আজ শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ ইং, ০৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



দানবীর কাজী আব্দুল আহাদ : সন্দ্বীপের এক স্মরণীয়, বরণীয়, নন্দিত মহান পুরুষের নাম

Published on 24 March 2017 | 4: 02 pm

:: অধ্যপক আ.ন.ম. আবদুর রহিম ::

সন্দ্বীপ জন্ম দিয়েছে কত গুণীজন, শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবী, প্রশাসক যার ইয়ত্তা নেই। সন্দ্বীপ ইতিহাস হাজারো মহান পুরুষের পদচারণায় ভরপুর। তৎকালীন অখন্ড বঙ্গদেশে সন্দ্বীপের কতিপয় মানুষের মানবীয় গুণাবলীর জন্য বিশেষ সুখ্যাতি রয়েছে। এখানকার মানুষের সততা, অথিতি পরায়ণতা, ধর্ম ভীরুতা, মানবতাবাদ, দানশীলতা, সমাজসেবা সন্দ্বীপের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে। মরহুম কাজী আব্দুল আহাদ ছিলেন এসব গুণে গুণান্বিত একজন মহান পুরুষ। তিনি আমার শ্রদ্ধেয় বড় মামা হন। তাঁকে অনেকে সন্দ্বীপের হাতেম তাই, অনেকে আবার দানবীর হাজী মুহাম্মদ মহসিনের সাথে তুলনা করে থাকেন।

তাঁর সুযোগ্য পিতা- কাজী আফাজউদ্দিন মোক্তারের রেখে যাওয়া তিনশতকানি সম্পত্তির বিশাল অর্থ ভান্ডারের আয়ের উৎস ত্রিশ বৎসর চেয়ারম্যান থাকালীন সময় দ্বীপের গরীব-দূঃখী মানুষের কল্যাণে তিনি অকাতরে ব্যয় করেন। তিনি তৎকালীন একত্রিভূত, মাইটভাঙ্গা, সারিকাইত, ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট কখনো চেয়ারম্যান। তিনি ঋণশালিনী বোর্ডের মেম্বার ছিলেন, চট্টগ্রাম জেলার জুড়ির বিচারক ছিলেন, উদ্দেশ্য মানুষের সেবা করা। জনগণের কল্যাণ করা তাঁর জীবনের ব্রত ছিল। তিনি জনগণের কল্যাণের জন্য পুল করেছেন, সেতু করেছেন, রাস্তা করেছেন, স্কুল করেছেন, মাদ্রাসা করেছেন, মসজিদ করেছেন, হাসপাতাল করেছেন। এবং দুর্ভীক্ষের সময় নঙ্গরখানা খুলেছেন, চরাঞ্চলের মছাফিরের জন্য। তিনি অনাথ, এতিম ও ভীক্ষুককে সবসময় খাওয়াতেন। হিন্দু, মুসলিম তার কাছে কোন ভেদাভেদ ছিল না। হিন্দুদের কাছে তিনি ছিলেন অবতারতুল্য। কাজী আব্দুল আহাদের সমগ্র জীবন মানুষের সেবায় উৎসর্গ করেছেন। এরকম সোনার মানুষ আজকাল খুজে পাওয়া দুষ্কর। কোথায় হারিয়ে গেল সে সোনার মানুষটি ! আজ তাঁর বড়ই অভাব অনুভব করছি। আরেকজন কাজী আব্দুল আহাদ আবার ফিরে আসুক।

কাজী আব্দুল আহাদের সর্ম্পকে আমার জানা খুবই সীমিত। বাল্যকালে যখন মায়ের সাথে মামার বাড়ীর যেতাম তখন দেখতাম তিনি আমার মাকে খুব স্নেহ করতেন তদ্রুপ আমাদেরকেও। জীবনের স্বল্প পরিসরে যা দেখেছি তা নিয়ে এখন কিছু স্মৃতিচারণ করব। তবে ঋষিতুল্য এ মহান মানুষ সম্পর্কে বিশদভাবে আলোচনা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। উনার দীর্ঘ সহচার্য যারা লাভ করেছেন তারা তাঁর সম্পর্কে যথার্থ কিছু লিখতে পারবেন আমার বিশ্বাস। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, দীর্ঘদিন পর উনার উপর কিছু একটা লিখার প্রয়াস গ্রহণ। সময় অনেক পার হয়ে গেছে। ঐ সময়ের খুব মানুষই বর্তমানে বেঁচে আছেন। তারপর তাঁর সুযোগ্য ছেলেদের পক্ষে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তার জন্য তাদেরকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। ইংরেজীতে একটা কথা আছে, “Better late then never” এ মহান পুরুষটি কে নিয়ে সামাজিক উদ্যোগে অনেক কিছু হতে পারতো, হতে পারতো রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সমাজে সে মূল্যবোধ আজ বিলুপ্ত হয়েছে, কারো কাজের স্বীকৃতি দিতে আমরা অতিমাত্রায় কৃপণ। ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল¬াহের ভাষায়,
” যে সমাজ মহৎ লোকের সম্মান দিতে পারেনা সে সমাজে মহৎ লোক জন্ম লাভ করেনা ”। এবার কাজী আব্দুল আহাদ সম্পর্কে কিছু স্মৃতিচারণ করবো।

বিভিন্ন তথ্য সূত্রে জানা যায়, তিনি সন্দ্বীপের ঐতিহাসিক সারিকাইত গ্রামে ১৩৫১ বঙ্গাব্দের ৩০ শে অগ্রহায়ণ মোতাবেক ১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দে দক্ষিণ সন্দ্বীপের বিখ্যাত কাজী পরিবারে কোন এক সুন্দর প্রভাতে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কাজী আফাজ উদ্দিন মোক্তার, মাতা আলহাজ্ব নাজমুন নেছা। তারা ছিলেন পাঁচ ভাই ও সাত বোন। পাঁচ ভাই যথাক্রমে কাজী আবদুল আহাদ, কাজী আব্দুল আওয়াল (আই.জি. প্রিজন), কাজী কামাল উদ্দিন, কাজী জামাল উদ্দিন, কাজী গিয়াস উদ্দিন। সাত বোন- অলি বিবি, স্বামী- মৌলভী সাজেদুল হক, মেহের আফরোজ, স্বামী- প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের খাঁন বি.এ.বি.টি, জেবুন্নেছা, স্বামী- বদিউল আলম তালুকদার, মমতাজ বেগম, স্বামী- বাদশাহ মিয়া তালুকদার, আনজুমান আরা, স্বামী- শামসুল আলম মোক্তার, রওশন আকতার বেগম, স্বামী- প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী আকরব বি.এ.বি.টি, শামসুন নাহার, স্বামী- অধ্যক্ষ মওলানা মোহাম্মদ উল¬াহ। কাজী আব্দুল আহাদের পিতা কাজী আফাজ উদ্দিন মোক্তার খুবই ধার্মিক, সমাজসেবী ও বহু প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন। মাও তদ্রুপ ধার্মিক, ধৈর্যশীল, ভাগ্যবতী, এক অনন্যা মহিলা ছিলেন। তাঁর দাদার নাম দেওয়ান আলী কাজী। তাঁর দাদীর নাম হিরা মনি বিবি। কথিত আছে, শেখ আইন উদ্দিনের বংশধরেরা আরব দেশ থেকে সর্বপ্রথম চট্টগ্রামের ফৌজদার হাটে বসবাস শুরু করেন। সেখানে হতে শেখ আইন উদ্দিন সন্দ্বীপে এসে চৌকাতলী গ্রামে বসবাস শুরু করেন। শেখ আইন উদ্দিন সন্দ্বীপ পরগনার বিচার বিভাগের কাজীর দায়িত্ব পালন করেন। শেখ আইন উদ্দিন কাজী আব্দুল আহাদের পূর্ব পুরুষ ছিলেন। এভাবে দক্ষিণ সন্দ্বীপের বিখ্যাত কাজী পরিবার তথা কাজী সমাজের জন্ম লাভ করে। এ সমাজের কিংবদন্তীর মহান পুরুষ কাজী আব্দুল আহাদ। বাল্যকালে ধর্মীয় প্রাইমারী শিক্ষা শেষে তিনি কার্গিল ইংরেজী হাই স্কুলে ভর্তি হন। নবম শ্রেণিতে উন্নিত হলে তাঁর পিতা আফাজ উদ্দিন মোক্তার পাঁচ ছেলে ও সাত মেয়ে রেখে মৃত্যুবরণ করেন। পারিবারিক প্রয়োজনে নবম শ্রেণিতে পাঠ্যরত অবস্থায় তাঁর লেখাপড়ার ইতি ঘটে। বাবার তিনশত কানি সম্পত্তি ও পরিবার দেখার ভার তাঁর উপর অর্পিত হল। অতপর অল্প বয়সে সামাজিক দায় বদ্ধতায় গ্রামের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এভাবে জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত সমাজ সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেন কাজী আব্দুল আহাদ। কোমলতা, মানবপ্রেম, উদারতা, মানুষের প্রতি ভালবাসা তাঁর চারিত্রিক ভূষণ ছিল। গ্রামের কোন অপরাধী দোষী ব্যক্তি তাঁর বিচারের কাঠগড়ায় আসলে তাদের প্রতি অতি সদয় হযে হালকা শাস্তি দিয়ে হিত উপদেশ প্রদান করে পকেটের টাকা খরচ করে বিদেশে পাঠিয়ে দিতেন। দেখা যেত ঐ চোর পরিশেষে চৌর্যবৃত্তি ছেড়ে দিয়ে ভালো হয়ে গেছে।
অবশ্য এ বিষয়ে মনস্তাস্তিক বিশে¬ষণ রয়েছে। তাঁর স্বহৃদয়তা প্রসঙ্গে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার চরণের বিশেষ মিল খোঁজে পাওয়া যায়। যেমন ঃ-
”দন্ডিতের সাথে দন্ডদাতা কাঁদে যবে,
সমান আঘাতে সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার।”
কাজী আবদুল আহাদ একই সাথে পারিবারিক দায়ভার, সামাজিক দায়বদ্ধতা অতীব নিষ্ঠার সহিত পালন করেন। বাবার জীবদ্দশায় দু’ বোনের বিয়ে হয়েছে বাকী পাঁচ বোন, পাঁচ ভাইয়ের বিয়েশাদী, লেখাপড়া, সর্বোপরি পরিবারে বিশাল জমিদারি রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হয়েছিল তাঁর শান্ত, সৌম্য, বিচক্ষণতা, প্রজ্ঞা ও সুবুদ্ধির কারণে। বোনদের সুপাত্রে বিয়ে দেন, একইভাবে ভাইদেরও। সব ভাইকে লেখাপড়ায় এগিয়ে নিতে চেষ্টা করেন। তাঁরই আপ্রাণ প্রচেষ্টায় এক ভাই কাজী আব্দুল আওয়াল অর্থনীতিতে যিনি সর্বপ্রথম সন্দ্বীপ হতে বি.এ. (অনার্স) পাশ করেন। আরেক ভাই কাজী গিয়াস উদ্দিন আরবী সাহিত্যে এম.এ পাশ করে অধ্যাপনা করেন। এসব কাজী আব্দুল আহাদের পরিবারের প্রতি অতুলনীয় ত্যাগের ফসল। তিনি নিজেও কম মেধার অধিকারী ছিলেন না। কার্গিল ইংরেজী হাই স্কুলে একজন ভালো ছাত্র হিসেবে তাঁর স্থান ছিল। পরিবার ও সমাজের টানে তাঁর এ আত্মত্যাগ। কথায় বলে ত্যাগেই ধর্ম, সেবাই ধর্ম, কাজী আব্দুল আহাদ ছিলেন তারই বিমূর্তরূপ।

তিনি ছিলেন কেজন শিক্ষানুরাগী মানুষ। সে সময়ে সন্দ্বীপে মুসলিম ছাত্রদের পড়ার সুযোগ তেমন ছিল না। ইংরেজী শিক্ষার একমাত্র আদি পীঠ ছিল কার্গিল হাই স্কুল। হিন্দু উচ্চবিত্তদের দখলে ছিল এ স্কুল। তাই প্রয়োজন হয় সন্দ্বীপ মডেল হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার। এ স্কুল প্রতিষ্ঠাই অন্যান্যদের ন্যায় তিনিও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেন। তাঁরই ভগ্নিপতি প্রধান শিক্ষক আলী আকবার বি.এ.বি.টি কে এ স্কুলের সফল ও স্বনামধন্য প্রধান শিক্ষক হিসেবে আমরা দেখতে পাই। এখানেও তাঁর প্রচেষ্টা ছিল। পুরো সন্দ্বীপের মানুষের জন্য শিক্ষার চিন্তা শেষ করে তিনি দক্ষিণ সন্দ্বীপকে শিক্ষার আলোকে আলোকিত করতে উদ্যোগি হন। দক্ষিণ সন্দ্বীপ হাই স্কুল প্রতিষ্ঠাই তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ছিল, আর্থিক সহযোগিতা ছিল। তাঁর আরেক সুযোগ্য ভগ্নিপতি আবুল খায়ের খাঁন এ স্কুলকে এবং এ অঞ্চলকে আলোর মুখ দেখান। স্কুলের প্রতিষ্ঠা লগ্ন হতে দীর্ঘকাল তিনি স্কুলের সেক্রেটারী ছিলেন। সে সময়ে স্কুলের সেক্রেটারীর ভূমিকা ছিল সর্বাধিক। স্কুলের প্রতিষ্ঠাই তিনি রাতদিন শ্রম দেন এবং বড় অংকের আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেন। ছাত্রদের এবং শিক্ষকদের থাকার জন্য নিজ কাচারী ঘর ছেড়ে দেন। নিজের ঘরে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেন। স্কুলের ঘন নির্মাণের জন্য পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে চলি¬শ দশক উত্তর নগদ দশ হাজার টাকা প্রদান করেন। ইহা ছাড়া স্কুলের বড় ধরনের কোনো খরচ আসলে নিজ পকেট হতে দান করতেন। তাই একবার পরিচালনা পরিষদ হতে সর্বসম্মত প্রস্তাব এসেছিল স্কুলটিকে তাঁর বাবা আফাজ উদ্দিন মোক্তারের নামে করার জন্য। কাজী আব্দুল আহাদ সবিনয়ে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। তখনকার দিনের দশ হাজার টাকার বর্তমান মূল্য কত ? বর্তমান সমাজে কারো ত্যাগের বিনিময়ে এ ধরনের প্রস্তাব যদি আসে জবাবটা কি আসবে সুপ্রিয় পাঠক তা নিশ্চয়ই সহজেই অনুধাবন করতে পারেন। দক্ষিণ সন্দ্বীপ হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার ইতিহায় নতুন প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে উপস্থাপন হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। যার যা প্রাপ্য তা দেওয়া উচিত। না হয় মানুষ মহৎ কাজ করতে আগ্রহী হবে না। (তথ্য সূত্র দ্বীপের চিঠি)

সে সময়ে স্কুল প্রতিষ্ঠাই ত্যাগি পুরুষদের নাম ফলক উম্মোচন করা উচিত। দাতা ও প্রতিষ্ঠাতাদের নামের তালিকার বোর্ড করে রাখা উচিত। স্কুলের প্রধান শিক্ষককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সবিনয়ে অনুরোধ রইল। এ স্কুল তখন হতে অদ্যবধি জন্ম দিয়েছে হাজারো শিক্ষাবিদ, ডাক্তার, অধ্যাপক, অধ্যক্ষ, প্রকৌশলী, আইনবিদ, সচিব, কবি, সাহিত্যিক প্রমূখ। আমাদের মহান স্বাধীনতার ঘোষণা সেদিন ইথারে সর্বপ্রথমে ভেসে আসছিল যার কণ্ঠে তিনি এ স্কুলের সুযোগ্য ছাত্র আবুল কাশেম সন্দ্বীপ। স্বাধীনতার পদকধারী কবি বেলাল মোহাম্মদ, ডাক্তার কাজী শহীদুল¬াহ, ডাক্তার কাজী রফিকুল হক, ম্যাজিষ্ট্রট আনছারুল হক, সচিব আ.ল.ম আবদুর রহমান, সচিব জাফর উল¬াহ খাঁন, সচিব আবদুল মান্নান, এন,ডি,সি রেক্টর বি,পি,এ টি, সি, ডাক্তার এনায়েত উল¬াহ, প্রকৌশলী আবুল কালাম আরো অনেকে। এসব কাজী আব্দুল আহাদের প্রচেষ্টার ফসল আমরা খুঁজে পাই। আমিও এ স্কুলে পড়েছি। তখন এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন শ্রদ্ধেয় আবুল খায়ের খাঁন।

দক্ষিণ সন্দ্বীপের হত দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যের ভাবনাও তাঁকে তাড়িত করেছিল। দেখুন কাজী আব্দুল আহাদের সামাজিক ভাবনা কত বড় ও কত সুদূর প্রসারী ছিল। তিনি শিবের হাটের দক্ষিণ পাশে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। তখন সন্দ্বীপ নোয়াখালী জেলায় অন্তর্ভূক্ত ছিল। সন্দ্বীপের সুযোগ্য সন্তান সৈয়দ আবদুল মজিদ নোয়াখালী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। তাঁরই সহযোগিতায় তিনি চর-ভাটার ভাঙ্গন কবলিত এলাকা হতে সন্দ্বীপে স্থাপন করেন। এভাবে তাঁর মানব সেবা প্রকাশ আমরা দেখতে পাই। এক হিন্দু ভদ্র লোক কমলা কান্তি মজুমদার হাসপাতালের ভূমি প্রদান করেন। হাসপাতালটিতে বর্তমানে দুজন এম.বি.বি.এস ডাক্তার চিকিৎসা সেবার দায়িত্ব পালন করছেন। ডাক্তার নুর মোহাম্মদ, ডাক্তার মোহাম্মদ হোসেন সহ অনেকে এ হাসপাতালে মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। (সূত্র- সন্দ্বীপের শিক্ষার ইতিহাস, সম্পাদনায় ডক্টর হাসান মোহাম্মদ)

কাজী আব্দুল আহাদ ছিলেন বিশাল হৃদয়ের এক মানুষ। তিনি ছিলেন সৎ, ধার্মিক, নির্লোভ, মানব দরদী ও দেশ প্রেমিক্ চেহারা সুরতে বিরাট অবয়ব। মুখে ধবধবে সাদা দাড়ি, পরনে পায়জামা, পাঞ্জাবী, আচকান, মাথায় জিন্নাহের ক্যাপ, হাতে বেতের লাঠি সুন্দর সুঠাম চেহারা, সর্বদা হাস্যজ্জ্বোল মুখ। হঠাৎ কেউ দেখলে মনে হত ভিনদেশি কোন এক রাজপুত্র। সোনা দিয়ে বাঁধানো দুটো দাঁত তাঁকে আরো আকর্ষনীয় করে তুলেছিল। যৌবনে তিনি ঘোড়ায় চড়ে চলা ফেরা করতেন। অবশ্য একবার ঘোড়া থেকে পড়ে দাঁত ভেঙ্গে ফেলায় তিনি ঘোড়া চড়া বন্ধ করে দেন। আমরা দেখেছি গরুর গাড়িতে করে সন্দ্বীপ শহরে তিনি আসা যাওয়া করতেন। পাশের বাড়ির শেখ আহমদ সহ আরো অনেকের গরুর গাড়ি ছিল তাঁর বাহন। সন্দ্বীপের জমিদারী প্রথার ইতিহাসে কাজী আব্দুল আহাদ ছিলেন একজন প্রজা বৎসল জমিদার। একাত্তর সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পবিত্র হজ্বে গমন করলে কিছুদিনের জন্য তিনি চেয়ারম্যান ছিলেন না। এসময় রিলিফ কমিটির মাধ্যমে গ্রাম প্রশাসন চলছিল কিছুদিন। অতপর বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এসে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দিলে তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। ইহার ছিল তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়। চুয়াত্তর সালে দেশে দুর্ভিক্ষ চলছিল। একদিন আমি কাজী বাড়িতে গেলাম, দেখলাম কাচারীর চারিদিকে কিছু মহিলা ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। কাচারীর ভেতরে ৭০-৮০ জন বৃদ্ধ লোক বসে আছে। সবাই তাঁর কাছে সাহায্যের জন্য এসেছে। এ সময় তাঁর আর্থিক অবস্থা ভালো ছিলনা। ভাইয়েরা সবাই ভিন্ন হয়ে গেছে। জায়গা  জমি উনার যা ছিল কর্যের দায়ে প্রায় বন্ধক। তাঁর স্ত্রী আমার মামী খুবই বুদ্ধিমতি মহিলা ছিলেন। তিনি বুদ্ধি করে কিছু জমি বিক্রি করিয়ে বাদ বাকী জমি মুক্ত করার উদ্যোগ নেন। এভাবে তাঁর হাতে কিছু টাকা আসে। এ সুযোগে গ্রামের মানুষ এসেছে তাঁর কাছে সাহায্যের জন্য। তিনি আমাকে দেখে বললেন, ভাগিনা তুমি বাড়িতে গিয়ে তোমার মামীকে কিছু বলবেনা। অর্থাৎ ঐ টাকা তিনি মানুষকে দান করেছিলেন। কত বড় মহৎ হৃদয়ের অধিকারী হলে মানুষ এ ধরনের ত্যাগ করতে পারেন। মহা মনিষীদের কথা আছে,
”জীবে দয়া করে যে জন,
সে জন সেবিছে ঈশ্বর।”
কাজী আব্দুল আহাদ গরীব, দুঃখী, দুস্থ মানুষের জন্য এভাবে সারা জীবন নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি নিজের সুখের কথা ভাবেন নাই, স্ত্রী পরিবারের কথা ভাবেন নাই, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভাবেন নাই, আত্মীয় স্বজনদের কথা চিন্তা করেন নাই সমাজ ভাবনায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তাঁর শেষ জীবনের দুঃসময়ে আলহাজ্ব কাজী জামাল উদ্দিন ও আমার খালাতো ভাই সালাউদ্দিন মানিক তাঁর পরিবারকে অনেক সহযোগিতা করেছেন বলে শুনছি। পরবর্তীকালে তাঁর সুযোগ্য জামাতা মেজর সাহাব উদ্দিন এ পরিবারের জন্য নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। অবশ্য আমার মামী খুবই প্রজ্ঞাবতী মহিলা ছিলেন। মামার মৃত্যুর পরও তিনি ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কঠিন পরীক্ষার মধ্যে মানুষ করেছেন। তিনিও আজ নেই, এ মুহূর্তে তাঁকে শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করছি। তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। তিনি প্রথম বিয়ে করেন সন্দ্বীপের বিখ্যাত জমিদার মৌলভী গোলাম খালেকের মেয়ে মোছাম্মৎ মুস্তফা খাতুনকে। চার ছেলেমেয়েকে রেখে তিনি অকালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সুযোগ্য বড় ছেলে ডাক্তার কাজী মুহাম্মদ শহীদুল¬াহ, সাবেক সি.এম. ও বাংলাদেশ রেলওয়ে। আত্মীয় স্বজনের জন্য তাঁর অকৃত্রিম দরদ ছিল। তাঁর দ্বিতীয় ছেলে সন্দ্বীপের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রধান শিক্ষক কাজী মুহাম্মদ আলমগীর। স্বভাব চরিত্রে তিনি অত্যন্ত বিনয়ী। আত্মীয় স্বজনের প্রতি তিনি খুবই আন্তরিক। দুজনেই কাজী আব্দুল আহাদের আদর্শ সন্তান। দুই মেয়ে জোহরা ও হাজেরা। দুজনই খুবই ধর্মানুরাগী, আত্মীয় স্বজনের প্রতি দরদ রাখেন। এরা প্রথম স্ত্রীর ঘরের সন্তান। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি বিয়ে করেন সন্দ্বীপের বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের সিরাজুল ইসলাম ঠাকুরের মেয়ে আনোয়ারা বেগমকে। এ ঘরে তাঁর পাঁচ ছেলে চার মেয়ে জন্ম নেন। এদেরকে অসহায় রেখে ১৯৮৯ সালের ১২ই ফেব্র“য়ারী রোজ সোমবার মোতাবেক ১৫ ই রবিউল আউয়াল তিনি নশ্বর এ পৃথিবী হতে চির বিদায় নেন। তাঁর এ বিদায় ছিল যেন একটি নক্ষত্রের পতন। মূল কথা হল- ” জন্মিলে মরিতে হবে, কে কবে অমর ভবে ”। এ ঘরের বড় ছেলে কাজী শিব্বির আহমদ ওসমানী আমেরিকার অভিবাসী, কাজী শওকত আলী ব্যারিষ্টার লন্ডনে অবস্থান করছেন, কাজী শিবলী নোমানী চট্টগ্রাম জজ কোর্টের স্বনামধন্য সিনিয়র উকিল, এডভোকেট কাজী ইকবাল আজম সন্দ্বীপে সমাজ সেবায় রত। মেয়ের জামাতা মেজর সাহাব উদ্দিন, প্রকৌশলী সালাউদ্দিন কাশেম, ব্যাংকার আব্দুল বাতেন, ডাক্তার কাউছার আহমদ, ডাক্তার সুলতার মাহমুদ স্ব স্ব অবস্থানে সুনামের সহিত অধিষ্ঠিত। মেয়ে- শেফা, রোকেয়া, সুফিয়া, সুলতানা প্রমূখ। ছেলেমেয়েদের নামকরণের মধ্যে তাঁর ইসলামী মূল্যবোধের প্রকাশ ঘটেছে। তিনি ষোলকলায় ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী ছিলেন। মায়ের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধ ছিল সুগভীর। ঘর হতে দূরে কোথাও যেতে তিনি মাকে সালাম করে বের হতেন। তিনি খুবই শরীফ স্বভাবের ছিলেন। নিজ স্ত্রীকে তিনি আপনি বলে সম্বোধন করতেন।

বাল্যকালে তাঁর অনেক নির্বাচনে মায়ের সাথে মামার বাড়ি যেতাম। মা খালারা সবাই একত্রিত হতেন। নির্বাচনের দিন সবাই ভাইয়ের জন্য নফল নামাজ আদায় ও তসবীহ নিয়ে বসে থাকতেন। অবশেষে জয়ের মালা তাঁর গলে পড়তো। এসময় তাঁর নির্বাচনকে নিয়ে তাঁরই একান্ত সহচর কাজী মমতাজ উদ্দিন বিভিন্ন চারণ গীতি রচনা করতেন। যেমন ঃ
” আমরা ভুলবনা, ভুলবনা,
কাজী সাবের গুণের কথা ভুলবনা।
কাজী সাব ভাই হক্কের কাজী,
আল¬াহ আছেন তাতে রাজি।”
আরো অনেক কিছু এ মূহুর্তে মনে আসছেনা। মমতাজ কাজী, মহিদুল হক, পাশের বাড়ির গুরুন, কাজী হাসানুজ্জামান তাঁর খুবই প্রিয় ছিলেন। সর্বক্ষণে তাঁর সাথে অবস্থান করতেন। কাজী আব্দুল আহাদের সমগ্র জীবন বর্ণাঢ্য ইতিহাসে ভরপুর। আমার বিশ-বাইশ বছর বয়সে উনাকে যেভাবে দেখেছি তা আজও স্মৃতিতে চির অ¤¬ান। যারা তাঁর সান্নিধ্যে ছিলেন তারা জানেন তিনি কত ভদ্র, নম্র ও মানব প্রেমিক ছিলেন। তাঁর সান্নিধ্যে সবসময় দেখেছি মাষ্টার কাজি গাজন ফারুল হক, প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের খাঁন, খান বাহাদুর মৌলভী খবিরুল হক, মৌলভী মোফাজ্জেলুর রহমান, মাওলানা মমতাজ, মাওলানা ছালামত উল¬াহ, হারিছ মিয়া, হাজী লুৎফর রহমান, কাজী ইছহাক মেম্বার সহ আরো অনেক গুণিজনকে। সম্মানিত লোককে তিনি সম্মান দিতে পারতেন। মাইট ভাঙ্গা গ্রামে একসময়ে যশোধারি জমিদার আসাদুল¬াহ মিয়ার পরিবারের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধাবোধ দেখেছি। তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যদের খোঁজ খবর রাখতেন। কাজী আব্দুল আহাদের ছোট ভাই কাজী কামাল উদ্দিন ছিলেন সবসময় তাঁর ইউ.পি.পি মেম্বার। ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালনায় তিনি ছিলেন মূল নিয়ামক শক্তি। সমগ্র দেশে তাঁর সুখ্যাতি করার অনেক লোক রয়েছে। আমার ছেলে ব্যাংকার সাইদুর রহিমের মুখে শুনেছি সে আই.আই.ইউ.সি তে পড়াকালীন সময়ে এক বৃদ্ধ সরকারী কর্মকর্তার সাথে তাঁর পরিচয় হলে তাঁর বাড়ি সন্দ্বীপে জানলে বলেন, আপনি কাজী আব্দুল আহাদ কে চেনেন ? সে বলল, কেন ? বললেন, আমার বাড়ি রংপুর। আমি একসময় সন্দ্বীপে সরকারি কাজে লিপ্ত ছিলাম। ফলে উনার বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। আমি উনার মত অতিথি পরায়ন, সৎ, ভালো মানুষ আমার জীবনে দেখিনি। কাজী আব্দুল আহাদের জীবনে এরকম হাজার মানুষের সাথে সাক্ষাৎ ও হাজার ঘটনা রয়েছে। সবকিছু লিখলে তাঁর জীবন নিয়ে স্বল্প-দীর্ঘ চলচ্চিত্র হতে পারে। আমার আব্বার-আম্মা দুজনের প্রতি উনার দরদ ছিল বেশী। আমার আব্বার আকস্মিক মৃত্যুর পর উনি একমাস কাল আমাদের ঘরে ছিলেন। উদ্দেশ্য আমাদের দেখশুনা করা। ইহা ছিল ইয়াতিম ভাগ্না ভাগ্নির ও বিধবা বোনের প্রতি দরদের বহিঃপ্রকাশ। আমার আব্বাকে বিভিন্ন কারণে তিনি খুবই পছন্দ করতেন। সাতচলি¬শের দেশ ভাগে অর্থাৎ আজাদী সংগ্রামে দুজনের ভূমিকা খুবই প্রশংসা বহুল। ভারত বর্ষে মুসলমানদের জন্য একটি স্বাধীন ওয়াতান সৃষ্টির জন্য তিনি ছিলেন লড়াকু সৈনিক। কাজী আব্দুল আহাদ তৎকালীন থানা মুসলিম লীগের সদস্য পদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দু’জনে ছিলেন সৈয়দ আবদুল মজিদের অনুরক্ত ভক্ত। আর আবদুল মুজিদ ছিলেন সন্দ্বীপের এম.এন.এ। লড়কেলেংগে পাকিস্তান ¯ে¬াগানের তারা সামনের কাতারে সৈনিক ছিলেন। অবশেষে দু’শ বছরের গোলামীর শেকল ছেড়ে সাতচলি¬শ সালে ইসলামের নামে অর্জিত হয় পাকিস্তান। ইসলামের ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় দীর্ঘ তেইশ বছর পর পাকিস্তান ভেঙ্গে চুরমান হয়ে গেল। নির্যাতিত বাঙালিরা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা করল। একাত্তর সালে তিনি বয়সের ভারে ন্যুজ। পাকিস্তানিদের নৃশংস হত্যা যজ্ঞকে তিনি মনে প্রাণে ঘৃণা করতেন। শুনেছি তিনি অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করেছেন। (সূত্র ঃ সন্দ্বীপের কৃতি সন্তান আজ যারা বেঁেচ নেই। সম্পাদক এ.বি.এম ছিদ্দিক চৌধুরী)
মানুষের শত্র“ থাকে ইহা স্বাভাবিক। আমি যতটুকু জানি কাজী আব্দুল আহাদের কোন শত্র“ ছিলনা। তাঁর পরম প্রতিদ্বন্ধী ও তাঁকে সম্মান করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়ার কোন উপাদান ছিল না। তাঁর সম্পর্কে আর দু-চার টি ঘটনা লিখে লেখার ইতি টানবো। যারা তাঁর জীবন কর্ম সম্পর্কে জানেন তা নিয়ে লিখলে একটি বিশাল গ্রন্থ হয়ে যাবে। তারই প্রচেষ্টায় সারিকাইত কমিউনিটি সেন্টার, বিশাল দিঘী করা হয়েছিল। কমিউনিটি সেন্টারে ইউনিয়ন পরিষদের অফিস ও একটা পাঠাগার ছিল। আমার যতটুকু মনে আছে পাঠাগারটি খুবই উন্নত ছিল। একবার আমি একটি বই পড়তে গিয়ে ভুলক্রমে বাড়িতে নিয়ে আসি। সাথে সাথে তিনি লাইব্রেরির পিয়নকে পাঠিয়ে বইটি নিয়ে যান। তাঁর দায়িত্ববোধ কর্তব্য নিষ্ঠা কত প্রকট ছিল ইহা তারই প্রমাণ। উনার সম্পর্কে আর একটি ঘটনা বলি। একবার আমি আমার আম্মা সহ আমার মামা আই.জি প্রিজন কাজী আব্দুল আওয়ালের চন্দনপুরাস্থ বাসায় ছিলাম। তিনি সেখান থেকে আমাকে নিয়ে জিলা কৃষি অফিসে গেলেন। তাঁকে দেখে কর্মকর্তাদের ব্যতিব্যস্ততা ও সম্মান বোধ দেখে আমি বিস্মিত হলাম। তিনি জোড়ালো ভাষায় সন্দ্বীপের চাষীদের জন্য কীটনাশক ঔষধ ও সার প্রেরণের জন্য জোড়ালো ভাষায় আহ্বান করেন। তাঁর এ কর্তব্য নিষ্ঠা, সাহস, জনগণের প্রতি দরদ দেখে আমি সেদিন পুলকিত হয়েছিলাম। তাঁর গরীব দুঃখী কৃষকের প্রতি এত দরদ এবং জোড়ালো ভাষায় কর্মকর্তাদের বলা তাঁর সৎ সাহসের পরিচয় বহন করে। আমি  জানিনা আমাদের কোন চেয়ারম্যান কৃষক, মজুর, চাষাভাইদের জন্য এভাবে বলবেন কিনা।
মানুষের জীবনের শেষ আছে। একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে। দীর্ঘদিন তিনি ডায়াবেটিস রোগে ভুগছিলেন। স্মৃতিশক্তি খানিকটা হারিয়ে ফেলেন। একদিন আমাদের বাড়িতে খবর আসল তিনি খুবই অসুস্থ। আমার আম্মাসহ আমি উনাকে দেখতে গেলাম। দেখলাম ঘরের সামনের কক্ষে তিনি শায়িত। অনেকটা সেন্সলেস। আমার আম্মার কেঁদে কেঁদে ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলেন, ভাইসাবজি আমি রুশো আইছি। এ কথা শুনার সাথে সাথে তিনি ফ্যাল ফ্যাল করে কেঁদে দিলেন। চোখ বেয়ে পানি পড়ছিল। এ দৃশ্য আজও আমার স্মৃতিতে চির ভাস্বর। হারিয়ে যাওয়া সেন্স যেন হঠাৎ করে ফিরে আসল। এরপর আর ফিরে আসে নাই। আমার আম্মা রওশন আকতারকে তিনি যেভাবে ভালোবাসতেন জীবনের শেষ মূহুর্তে সে সাক্ষ্য রেখে গেলেন। সম্ভবত ঐদিন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্নালিল¬াহি………………..রাজিউন। তাঁর স্মেহময়ী ছোটবোন কাজী রওশন আকতার ২০১৫ সালের ১লা মার্চ ইন্তেকাল করেন। এভাবে কাজী আফাজ উদ্দিন পরিবারের সব সদস্য কাজী আব্দুল আহাদের সব ভাই বোন পৃথিবী হতে একে একে বিদায় নিলেন। পরেরদিন জোহরের নামাযের পর তাঁর বাড়ির সামনে বিশাল মাঠে কাজী আব্দুল আহাদের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সন্দ্বীপের ইতিহাসে ইহা ছিল সর্ব বৃহত্তম নামাজে জানাজা। হাজার হাজার ভক্ত মানুষের শেষবারের মত প্রিয়জনকে দেখার জন্য ছুটে আসা ঢল দেখলাম। সেদিন অশ্র“ভেজা মানুষের ক্রন্দনে আকাশ বাতাস বিষিয়ে উঠেছিল। আমি দেখলাম এক হিন্দ ভদ্র লোক বাবু হরেন্দ্র ডাক্তার তাঁকে দেখতে এসে বুক চাপড়িয়ে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, ”কাজী আব্দুল আহাদ তুমি মানুষ নও, তুমি ঈশ্বরের অবতার। তুমি মানুষ নও তুমি দেবতা।” প্রিয়জনের প্রতি সে কি হৃদয় বিদারক দৃশ্য ! এ দৃশ্য কতই না বেদনা বিধুর। ”মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য।” একথাটি কাজী আব্দুল আহাদের জন্য প্রযোজ্য। কাজী আব্দুল আহাদ আজ নেই। কিন্তু যুগযুগ ধরে মানুষের হৃদয়ের কন্দরে তিনি বেঁেচ থাকবেন। পরিশেষে কবির ভাষায় আবার বলতে হয়-
”এনেছিলে সঙ্গে করে মৃত্যুহীন প্রাণ,
মরণে তাহা তুমি করে গেলে দান।”
অথবা
” তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি মহৎ,
তাই তব জীবনের রথ
কীর্তিরে ফেলে যায়
বারংবার।”
কাজী আব্দুল আহাদ ছিলেন একজন মহাপ্রাণ পুরুষ। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই একক। এ মূহুর্তে আমি তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। আল¬াহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন।

————————————————————————————–
লেখক পরিচিতি :
আ.ন.ম. আবদুর রহিম, সাবেক অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) ফতেয়াবাদ ডিগ্রী কলেজ।
বিভাগীয় প্রধান ঃ ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ।
অধ্যক্ষ ঃ ফতেয়াবাদ কিন্ডার গার্টেন স্কুল।

মোবাইল ঃ ০১৮১৯-৬৪৮৩৯৮।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন