আজ মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮ ইং, ১১ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



বাড়ছে আমদানি কমছে রফতানি

Published on 08 January 2017 | 7: 53 am

হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে আমদানি, যার প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাব ভারসাম্যে। আমদানি ব্যয়ের চেয়ে রফতানি আয় কম হওয়ায় লেনদেন ভারসাম্য নেতিবাচক হয়ে পড়েছে। চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) এক হাজার ৭২২ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। একই সময়ে পণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছে মাত্র এক হাজার ৩৩৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ফলে পাঁচ মাসের হিসাবে সামগ্রিক পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৮৮ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশী টাকায় ৩০ হাজার ৬৫২ কোটি। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে আমদানির এ হার প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশ করা হালনাগাদ পরিসংখ্যান থেকে বৈদেশিক লেনদেনের এসব তথ্য জানা গেছে।

সরকারের দাবি, দেশে পদ্মা সেতু, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেলসহ বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন চলছে। এসবের নির্মাণ সামগ্রীর আমদানিও বেড়ে গেছে, যার প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক আমদানির ওপর। এদিকে বিষয়টি সত্য হলেও এর প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও দেশের লেনদেন ভারসাম্যের ওপর। বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) বেশকিছু দিন ধরে বড় উদ্বৃত্ত ছিল কিন্তু নভেম্বর পর্যন্ত এ হিসাবে ঘাটতি দেখা দিয়েছে । আমদানির এই হার গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যে হারে আমদানি বাড়ছে, রফতানির পরিমাণ নানা কারণে সে হারে বাড়ানো যাচ্ছে না। দেখা গেছে, এ সময়ে (জুলাই-নভেম্বর) বাংলাদেশ বিভিন্ন পণ্য রফতানি থেকে আয় করেছে মাত্র এক হাজার ৩৩৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার। আমদানি বেশি এবং রফতানি কম হওয়ায় ঘাটতির আকারও বড় হচ্ছে।

জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন যুগান্তরকে বলেন, দেশে এখন কয়েকটি বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। সেসব প্রকল্পে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানি করতে হচ্ছে। বিশেষ করে প্রকল্পের দ্রুত উন্নয়নের লক্ষ্যে বাজেট পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি খাতে ব্যয় বেড়ে গেছে। একইভাবে আইআরসি সার্টিফিকেট অনুযায়ী বেসরকারি পর্যায়ে শিল্পের কাঁচামাল এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি কেনার হারও বেড়েছে। এ কারণে বাণিজ্য ঘাটতি সাময়িক একটু বেশি হতে পারে। তবে আমি মনে করি এ নিয়ে শংকিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। দেশে চাহিদা রয়েছে বলেই আমদানি বেশি হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ও কাঁচামাল আমদানি বেড়ে যাওয়া মানে হচ্ছে দেশে বিনিয়োগ বাড়া। অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হওয়া। সেটাই এখন হচ্ছে। এর সুফল অচিরেই দেশের অর্থনীতিতে পাওয়া যাবে বলেও দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে রফতানি আয় সেভাবে না বাড়ার নেপথ্য কারণ সম্পর্কে বাংলাদেশ রফতানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী যুগান্তরকে বলেন, রফতানি খাতের প্রধান স্তম্ভ হচ্ছে তৈরি পোশাকশিল্প। মোট রফতানি আয়ে ৮৮ শতাংশই এসে থাকে এ খাত থেকে। কিন্তু নানা বাস্তবতার কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে এ খাতের স্বাভাবিক পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের তৈরি পোশাকের মার্কেটিং অর্ডার, নেগোসিয়েশন, কোয়ালিটি চেক ও মেইনটেন্যান্স এসব কাজে বিদেশীদের বাংলাদেশ সফরের ক্ষেত্রে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী চলমান অস্থিতিশীলতার পাশাপাশি ব্রেক্সিট ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের মতো ভূ-রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণেও বাংলাদেশের রফতানি আয়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের ক্রয় এবং চাহিদা দুটোই কমে গেছে। এর বাইরে রফতানি পণ্যের মূল্য হ্রাস, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বিদেশী ক্রেতা জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের কমপ্লায়েন্স শর্ত পালনে অতিরিক্ত খরচের কারণে উদ্যোক্তার সক্ষমতাকে শূন্যের কোটায় নেমে আসাও এর নেপথ্য কারণ বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা।

ওদিকে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও। কারণ নিয়মিত আমদানি-রফতানিসহ অন্যান্য আয়-ব্যয় চলতি হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হয়। এ হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হল, নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। অর্থাৎ এই পাঁচ মাসের আমদানি পরিস্থিতি দেশকে একটা উদ্বেগজনক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবেই সেটি প্রকাশ পাচ্ছে। এতে দেখা গেছে, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাব ভারসাম্যে ৭২ কোটি ৬০ লাখ ডলারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে উদ্বৃত্ত ছিল ১৩৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার। বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলেছেন, গত দুই-আড়াই বছরে আমদানি খাতে ব্যয় কম ছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্যের দাম কম থাকা। এ কারণে সে সময় আমদানি করেও বাংলাদেশের লেনদেন ভারসাম্য একটা সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল। কিন্তু বেশ কয়েক মাস ধরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও অস্থিতিশীল হতে থাকায় এর প্রভাব পড়েছে দেশের আমদানি খাতে। ফলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে ঘাটতি দিন দিন বড় হচ্ছে।


Advertisement

আরও পড়ুন