ্ঠ কবি শামসুর রাহমান এবং আল মাহমুদ। কবি শামসুর রাহমান কবি আসাদ মান্নানকে নিয়ে লিখেছেন, “আমাদের কাব্যক্ষেত্রে একটি নতুন কন্ঠস্বর ধ্বনিত হচ্চ্ছে। এই কবি হাউই-এর ধরনের খানিক জ্বলেই মিলিয়ে যাবার কেউ নন।” অপরদিকে আল মাহমুদ অপকটে স্বীকার করেছ “আসাদ মান্নানের কবিতা আমার হৃদয় স্পর্শ করেছে।”

নিসর্গ কবি আসাদ মান্নানের কবিতা অনিবার্য উপসঙ্গ। নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বৃক্ষ, নীলিমা, অন্ধকার, মেঘমালা -এরকম নানা অনুসঙ্গ উঠে উঠেছে। বিশেষ করে কি প্রেম কি দ্রোহ প্রায় সব কবিতাই সমুদ্রসিঞ্চিত নদীনিকাশিত। যেমন- “স্বপ্ন ছিলো সূর্যটাকে ন্যাংটো করে নিয়ে যাবো নদীর কিনারে,/ তারপর স্বপ্নের আগুনে তার মুখটাকে পুড়ে পুড়ে খাব;”। কিংবা, “রক্তেই সমুদ্র জ্বলে; তার সঙ্গে ধরলার মেয়ে / নক্ষত্রের মায়াকুঞ্জে জ্বালিয়েছে মোমেরজীবন:”।

আসাদ মান্নানের কবিতা যেনো উপমার রাজ্য। অসংখ্য উপমা প্রতিটি কবিতায়। ‘চাঁদের ওলান’, ‘লাটিম জীবন’, ‘নদীর জরায়ু’, ‘ঘুমের মলম’ এরকম অজস্র কবিতা জুড়ে।

কবি ‘কিশোরীর স্তন মেঘের ভেতর থেকে নতুন চরের মতো একা জেগে উঠা খরার নদীর বাঁকে।’ এমন অনন্য চিত্রকল্পে কবিতা সাজিয়েছেন।

কবির কবিতার বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে প্রেম ও বিরহ। রয়েছে রোমান্টাকিতা, তাও নানা উপমায়। যেমন, “আলোটা নিভিয়ে দাও : খুলে ফেলো দিনের পোশাক/শরীরে জড়তা কেনো? টান টান শুয়ে পড়ো মেয়ে,/ না, এভাবে নয় লক্ষী! হাঁ, ওভাবেই থাকো, / দেহের উজান বেয়ে বেয়ে যাক যৌবনের নদী।” কিংবা বিষাদ আসে “অন্ধকারে ডুকরে কাঁদে উত্তর তিরিশ/বয়সের ম্লান যুবা।”

কবি প্রেম কিংবা বিরহতাপে বাঙালীর রাজনৈতিক চেতনা, মানবতাবোধ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা বোধ থেকে সরে যান নি। “আমার স্বদেশ যেনো কেঁদে উঠে ওই মিউমিউ ডাকে।” বা, “অবশেষে কারফিউ আক্রান্ত হলো আমাদের প্রিয় স্বাধীণতা/রবীন্দ্ররচনাবলী নজরুলের গানগুলো আর ওই জাতীয় আকাশ।” অথবা, “কি হবে শপথ নিয়ে মাটি ও মায়ের! যখন নদীকে দেখি মোহনার চরে মাটি খেয়ে ছুটে যাচ্ছে মায়ের কবরে; গোলাপঝাড়ের নিচে অন্ধকারে ধীরে ধীরে গজিয়েছে নাগিনীর মুক্তি নয়, মৃত্যুর ফতোয়া ওরা ফেরি করে আঁতুড় মহলে।” কিংবা “মা গো! আর কোনো শোক নয়,/এই দ্যাখো, শোক জ’মে জ’মে পাথড় হয়েছে;/ মা গো! আর কোনো অশ্রু নয়,/ এই দ্যাখো, অশ্রু জ’মে জ’মে আগুন হয়েছে।”

বিশ্বরাজনীতি, সাম্রাজ্যবাদ নিয়েও কবি সোচ্চার। “মহান পোপের হাতে যিশুহীন বাইবেল কাঁদে।”

এতকিছুর পরও কবি তার জন্মস্থানকে ভুলে যাননি। তিনি সবকিছুর উপরে জন্মস্থানকে মূল্যায়ন করেছেন এভাবে- “আমার পায়ের নিচে লেগে থাকে সন্দ্বীপের কাদা-কী লাভ আমার শুনে ইরাকের যুদ্ধের/খবর, বরং আমাকে দাও সে- খবর আমার যেসব পূর্ব পুরুষ শুয়ে আছে পলির/ পাটিতে, তাঁরা কি এখনো শুয়ে আছে, নাকি ভেসে গেছে স্রোতে?”

কবি আসাদ মান্নান কাব্যচর্চার স্বীকৃতি স্বরুপ ১৯৭৭ ও ১৯৭৮ সালে শ্রেষ্ঠ তরুন কবি হিসাকে পরপর দুবার ‘বাংলাদেশ পরিষদ সাহিত্য পুরস্কার’, ১৯৭৯ সালে ‘কর্ণফুলী সাহিত্য পদক’ ও ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদ সম্মাননা’ এবং ২০০৭ সালে ‘জীবনানদাশ পুরস্কার’ ‘কবিকুঞ্জ পদক সম্মাননা’ ‘রাজশাহী সাহিত্য পরিষদ পদক্ষেপ ও সম্মাননা’ অনুপ্রাশ কবিতা পদক’ ‘কুবঞ্চ পদক’ লাভ করেন।

আজ কবির জন্মদিন, কবিকে শুভেচ্ছা।
“শুভ জন্মদিন প্রিয় কবি আসাদ মান্নান।”


৩ নভেম্বর কবি আসাদ মান্নান এর জন্ম দিনে- মোসলেহ্ মহসিন (ঐতিহ্য সাহিত্য পরিষদ) এর ফেসবুক ষ্ট্যাটাস থেকে


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন