আজ মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮ ইং, ০২ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



সন্দ্বীপ ভ্রমণ!

Published on 06 July 2017 | 3: 39 am

 গাজী মোহাম্মদ মমিনুল হক ::::


সন্দ্বীপে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল অনেকদিন আগে থেকে। সময়-সুযোগ হচ্ছিল না তাই এতদিন যাওয়া হয়ে উঠেনি। অবশেষে সে সুযোগ আসল। ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য সন্দ্বীপ একটা চমৎকার জায়গা। সন্দ্বীপ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকুলে অবস্থিত একটি দ্বীপ । এটি বঙ্গোপসাগরের উত্তর পূর্বকোনে মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত। চতুর্দিকে নদী আর সাগর বেষ্টিত এই ছোট্ট দ্বীপ সন্দ্বীপ। শত বছরের পুরনো ঐতিহ্য ইতিহাস আর সৌন্দয্যে ভরপুর বেশ বড় পুরনো একটা দ্বীপ। অবিরত নদী ভাঙ্গনের ফলে দ্বীপটি ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। কালের বিবর্তনে সন্দ্বীপের বর্তমান দৈর্ঘ্য ১৮-২০ ও প্রস্থ ৭-৮ মাইলের অধিক হবে না। কিন্তু, এককালে এর সীমা বহুদুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সন্দ্বীপের পশ্চিম-দক্ষিণে ছিল শাহবাজপুর, পূর্বে ও উত্তরে ছিল বিক্রমপুরের দক্ষিণ এবং বর্তমানে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বকোণে সন্দ্বীপের অবস্থান।

সন্দ্বীপের নামকরণের রয়েছে নানা ইতিহাস। তবে বহুল প্রচলিত আর জনপ্রিয় মত হচ্ছে,  একটি বিরাট ’’বালিরস্তুপ’’- যা ইউরোপীয়দের ভাষায় ‘‘স্যান্ডহিপ’’ ‘‘Sandheap” নামে পরিচিত। কালক্রমে এই ‘‘স্যান্ডহিপ’’ শব্দটি থেকেই সাগর কন্যার নাম হয়েছে ‘‘সন্দ্বীপ’’। কারো কারো মতে শুন্যদ্বীপ থেকে সন্দ্বীপ, কারো মত স্বর্ণদ্বীপ হতে সন্দ্বীপ নামের উৎপত্তি। বাখরগঞ্জের ইতিহাস লেখক বেভারিজের মতে চন্দ্র দেবতা ‘সোম’ এর নামে এই দ্বীপের নাম ছিল সোমদ্বীপ যা কালের বিবর্তনে সন্দ্বীপে রূপ নিয়েছে।

 

সন্দ্বীপ যাওয়ার জন্য সবচে বেশি আগ্রহী ছিলাম নৌপথের কারণে। নৌপথ ভ্রমণ বরাবরই আমার বেশ ভাল লাগে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বাসা থেকে বের হয় তিন বন্ধু। আমি, সাইমন আর দস্তগীর। বড়দিঘীর পাড় থেকে একটা সিন.এন.জি নিয়ে আমরা সীতাকুণ্ড ভাটিয়ারী লিংক রোড যায়। সেখানে অপেক্ষা করছিল দস্তগীরের বড় ভাই গোলাম জাকারিয়া। তিনি সন্দ্বীপের নতুন ইউএনও। উনার সাথে পরিচয় হয়ে বেশ ভাল লাগলো। তিনি সেদিন চট্রগ্রামে একটা মিটিং এ আসছিল। উনার গাড়ি করে আমরা কুমিরা ঘাটে যাই। যাওয়ার পথে সন্দ্বীপ নিয়ে অনেক কথা হয়। যার মধ্যে অন্যতম হল, শিবের হাটের মিষ্টি আর রসমালাই। ড্রাইভারের কথায় বুঝা গেলো  এই মিষ্টি না খেয়ে আসলে এই ট্যুর বৃথা যাবে। টিকেট কাউন্টারে এসে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। জাকারিয়া ভাই টিকেটের জন্য গেলেন। আমরা ততক্ষণে চারদিক দেখতে লাগলাম। ছবি তুললাম। চারদিক বড় বড় জাহাজ, সব কেটে ফেলা হচ্ছে। কুমিরা ঘাটে ছোট জাহাজ আর স্পীডবোর্টে করে সন্দ্বীপ যাওয়া যায়। আমরা ভ্যানে চড়ে ঘাটে আসলাম। ঘাটে অনেক মানুষ। ঘাটের শেষ প্রান্তে দেখা মিললো কফিন বন্দী একটা লাশের।

নদীর ছোট ছোট ঢেউ দেখে বেশ ভাল লাগল। বোর্টে উঠার কিছুক্ষণের মধ্যে বোর্ট ছাড়ল। একটু একটু করে স্পীড বাড়ছিল। এই বোর্ট জার্নি আমার স্মরণকালের রোমাঞ্চকর জার্নি। কিছুদূর যেতেই চারদিক নদী আর নদী। স্পীড বোর্ট ছুটছে ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে। চুল উড়ছে, দু’পাশে পানি উড়ছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে স্পীড বোর্টও উড়ছে। খানিক পাশ দিয়ে যাওয়া স্পীড বোর্টের গতি আর পঙ্খীরাজের মতো  উড়ার অবস্থা দেখে পিলে চমকে যাওয়ার মত অবস্থা আমাদের। সব মিলিয়ে এই চমৎকার অনুভূতির কথা লিখে বোঝানো যাবে না। সন্দ্বীপে পৌঁছতে স্পীডবোর্ট সময় নিয়েছিল মাত্র আটাশ মিনিট। এই আটাশ মিনিটের রোমাঞ্চকর জার্নি আমার বাকিজীবন মনে থাকবে।

ঘাটে নামতেই দেখা মিলল সবুজ বেষ্টনির ম্যানগ্রোভ গাছগুলোর। বেশ সুন্দর লেগেছিল গাছগুলোকে দেখতে। কয়েকটা ছবি তুললাম। ঘাটে গোলাম জাকারিয়া ভাইয়ের ড্রাইভার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। ভ্যানে চড়ে মূল রাস্তায় গেলাম, সেখানে গাড়ি ছিল।

সন্দ্বীপের রাস্তাগুলো বেশ সংকীর্ণ। গাড়ি একটু সামনে এগুতেই চোখে পড়ল মাছের প্রজেক্ট। ড্রাইভারের কাছে জিজ্ঞাস করতে তিনি বললেন, এইসব ব্যক্তিমালিকানার, সরকারের না। কিছুদূর যেতে চোখ পড়ল ইট-ভাটা। আর একটু ভেতরে ঢুকতেই আমাদের হাতছানি দিল মনোরম এক সবুজ পরিবেশ। রাস্তার দু’পাশে গাছ। ঘাট থেকে মূল শহর মোটামোটি অনেকদূর।

রাস্তাগুলো বেশ  সংকীর্ণ হওয়ার পরেও অনেক জায়গায় দেখলাম গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখে মালামাল নামানো আর উঠানো হচ্ছে। এই কারণে অনেক জায়গায় যানজটের সৃষ্টি হয়।

 

আমরা প্রথমে ইউএনও এর বাংলোতে উঠি। ফ্রেশ হয়ে আসতেই ভাবী (গোলাম জাকারিয়া ভাইয়ের স্ত্রী) আমাদের শিবের হাটের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করে। মিষ্টি মুখে দিতেই মনে হলো পৃথিবীর জাগতিক মজা আমাদের মুখের ভেতর।

নাস্তা শেষে কিছুক্ষণ গল্প করে আমরা বের হলাম। বাংলোতে আসার সময় চোখে পড়ল ডাক বাংলো। আমরা সিদ্ধান্ত নিই ডাক বাংলোয় থাকব। জাকারিয়া ভাই আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেন। যদিও উনি বলেছিলেন উনার বাসায় থাকতে। কিন্তু আমাদের রাতে আশপাশ ঘুরার প্ল্যান ছিল তাই আমরা ডাক বাংলোয় থাকার কথা বলি। ডাক বাংলো দেখাশুনা করে মাহমুদ ভাই। তিনি অত্যন্ত ভাল মানুষ। আমাদের অনেক সাহায্য করছিলেন।

রাতে আমরা সেনরহাট আর তার আশপাশ ঘুরি। হাঁটতে হাঁটতে দেখা মিললো এক ফ্রেন্ডের কাজিনের সাথে। উনার সাথে অনেকক্ষণ গল্প করি। তিনি আমাদের সন্দ্বীপ সম্পর্কে অনেক কথা জানালেন। তার পরের দিন ঘুরার প্ল্যানটাও ঠিক করে দিলেন।

আড্ডার শেষের দিকে উনি আমাদের চা খাওয়াতে নিয়ে যান জুলি টি স্টলে। এই স্টলের মালিক মোঃ ফরিদ উদ্দিন। তিনি এই দোকানের মালিক, তিনিই কর্মচারী, তিনিই ক্যাশিয়ার। এই ব্যাপারটা আমাকে বেশ মুগ্ধ করে। একটা মানুষ একাই একটা দোকান দেখছে। এই দোকান নাকি তিনি ১০/১২ বছর আগে থেকে একাই চালাচ্ছেন। এইখানে শুধু নাস্তা আর চা পাওয়া যায়। অন্য কোন কিছু পাওয়া যায় না। চা শেষ হলে তিনি নাকি সাইন বোর্ডের মাধ্যমে জানিয়ে দেন। সব কিছু মিলিয়ে জনাব ফরিদ উদ্দিন আমাদের বেশ মুগ্ধ করেছেন। এই দোকান চালিয়ে তিনি এখন বেশ স্বাবলম্বী। আমরা যখন গেলাম তখন দোকানে বেশ ভিড় ছিল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর বসতে পারি। দোকান বেশ গুচানো আর পরিস্কার। চা আর কেক খেয়েছিলাম আমরা। চা খুব টেস্ট ছিল। খুব সম্ভবত গরুর দুধের চা ছিল। সন্দ্বীপে কেউ গেলে অবশ্যই উনার দোকান থেকে চা খেয়ে আসবেন।

রাত একটু বাড়তেই ঠান্ডার আমেজ বাড়তে শুরু করল। আমরা ডাক বাংলোয় ফিরে আসলাম। মোবাইলে চার্জ ছিল না। মাহমুদ ভাই চার্জার এনে দিল একটা। উনি বললেন কারেন্ট ১১ টায় চলে যাবে। এর আগে চার্জ দিয়ে দিতে।

মোবাইল চার্জে দিয়ে আমরা খেতে আসলাম। তরকারি আর মাছের আইটেমে টেবিল ভর্তি। দুই তিনটা নতুন মাছ খেলাম, নামটা ঠিক এখন মনে পড়ছে না। ভাবীর হাতের রান্না বেশ টেস্টি ছিল। খাওয়া শেষে আমরা রসমালাই খেলাম। যদিও এইটা শিবের হাটের বিনয় কৃষ্ণ সাহা (স্থানীয় নাম বিনাশা) দোকানের রসমালাই ছিল না। তবুও অনেক টেস্ট ছিল। খেয়ে আমরা ডাক বাংলোয় চলে আসি। ডাক বাংলো কাছেই।

একটু রাত নামতেই ডাক বাংলোর আশপাশটা নীরবতা নেমে আসল। সামনের স্টাফ রুমগুলো বেশ শান্ত। দক্ষিণ দু’টো কুকুর রাজত্ব করছে পুরো ডাক বাংলোর নিচটা। ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দে ভাসছিল ঘাটে দেখা মেলা কফিন বন্দি লাশটার স্বজনদের কান্না।

আমরা দুই তলায় ছিলাম। সারাদিনের ক্লান্ত দেহ বিছানায় এলিয়ে দিতেই ঘুমের রাজ্যে কবে তলিয়ে গেছি তার টেরও পাইনি। সকালে ঘুম ভাঙে পাখির ডাকে। বিছানা ছেড়ে বারান্দায় যেতে দেখে মিললো অনেকগুলো পাখির। ছবি তুললাম তাদের।

তারপর ফ্রেশ হয়ে জাকারিয়া ভাইয়ের বাংলোয় আসলাম। ভাবী নাস্তা দিল। নাস্তা খেতে খেতে ভাবীর সাথে অনেক গল্প হলো। নাস্তা করে আমরা বেরিয়ে পরলাম পশ্চিম দিকটা ঘুরার জন্য।

ট্যাক্সি করে আমরা পশ্চিম দিকের বিচে গেলাম। গ্রামীণ পরিবেশ বেশ ভাল লাগল। ট্যাক্সি থেকে নামতেই দেখা মিললো  নব নির্মিত বিনোদন কেন্দ্র সন্দ্বীপ রিসোর্টের। এই রিসোর্টের এখনও কাজ চলছে। সন্দ্বীপে পিকনিক করার জন্য এবং ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য এই বিচ সন্দ্বীপবাসীদের জন্য একটি বড় পাওনা বলে আমার মনে হয়। এই রিসোর্টটা বেশ পর্যটন টানতে পারবে বলে আশা রাখি। আমাদের বেশ ভালই লেগেছিল রিসোর্ট টা, সেখানে দেখলাম শর্ট মুভির শ্যুটিং চলছিল। রিসোর্ট থেকে পশ্চিম দিকটাই থাকালে দেখে মেলে পানি আর পানি। এই বিচ থেকে সূর্যাস্ত বেশ দারুণ ভাবে উপভোগ করা যায়, সাথে পূর্ণিমাও।

পশ্চিম-উত্তর দিকটা ধরে আমরা তিনজনে হাঁটতে হাঁটতে অনেকদূর চলে আসি। যতদূর হেঁটেছি তা এককালে নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে সব নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার চর উঠছে। গ্রামের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বেশ ক্লান্ত হয়ে উঠেছি।

একটা দোকানে নাস্তা করে আবার হাঁটা শুরু করলাম। রাস্তা ছেড়ে কখনও সাঁকো, কখনও মেঠো পথ, আবার রাস্তা এইভাবে হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির দেখা মিলল। শুক্রবার ছিল বিধায় আমাদের ডাক বাংলোয় জুমার আগে ফিরতে হয়েছিল। নাহলে আরও অনেক ঘুরা যেতো। ফিরে এসে শুনলাম, চট্রগ্রামের মুক্তিযোদ্ধার জেলা কমান্ডার আসবেন ৬/৭ নিয়ে। আমাদের দুই তলার রুম ছেড়ে দিতে হবে। মাহমুদ ভাই বলল আমরা চাইলে নিচের রুমে থাকতে পারবো। কিন্তু জাকারিয়া ভাইয়া মানা করে দিলেন। তাঁর বাসায় চলে আসতে বললেন। আমরা মাহমুদ ভাইকে বলে নিচের রুম ঠিক করে নিলাম। পরে জাকারিয়া ভাইয়াকে বলে নিচের রুমে থাকার বন্দোবস্ত করলাম। তিনি রুম ঠিক করে দিলেন।

তারপর গোসল করলাম। এরপর উপজেলা কমপ্লেক্সের মসজিদে নামায পড়ি। নামায পড়ে এসে খেয়ে রেস্ট নিই। বিকালে প্লেন ছিল সবুজচরে যাওয়ার।

বিকালে সবুজচরে যায় আমরা সবাই, সাথে জাকারিয়া ভাইয়ের ফ্যামিলিও ছিল।

সন্দীপের একটা ইউনিয়ন এই সবুজ চর।  নামে সবুজ চর হলেও  সবুজের দেখা মিলেছে শুধু অল্প কিছু জায়গায়। তবে বছরের একটি সময়ে এই চর সবুজ থাকে। ৭০ এর দশকে সাগরের ভাঙনে বিলীন হয়ে যায় এই জায়গা টা। আবার ৯০ দশকে এই চর জেগে উঠে মানুষকে আলো দেখায়। ১৯৯৩ সালের দিকে মানুষ গিয়ে ওই চরে নিজেদের জায়গা দখল নিতে থাকে। বিক্ষিপ্তভাবে কিছু কিছু জায়গায় এখন মানুষ বসবাস করছে। মাটি লবাক্ত হওয়ার কারণে বর্ষার মৌসুম ছাড়া এইখানে অন্য সময়ে কোন চাষ হয় না। সরকারের ভূমি অফিসের সহায়তায় জমির সিট দেখে জমির মালিকদের মধ্যে চরের জমি বরাদ্দ দেওয়ার কাজ চলছে খুব সম্ভবত। তবে তা খুব অল্প। বাস্তুহারাদের জন্য সরকারিভাবে প্রায় ৯০ টা পরিবারের জন্য বাড়ি তৈরি করা হচ্ছে সেখানে। কাজ প্রায় শেষের দিকে।

আমার দেখা অন্যতম চর এই সবুজ চর। কিছু কিছু জায়গায় দেখলাম মহিষ আর ভেড়ার পাল। দু’চোখ যতদূর গেলো শুধু চর আর চর দেখলাম। আমরা সূর্যাস্ত দেখলাম সবুজ চরে উত্তর-পশ্চিম দিকটাই। এই চরে তাবু কাটিয়ে জোছনা উপভোগ করার খুব ইচ্ছে। সন্দ্বীপ কেউ গেলে এই চর অবশ্যই অবশ্যই ঘুরে আসবেন। আকবর হাট হয়ে ঘুরে যেতে হয় এই চরে। আমার দেখা আকবর হাত ছিল সবচে বড় হাট। এইদিকের রাস্তাগুলো খুবই সংকীর্ণ। রাস্তাগুলো দ্রুত সংস্কার করার দরকার। একটা গাড়ী গেলে উল্টো দিক থেকে আসা অন্য গাড়িটার দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আমরা একটা জায়গায় অল্পের জন্য এক্সিডেন্টের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম।

আমাদের সাথে সবুজচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিল। তিনি আমাদের সবকিছু ঘুরিয়ে দেখালেন। আরেকটু আগে গেলে আমরা আরও বেশ দারুণ সময় উপভোগ করতে পারতাম।

ফিরে এসে ডাক বাংলোয় আসলাম। ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে বের হলাম। দাওয়াত ছিল একটা। জুলি স্টলে চা খাওয়ানো সে ভদ্রলোকের বাসায় (তিনি আমাদের এক বন্ধুর কাজিন)। সেনের হাটে উনার একটা দোকান আছে। সেখানে গিয়ে গল্প করার পর উনার বাসায় যাই।

উনাদের মেহমানদারি দেখে আমরা অবাক হয়েছি। সন্দ্বীপের মানুষের এমন মেহমানদারির কথা আমার অনেক দিন মনে থাকবে। মানুষটার মেহমানদারী দেখে বুঝার উপায় ছিল না উনার সাথে আমাদের গতকাল দেখা হয়েছিল।

নতুন একটা মাছ খাওয়ালেন। নামটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। সন্দ্বীপে যে তিনদিন ছিলাম তিন দিনই বিভিন্ন মাছ খেলাম। তারপর তিনি খাটি মহিষের দুধের দই খাওয়ালেন। অনেক টেস্ট ছিল। এরপর উনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা ডাক বাংলোয় ফিরে আসি। ইচ্ছে ছিল সে রাতে  চট্রগ্রামের মুক্তিযোদ্ধার জেলা কমান্ডারের সাথে কথা বলার। কিন্তু সুযোগ হয়ে উঠেনি।

মাহমুদ ভাইয়ের সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে আমরা ঘুমিয়ে পরি। পরের দিন প্ল্যান ছিল দক্ষিণ দিকটা ঘুরার।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবীর হাতের মজাদার খিচুড়ি আর ডিম ভুনা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম দক্ষিণ দিকটা ঘুরার জন্য।

আমরা প্রথমে উপজেলা কমপ্লেক্স থেকে ট্যাক্সি করে শিবের হাট গেছি। অন্যান্য জায়গা থেকে এইখানে ভাড়া খুব বেশি। সেখান থেকে দক্ষিণ চরে যাওয়ার জন্য ট্যাক্সি ভাড়া করতে চাইলে ড্রাইভার অনেক ভাড়া চায়। শেষ অবধি আমরা শিবের হাট থেকে সাইকেল ভাড়া করে দক্ষিণ দিকে ছুটে চললাম। দক্ষিণ দিকটাই গ্রাম অনেক। মেঠো পথে সবুজের সমরোহ বেঁধ করে সাইকেল নিয়ে ছুটতে বেশ দারুণ লাগছিল। অনেকগুলা খেজুর গাছ দেখলাম। কেউ কেউ রস নিয়ে যাচ্ছে গাছ থেকে পাত্র বা বোতলে করে। পাখিও পিছিয়ে নেয়। মনের আনন্দে তারাও রস খাচ্ছে। পাখির অনেকগুলো ছবি তুললাম। এরপর আরেকটু এগুতেই দেখা মিললো চরের। সে চরে ভেড়ার পাল ছুটে বেড়াচ্ছে ইচ্ছে মতো। এই দিকের মানুষগুলো জীবন যাত্রার মান একটু অনুন্নত। স্যানিটারি সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। চরে অনেকক্ষণ ঘুরলাম। ফিরে আসতে দেখা মিললো মনোরম দৃশ্যের।

শিবের হাটে এসে সাইকেল রেখে খুঁজ নিলাম বিনয় কৃষ্ণ সাহার দোকানের। যার মিষ্টি খাওয়ায় ছিল এই ট্যুরের মূল গোল। একটু খোঁজ নিতেই স্থানীয় মানুষের সাহায্য খুঁজে পেলাম সে দোকান। ঢুকেই মিষ্টি অর্ডার করতে করতে ঘুরে আসলাম দোকানের একদম ভেতরটা। কারিগর এবং কর্মচারীদের সাথে কথা বলে জানলাম এই দোকান ৬০ বছর আগের। বিনয় কৃষ্ণ সাহা এখনও বেঁচে আছেন। উনার সাথে দেখা করে ভাল লাগল। উনার ছবি তুললাম, মিষ্টি বানাচ্ছে তা দেখলাম। ছবি তুললাম। এরপর এসে মিষ্টি খেতে বসলাম। গরম গরম মিষ্টি মুখে দিতেই স্বাদ পেলাম এক অমৃতের। যা কখনও ভুলার মত না। এরপর রসমালাই খেলাম। এই রকম রসমালাই  আমার জীবনে আমি আগে কখনও খাইনি। খাওয়ার পর বিল মিটিয়ে চলে আসলাম।

ডাক বাংলোয় আসতে আসতে তিনটা বেজে যায়। খাওয়ার পর আমাদের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জাকারিয়া ভাইয়ের ব্যস্ততার কারণে রওনা দিতে পারিনি।

 

সন্দ্বীপের কথা উঠলেই মনে পড়ে বেশ কিছু সাহসী বীরের কথা। তাদের মধ্যে অন্যতম দক্ষিণ এশিয়ার কমিউনিষ্ট পার্টির জনক কমরেড মুজফফর আহমদের মতো রাজনীতিবিদ, ভাষাসৈনিক রাজকুমার চক্রবর্তীর মতো দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান ও মাওলানা অজিউল্লাহর মতো মেধাবী আলেম, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামী আবু তোরাব চৌধুরীর মতো বীরযোদ্ধা, চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহের সাহসী সৈনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের কৃতি ছাত্র বিপ্লবী লালমোহন সেন, আলীয়া নেছাবের মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা খানবাহাদুর মাওলানা জিয়াউল হক, মৌলভী বসির উদ্দীন এর মতো গর্বিত সন্তানদের।

প্রায় হাজার খানেক মুক্তিযোদ্ধাও রয়েছে।

সেদিন সন্দ্বীপে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাইয়ের কাজ চলছিল। রাতে আমরা ঢুঁ মারলাম সেখানটাই। আমি আগে কখনও এত মুক্তিযোদ্ধা এক সঙ্গে দেখি নাই। একজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল।

মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল। কিভাবে তাঁর সন্দ্বীপ থেকে ভারতে গেল, সেখানে কোথায় ট্রেনিং নিলো, তাদের কি খেতে দেওয়া হতো, তারা কিভাবে আবার সন্দ্বীপে ফিরল এইসব বলেছিল।

সন্দ্বীপে যুদ্ধ তেমন হয়নি। সেদিন সকাল ১০ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত চলেছিল যাচাই-বাচাইয়ের কাজ। দেখা হয়েছিল সে সময়কার ১৫ বছর বয়সী মুক্তিযোদ্ধার সাথে। তাঁর কথা শুনে শিরশির করে উঠল ভেতরটা। কি দুঃসাহস ছিল তাঁদের।

তাঁদের জন্য আজ আমরা পেয়েছি স্বাধীন রাষ্ট্র, বাংলা ভাষা। এই ভাষার মাসে তাঁদের জানাই অন্তরের অন্তস্থল থেকে শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।

রাতে খেয়ে আবার ডাক বাংলোয় ফিরে আসি। সারাদিনের ক্লান্ত দেহ বিছানায় এলিয়ে দিতেই ঘুম চলে আসল।

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে নাস্তা করে জাকারিয়া ভাই, ভাবীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে পরি। ড্রাইভার আমাদেরকে ঘাটে পৌঁছাই দেই। সবুজ বেষ্টনির ম্যানগ্রোভ গাছগুলো আবারও মন জুড়াই দিয়েছিল। ছবি তুললাম কিছু।

এরপর জাহাজের টিকেট কেটে এদিক ওদিক ঘুরে উঠে পড়লাম জাহাজে। আসার পথে গাঙচিল ছিল আমাদের সঙ্গী।

আবার দেখা হবে এই অপরূপ দ্বীপের সাথে, এই দ্বীপের অমায়িক মানুষদের সাথে, এই দ্বীপের বিখ্যাত মিষ্টির সাথে- যার কথা কখনও ভুলবো না আমি।

আবার আসলে পশ্চিম পাড়ে জোছনা উপভোগ করতে করতে আবৃতি করা হবে কবি নজরুলের চক্রবাক কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো। যা তিনি সন্দ্বীপে বৃক্ষের ছায়াতলে বসে লিখেছিলেন।

মধ্যযুগে সন্দ্বীপের সুধারামপুরে জন্ম নেওয়া কবি আব্দুল হাকিমের দু’লাইন কবিতা দিয়ে এই লেখার ইতি টানছি।

“যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী

 সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”


লেখক : শিক্ষার্থী প্রিমিয়ার ইউনিভারসিটি


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন