আজ শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



গুনাহ মুক্ত অন্তরই হচ্ছে বিশুদ্ধ অন্তর

Published on 10 November 2015 | 3: 08 am

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

by Abu Ibrahim

আমরা অনেকেই সময় মতো নামাজ, রোজা, দান-খয়রাত বা দাওয়াত ইত্যাদি উত্তম ইবাদত করি; মাশাআল্লাহ। কিন্তু তা সত্ত্বেও নিজেকে গুনাহ বা পাপ থেকে মুক্ত রাখতে পারি না। কেন জানি সামনে দিয়ে অপরিচিত কোনো মহিলা হেঁটে গেলে চোখ সেদিকে চলে যায়। গোপনে আমরা এমন অনেক কাজ করি যা খুবই ঘৃণিত। আবার সুদ, ঘুষ, হিজাব ছাড়া চলাফেরা করা – এসব যেন স্বাভাবিক ব্যপার, যা এখন আমরা ওপেনলি করি। কিন্তু কেন? হতে পারে আমাদের ইবাদতের মধ্যে ইখলাসের ঘাটতি হচ্ছে অথবা আল্লাহর ভয় আমাদের মনের মধ্যে কাজ করে না যে একদিন আমাদেরকে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা এর সামনে দাড়াতে হবে আমাদের সমস্ত কাজের বোঝা নিয়ে আর এর উত্তর দিতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন – “আদম সন্তানের দুই পা কেয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সামনে থেকে অগ্রসর হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজের সম্পর্কে এই পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারবে –

১- সারাজীবন – কিভাবে সে তা ব্যয় করেছে?
২- যৌবনকাল – কিভাবে সে তার যত্ন নিয়েছে?
৩- সম্পদের অর্জন – কিভাবে সে তা অর্জন করেছে?
৪- সম্পদের খরচ – অর্জিত সম্পদ কোথায় খরচ করেছে?
৫- জ্ঞান – অর্জিত জ্ঞানের উপর কতটুকু/কিভাবে আমল করেছে?”

নামাজ, রোজা, হজ্জ এসব নিঃসন্দেহে খুব গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, তবে যাবতীয় ছোট-বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকাটাও হচ্ছে অনেক বড় একটি ইবাদত এবং গুনাহ মুক্ত অন্তরই হচ্ছে বিশুদ্ধ অন্তর। আর গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা শুধু তাদের পক্ষেই সম্ভব যারা আখিরাতের পুরস্কারের আশা রাখেন এবং আল্লাহর সামনে একদিন দাঁড়াতে হবে হিসাব-নিকাশের জন্য তার ভয় রাখেন। তাই আল্লাহর প্রতি আশা এবং ভয় এই দু’টিই আমাদের সমানভাবে থাকা উচিত।

ইসলামের আলিমরা আশা এবং ভয় এই দু’টিকে পাখির দুই ডানার সাথে তুলনা করেছেন, যদি এই ডানা দু’টির ভারসাম্য এবং ব্যবহার সঠিক থাকে তাহলে আপনি এই ডানা দিয়ে উড়ে চলে যাবেন চির শান্তির স্থান – জান্নাতে। আলী (রাঃ) সুন্দরই বলেছিলেন – “তুমি যদি গুনাহের কাজ করতে চাও তাহলে –

– এমন কোনো জায়গায় যাও যেখানে আল্লাহ তোমাকে দেখতে পাবেন না
– আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দেওয়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার না করে কর
– আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পরিধির রেখার বাইরে গিয়ে কর

আলী (রাঃ)-এর এই উপদেশগুলো জানার পর মনে হয়েছিল এই তিনটি উপদেশ যদি কেউ মাথায় রাখে তাহলে গুনাহ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা সম্ভব, ইনশা আল্লাহ। আল্লাহকে ভয় করতে হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই, একই সাথে তাঁর সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞানও রাখতে হবে। আমি এখানে একটা গল্প উল্লেথ করলাম কিভাবে সে একজন ব্যক্তির কাছে এসে গুনাহ করতে গিয়েও করতে পারলনা।

মক্কা নগরীতে এক সুন্দরী মহিলা থাকতেন; তিনি একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রশংসা করতে করতে তার স্বামীকে বলছিলেন “এখানে কি এমন কেউ আছে যে আমার রূপ দেখবে আর তাতে দেখে প্রলুব্ধ হবে না?” তিনি বললেন “হ্যাঁ আছে, উবাইদ বিন উমাইর (রহ)।” তখন মহিলা তাঁর স্বামীর কাছে অনুমতি চাইলেন সেই লোককে প্রলোভন দেখাবার সুযোগ দেওয়ার জন্য যাতে তাকে গুনাহের কাজে নিয়োজিত করতে পারে।

স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে ওই মহিলা উবাইদ বিন উমাইরের কাছে গেলেন আর এমন ভান করলেন যেন তার কাছে খুব জরুরী প্রশ্ন করতে এসেছেন। যখন তারা মসজিদুল হারামের পাশে গেলেন মহিলা তার চেহারা উন্মুক্ত করলেন যেন একটি পূর্ণিমার চাঁদ। উবাইদ বিন উমাইর জিজ্ঞাস করলেন – “ও আল্লাহর বান্দা, কি জানতে চাও?” সে উত্তরে বললেন “দয়া করে আমার ইচ্ছা পূরণ করুন। আমি আপনার ভালবাসার মধ্যে পড়ে গিয়েছি” উবাইদ বিন উমাইর বললেন আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করব, আপনি যদি এর সত্যি উত্তর করতে পারেন তবেই আমি আপনার ইচ্ছা পূরণ করব” মহিলা বলল “আমি অবশ্যই সত্যি উত্তর দেব, আপনি যতগুলো প্রশ্ন ইচ্ছা আমাকে করতে পারেন।” তখন উবাইদ বিন উমাইর সেই মহিলাকে কিছু প্রশ্ন করলেন যা আসলেই আমাদের জন্য চিন্তার খোরাক হতে পারে:

উবাইদ বিন উমাইর জিজ্ঞেস করলেন, “যদি মৃত্যুর ফেরেশতা আপনার জান কবজ করতে আসে আপনি কি তখন খুশি হবেন যে আমি আপনার ইচ্ছা পূরণ করি?” মহিলা বলল, “আল্লাহের কসম, কক্ষণই না।” তিনি উত্তরে বললেন, “আপনি সত্যি কথা বলেছেন।” এরপর উবাইদ বিন উমাইর এক এক করে বললেন, কবর দেওয়ার কথা, পুলসিরাতের ব্রিজ অতিক্রমের কথা, মীযানে ভাল-মন্দ কাজের পরিমাপ করার কথা। এবং সবশেষে উবাইদ বিন উমাইর আবার জিজ্ঞেস করলেন, “যখন আপনি আল্লাহর সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন এবং আপনার সারা জীবনের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র সব কাজের হিসাব নেওয়া হবে, তখন কি আপনি খুশি হবেন যদি আমি আপনার ইচ্ছা পূরণ করি?” মহিলা বলল, “আল্লাহর কসম, কক্ষণই না।”

উবাইদ বিন উমাইর উত্তরে বললেন “আপনি সত্যি কথা বলছেন, ও আল্লাহর বান্দা, আল্লাহকে ভয় করুন, যিনি আমাদের উপর প্রতিনিয়ত তাঁর রহমত বর্ষণ করছেন।” এরপর মহিলা তার স্বামীর কাছে ফিরে গেলেন, তিনি মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কি হয়েছে?”, মহিলা বললেন “আমরা এতদিন পর্যন্ত আমাদের জীবনের সময়গুলো বৃথা নষ্ট করেছি।” আর এরপর তিনি নিজের চিন্তাভাবনাকে পরিবর্তন করে ফেললেন এবং নিজেকে নামাজ, রোজা ও বিভিন্ন ইবাদতের মধ্যে আত্মনিয়োগ করলেন।

আসুন এবার একটা মডার্ন উদাহারণ দেখি। একটু ভেবে দেখুন, আপনি যদি জানেন যে আপনাকে কেউ ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা দিয়ে মনিটর করছে আপনি কি তখন কোনো গুনাহের কাজ করবেন? আর যদি না জেনে করে ফেলেন তাহলে কিন্তু খুব সহজেই ধরা পড়ে যাবেন এবং দোষী সাব্যস্ত হবেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাও কিন্তু আমাদের সব কিছুর খবর রাখেন এবং জানেন। নিচে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কিছু গুণাবলী উল্লেখ করলাম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা –

আমাদের দেখছেন (আল-বাসির): “তোমাদের স্বজন-পরিজন ও সন্তান-সন্ততি কেয়ামতের দিন কোনো উপকারে আসবে না। তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করবেন। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন” (সূরা মুমতাহিনা: আয়াত ৩)

সব কথা শুনছেন (আস-সামি): “অতএব তারা যদি ঈমান আনে, তোমাদের ঈমান আনার মতো, তবে তারা সুপথ পাবে। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আবশ্যই তারা বিরোধিতাতে আছে। সুতরাং এখন তাদের জন্যে আপনার পক্ষ থেকে আল্লাহই যথেষ্ট। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী” (সূরা বাকারাহ: আয়াত ২)

আমাদের সব কিছুর ব্যপারে জ্ঞান রাখেন (আল-হাকিম): “আর তিনিই সেইজন যিনি মহাকাশে উপাস্য আর দুনিয়াতেও উপাস্য। আর তিনিই প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ” (সূরা যুখরুফ: আয়াত ৮৪)

তিনি সব জানেন (আল-আলিম) আর সব খবর রাখেন (আল খাবির): “হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিতি হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।” (সূরা হুজুরাত; আয়াত ১৩)

সুতরাং আপনি যতই গুনাহের কাজ করেননা কেন এবং যত গোপনেই করেননা কেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আপনাকে ধরা পড়তেই হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদেরকে এই ব্যপারটি নিয়ে ভাবার এবং সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর নিয়ে তৈরি থাকার ক্ষমতা দিন; যাতে আমরা নিজেদেরকে সব রকম গুনাহ/পাপ থেকে মুক্ত রাখার মাধ্যমে আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে পারি এবং আল্লাহকে খুশি রাখতে পারি। আমিন।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন