আজ সোমবার, ১৮ জুন ২০১৮ ইং, ০৪ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



মৃত্যুঞ্জয়ী মহান পুরুষ দ্বীপবন্ধু মুস্তাফিজুর রহমান

Published on 22 October 2017 | 7: 47 pm

::কাজী মঞ্জু ::


মুল ভূখণ্ড হতে বিচ্ছিন্ন সন্দ্বীপ। রাক্ষসী মেঘনার করাল ঘ্রাসে ক্রমশ বিলিন হচ্ছে আয়তন, হারিয়ে যাচ্ছে উর্বর ভূমি। প্রসবিত সন্তানের কল্যাণে গৌরবময়, ইতিহাস ঐতিহ্যে অনন্য উপজেলা “সন্দ্বীপ”। এই দ্বীপে যুগে যুগে জন্মেছে ক্ষণজন্মা মহান পৌরুষ। প্রিয় আতুর ঘর সন্দ্বীপ এক কথায় রত্নপ্রসবিনী।

প্রসবিত অনন্য রত্ম দ্বীপবন্ধু মুস্তাফিজুর রহমান। মাতা বিবি আমেনার কোল জুড়ে ১৯৪৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর সন্দ্বীপ উপজেলা বাউরিয়া ইউনিয়নের কুচিয়া মোড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মৌলভী হাবিবুর রহমানের একমাত্র পুত্রসন্তান মুস্তাফিজুর রহমান।

প্রকৃতির ধুলা-বালি গায়ে মেখে, সতেজ আলোবায়ু সেবন করে গ্রামবাংলার পোড়া মাটির বুকে মা-বাবার স্নেহরসে বেড়ে উঠেন। প্রাথমিক স্তরে সরকারী বৃত্তি লাভের মধ্যে দিয়ে মেধার স্বাক্ষর প্রমাণ করেন। দৈন্যদশার সাথে যুদ্ধ করে মুছাপুর বদিউজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয় হতে মাধ্যমিক ও ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রাম সরকারী কমার্স কলেজ থেকে কৃতিত্বের সহিত স্নাতক ডিগ্রীলাভ।

ডিগ্রীলাভের পর একটি দিন ও অপব্যয় করেননি। জীবিকার তাড়শে খুঁজে নিলেন প্রথম কর্মস্থল বহুজাতিক কোম্পানি জেমস ফিনলে,চট্টগ্রাম। পেশাগত জীবনে অধ্যবসায়, সংযম,পরিশ্রম, মেধাশক্তির সমন্বয় সাধন করে নিজেকে প্রতিনিয়ত ভেঙে চুড়ে অনাগত ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তুলেন। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৫ সালে ইউনাইটেড ব্যাংক লিঃ এর কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান। বছর ঘুরতে না ঘুরতে অসাধারণ দক্ষতা ও যোগ্যতার কল্যাণে পরিচালনা পর্ষদের নজর কাড়েন। খুলে গেলো ভাগ্যযট। হাতে এলো শ্রম ও কর্মের স্বীকৃতিপত্র। প্রধান কার্যালয়ে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে পদোন্নতি। আর পেছনে ফিরে তাকাইতে হয়নি। সফলতার শীর্ষচূড়ায় আরোহন করতে বিরামহীন ছুটেছেন। এক এক করে সাফল্য ও সফলতার চাদরে আবৃত হলেন মুস্তাফিজুর রহমান।

তকদিরে সোনা মোড়ানো সাফল্য লেখা থাকেনা। প্রাণান্তকর চেষ্টা, অপরিমেয় পরিশ্রম, কর্মের প্রতি আন্তরিকতা, স্বচ্ছতা,অপরিমেয় ভালোবাসা চিত্তে থাকলে সফলতা নিজের পায়ে হেটে এসে ধরা দেয়। জীবন চলার পথে সফল মানুষ দ্বীপবন্ধু মুস্তাফিজ ছিলেন কর্মমুখী ও সৃজনশীল। তাঁর সৃষ্টিকৌশল ছিল অনন্য অসাধারণ।

১৯৮৩ সাল থেকে দেশের উন্নয়নের চাকা ঘুরাতে মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন বদ্ধপরিকর। প্রাণান্তকর ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ধীরেধীরে দেশের শীর্ষস্থানীয় ০৮(ছয়)টি অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন।যার মধ্যে ব্যাংক, বীমা,কো-অপারেটিভ অন্যতম। দ্বীপবন্ধুর উদারতা ও অকৃত্রিম ভালোবাসায় শিক্ষিত বেকার যুবক খুঁজে পেতো কর্মের ঠিকানা। মুখে হাসি, বুকে বল, মুস্তাফিজের আন্তরিকতার ফল।

মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন একজন নিখাদ নিরেট সংবাদ সেবী। মুস্তাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় সন্দ্বীপ ভবন, ২৮/এ-৩ টয়নবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল থেকে সব মানুষের পত্রিকা “দৈনিক রূপালী “সহ সাপ্তাহিক, পাক্ষিক,মাসিক প্রায় ১১ টি পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশিত হতো। বর্তমান সময়ে নামজাদা প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার অনেক জাদরেল সাংবাদিক, কর্মকর্তা, টেকনেশিয়ান মুস্তাফিজের হাত ধরে দৈনিক রূপালী’র সৃষ্টি। সংবাদ প্রকাশ ও পরিবেশনায় মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন অদম্য সাহসী। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে মুস্তাফিজুর রহমানে ছিলেন দক্ষ, একনিষ্ঠ ও বলিষ্ঠ। ক্রীড়া,পেশাজীবী সংগঠন, লায়ন্স ক্লাব,সন্দ্বীপ সমিতি,সন্দ্বীপ ইয়াং এসোসিয়েশন সহ অসংখ্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও বিভিন্ন মেয়াদে দক্ষতার সহিত নেতৃত্বদান করেন। মাদক ও ধূমপান বিরোধী প্রচার ও রোধকল্পে গড়ে তুলেন “আমার দেশ” নামক সংগঠন। সমগ্র বাংলাদেশে সংগঠনটি বিস্তৃত করেছিলেন।
লায়ন মুস্তাফিজুর রহমান সন্দ্বীপের প্রায় বিশ হাজার মানুষের চক্ষু চিকিৎসা করান এবং অগণিত অন্ধজনের চোখের তারায় আলো ফিরিয়ে দিয়েছেন।

মানব দরদী, উদার মহামানব মুস্তাফিজ ছিলেন বেকার যুবকের কর্মের ঠিকানা,কন্যা দায়গ্রস্ত পিতার ত্রাতা, অনাহারী অর্ধাহারীর খাবার যোগানদাতা, গরীব দুঃখী অসহায় মানুষের আপনজন, আপনধন। হিন্দু,মুসলিম,জেলে,তাঁতির ভালোবাসার অপর নাম দ্বীপবন্ধু মুস্তাফিজ। শিক্ষাদীক্ষা ও আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে অনগ্রসর জনপদ সন্দ্বীপে স্বউদ্যেগে নিজ নামে ১১ টির অধিক স্কুল কলেজ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রায় সকল স্কুল কলেজ মসজিদ মক্তব মাদ্রাসা মন্দিরের অবকাঠামোগত উন্নয়নে আর্থিক অনুদান প্রদান করেন।
পাশাপাশি স্কুল ভবন,ছাত্রাবাস,বিজ্ঞানাগার,শহীদ মিনার,ক্রীড়াঙ্গন গড়ে শিক্ষাখাতে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

সন্দ্বীপে আন্তঃযোগাযোগ সড়ক ব্যবস্থা ছিল কাঁচা ও অনুন্নত। সীমাহীন দুর্ভোগ লাগব করতে১৯৯১-২০০১ সালের মধ্যে ৫০টির অধিক রাস্তা পাকাকরণ ও উন্নয়নের কাজ সম্পূর্ণ করেন। তাইতো সন্দ্বীপবাসীর মুখরিত স্লোগান “কাঁচা রাস্তায় ইটবালি, মুস্তাফিজ তোমায় কেমনে ভূলি”।

১৯৯১ সালের প্রলয়ংঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে সমগ্র সন্দ্বীপ তছনছ হয়ে যায়। দুর্গত সন্দ্বীপবাসীর পাশে দাঁড়াতে ত্রাণের জাহাজ নিয়ে এমপি মুস্তাফিজ হাজির হলেন তার পরদিন। ঘরবাড়ি,স্বজন হারা সন্দ্বীপবাসীর আর্তনাদে অজরে কেঁদেছিল প্রিয় নেতা মুস্তাফিজ। বানের তোরে ছিড়ে গেছে বেড়িবাঁধ, ঘরবাড়ি লণ্ডভন্ড,অসুখ বিসুখ শোকদুঃখে মহামারী রূপ নিয়েছিল প্রিয় সন্দ্বীপ। মুস্তাফিজ সাহেব মর্মে মর্মে উপলদ্ধি করলেন সন্দ্বীপবাসীর দুঃখ দৈন্যদশা। সুরক্ষিত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে টেকসই,বেড়িবাঁধ,মার্জিনাল ডাইক,সিআরপি বাঁধ,স্লূইচ গেট নির্মাণ ও মেরামত করেন।

বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী মুস্তাফিজ কর্মগুনে জীবদ্দশায় শ্রেষ্ঠ ব্যাংকার, বীমাবিদ, সফল সংগঠক, আলোকিত মানুষ হিসেবে অসংখ্য সম্মাননা ও পদকে পুরষ্কৃত হয়েছেন।

মা-মাটি-মানুষের প্রতি নিখাদ নিরেট অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে সন্দ্বীপবাসী মুস্তাফিজ কে #দ্বীপবন্ধু নামে অাখ্যাদান করেন।। চলমান সময়ে প্রতিনিয়ত মরণোত্তর সম্মাননা পদকে ভূষিত হচ্ছেন। জনতার হৃদ মাজারে চির-জাগরুক দ্বীপবন্ধু মুস্তাফিজ।

Image may contain: 9 people, people smiling, people standing and suit


২২/১০/১৭


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন