আজ সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮ ইং, ১০ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



আবেগ কি মানুষকে বোকা বানায়?

Published on 24 January 2017 | 7: 56 pm


 
আবেগ কী বলছে সেটা একটু ভালো করে শোনার চেষ্টা করতে হবে। আবেগপ্রবণ মানুষেরা নিজেদের বোকা ভাবে। বিশেষ করে আঘাত পেলে। পৃথিবীর বেশির ভাগ আবেগপ্রবণ মানুষের মতো আমারও আবেগ নিয়ে অনেক আবেগপ্রবণ কথা বলার আছে! তারপর ভাবলাম বলা যত সহজ, গুছিয়ে লেখা ঠিক ততটাই কঠিন। আমার উদ্দীপনা কিঞ্চিৎ দমে গেল। ভাবলাম, আবেগপ্রবণ মানুষ আসলে খুব বোকা হয়। পরে চিন্তা করে দেখলাম, এ রকমভাবে ভাবাটাই আসলে বোকামি। পৃথিবীর বেশির ভাগ বড় ও ভালো কাজ হয়েছে গভীর আবেগের জায়গা থেকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেলসন ম্যান্ডেলা, আইনস্টাইন, আমার জানামতে তাঁরা সবাই আবেগপ্রবণ ছিলেন। নিজের আবেগ প্রয়োগ করেছেন বিভিন্নভাবে মানুষের ভালোর জন্য। সাধারণত বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরা আবেগের কথা ভাবি না। কিন্তু স্বয়ং আইনস্টাইন বলেছেন, বিজ্ঞানে জ্ঞানের চেয়ে কল্পনার ভূমিকা বড়। আবেগ ছাড়া কল্পনা হয় না। সুতরাং, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও আবেগ প্রয়োজন।
 
আসলে আবেগ কী? প্রচলিত মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞায়, আবেগ মানুষের মস্তিষ্কের একধরনের সংকেত পদ্ধতি। আমাদের যদি কিছু ভালো না লাগে, তাহলে আমরা রেগে যাই। না হলে আমাদের মনে ভয় অথবা ঘৃণার সঞ্চার হয়। মন খারাপ হয়। কিছু ভালো লাগলে আমরা খুশি হই। এই সংকেতগুলো আমাদের মস্তিষ্ক আগে অনুধাবন করে। সংকেত পেয়ে আমরা আমাদের যুক্তি, অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নিই কী করব। সুতরাং, আবেগের জায়গা থেকে বেশির ভাগ মানুষের অবস্থানই কিন্তু এক। খারাপ কিছু দেখলে বেশির ভাগ মানুষ রেগে যায়, মন খারাপ করে, ভয় অথবা ঘৃণা অনুভব করে। এই আবেগ অনুভব করার মধ্যে খারাপ কিছু নেই, বরং যদি এই অনুভূতি না আসে, তাহলে বলতে হবে যে শারীরিক অথবা মানসিকভাবে সেই ব্যক্তি অসুস্থ।
 
বিষয়টাকে যদি একটু অন্যভাবে দেখি। ধরুন, আপনার হাত অবশ হয়ে আছে। এই অবস্থায় আপনি লক্ষ না করে আগুনে হাত রাখলেন। আপনার হাত পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে কিন্তু আপনি কিছু টেরই পাবেন না। হাত যদি অবশ না থাকত, তাহলে আপনি ব্যথা পেতেন এবং ঠিক সময়মতো হাত সরিয়ে ফেলতে পারতেন। দৈহিক ব্যথা বা আনন্দ যেভাবে আমাদের শারীরিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে, ঠিক সে রকমই আবেগ আমাদের মানসিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। আমরা নিশ্চয় মনে করব যে হাত পুড়ে যাচ্ছে কিন্তু আমরা সেটা অনুভব করতে পারছি না, এটা একধরনের অসুস্থতা। ঠিক সে রকমই আমাদের মনে করা উচিত যে একজন আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে কিন্তু আমার কোনো ধরনের অনুভূতি হচ্ছে না, সেটাও একধরনের অসুস্থতা।
 
এখন বোকামির বিষয়টায় আসি। আগুনের ওপর হাত রেখেছেন। প্রচণ্ড ব্যথা করছে কিন্তু আপনি হাত সরাচ্ছেন না। সেটা হলো বোকামি। ঠিক সে রকম কেউ আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে, আপনার প্রচণ্ড রাগ অথবা মন খারাপ করছে কিন্তু আপনি সে ব্যাপারে কিছু করছেন না, সেটাও বোকামি। আপনার মন কিন্তু আপনাকে সংকেত দিচ্ছে কিন্তু সেই সংকেত অনুযায়ী আপনি কাজ করছেন না। এ অবস্থায় ব্যথা পেলে আবেগের দোষ দিয়ে কী লাভ?
 
এটা সত্য যে, অনেক সময় আমাদের জৈবিক অভিজ্ঞতা এতই জটিল যে আমরা কোনো ধরনের আবেগ অনুভব করি না। বেশির ভাগ পরিস্থিতিতে আমাদের মনে বিভিন্ন ধরনের আবেগের সঞ্চার হয়।
 
সেই অনুভূতিগুলোর যথার্থ গুরুত্ব দিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা এবং বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে ঠিকঠাক সিদ্ধান্ত নিতে পারাটাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। এই বুদ্ধি সবার সমান থাকে না। আমার যে খুব একটা আছে, সেই দাবিও আমি করি না। থাকলে বছরের পর বছর আমাকে কষ্ট দেওয়ার পরও আমি লিভারপুলকে সমর্থন করতাম না। তবে হ্যাঁ, আমি আমার মস্তিষ্কের আবেগপ্রবণ মনকে দোষ দিই না। আবেগ আছে বলে আমি বাংলাদেশ জিতলে আনন্দ পাই। অনেক দিন পর বিদেশ থেকে ফিরে এসে মাকে দেখলে আমার চোখ ভিজে আসে। কোনো প্রিয় দুঃখের গান শুনলে মন খারাপ হয়, আবার শুনতেও ভালো লাগে।
 
আমাদের আবেগ আমাদের ভালো-খারাপ অনেক কিছু বলার চেষ্টা করে। আবেগ কী বলছে সেটা একটু ভালো করে শোনার চেষ্টা করলে হয়তো আমরা আরেকটু সুখী হব। নিজেদের হয়তো অতটা বোকা মনে হবে না।
লেখক : ইরেশ যাকের, সুত্র : প্রথম আলো,


Advertisement

আরও পড়ুন