আজ শুক্রবার, ২৫ মে ২০১৮ ইং, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



জিডি করতেও লাগে টাকা

Published on 07 February 2017 | 4: 57 am

রাজধানীর থানাগুলোর ডিউটি অফিসারের রুমে ঢুকলে যে লেখাটি চোখে পড়ে তা হল- ‘মামলা বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে কোনো অর্থের প্রয়োজন নেই।’ কিন্তু এই কথার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। ঠিকই জিডি করার বিনিময়ে নেয়া হচ্ছে টাকা। এ ছাড়া হাজতে বন্দিদের দেখা করিয়ে দেয়ার বিনিময়ে তাদের স্বজনদের কাছ থেকেও নেয়া হচ্ছে টাকা। রাজধানীর সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া, শ্যামপুর এবং যাত্রবাড়ীসহ কয়েকটি থানায় সরেজমিনে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছে, জিডি বা স্বজনদের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেয়ার বিনিময়ে টাকা নেয়ার নিয়ম নেই। তবে খুশি হয়ে কেউ কিছু দিলে তা নেয়া হয়। ড্রাইভিং লাইসেন্স হারিয়ে যাওয়ায় শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার দূর্বাডাঙ্গা গ্রামের মনিরুল ইসলাম রোববার সকাল সোয়া ১০টার দিকে রাজধানীর সূত্রাপুর থানায় জিডি করতে যান। জিডি লেখার আগেই ওয়্যারলেস অপারেটর মনিরুলের কাছে জানতে চান পকেটে টাকা আছে কি-না। মনিরুল হ্যাঁসূচক জবাব দেয়ার পর জিডি লিখতে শুরু করেন ওয়্যারলেস অপারেটর নাজমুল হোসেন। এর ১৫ মিনিট পর সাড়ে ১০টার দিকে জিডি লেখা শেষে মনিরুল ২০০ টাকা তুলে দেন নাজমুলের হাতে। এতে খুশি না হওয়ায় পরে তাকে আরও ১০০ টাকা দেয়া হয়।

থানা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় মনিরুল এ প্রতিবেদককে জানান, তিনি সূত্রাপুর থানা এলাকাতেই থাকেন। ৩ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীবাজার এলাকায় তার ড্রাইভিং লাইসেন্স হারিয়ে যায়। এ বিষয়ে জিডি করতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘যিনি জিডি (নম্বর ১৬৫) লিখে দিয়েছেন তিনি ৫০০ টাকা চেয়েছিলেন। তাকে ৩০০ টাকা দিয়েছি।’ জিডি লিখে দেয়া ওয়্যারলেস অপারেটর নাজমুল হোসেন বলেন, ‘আমরা কারও কাছ থেকে টাকা চেয়ে নেই না। আপনি সম্ভবত ভুল জেনেছেন বা দেখেছেন।’

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গেণ্ডারিয়া থানায় গিয়ে দেখা যায়, সেন্ট্রি মো. হাসান এক মহিলার কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন। জানতে চাইলে পুলিশ সদস্য হাসান বলেন, ‘ওই মহিলার ছেলেকে ধর্ষণ মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। সাধারণত হাজতে থাকাদের সঙ্গে স্বজনদের দেখা করার নিয়ম নেই। কর্মকর্তাদের চোখের আড়ালে কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বজনদের কথা বলার সুযোগ করে দিই।

এর বিনিময়ে স্বজনরা যা দেন তাই নিই।’ রুবিনা নামের ওই মহিলা জানান, তার ছেলেকে শনিবার সকাল ৭টার দিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। টাকা ছাড়া দেখা করতে দেয়া হয় না। যতবার দেখা করেছি ততবার ১০০ টাকা করে দিয়েছি।

বেলা ১টার দিকে শ্যামপুর থানায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে তিনটি জিডি হয়। প্রত্যেকের কাছ থেকেই টাকা নেয়া হয়। এর মধ্যে ১৫৭ নম্বর জিডির বাদী জিয়াউর রহমান জানান, ১৭৩ পূর্ব জুরাইনে তার জায়গার ওপর দেয়াল নির্মাণে বাধা দেয়ার কারণে স্থানীয় শিমুল, মর্জিনা ও মাইন উদ্দিনসহ কয়েকজন তাকে ভয়ভীতি দেখিয়েছেন এবং হুমকি দিয়েছেন। তাই তিনি তাদের বিরুদ্ধে জিডি করেছেন। জিডি করার বিনিময়ে তিনি ২০০ টাকা দিয়েছেন। ১৫৭ নম্বর জিডির বাদী জানান, গত ৪ ফেব্রুয়ারি পোস্তগোলা থেকে জুরাইন যাওয়ার পথে তার গাড়ির সব কাগজপত্র হারিয়ে গেছে। তাই তিনি জিডি করেছেন। যাওয়ার সময় তিনি ডিউটি অফিসারকে ৩শ’ টাকা দিয়েছেন। জিডির বিনিময়ে টাকা নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই সৈয়দ গোলাম সারোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা কারও কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিই না। খুশি হয়ে কেউ কিছু দিলে তা নেই।’

গত ২৭ জানুয়ারি সকালে যাত্রাবাড়ী থানায় গিয়ে দেখা যায়, ডিউটি অফিসার নূরজাহান বেগম সবার সামনেই দুই যুবকের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন। জানতে চাইলে দুই যুবক বলেন, ‘হারানো বিষয় নিয়ে জিডি করতে এসেছিলাম। জিডির কপি দেয়ার সময় আপা চা খাওয়ার টাকা চান। তাই কিছু টাকা দিলাম।’ দুই যুবক চলে যাওয়ার পর একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আসেন তার ভাগ্নের বিরুদ্ধে জিডি করতে। কারণ তার ভাগ্নে তার মেয়েকে উত্যক্ত করে। জিডির কপি নেয়ার আগে ওই মুক্তিযোদ্ধা নিজ উদ্যোগেই চা খাওয়ার জন্য টাকা অফার করেন। সঙ্গে সঙ্গেই এসআই নূরজাহান বলেন, যা দেয়ার দ্রুত দিয়ে দিন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নূরজাহান বলেন, ‘আমরা তো কাউকে ঠেকিয়ে টাকা নিচ্ছি না। নিজ ইচ্ছায় চা খাওয়ার জন্য যে যা দিচ্ছেন তাই নিচ্ছি। এর বেশি কিছু না।’


Advertisement

আরও পড়ুন