আজ শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ ইং, ০৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ভেঙে দেয়া হচ্ছে না’গঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির কমিটি

Published on 27 December 2016 | 3: 05 am

ভেঙে দেয়া হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির কমিটি। আর এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের রাজত্ব হারাতে বসেছেন বর্তমান জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে তার ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ দলের হাইকমান্ড। শুধু তৈমুর নয়, সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কালাম ও মো. গিয়াসউদ্দিনেরও কপাল পুড়তে যাচ্ছে। এই তিনজনের সঙ্গে আবুল কালামের ভাই বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলও ছিটকে পড়তে পারেন। ইতিমধ্যে তৃণমূল পুনর্গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানকে দ্রুত নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর কমিটি ভেঙে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নির্দেশনায় এই চারজনকে বাদ দিতে বলা হয়েছে।

এদিকে হাইকমান্ডের এমন মনোভাব বুঝতে পেরে নানা মাধ্যমে তদবির শুরু করেছেন বিতর্কিত ওই নেতারা। গত কয়েকদিনে রাজধানীতে সিনিয়র কয়েক নেতার বাসায় তাদের ধরনা দিতে দেখা গেছে। সিনিয়র নেতারা তাদের প্রতি কঠোর মনোভাব দেখিয়েছেন বলে জানা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে গুলশান কার্যালয়ে কয়েক কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করছেন তৈমুর।

সূত্র জানায়, তিন নেতার প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা নিয়ে হাইকমান্ড খুবই ক্ষুব্ধ। এদের বাদ দিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তাদের ছাড়া নারায়ণগঞ্জ বিএনপি অচল- তিন নেতার এমন দাম্ভিকতায় এবার আঘাত হানার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর কমিটি পুনর্গঠনে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামত নেয়া হবে। এছাড়া নাসিক নির্বাচনে যেসব কেন্দ্রীয় নেতারা দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের পরামর্শ নেয়া হবে।
জানতে চাইলে তৃণমূল পুনর্গঠনের সমন্বয়ক মোহাম্মদ শাহজাহান যুগান্তরকে বলেন, নাসিক নির্বাচনের পর দ্রুত জেলা ও মহানগর পুনর্গঠনে আমরা একটা তাগিদ অনুভব করছি। নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর পুনর্গঠন অতি জরুরি এবং প্রয়োজনীয় সেটা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে। আমরা দ্রুত এসব কমিটি পুনর্গঠনের কাজে হাত দেব।

দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা যুগান্তরকে জানান, নাসিক নির্বাচন নিয়ে যারা দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন তাদের রেহাই নেই। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। যাতে সারা দেশের নেতাকর্মীদের কাছে একটা বার্তা যায়, কেউ দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে রেহাই পাওয়া যাবে না।

ওই নেতা আরও বলেন, এখন থেকে দলে ঘাপটি মেরে থাকা সুযোগসন্ধানীদের ব্যাপারে কঠোর না হলে আগামীতে দলকে আরও বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। কারণ সামনে জাতীয় নির্বাচন। ওই নির্বাচনে বিশ্বাসঘাতকরা যাতে সুযোগ নিতে না পারে সে ব্যাপারে এখন থেকেই সতর্ক হতে হবে।

এদিকে তৈমুরকে বাদ দিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির নেতৃত্বে কারা আসতে পারেন এ নিয়ে চলছে আলোচনা। জানা গেছে, জেলার বর্তমান সাধারণ সম্পাদক কাজী মনিরুজ্জামান মনির নতুন সভাপতি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আলোচনায় আছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা নজরুল ইসলাম আজাদ ও মোস্তাফিজুর রহমান (দীপু ভুঁইয়া)। দীপু ভুঁইয়া এবারের নির্বাচনে বেশ সক্রিয় ছিলেন। দীপুর শহরের বাড়িতেই সাখাওয়াতের নির্বাচনী ক্যাম্প ও মিডিয়া সেন্টার খোলা হয়। সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে সিদ্ধিরগঞ্জের সদস্য সচিব অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, বন্দরের হাবিবুর রহমান দুলাল ও শহরের ১২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শওকত হাশেম সকু আলোচনায় রয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ মহানগর সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে সাখাওয়াতের বিপক্ষে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। জাহাঙ্গীর আলম আবার সেলিনা হায়াৎ আইভীর আত্মীয়ও। মহানগর কমিটি থেকে জাহাঙ্গীর বাদ পড়ছেন এটা মোটামুটি নিশ্চিত। নতুন সভাপতি হিসেবে আলোচনায় আছেন বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল। কামাল নাসিক নির্বাচনে ব্যাপক সক্রিয় ছিলেন। তিনি মহানগরের সভাপতি হচ্ছেন এটা মোটামুটি নিশ্চিত। তবে কামালের সমর্থকরা তাকে জেলার সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দেখতে চান। মহানগরের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আলোচনায় আছেন ধানের শীষের মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি মূলত মহানগরকেন্দ্রিক রাজনীতি করেন। তবে সাখাওয়াতের সমর্থকরা চাচ্ছেন তাকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক করা হোক। এছাড়া ১২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শওকত হাশেম সকু ও ১৩নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তৈমুর আলমের ছোট ভাই মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আলোচনায় আছেন।

জানতে চাইলে এটিএম কামাল যুগান্তরকে বলেন, হাইকমান্ড যেখানে দায়িত্ব দিয়েছেন তা শতভাগ পালন করার চেষ্টা করেছি। চেয়ারপারসন তাকে যে দায়িত্ব দেবেন তা যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করব।
সূত্র জানায়, শেষ পর্যন্ত তৈমুর ধানের শীষের পক্ষে কাজ করবেন না এটা নির্বাচনের আগেই কিছুটা টের পাওয়া যায়। হাইকমান্ড থেকে বারবার বলার পরও তৈমুর প্রার্থী না হওয়ায় অনেকের মনে সন্দেহ জাগে। এই সন্দেহের মাত্রা আরও বেড়ে যায় যখন সবাই নির্বাচনী কৌশল নিয়ে ব্যস্ত ঠিক তখনি তৈমুর জেলার কমিটি করার জন্য লবিংয়ে ব্যস্ত থাকেন। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করে জেলা সভাপতি হওয়ার জন্য তদবির শুরু করেন তিনি। নির্বাচনের আগে জেলার নতুন কমিটি দেয়ার জন্য হাইকমান্ডকে নানাভাবে চাপ দেন। কমিটি করা না হলে সাখাওয়াতের পক্ষে কাজ করবেন না এমন বার্তাও দেয়া হয়। কিন্তু হাইকমান্ড থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়, নির্বাচনের পর জেলার কমিটি দেয়া হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনের সার্বিক কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করবে তাদের ভাগ্য।

সূত্র জানায়, তৈমুরপন্থীরা কখনও চাননি সাখাওয়াত মেয়র নির্বাচিত হোক। মেয়র হলে শহরে তৈমুরের রাজত্বে ভাগ বসাতে পারেন সাখাওয়াত এমন শংকা ছিল তাদের মধ্যে। তাই ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ করে তৈমুরপন্থীরা সাখাওয়াতের পক্ষে কাজ করা থেকে বিরত থাকেন।

নাসিক নির্বাচনকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল বিএনপি। কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক কমিটির পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে কমিটি করা হয়। কেন্দ্রের প্রায় দু’শ নেতা পুরো নাসিক এলাকা চষে বেড়ান। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও সব সময় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে রাখতেন। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ সিনিয়র নেতারা জয়ী হয়ে রাত-দিন পরিশ্রম করেন। সবার প্রত্যাশা ছিল নাসিকে ধানের শীষের প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়ী হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিন নেতার অসহযোগিতায় সেই জয় হাতছাড়া হয়। তাই জেলার রাজনীতি থেকে এদের বাদ দিতে সিনিয়র নেতারাও একাট্টা।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন