আজ বুধবার, ১৫ আগষ্ট ২০১৮ ইং, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সম্মেলনে এ ডব্লিউ চৌধুরী ।। অপারেশন জ্যাকপটের সফলতা চট্টগ্রামেরই গৌরব

Published on 31 December 2016 | 5: 15 am

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্পিরিচুয়াল পাওয়ার ছিল উল্লেখ করে খ্যাতনামা মুক্তিযোদ্ধা এবং অপারেশন জ্যাকপটের নৌ কমান্ডো দলের প্রধান কমোডর এ ডব্লিউ চৌধুরী (আবদুল ওয়াহেদ) বীর উত্তম, বীর বিক্রম বলেছেন, স্পিরিচুয়াল পাওয়ার বা রূহানি শক্তির কারণেই বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ আমাকে ফ্রান্সে, সাবমেরিনের মধ্যেই আকৃষ্ট করেছিল। তিনি গতকাল চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণ দিচ্ছিলেন। প্রেসক্লাবের ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

এ ডব্লিউ চৌধুরী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের অপারেশন জ্যাকপট চট্টগ্রামের মাটিতেই সফলতা পেয়েছিল। এ গৌরব চট্টগ্রামের। এ গৌরব চট্টগ্রামবাসীর। অপারেশন জ্যাকপট পাকিস্তানিদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে যুদ্ধরত সৈনিকদের রসদ ও গোলাবারুদ আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারণ আকাশপথ আরও আগেই বন্ধ করে দিয়েছিল ভারত। অপারেশন জ্যাকপট সফল হওয়ায় কর্ণফুলী নদীতে নয়টি জাহাজ ডুবে চট্টগ্রাম বন্দর পুরোপুরি অচল হয়ে গিয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঘটনাবলী উল্লেখ করে কমডোর এ ডব্লিউ চৌধুরী বলেন, পঁচিশে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ট্যাংক চালিয়ে পাকিস্তান জঘন্য অপরাধ করেছিল। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রতারণা করেছে তারা। আমরা যুদ্ধ করে সেই পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছি। পৃথিবীতে ইউনিফর্মে আত্মসমর্পণ জঘন্যতম কলঙ্কের বিষয়।

এ ডব্লিউ চৌধুরী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, পাকিস্তানি যে সাবমেরিনে আমি চাকরি নিয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধের শুরুর সময় সেটি ফ্রান্সে ছিল। ১০ জনকে নিয়ে দেশের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। একজন অজুহাত তুলে পালাল। নয়জন থাকল দলে। এর মধ্যে সিলেটের একজন ইংল্যান্ড চলে গেল। রইলাম আটজন। জেনেভা, বার্সেলোনা হয়ে, রোমে ১০ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রাবিরতি শেষে ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয়ে বম্বে উড়ে এলাম। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ মানুষের জীবনে বারবার আসে না। অপারেশন জ্যাকপটের জন্য ভারতে ৩০০ ছেলেকে ট্রেনিং দেওয়া হয়। এসবই হতো ১০ নম্বর সেক্টরের অধীন। তবে খুবই সিক্রেট। যমুনা নদীর তীরে, কুতুব মিনারে আমাদের আটজন সাবমেরিনারের আলাদা ট্রেনিং হতো। মিত্র বাহিনীর টার্গেট ছিল আগস্টে জাহাজে আক্রমণ করা। একটি জাহাজে তিনটি করে ম্যাগনেটিক মাইন লাগানো হবে ছয় ফুট পানির নিচে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এ ডবিহ্মউ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামের ডা. শাহ আলম ছিল আমাদের ডেপুটি লিডার। সে সাঁতার জানত না। আমি ভাগিরথী নদীতে তার পেটের তলে হাত রেখে সাঁতার শিখিয়েছি। আমরা ৬০ জন কমান্ডো নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হই। প্রথমে ট্রাকে চড়ে কলকাতা। সেখান থেকে বিমানে আগরতলা। তারপর হরিণা ক্যাম্প হয়ে বাংলাদেশে। বিমানে ওঠার পর জেনারেল অরোরা আমার কাঁধে হাত দিয়ে জানতে চাইলেন অপারেশন কোন দিন হবে জানি কিনা। আমি বিস্ময় প্রকাশ করি। তখন তিনি বললেন ‘মে বি ফিফটিন’। এর আগে আমাকে দুটি গান নিয়মিত শোনানো হতো ট্রানজিস্টারে ‘আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম’ ও ‘আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুর বাড়ি’। ওই গান দুটিই ছিল আমাদের অপারেশনের প্রস্তুতি ও শুরুর সংকেত।

তিনি বলেন, এখানে তিনজন নৌ কমান্ডো উপস্থিত আছেন। নুরুল হক, জিলানি আর আনোয়ার। আমাদের কেউ বলেনি, অপারেশন শেষে তোমরা আবার ফেরত আসবে। খরচের খাতায় রেখে দেওয়া হয়েছিল আমাদের। ওই যে কথায় বলে ‘বলির পাঁঠা’ সেই রকম আর কি। তারপরও আমরা উত্তেজিত ছিলাম যুদ্ধের জন্য। দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য। বাংলাদেশে ঢোকার আগে একদিন আ স ম আবদুর রব জঙ্গলে নিয়ে গেলেন। পরিচয় করিয়ে দিলেন মনি ভাইয়ের সঙ্গে। মেজর রফিক সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। উনার সঙ্গে দেখা হয়েছে পরে।

এ ডব্লিউ চৌধুরী আরো বলেন, আমাদের ৬০ জনের কাছে ছিল একটি করে ডেটোনেটর ও লিমপেট মাইন্ড। কিছু স্টেনগান আর গ্রেনেড। চট্টগ্রামবাসীর সহায়তায় বিশেষ করে এসএম ইউসুফ, মৌলভী সৈয়দ, হারিছ, মঈনুদ্দিন খান বাদল, ইঞ্জিনিয়ার আজিজ ও মতিন প্রমুখের সহায়তায় আমরা সফল অপারেশন করেছি। যারা আমাদের গোলাবারুদ বয়ে এনেছে তাদের আনপ্যারালাল কৃতিত্ব রয়েছে। আমার বডিগার্ড ছিল খুরশীদ। অপারেশন শুরশুর আগে তাকে আমার পিস্তল দিয়ে বলেছিলাম, ধরা পড়লে সে যেন শ্যুট করে দেয়। আমাদের সৌভাগ্য আমরা কর্ণফুলীর প্রবল স্রোত উপেক্ষা করে ১৪ আগস্ট রাত ১২টায় ঝাঁপিয়ে পড়ি। ৩৩ জন ১১টি জাহাজে মাইন লাগিয়ে দিই। নিরাপদে ফিরেও আসি। ফেরার সময় চাইনিজ রাইফেলের বুলেট আমার কানের পাশ দিয়ে চলে যেতে দেখি।

প্রেসক্লাবের সভাপতি কলিম সরওয়ারের সভাপতিত্বে সম্মেলনের উদ্বোধক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন চ্যালেঞ্জিং কাজ। সাংবাদিকরা যেভাবে লিখবেন, উপস্থাপন করবেন সেভাবেই জনমত গড়ে ওঠে। এ কারণে অনেক সময় পাঠকের মধ্যে বিভক্তিবিভাজন তৈরি হয়। আমি মনে করি, আমাদের শেষ ভরসাস্থল আপনারাই (সাংবাদিক)

মেয়র বলেন, সাংবাদিকরা গুরশু দায়িত্ব, কঠিন দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যক্তিগতভাবে কারও প্রতি পছন্দ থাকতে পারে, কোনো দলের প্রতি দুর্বলতা থাকতে পারে, এমনকি আঞ্চলিকতার প্রতিও দুর্বলতা থাকতে পারে। এটি বাস্তবতা। সাংবাদিকদের এ বাস্তবতার ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা অনেক। আমরা বাঙালি। রাজনৈতিক মতাদর্শে পার্থক্য থাকতে পারে। আমাদের দেশ এগিয়ে যাকএ মৌলিক প্রত্যাশায় পার্থক্য আছে বলে মনে করি না। তাই দেশ বিনির্মাণে সব সংকীর্ণতা পরিহার করে আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করে যেতে হবে। আমাদের ঐতিহ্য, ইতিহাস জানা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। শুধু সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা যাবে না। আইন প্রয়োগ যেমন প্রশাসনের দায়িত্ব তেমনি আইন মেনে চলাও নাগরিকের দায়িত্ব।

মেয়র বলেন, বিদেশে এত ট্রাফিক পুলিশ থাকে না। সেখানে রাস্তায় ক্যামেরা বসানো আছে। বাঙালি চালকেরা ক্যামেরার আওতা পেরোলেই বেশি স্পিডে গাড়ি চালান। আইন মেনে চলার প্রবণতা বাঙালির কম। দেশকে এগিয়ে নিতে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব অগ্রণী ভূমিকা রাখবে উল্লেখ করে মেয়র বলেন, চট্টগ্রাম সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবও অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক মহসিন চৌধুরী। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সহসভাপতি শহীদ উল আলম ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিইউজে) সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আবৃত্তিশিল্পী ফারশুক তাহেরের নির্দেশনায় আবৃত্তি পরিবেশন করে প্রেসক্লাব সদস্যের সন্তানরা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন যুগ্ম সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ। পরে অতিথিরা প্রেসক্লাবে বঙ্গবন্ধু বহুমাত্রিক হলের উদ্বোধন করেন। বিকেলে সাংগঠনিক অধিবেশন প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আবু সুফিয়ানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। আজ চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবার ১৫ পদে ৩৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন