আজ শুক্রবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৮ ইং, ১৪ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



নির্দলীয় নিরপেক্ষ মানুষ কোথায় পাবেন ?

Published on 25 October 2017 | 7: 25 am

:: আকতারুজ্জামান মোহাম্মদ মোহসীন ::

নির্দলীয় নিরপেক্ষ মানুষ কোথায় পাবেন ?
নির্দলীয়, নিরপেক্ষ মানুষ রয়েছে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে । কিন্তু অনেক কিছু করনীয় আছে রাজনৈতিক দলগুলোর । তাঁরা কি তাদের সেই বিসাক্ত ছোবল তুলে নেবেন, যার কারণে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ মানুষ মিলছে না ?
গ্রামের নির্বাচন থেকে দলীয় রাজনীতি তুলে নেন । সেখানে একই পরিবারের সদস্য আলাদা নির্বাচন করবেন, কেউ রাজনীতির লেজুর বৃত্তি করবে না । পরিবারের কোমল মতি শিশুটি রাজনীতির নোংরামি দেখতে পাবে না । সে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ মানুষ হিসাবে বড় হবে । দেশের উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে দলীয় রাজনীতি তুলে নেন । তাঁরা ছাত্র রাজনীতি করবে, কোন দলের লেজুর বৃত্তি করবে না । তাঁরা লেজুর ভিত্তির রাজনীতি খুজে পাবে না বলে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ মানুষ হিসাবে বড় হবে । তাঁরা শিক্ষা শেষে যে যার পেশায় চলে যাবে, কেউ কারও সাথে রাজনীতির লেজুর নিয়ে যাবে না । সরকার কোন দলের থাকে না । কারন আমাদের সব রাজনীতিক আর কিছু না জানলেও আব্রাহাম লিঙ্কনের ডেমোক্রেসির সংজ্ঞা জানেন “Government by people, of the people and for the people” “সরকার জনগণের দ্বারা, সরকার জনগণের জন্য এবং জনগণের সরকার” । নির্বাচনে কোন দল সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু সরকার কোন দলের থাকে না । সরকার হয়ে যায় “সরকার জনগণের দ্বারা, সরকার জনগণের জন্য এবং জনগণের সরকার” । কিন্তু আমাদের কোন সরকার এটা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না তাঁরা শপথের কথা কেউ একবার মনে করে থাকেন ?
ওটা নামমাত্র অনুষ্ঠান ছাড়া মুল্যবান ভাবতে আমরা এখনও দেখিনি । এটা আমাদের জন্য চরম লজ্জার, দুঃখের এবং কষ্টের । কারন আমাদের অর্থে দেশ চলে, সরকার চলে । সরকার কখনও আমাদের কথা ভাবে না । তাঁরা চিরকাল তাদের ইচ্ছা মত যখন যা করার তাই করে থাকেন । আমরা সাধারণ মানুষ কেবল নিরব দর্শক আর শ্রোতা । কখনও বা রাজনীতিকদের বলির ফাটা । কেউ পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে থাকছি, কেউ লাশ হয়ে কবরে যাচ্ছি ।
দলীয় রাজনীতি মুক্ত ছাত্ররা যখন দেশের ভবিষ্যতের দায়িত্ব গ্রহণ করবে, তখন নির্দলীয় নিরপেক্ষ হয়ে দেশ পরিচালনা করতে পারবে । দেশ পরিচালনায় এসে যদি তিনি কারও প্রতি অনুরাগ/ বিরাগ পোষণ করবেন না । উকে তিনি কারও প্রতি অনুরাগ/ বিরাগ পোষণ করে থাকেন তবে তিনি তার শপথ ভঙ্গ করবেন । নিতান্তই বেঈমান না হলে প্রজাতন্রে রর কোন কর্মকর্তার শপথ ভাঙ্গার প্রয়োজন হবে না । সরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সকল ব্যক্তিবর্গ “সরকার জনগণের দ্বারা, সরকার জনগণের জন্য এবং জনগণের সরকার” ন্যায় সকলের জন্য সমান । কোন দলের জন্য অনুরাগী/ বিরাগী হওয়ার কথা নয় । কেন না তিনি কোন দলের দ্বারা নির্বাচিত কিংবা পরিচালিত হওয়ার কথা নয় । তিনি প্রজাতন্ত্রের আইনে পরিচালিত হয়ে থাকেন । প্রজাতন্ত্রে সরকার শুধু পরিচালনাকারী দলের অর্থে পরিচালিত হয় না । সরকার পরিচালিত হয় বিরোধী দল, অন্যান্য দল, ব্যবসায়ী, পেশাজীবি, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, কৃষক, দিন মজুর, ভিক্ষুক, শিশু, কিশোর, যুব, বৃদ্ধ সকলের করের টাকায় । সুতারাং সরকারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কোন অবস্থাতেই কোন দলের হতে পারেন না । তিনি যদি কারও প্রতি অনুরাগী/ বিরাগী হয়ে থাকেন তবে তিনি সব চেয়ে বড় বিশ্বাস ঘাতক হওয়ার কথা । কর্মস্থলে বসে রাজনীতি করলে যদি চাকরী হারাতে হতো তবে এমন অভ্যাসই থাকতো না । কিন্তু এখন আমরা তার বিপরীত দৃশ্য দেখতে অভ্যস্ত । বরং সরকারী প্রতিষ্ঠানে যত বেশী নিজেদের দলীয় লোক দেখতে পাই, তাদের তত বেশী পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকি । তাহলে কি করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ মানুষ পাবেন ?
কেবল চিৎকার করবেন, একজনও খুজে পাবেন না । এটা আপনাদেরই আবাদ করা মাঠের ফসল ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবি প্রতিষ্ঠান, সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান রাজনীতি মুক্ত থাকার কথা । তাহলে সেখানে নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তিও থাকার কথা । সেখান থেকে আমরা দেশের ক্রান্তিকালে নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে সমস্যা উত্তরণ করতে পারি । নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তির অভাবতো হবেই না, বরং আমরা যাকে চাইব তাকেই সমস্যা সমাধানের জন্য নির্ভরযোগ্য ভাবতে পারব । সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে যদি দলীয় রাজনীতি বর্জন করা যেত তাহলে আমরা আরও মেধাবী মানুষ নিয়োগ দিতে পারতাম । প্রত্যেক সরকার দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু অপদার্থকে নিয়োগ দিয়ে থাকে বলে পুরো প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে মেধাশুন্যতার দিকে এগুচ্ছে । অনেক সময় স্বাভাবিক জ্ঞানবুদ্ধির লোকও পাওয়া যায় না । প্রজাতন্ত্রের সদস্য হিসাবে তখন খুব কষ্ট লাগে । তাছাড়া দলীয় ভাবে নিয়োগ/ কাজ করার কারণে অনেক ব্যক্তিকে একটা সরকারের সময়কালে ওএসডি করে রাখেন । যার কারণে বিনা কাজে বেতন পরিশোধ করায় রাজস্বের অনেক লোকশান গুনতে হয় । সেই রাজস্ব আসে বিরোধী দল, অন্যান্য দল, ব্যবসায়ী, পেশাজীবি, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, কৃষক, দিন মজুর, ভিক্ষুক, শিশু, কিশোর, যুব, বৃদ্ধ আপামর জনসাধারনের কাছ থেকে । অথচ সব দল নির্বাচিত হয়ে সরকার পরিচালনা করতে এসে নিজেদের খেয়াল খুশী মত এভাবে ওএসডি অপচয় করেই থাকেন ।
সরকারের একজন কর্মকর্তা নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে অবসর পর্যন্ত দীর্ঘদিন বেতন ভাতা নিয়ে থাকেন । দলীয় রাজনীতির কারণে সমস্ত কুলঙ্গারদের জন্য বার বার এভাবে রাজস্বের অপচয় করতে হয় । দেশে তৈরি হয় মেধা শুন্যতা, পিছিয়ে যেতে থাকে সমস্ত জাতি । এর দায়ভারও আমাদের দেশের রাজনীতিকদের নেয়ার কথা, কিন্তু দেশের মানুষের এসব ভাবার সময় যেমন নেই, তেমনই অনেক জনগণ এসব ভাল করে বুঝেনও না । নয়তো আমাদের দেশের রাজনীতিকদের চলতে কষ্ট হতো । ব্যবসায়ী, সাংবাদিকরাও নিজেদের নিরাপদ রাখতে কোন না কোন রাজনীতির লেজ ধরতে বাধ্য হন । কারন নয়তো তাকে চাদাবাজী, সন্ত্রাসী, ঘুম, দখলহীন, মুক্তিপণ আরও কত কিছু আছে যা হয়তো আমি নিজেও জানি না, এমন অনেক কিছুর শিকার হতে হবে । তাই তিনিও রাজনীতির লেজুর হয়ে পরেন বা বয়ে বেড়াতে বাধ্য হন । ফলে আমাদের দেশে আর কোন নির্দলীয় নিরপেক্ষ লোক পাওয়া যায় না । যার দিকে দৃষ্টিপাত করবেন তারই কোন না কোন ভাবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খুজে পাওয়া যায় । বেশী না হউক ছাত্র জীবনে তমুক দলের মিছিলে তাকে দেখা গেছে । বিভিন্ন পেশা সংগঠনের নির্বাচনে তমুক দলের সাথে জড়িত থাকার কলঙ্ক বয়ে বেড়ান ।
আমাদের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, বাজার, ক্লাব, সংগঠন কোনটি আপনাদের রাজনীতির আগুন থেকে বেঁচে আছে ? মিল কারখানার শ্রমিক, হোটেল রেস্টুরেন্ট শ্রমিক, রিক্সা ভ্যান শ্রমিক, মাছ – তরকারী, মুদি, শ্রমিকও না । কারন তাকেও ট্রেড ইউনিয়ন করতে হয় কোন না কোন রাজনৈতিক দলের ব্যানারে । অথচ ওটা ছিল ট্রেড ইউনিয়ন, কোন রাজনৈতিক সংগঠন নয় । সেখানেও আপনাদের অবাধ বিচরণ ঘটেছে । কেউ বাঁচতে চাইলেও আপনারা তাদের বাঁচতে দেননি । দলীয় রাজনীতির বদল হয়নি, বদল হয়েছে সময় আর দলের । বর্তমানে দেশের অনেক দায়িত্ব সম্পন্ন, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান আছে যা কোন অবস্থাতেই রাজনীতি করন উচিত হয়নি, আপনারা তাও রাজনীতিকি করন করেছেন । আপনাদের সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে কেবল আমাদের মত সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে । আপনাদের আধিপত্য, আপনাদের প্রভাব বিস্তার, আপনাদের নেতৃত্ব বজায় রাখার জন্য আপনারা রাজনীতিকি করন করেননি এমন কোন জায়গা আছে দেখাতে পারবেন ? শুরু করেছেন সেই……….থেকে যা অব্যাহত ভাবে চলছেই । এতদিন শুধু দলের বদল হয়েছে, তার বেশী কিছু হয়নি । আপনারা রাজনীতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে পৌঁছে দিয়েছেন যে, গনি মিয়া একজন কৃষক, তাকেও নির্দলীয় নিরপেক্ষ বলবেন না । কারন সেখানেও রাজনীতি পৌঁছে গেছে, নয়তো তার ছেলে রাজনীতির সাথে জড়িত । তবে কে হবেন আমাদের ক্রান্তিকালের নির্দলীয় নিরপেক্ষ মানুষ ? কে শুনবে আপামর মানুষের দুঃখ, কষ্টের কথা ?
আমাদের কষ্ট শুনার যেমন মানুষ নেই, তেমনই আপনাদের সমস্যা সমাধানের জন্যও মানুষ নেই । ঐ যে আমাদের মত সাধারণ চা পোষা মানুষের কেবল ভোগান্তি ছাড়া আর কিছু নয় ।
কোথা থেকে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ লোক আসবে, এমন কোন জায়গা আছে ?
আপনারা রান্না ঘর থেকে সচিবালয় পর্যন্ত, পাঠশালা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ থেকে মন্দির, বাজার থেকে মেলা, বাড়ি থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত ইত্যাদি সব জায়গায় রাজনীতি ছড়িয়ে দিয়েছেন । সুতারাং দেশের লোকগুলো দেশের এসব জায়গায়তো বসবাস করেন । যেখানে দেশের সব জায়গায় রাজনীতি বিরাজ করছে, সেখান থেকে নির্দলীয় নিরপেক্ষ লোক আশা করেন কি করে ?
আপনারা পারবেন দেশের রাজনীতিকে জাতীয় পর্যায়ে রেখে সারা দেশ থেকে রাজনীতি গুটিয়ে আনতে ?
আপনারা কি পারবেন আপনাদের প্রতিহিংসা ভুলে আমাদের সকল প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনীতিকে গুটিয়ে নিতে ?
আপনারা কি পারবেন আপনাদের জাতীয় নেতা/ কর্মীর মাঝে রাজনীতি সীমাবদ্ধ রেখে সারা দেশ থেকে রাজনীতি অপসারণ করতে ?
আপনারা আমাদের রান্না ঘর থেকে সচিবালয় পর্যন্ত, পাঠশালা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ থেকে মন্দির, বাজার থেকে মেলা, বাড়ি থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত ইত্যাদি সব জায়গাকে রাজনীতি মুক্ত করতে ?
যদি এসব রাজনীতি মুক্ত করে দেন তবে দেশের জন্য কল্যাণ হবে, জাতির জন্য মঙ্গল হবে । তবে কিছু দিন পর দেশে নির্দলীয় নিরপেক্ষ মানুষের অভাব হবে না । আমি চিৎকার করে বলতে পারব আমার শিক্ষক সাহেব একজন নির্দলীয় নিরপেক্ষ মানুষ । উকিল সাহেব বলবেন আমার বিচারক সাহেব কোন দলীয় মতাদর্শের নয়, তিনি নির্দলীয় নিরপেক্ষ মানুষ । আপনারা কেউ খুজে না পেলেও এমন আরও কত লোক তখন আপনাদের নির্দলীয় নিরপেক্ষ লোক খুজে দিতে পারবেন ।


Advertisement

আরও পড়ুন