আজ শুক্রবার, ২৫ মে ২০১৮ ইং, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



আমার প্রাণপ্রিয় দিদা রিজিয়া বেগম ছাবিহা স্মরণে

Published on 09 July 2017 | 5: 18 pm

অধ্যাপক আ.ম.ম আবদুর রহিম


সে আমার বড় বোন, বড় আদরের বড় বোন। আমার প্রিয় বড়বোন রিজিয়া বেগম ছাবিহা আজ পৃথিবীতে নেই। ২০১৩ সালের মে মাসের ১০ তারিখ রাত আটটার সময় তিনি পৃথিবী হতে চির বিদায় নেন। তার মৃত্যুতে ভীষণ দুঃখ পাই। তার মৃত্যুর চারদিন আগে আমার সাথে তার ফোনে আলাপ হয়। আমাকে বললেন, আমি আর বাঁচব না। আমি বললাম- ঔষধ খান, ডাক্তার দেখান, ইনশাল্লাহ ভাল হয়ে যাবেন। তিনি একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন- আমার জন্য তোমার মত দরদী আর কে আছে। আমি তোমার জন্য দোয়া করি। আমাকে আরো বললেন ডাবের পানি খেতে ইচ্ছা হয়। আমি সাথে সাথে বাড়ির কেয়ার টেকারকে খবর দিয়ে ১৫/২০ টা ডাব পাঠিয়ে দিলাম। চিকিৎসার জন্য ফেরদাউস মাষ্টারের মাধ্যমে একহাজার টাকা পাঠালাম। মাঝখানে ৩/৪ দিন আমি ব্যস্ততায় ফোন করতে পারি নাই। মে মাসের ১০ তারিখ রাতে হঠাৎ করে ফোন আসল, নির্মম দুঃসংবাদ। প্রিয় বোনটি ইেেন্তকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহে……………. রাজিউন।

তার মৃত্যুর খবর জেনে কি রকম আঘাত পেয়েছি তা ব্যক্ত করতে পারব না। চোখ বেয়ে পানি আসল। চিরতরে আমার একজন প্রিয়জনকে হারালাম। আমার একজন শুভাঙ্খাকী হারালাম, মায়ের পরে যার স্থান ছিল। এ বোনকে আমরা দিদা বলে ডাকতাম, মেঝ বোনকে দিদি ডাকতাম। কেন ডাকতাম জানিনা। সম্ভবত এসব বাবা শিখিয়েছেন। আমার আব্বা মৌঃ মুহাম্মদ আলি আকবর বিএবিটির বাংলাসাহিত্যের লোক ছিলেন। তার অনেক লেখালেখি ছিল। বাবা সমস্ত কূপমন্ডুকতার ঊর্দ্ধে  উদার সাহিত্যিক ছিলেন। আমাদের হিন্দু পরিবারে দিদা দিদির ব্যবহার দেখি। বাবা এসব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ছিলেন বলে মনে হয়। আজ দিদা ও নেই, দিদিও নেই, স্নেহময়ী মাও নেই। বাবাতো ছোটকালে চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

১৩, ১৪, ১৫ সাল আমাদের পরিবারে দুঃখের ঝড় নেমে এসেছে। প্রথমে বড়বোন অতপর বড় দুলাভাই, অতপর মা, অতপর মেঝবোন পৃথিবী হতে বিদায় নিলেন। দুঃখের বিষাদ সিন্ধু যেন সে মূহুর্তে উপস্থিত। কি লিখব, দুঃখ আর দুঃখ, প্রিয়জনদের বিদায়। যারা আমাকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন, আজ সারাক্ষণ তাদেরকে খুজে মরি। পল্লী কবি জসীম উদ্দিনের কবর কবিতায় লিখেছেন- “যখন যারে জড়িয়ে ধরেছি, তখন সে গেছে ছাড়ি”। এ বোনটি আমাকে অত্যাধিক আদর স্নেহ করতেন। যখন বাড়িতে গেছি, তখন তাকে দেখতে যেতাম। না দেখে কখনো আসি নাই। সে বোনটি আজ আমাদেরকে ছেড়ে চিরতরে চলে গেলেন। বাড়ির পুকুরে মাছ ধরলে তার জন্য মাছ না পাঠালে শান্তি পেতাম না। দেখতে গেলে বুকে জড়িয়ে ধরতেন। দু’চোখ বেয়ে পানি পড়ত। হাস্যউজ্জ্বল দীপ্ত মুখখানি সবসময় হাসি ঝড়ে পড়ত। তার চেহারা ছুরতে এক ধরনের ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পেত। কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। কারো সাথে কখনো কঠোর কথা বলতেন না। তাদের বাড়িতে গেলে খাওয়ানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। খাওয়ায়ে দাওয়ায়ে, পরিশেষে এক খিলি পান দিতেন। আসার সময় আরো এক খিলি। বাড়ির পুকুর পাড় পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন, অবশেষে ঘরে ফিরতেন। তাকে হারিয়ে আজ বার বার তার কথা মনে পড়ে। এ মূহুর্তে তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ তাকে বেহেস্তে নসিব করুন।

এ বোনটির জীবনে বিশাল দুঃখময় অধ্যায় রয়েছে। সেটি আমি মর্মে মর্মে অনুভব করতাম। আমার আব্বা প্রথম বিয়ে করেন সন্দ্বীপের দৈতেরগো বাড়ির সোনামিয়া মালাদায়ের ছেলে মুন্সি আবদুল হাদির কন্যা মোছাম্মৎ তেয়বা খাতুনকে। দু বছর বয়সে তার মা মৃত্যুবরণ করেন। অসহায় এ বোনটিকে বাবা পরম স্নেহে লালন পালন করেন। এ যেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পোষ্ট মাষ্টার গল্পের সে ছোট মেয়েটি। কখনো নানার বাড়িতে, কখনো জেঠার ঘরে, কখনো নিজের কাছে। তখনকার দিনে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। বাবা সাহিত্যিক ছিলেন, দানবির ছিলেন, ভাববাদী ছিলেন। ১ম স্ত্রীর মৃত্যু তার মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। জগৎজীবন সম্পর্কে তাকে ভাবিয়ে তুলল। প্রিয়তমা স্ত্রীর অকাল মৃত্যুতে ভীষণ দুঃখ পেলেন। জীবন সঙ্গিনীর হঠাৎ করে অসময়ে চলে যাওয়াকে তিনি মেনে নিতে পারেন নাই। অনেকদিন সংসার জীবন করলেন না। পরিশেষে মেয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে পুনরায় বিবাহ করলেন, আমার আম্মা কাজী রওশন আক্তারকে। বয়সের দিক হতে আমার আম্মা ও বোনের ৫/৬ বছরের ব্যবধান ছিল।

পরবর্ত্তীকালে সমাজের কেউ তিনি যে নিজ মেয়ে নয় একথা বুঝতে পারতোনা। তারা দুজন দুজনকে এমনভাবে গ্রহণ করেছিলেন, মৃত্যু পর্যন্ত দুজন মামেয়ে ছিল। বাবা তাকে বিয়ে দেন মৌলভী সৈয়দের একমাত্র ছেলে মৌলভী মাহফুজুর রহমান বন্দরের শেড ইন্সপেক্টরের নিকট। একজন সৎমানুষ হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। ২০১৪ সালে তিনিও ইন্তেকাল করেন। বাবা যখন হাটহাজারী পার্বতী হাইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তখন বাবার সাথে স্কুল হোস্টেলে থাকতেন। বাবা যখন বসুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তখন আমার আম্মাসহ ছিলেন। বাবার হাত ধরে দোকানে যেতেন।

বাল্যকালে মা বাপ হারা বড়বোনটি আমাদেরকে পেয়ে সবকিছু ভুলে গেলেন। গভীর আন্তরিকতায় আমাদেরকে ভালবাসতেন। তার একমেয়ে তিন ছেলে। মা-বাবার মৃত্যুর পূর্বে তাঁর মেঝো ছেলে প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান হার্ট এ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করে। এ মৃত্যু তাদের পরিবারে দুঃখের ছায়া নেমে আসে। বড় মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস সুরমা, বড় ছেলে মামুনুর রহমান, বন্দরের কর্মকর্তা, ছোট ছেলে মওলানা কামরুর রহমান সোহরাব হাইস্কুলের শিক্ষক। বড় মেয়ের ছেলে মিলাদ জজকোর্টে সাবজজ। সব কিছু ছেড়ে বোনটি আমার আজ অন্ধকার কবর দেশের বাসিন্দা।
আমাদের ভাইবোন হিসেবে কত বড় হৃদয় নিয়ে দেখতেন তা লিখে শেষ করা যাবে না। ভাই হিসেবে আমাকে দেখলে তার আনন্দের সীমা থাকত না। তুমি ছাড়া তুই কোনদিন বলেন নাই। কথায় কথায় বলতেন আমার ভাই আবদুর রহিম। একথা বলতে তার মধ্যে প্রচুর আনন্দ উচ্ছলতা লক্ষ্য করেছি। বোনের গুনগান ধৈর্য্য এসবের কথা বলে শেষ করা যাবে না। আমার প্রতি ছিল তার অনেক দরদ। প্রিয়বোনকে কাগজের পাতায় ধরে রাখার ইচ্ছে আমার তার মৃত্যুর পর হতে। ছোটকালে বোনের বাড়িতে গিয়ে বেড়াতাম। মা বোনকে দেখতে পাঠাতেন। ভাগিনা ভাগিনী প্রায় আমার সমবয়সী। তাদের সাথে আমার বিশেষ সখ্যতা ছিল। তার শ্বাশুড়ি আলহাজ্ব রাহেলা খাতুন খুবই প্রজ্ঞাসমপন্না, ধার্মিক মহিলা ছিলেন। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন, দোয়া করতেন। তিনি আমার মায়ের পরম বান্ধবী ও খালাতো বোন। সুতরাং আমাকে বোনপুত্র আবদুর রহিম বলে ডাকতেন। আমাকে যারা স্নেহ করতেন তাদের মধ্যে তিনি একজন। আজ তিনি কবর দেশের বাসিন্দা।
আমার প্রিয় বোনটির আমাদের জন্য অনেক দরদ ছিল, আমি যেদিন এ সুন্দর পৃথিবীতে এসেছি, এ খবর শুনে রাতের আধারে ফানুস বাতি নিয়ে খাল পাড়ি দিয়ে আমাকে দেখতে আসেন পরম আনন্দে। এসব মায়ের মুখে শুনেছি। আমার কখনো অসুখ বিসুখ হলে তিনি না আসা পর্যন্ত আমি স্বস্তি পেতাম না। খবর দিলে সাথে সাথে চলে আসতেন। অনেক সময় রাতে খেয়ে দেয়ে কাউকে সাথে করে নিয়ে আমাদেরকে দেখতে চলে আসতেন। এখানে রাত জেগে থেকে গল্প গুজব করে ভোররাতে চলে যেতেন। আমাদেরকে দেখে না গেলে তিনি শান্তি পেতেন না। ভাইবোনদের জন্য কি অতুলনীয় দরদ। তার সাথে আমাদের অনেক স্মৃতি জড়িত। ৬২ এর সে ভয়াল ঝড়ের সময় তিনি তার নানার বাড়িতে ছিলেন। ঐ ঝড়ে আমাদের ঘর পড়ে যায়। আমরা অল্পের জন্য বেঁচে যায়, না হয় ঘরের মধ্যে আমাদের মৃত্যু হত। আমার এক জেঠাতো ভাই ভুলু আমাদেরকে ঝড়ের মধ্যে কোলে করে তাদের ঘরে নিয়ে যায়। এভাবে আমরা নির্ঘাত মৃত্যুর হাত হতে রক্ষা পাই, আল্লাহর অশেষ কৃপায়। ঝড়ের মধ্যে প্রিয় বোনটি ভাইবোনদের জন্য অস্থির ছিলেন। ভোরবিহানে ৭/৮ মাইল পথ পায়ে হেঁটে  তিনি আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। আদর করে আমাদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। সে স্মৃতি আমার এখনো মনে আছে। আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার সময় তিনি আমাকে ত্রিশটি টাকা প্রদান করেছিলেন। এ টাকা আমি ভর্তির কাজে লাগায়। আমি যখন চট্টগ্রাম কলেজ ভর্তি হই উনার নিজের লেপ ও ব্যবহারের চাদরটি আমাকে প্রদান করে। আমার বিয়ের পর আমরা দেশের বাড়িতে যাওয়ার আগে তিনি আমাদের ঘরে এসে হাজির। আমি, আম্মা, দুলাভাই আলম সাহেব, নুতনবউ, আমার ভাগিনী লুনাসহ আমরা বাড়িতে পৌঁছলাম। বড়বোন নুতনবউকে রিক্সা হতে কোলে করে ঘরে নিয়ে যান। সেকি তার পরম আনন্দ। এরপর কয়েকদিন আমাদের বাড়িতে থেকে যান। আমাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেন। তিনি আমার স্ত্রীকে খুব পছন্দ করতেন। নতুন বধূকে বেড়ানোর জন্য তাদের বাড়িতে নিয়ে যান। আমাদের প্রতি বোনের অকৃত্রিম দরদের অভাব ছিল না। আমার ছোট ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে তিনি চট্টগ্রামে চলে আসেন। আমি তিন বোনকে শাড়ি প্রদান করেছিলাম। আমার আম্মাও তখন চট্টগ্রামে ছিলেন। আম্মা হজ্জ্বে যাওয়ার কয়েকদিন আগে তিনি আমাদের বাড়িতে চলে আসেন। বুদ্ধি জ্ঞান প্রজ্ঞায় তিনি শুধুমাত্র বড় বোন না, বড় ভাইয়ের মত ছিলেন। হজ্জ্বের জন্য আম্মাকে বিদায় দিয়ে আমাদের বাড়িতে দিন কতেক ছিলেন। আমি ভাগিনা সামসুদ্দিন স্টীমারে করে আম্মাকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসি। অতঃপর আম্মা হজ্জ্বে যান। কোন দিন পৈত্রিক সম্পত্তির কথা বলেন নাই। পরে অভাব অভিযোগে পড়ে গেলে, আমি নিজে উনার প্রাপ্য জমি বিক্রয় করে নিজ হাতে টাকা প্রদান করি। ঐ টাকা ছেলেদের চাকরী ও পারিবারিক কাজে লাগিয়েছেন। আমার বোনের জীবনে সুখ নেমে এসেছিল। ছেলে বিদেশী জাহাজের ইঞ্জিনিয়ার। ছেলে মেয়ে মা বাপকে নিয়ে হালিশহরে থাকতেন। হঠাৎ একদিন জাহাজ থেকে আসার পর রাত্রে হার্ট এ্যাটাক করে মৃত্যুবরণ করে। বোনের জীবনে আবার কান্নার স্রোত। উপযুক্ত ছেলেকে হারিয়ে বোন কান্নার সাগরে ভাসতে লাগলেন। সবরের উপর ভরসা করে কয়েক বছর বেচেঁ ছিলেন। বড় ছেলের মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে দুজন চট্টগ্রামে আসেন। দুলাভাই অসুস্থ বায়োবৃদ্ধ, বোন খানিকটা ভাল। আমরা ভাইবোন পাঁচজন একত্রে দুলাভাই সহ ছবি তুললাম। বোনের চেহারায় তখনো অসুস্থতা। বিয়ের পর দুলাভাইকে বাড়িতে নিয়ে গেল। বোন রয়ে গেল বড় ছেলের বাসায়। উদ্দেশ্য সবাইকে দেখে যাবেন। পরে পর্যায়ক্রমে আমার ছোট বোনের বাসায়, আমার বাসায়, মেজবোনের বাসায় প্রায় দেড়মাস সময়কাল বেড়ান। বোনের কিছু অসুস্থতার কথা আমি জানতাম। আমার ইচ্ছে ছিল উনার চিকিৎসা করায়, কিন্তু নিজ ছেলেরা বড় হলে অন্যদের পক্ষে কোন কিছু করা সম্ভব নয়। আমি আত্মীয় স্বজন কয়েকজনদের সাথে আলাপ করলাম। কারো সাইঁ পেলাম না। আমাদের বাসায় ১০/১২ দিন থাকার পর মা জোর করে আমাদের বাসায় আরো এক সপ্তাহ রেখে দিলেন। সেদিন  দেখলাম আমার অসুস্থ বৃদ্ধ মায়ের মেয়ের প্রতি দরদের রূপ। অবশেষে আমার বাসা হতে বোন চলে গেল, মেজ বোনের বাসায়, সেখান হতে বাড়িতে। অতপর মাটির ঘরে চির নিদ্রায় শায়িত হলেন। চলে যাওয়ার পর আমি বার বার ফোন করলাম, আমাকে তার অসুখের অনেক কথা বললেন। ভাই তুমি ছাড়া আমার কথা চিন্তা করার আরকে আছে। আমাকে বললেন,  আমি মরে যাবো। তোমার জন্য আমি দোয়া করি। হ্যাঁ তিনি বাড়িতে মারা গেলেন। আমার কাছে খবর আসল, শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমার যাওয়া  হলোনা। দেশে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে কবর দিল। ফোনে তার বড় ছেলেকে আমার নামের উপর অর্থাৎ আমার পক্ষে বোনের কবরে এক মুঠো মাটি দিতে বলি। অতপর চার দিনের খাওয়ায় আমি তিন হাজার টাকা পাঠালাম। তিনি পৃথিবী হতে চলে গেলেন চিরতরে। আমাদের জন্য কিছু প্রশ্ন রেখে গেলেন। আমরা হতভাগা। তার জন্য কেউ কিছু করতে পারলাম না। কেন পারলাম না? আজ বারবার মনে এ প্রশ্ন জাগে। একজন মানুষ পৃৃথিবী হতে বিদায় নেবে আত্মীয় স্বজন চেয়ে থাকবেন এ হতে পারে না। আজকাল আমরা অতিমাত্রায় স্বার্থপর হয়ে গেছি। আল্লাহ আমার প্রিয়বোনটিকে জান্নাতবাসী করুক। আমার বোন বিশাল মনের অধিকারী ছিলেন। পরে বাড়িতে গেলে তার পরের দিন তার কবর জিয়ারত করে দোয়া কালাম পড়ে তার রুহের মাগফিরাত কামনা করি। অবশেয়ে আমি বোনের বাড়ি ত্যাগ করলাম। পেছন থেকে বারবার দেখতে লাগলাম বোনের কবরটি। বোনের সাথে আমাদের অনেক স্মৃতি জড়িত। লিখলে বিশাল লেখা হয়ে যাবে। ৭০’র বন্যার সময় তিনি আমাদের বাড়িতে ছিলেন। সম্ভবত আর্শ্বিন মাস। বাজার হতে ইলিশ মাছ এনেছিলাম প্রচুর। বোনের কাছে বেশি পছন্দনীয় ছিল ইলিশ মাছ, গরুর গোস্ত। মা  বলেছিলেন, হুজুর দিয়ে আমার বাপের কবর জিয়ারত করাতে। সকাল ১১ টায় হঠাৎ করে জোয়ারের পানি আসতে লাগল। আমরা দৌড় দিয়ে স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টারে উঠলাম। পানি কমে গেলে অবশেষে সবাই বাড়িতে ফিরলাম। মানুষের দুঃসময়ে কেউ কারো নয়। বিশেষ করে মানুষ যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত হয়ে পড়ে আমরা তখন তাদের কথা তেমন ভাবি না। বোনটি পৃথিবী হতে নিরবে বিদায় নিলেন। আমরা কে কি করলাম সে প্রশ্নটি রেখে গেলেন। সবাইকে একদিন এ পৃথিবী হতে বিদায় নিতে হবে। মাটির পৃথিবীতে বোনটিকে আর কোন দিন দেখতে পাব না।
প্রিয় বোনটিকে কখনো ভুলতে পারি না। ক্ষণিকে মানসপঠ্ েতার দরদী মুখটি ভেসে উঠে। মানুষ পৃথিবীতে আসে আবার চলে যায়। নিয়তি বড়ই নিমর্ম। আজ প্রিয়জনদের ছেড়ে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে কোন রকমে বেঁচে আছি। মানুষ মরণশীল। একদিন আমাদের সবাইকে চলে যেতে হবে। পরিশেষে কবির ভাষায় বলতে হয়-
“আমি ভালবাসি যারে-
সেকি কভু আমা হতে দুরে যেতে পারে”?
বোনটি তার পুকুর পাড়ে কঠিন মাটির নিচে নিঘোর ঘুমে ঘুমিয়ে আছেন। এ ঘুম হতে জাগাবার সাধ্য কার! এতো দুর বহুদূর। ভারাক্রান্ত মনে পরিশেষে বলতে হয়- ” সে আমার বড় বোন, বড় আদরের বড় বোন। ”


লেখক পরিচিতি : আ.ম.ম. আবদুর রহিম (কবি ও প্রাবন্ধিক), সাবেক অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) ফতেয়াবাদ ডিগ্রী কলেজ। অধ্যক্ষ ঃ ফতেয়াবাদ কিন্ডার গার্টেন স্কুল। মোবাইল ঃ ০১৮১৯-৬৪৮৩৯৮


Advertisement

আরও পড়ুন