আজ বুধবার, ১৫ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



চট্টগ্রামের মেয়র কি নিউইয়র্কের মেয়র হয়ে গেলেন?

Published on 28 September 2017 | 8: 13 pm

:: এম. এ. হাশেম আকাশ ::


দৈনিক আজাদীর আজকের প্রথম পৃষ্ঠার সংবাদ শিরোনাম, নতুন কর আতঙ্কে চট্টগ্রাম সিটির হোল্ডিং মালিকরা। প্রত্রিকাটি যেভাবে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে রিপোর্ট করেছে তাতে প্রতিবেদনের বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করার অবকাশ নেই। তবে কর আতঙ্কে শুধু হোল্ডিং মালিকরা কথাটি ঠিক নয়। কেননা ভাড়াটিয়া, উপভাড়াটিয়া, ব্যবসায়ী, ছাত্র, শ্রমিক, শ্রমিক, মজুর কারও এতে আতঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। নগরীর সকল লোকই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে হোল্ডিং ট্যাক্সের সাথে সম্পর্কিত। সবাইকেই তো বহুতল ভবন হোক বা পাকা, কাঁচা, আধাপাকা অথবা বসতির ঝুপড়িগুলোর কোথাও না কোথাও থাকতে হয়। কেবল মাত্র ছিন্নমূলের যারা সড়কের পাশে বা রেললাইনের পাশে খোলা আকাশের নীচে থাকে তাদের হয়তো তেমন আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে তারাও একদম নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন না। কারণ হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়লে ঘরভাড়া, দোকানভাড়া, স্টল ভাড়া বাড়ার সাথে দ্রব্যমূল্য যে বাড়বে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ফলে নগরীর ফকিরদেরও কিন্তু নির্ভার থাকার সুযোগ নেই।
*
যাহোক, আসা যাক আসল কথায়, মিয়াখান নগরের বাসিন্দা মো. সেকান্দরের কাঁচা ও পাকা বসতঘরের পূর্বের ৮ হাজার পাঁচশ টাকার করের স্থলে নতুন নিয়মে চসিকের দাবী ১ লাখ ৫ হাজার। মধ্যম হালিশহরের বাসিন্দা নিজাম উদ্দিনের ৪ ফ্ল্যাটের দেড়তলা ভবনে তার অন্য ভাইয়েরা সহ পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করেন যাতে পূর্বে কর দিতেন ৩,৩৬০/- টাকা। নতুন এসেসমেন্টে তা হয়ে গেল ৩৫ হাজার ৭শ টাকা। লালখান বাজারের নুর হোসাইনের এক ভবনের কর ১৩,৬০০/- থেকে বেড়ে হয়েছে ১লক্ষ ৩৫ হাজার আর অন্য ভবনেও সমভাবে বেড়েছে। তিনি দামপাড়া অফিসে আপিল করতে গেলে প্রতিটি আপিল ফরমে ১৫০০/- টাকা করে নেয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কর ১লাখ ১৯ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১৬ লক্ষ টাকা। জনতা ব্যাংকের আগ্রাবাদের নিজস্ব ভবনের ট্যাক্স ১,৮৩,৬০০/- টাকা থেকে ১৭,০০,০০০/- টাকা! মাস্টারপুলের আবু তৈয়ব তিনটি ফ্ল্যাটের একটিতে নিজে থাকেন অপর দুটির একটির মাসিক ভাড়া ৮,০০০/- অন্যটির মাসিক ভাড়া ৪,০০০/- মোট ভাড়া পান ১২,০০০/- টাকা। আগে কর দিতেন ২,৮০০/-টাকা এবার চসিকের দাবী ৩০,০০০/- টাকা। চান্দগাঁওয়ের ফারজানার ভবন থেকে বছরে আয়ে ৭,২০,০০০/- টাকা আর চসিকে দাবীকৃত ট্যাক্স ৮,০০,০০০/-টাকা। ট্যাক্সের পরিমাণ বার্ষিক আয়ের চেয়েও ৮০,০০০/- টাকা বেশী।
*
গড়ে ট্যাক্স বেড়েছে দশ থেকে বার গুন। উন্নয়নের সাথে সাথে উন্নয়ন সংস্থাগুলির ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ট্যাক্সের পরিমাণও বাড়তে পারে সেটা সাধারণ ব্যাপার। একসাথে ১০/১২ গুন। চসিক কি ভেবে দেখেছে এ সময়ে তারা এমন কি উন্নয়ন নাগরিকদের দিতে পেরেছ যে তারা এতগুন ট্যাক্স দিতে সক্ষম ও সম্মত হবে? আমাদের দেশে এখন আরেকটি কৌশল চালু হয়েছে তা হল, ট্যাক্স, বিল বা অন্যান্য ফি এমন বিপুল পরিমাণ দাবী করা যাতে জনগন আপিল/আন্দোলন বা অন্যকোনভাবে দাবীর প্রেক্ষিতে কিছু কমানোর পরও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকগুন বেশী থাকে। চসিকও কি সে কৌশল করছে? আরেকটি চমকপ্রদ কৌশল হলো প্রসেসে বা মূল্যায়নে মাত্রাতিরিক্ত দেখায়ে অনেকগুল দেখাতে পারলে পরে দেনদরবার করে কমানের নামে সাধারণ মানুষ থেকে মোটা অংকের ঘুষ বা অবৈধ অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরী হয়। তার প্রমাণ অবশ্য আজাদীর প্রতিবেদনেও স্পষ্ট। মেয়র হতে শুরু করে কর্তারা বলছেন অতীতে আপিল ফরমের ফি ছিল এক টাকা এবার তা সম্পূর্ণ ফ্রি করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবেদনে যাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে তারা প্রত্যেকে বলেছেন তাদের থেকে প্রতি ফরমের ফি বাবদ ১,৫০০/- টাকা করে নেয়ে হয়েছে বা হচ্ছে। আবার কর্মর্তার মন্তব্য কেউ অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেবেন। যেখানে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে ইতোমধ্যে ফি বাবদ অর্থ আদায় করা হয়েছে সেখানে অভিযোগ ছাড়াই ব্যবস্থা নিতে সমস্যা কোথায়?
নাকি অভিযোগ দিতে গেলে যাতে আরো কিছু অবৈধ আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয় সে প্রত্যাশা???
*
চসিকের মাননীয় মেয়র নিউইয়র্কের মেয়র নন এটা নাগরিকরা যেমন জানেন তিনিও খুব ভাল জানেন। উন্নত শহরের মেয়রগণ তাদের জরিপ, পরিসংখ্যান, বাস্তব অবস্থা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ নেন। সেক্ষেত্রে বাস্তবায়নও হয় স্বাভাবিকভাবে। দুর্নীতি পৃথিবীর সর্বত্র থাকলেও আমাদের মতো অষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যায়নি। তাই পঞ্চবার্ষিকী কর মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আইন মেনেই এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই কর ধার্য্য করেছে চসিক এবং এক্ষেত্রে চসিকের নিজস্ব কোন এখতিয়ার নেই কর্মকর্তাদের এ ধরনের দায়সারা কথাবার্তা গ্রহণযোগ্য নয়। মেয়রকে যারা ভোট দিয়েছেন তারা এ নগরীরই নাগরিক। তাদের সার্বিক অবস্থাও মেয়র মহোদয়ের অজ্ঞাত নয়। বছরের ছয়মাস নাগরিকদের পানির মধ্যে ডুবে থাকতে হচ্ছে। চালের দামের লাগামছাড়া উল্লম্ফন। নিত্য প্রয়োজনীয় শাকসব্জি, তরিতরকারিসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের উচ্চ দামে সাধারণ লোকের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। শিক্ষার অধিকার উচ্চবিত্যদের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাচ্ছে। রাস্তাঘাটের অবস্থা অবর্ণনীয়। সেসব দিকে কোন চমক নেয়। কিন্তু বিদ্যুৎবিল, গ্যাসবিল, খাজনা, ট্যাক্স বাড়ানোতে সরকারী সংস্থাগুলো চমকের পর চমক দিচ্ছে। সাধারণ মৌলিক চাহিদা মেটানোর সুযোগ সুদূর পরাহত।
*
আমার লেখায় কেউ কেউ ভাবতে পারেন ভবনের ট্যাক্স বাড়লে গরীব বা গৃহহীনের সমস্যা কোথায়? সমস্যা যে সত্যিই প্রকট সেজন্য সামান্য পর্যবেক্ষনই যথেষ্ট। যিনি বাস মিনি বাসের ড্রাইভার হেলপার তিনি কোন না কোন হোল্ডিঙের অধিনেই ভাড়া থাকেন। অতিরিক্ত ট্যাক্স দিতে গিয়ে হোল্ডিংয়ের মালিক তাদের বাসা বা ঝুপরি যাই হোক তার ভাড়া বাড়াবেন। ড্রাইভার বাসের মালিক থেকে অতিরিক্ত বেতন চাইবেন আর মালিক স্বাভাবিকভাবেই বাসভাড়া অনেকগুন বাড়াবেন। নগরের কোন সাধারণ মানুষের বাস/টেম্পো/টেক্সি/মেক্সিতে না চড়ে উপায় নেই। পরিবহন ভাড়া বাড়লে শাকসব্জি, মাছ-তরকারি সবকিছুর পরিবণ খরচ বেড়ে দামও বাড়বে। শিক্ষ বোর্ডের হোল্ডিং ট্যাক্স বেড়েছে, বেড়েছে ব্যাংকেরও। তাহলে ছাত্রদের বিভিন্ন ফি বা ব্যাংকের সার্ভিস চার্জ কি বাড়বে না? এককথায় প্রভাবটা সবখানেই পড়বে। বাস্তবতা হল প্রতক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবটা এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা কারো নেই।
*
তাই এ নগরীর মেয়র মহোদয় নিজেকে নিউইয়র্কের মেয়র ভাবলে হবে না। তাঁর নগরের বাস্তব অবস্থা উপলদ্ধি করে স্তরে স্তরে ব্যবস্থা নিতে হবে। ট্যাক্সের পরিমাণ যাতে সহনীয় পর্যায়ের হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। আপিলের বিনে পয়সার ফরমে কারা ১৫০০/- টাকা আদায় করছে তা নিজ দায়িত্বে মনিটরিং করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আইনে সীমাবদ্ধতা থাকলে তা পরিবর্তনের ব্যবস্থা তাঁকেই নিতে হবে। মন্ত্রনালয়ের সমস্যাও তাঁকেই মিট করতে হবে। নগরীর জনগন মন্ত্রণালয় চিনেনা চিনে চট্টগ্রামের নগর পিতাকে, তাদের নির্বাচিত মেয়রকে।


১৩ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২৮.০৯.২০১৭ খ্রিঃ


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন