আজ শনিবার, ১৮ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ০৩ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



আয়কর রিটার্নের আদ্যোপান্ত আয়কর রিটার্ন জমার প্রস্তুতি

Published on 17 October 2017 | 4: 08 am

ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের আয়কর রিটার্ন ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দাখিল করা বাধ্যতামূলক। কোনো ব্যক্তি করদাতার আয় যদি বছরে আড়াই লাখ টাকার বেশি আয় থাকে তবে তাকে রিটার্র্ন দাখিল করতে হবে। এরপরে রিটার্র্ন দাখিল করতে হলে জরিমানা গুনতে হবে। করযোগ্য আয় আছে; কিন্তু রিটার্র্ন না দেয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ব্যক্তি করদাতাকে নির্ধারিত কর দিবসের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে হবে। ২০১৭-১৮ কর বছরের জন্য ৩০ নভেম্বর হচ্ছে এ কর দিবস বা রিটার্ন দাখিলের সর্বশেষ তারিখ। একজন ব্যক্তি করদাতা ১ জুলাই, ২০১৭ থেকে ৩০ জুন, ২০১৮ পর্যন্ত যে পরিমাণ আয় ও সম্পদ অর্জন করেছেন তার ভিত্তিতে হিসাব করে ২০১৭-১৮ করবর্ষের রিটার্র্ন দাখিল এবং নির্ধারিত কর জমা দেবেন।

যাদের জন্য বাধ্যতামূলক
বার্ষিক আয় আড়াই লাখ টাকা অতিক্রম করলে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। মহিলা ও ৬৫ বছর বয়সোর্ধ্ব নাগরিকের ক্ষেত্রে ৩ লাখ টাকা, প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে ৪ লাখ টাকা এবং গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের আয় ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকার বেশি হলে রিটার্ন দিতে হবে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। আর সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় চাকরিরতদের মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা বা তার বেশি হলে রিটার্ন জমা দিতে হবে। এছাড়া কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা চাকরিজীবী, ফার্মের অংশীদার, ব্যবসা বা পেশার নির্বাহী বা ব্যবস্থাপনা পদে বেতনভোগী কর্মী হলে রিটার্ন জমা দিতে হবে। মোটরগাড়ির মালিক (প্রাইভেট কার, জিপ ও মাইক্রোবাস); ভ্যাট আইনের অধীনে নিবন্ধিত ক্লাবের সদস্য হলে; সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করলে; চিকিৎসক, দন্ত চিকিৎসক, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট, প্রকৌশলী, স্থপতি বা সার্ভেয়ার বা সমজাতীয় পেশাজীবী হিসেবে কোনো স্বীকৃত পেশাজীবী সংস্থার নিবন্ধন থাকলে; আয়কর পেশাজীবী হিসেবে এনবিআরে নিবন্ধিত থাকলে; বণিক বা শিল্পবিষয়ক চেম্বার বা ব্যবসায়ী সংঘ বা সংস্থার সদস্যপদ থাকলে; পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের কোনো পদে বা সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী হতে চাইলে; সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা স্থানীয় সরকারের টেন্ডারে অংশগ্রহণ করলে এবং কোনো কোম্পানি বা গ্রুপ অব কোম্পানিজের পরিচালনা পর্ষদে নিয়োজিত থাকলে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে।

যেসব কাগজপত্র লাগবে
করদাতা চাকরিজীবী হলে বেতন বিবরণী, ব্যাংক সুদ থেকে আয় হলে তার বিবরণী বা সার্টিফিকেট, বিনিয়োগ থাকলে তার স্বপক্ষে প্রমাণাদি (সঞ্চয়পত্রের সার্টিফিকেট, জীবন বীমার পলিসি থাকলে প্রিমিয়ামের ফটোকপি, বন্ড বা ডিবেঞ্চারের ফটোকপি) জমা দিতে হবে। গৃহসম্পত্তি খাতে বা বাড়ি ভাড়া থেকে আয় হলে ভাড়ার চুক্তিনামা বা
রসিদের কপি এবং প্রাপ্ত জমাসংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের বিবরণী; পৌর কর, সিটি কর্পোরেশন কর দেয়ার রসিদের কপি;
ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে বাড়ি কেনা বা নির্মাণ করা হলে ঋণের সুদের সমর্থনে ব্যাংক সার্টিফিকেট, গৃহসম্পত্তির বীমা করা থাকলে বীমার প্রিমিয়ামের রসিদের কপি রিটার্নের সঙ্গে দিতে হবে। অন্য উৎস থেকে আয় থাকলে তার স্বপক্ষে কাগজপত্র জমা দিতে হবে। এছাড়া প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তা অথবা ওয়ার্ড কমিশনার অথবা যে কোনো টিআইএনধারী করদাতার দ্বারা সত্যায়িত করা ছবি লাগবে।

কী হারে কর দেবেন
আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হলে কর দিতে হবে না। এরপরের ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। তবে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের করদাতাদের ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা, অন্য সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে ৪ হাজার টাকা এবং সিটি কর্পোরেশন ছাড়া অন্য এলাকার করদাতাদের ন্যূনতম ৩ হাজার টাকা কর দিতে হবে। ৪ লাখের পরবর্তী ৫ লাখ টাকা আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ২০ শতাংশ, পরবর্তী ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ এবং পরবর্তী সাড়ে ৪৭ লাখ টাকা আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। কোনো করদাতার প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে তার করমুক্ত আয়সীমার সঙ্গে ২৫ হাজার টাকা যোগ হবে। বিদেশি করদাতাদের আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।

দাখিলের পদ্ধতি
সাধারণ এবং সার্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিল করার নিয়ম রয়েছে। সাধারণ পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা দিলে কর অফিসের দেয়া প্রাপ্তি স্বীকারপত্রটি কর নির্ধারণী আদেশ হিসেবে গণ্য হয় না। রিটার্ন দাখিলের পর উপ কর কমিশনার কর নির্ধারণ করে থাকেন। পক্ষান্তরে সার্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে রিটার্ন জমার ক্ষেত্রে করদাতা নিজেই নিজের আয় নিরূপণ করে কর পরিশোধ করতে পারেন। এক্ষেত্রে করদাতাকে রিটার্ন জমার পর যে প্রাপ্তি স্বীকারপত্র দেয়া হয় সেটিই কর নির্ধারণী আদেশ হিসেবে গণ্য করা হয়। বর্তমানে বেশিরভাগ ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাই সার্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা দেন। তবে করদাতার ১২ ডিজিটের টিআইএন না থাকলে সার্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিল করার সুযোগ নেই। তাছাড়া মোট আয়ের ওপর প্রযোজ্য সব আয়কর এবং সারচার্জ পরিশোধ করা না হলে অথবা ৩০ নভেম্বর তারিখের মধ্যে অথবা বর্ধিত সময়ের মধ্যে দাখিল করা না হলে করদাতার রিটার্ন সার্বজনীনের আওতায় পড়বে না।

কর পরিশোধ
ট্রেজারি চালান, পে-অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট ও অ্যাকাউন্ট পে চেকের মাধ্যমে করদাতা নিজ কর অঞ্চলের অর্থনৈতিক কোডে টাকা জমা দিয়ে কর পরিশোধ করা যায়। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়কর ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করতে পারবেন করদাতা। তবে এর বেশি আয়কর পরিশোধ করতে চাইলে পে-অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট, অ্যাকাউন্ট পে চেক ব্যবহার করতে হবে।

কর রেয়াত
নির্ধারিত খাতে বিনিয়োগ করলে করদাতারা কর ছাড় পাবেন। এক্ষেত্রে করদাতার মোট আয়ের ২৫ শতাংশ বিনিয়োগকে অনুমোদনযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে। উদাহরণস্বরূপ কোনো করদাতার আয় যদি ১০ লাখ টাকা হয় তবে তিনি ২৫ শতাংশ বা আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করে কর রেয়াত নিতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ বা সাড়ে ৩২ হাজার টাকা কর রেয়াত পাবেন। তবে আয় ১০ লাখ টাকার বেশি; কিন্তু ৩০ লাখ টাকার কম হলে প্রথম আড়াই লাখের জন্য ১৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট বিনিয়োগের ওপর ১২ শতাংশ হারে রেয়াত পাবেন। আর মোট আয় ৩০ লাখ টাকার বেশি হলে প্রথম আড়াই লাখের জন্য ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখের জন্য ১২ শতাংশ এবং অবশিষ্ট টাকার জন্য ১০ শতাংশ হারে রেয়াত পাবেন।

সারচার্জ বা সম্পদ কর
বিত্তশালী করদাতাদের নির্ধারিত করের অতিরিক্ত সারচার্জ বা সম্পদ কর দিতে হবে। সোয়া ২ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদ থাকলে কর দিতে হবে না। তবে সোয়া ২ থেকে ৫ কোটি টাকার সম্পদ থাকলে ১০ শতাংশ হারে, ৫ থেকে ১০ কোটি টাকার সম্পদ থাকলে ১৫ শতাংশ, ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ২০ শতাংশ, ১৫ থেকে ২০ কোটি পর্যন্ত ২৫ শতাংশ এবং ২০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে ৩০ শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হবে। এক্ষেত্রে সম্পদের দলিল মূল্যকে বিবেচনায় নেয়া হবে। করদাতাকে ন্যূনতম ৩ হাজার টাকা সারচার্জ দিতেই হবে।

সম্পদ বিবরণী ঐচ্ছিক
কোনো করদাতার আয় বছর শেষে সম্পদের পরিমাণ ২৫ লাখ টাকার বেশি না হলে, মোটরগাড়ির (প্রাইভেট কার, জিপ বা মাইক্রোবাস) মালিকানা না থাকলে এবং সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অ্যাপার্টমেন্ট বা গৃহসম্পত্তির মালিক না হলে সম্পদ বিবরণী জমা দিতে হবে না। তবে উপ কর কমিশনার চাইলে নোটিশ দিয়ে করদাতার সম্পদের তথ্য চাইতে পারেন।

যেসব বিনিয়োগে রেয়াত
বর্তমানে ২৪টি খাতে বিনিয়োগ বা দান করলে কর ছাড় পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে; জীবন বীমার প্রিমিয়াম, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে চাঁদা, স্বীকৃতি ভবিষ্যৎ
তহবিলে নিয়োগকর্তা বা কর্মকর্তার চাঁদা, সঞ্চয়পত্র ক্রয়, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডিপোজিট পেনশন স্কিমে বার্ষিক ৬০
হাজার টাকা বিনিয়োগ করলে এবং শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত শেয়ার বা মিউচুয়াল ফান্ড ক্রয়, জাকাত তহবিলে দান এবং ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে ল্যাপটপ বা কম্পিউটার কিনলে কর ছাড় পাওয়া যাবে। সূত্র : আয়কর পরিপত্র


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন