আজ শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ ইং, ০৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ভারতীয় ঋণে নামেই এক শতাংশ সুদ

Published on 26 December 2016 | 3: 44 am

ব্যাপক উৎসাহ নিয়েই একের পর এক ঋণ নেয়া হচ্ছে ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) থেকে। এ ঋণে সুদের হার ১ শতাংশ।

আপাতদৃষ্টিতে কম সুদের ঋণ মনে হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসলে তা নয়। কেননা এ ঋণ দেয়ার মধ্য দিয়ে ৩ ধরনের সুবিধা পাচ্ছে ভারত।

প্রথমত, ১ শতাংশ সুদ তো পাচ্ছেই। দ্বিতীয়ত, শর্ত অনুযায়ী এ ঋণের অর্থে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তার পণ্য ভারত থেকে কিনতে হচ্ছে। ফলে ভারতীয় পণ্য বিক্রির বাজারে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ। তৃতীয়ত, বেশির ভাগ প্রকল্পই আঞ্চলিক যোগাযোগ সংক্রান্ত। ফলে ভারতের সুবিধা জড়িত থাকছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, ভারত এখনও বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা থেকে প্রচুর ঋণ নিয়ে থাকে। তারপরও তারা ৩৬টি দেশে ঋণ দেয়। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে সম্পর্ক ঠিক রাখা এবং ব্যবসা করা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ রোববার যুগান্তরকে বলেন, ভারতীয় ঋণকে বলে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট। সুদ এখানে কোনো বিষয় নয়, কম সুদ দেখানো হয় ঋণগ্রহীতাকে আকৃষ্ট করার জন্য। কিন্তু তাদের (ভারত) শর্তানুযায়ী যেসব পণ্য সরবরাহ করে সেগুলোর মানের বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ। সব যে খারাপ সরবরাহ করে তা বলছি না। কিন্তু এক্ষেত্রে যারা ঋণ নেয় তাদের কিছু বলার থাকে না। এর মধ্যে মানসম্মত পণ্য পেলে সেটি সৌভাগ্যের বিষয়।

তিনি আরও বলেন, এ ঋণে কম দামে ভালো পণ্য পাওয়া যায় কিনা সে বিষয়টি যাচাই করার সুযোগ নেই। তাদের পণ্য বিক্রি করাই থাকে মূল উদ্দেশ্য। সুদ কম মনে হলেও ইফেকটিভ কস্ট কম হবে বলে মনে করি না। একেবারেই না নিলেই নয়, এ রকম পরিস্থিতি ছাড়া এ ধরনের সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট যত কম নেয়া যায় বা পরিহার করা যায় ততই ভালো।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানায়, ভারতীয় ঋণের অন্যতম শর্ত হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্মাণ সংক্রান্ত ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশ পণ্য তাদের দেশ থেকে কিনতে হবে। আর সরবরাহ সংক্রান্ত বিষয়ে ৭৫ শতাংশ ভারত থেকে কিনতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে ভারতের চাহিদা ছিল নির্মাণ ও সরবরাহ উভয় ক্ষেত্রেই ৮৫ শতাংশ ক্রয় করার। কিন্তু পরবর্তীকালে আলাপ-

আলোচনার মাধ্যমে সেটি কমিয়ে আনা হয়েছে। এ ছাড়া এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ২০ বছরে। সেই সঙ্গে অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নিতে গেলে সাধারণত যেসব শর্ত থাকে সেগুলো তো আছেই।

ইআরডির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এ ঋণ ভারতের কোনো দয়া বা মহানুভবতা নয়, এটা এক ধরনের বিনিয়োগ। তবে গ্রান্ট এলিমেন্ট বিবেচনায় এ ঋণকে সফট ঋণ বলা হয়ে থাকে।

সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর অবশেষে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ১১ প্রকল্পেরই সম্মতি মিলেছে ভারতের কাছ থেকে। দ্বিতীয় দফায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলারে ভারতীয় ক্রেডিট লাইনের আওতায় এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে।

এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতীয় ঋণ থেকে ১৬৫ কোটি ৫৫ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় হবে। নতুনভাবে সম্মতি পাওয়া প্রকল্পের বিষয়টি ইতিমধ্যেই মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে নতুন করে আরও ৩ থেকে ৪টি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানোর প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ইআরডির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ২৯-৩০ নভেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে দশম এলওসি পর্যালোচনা সংক্রান্ত একটি বৈঠক। এতে ভারতীয় নতুন ও পুরনো উভয় ঋণের অর্থে বাস্তবায়ন হওয়া ও বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। ওই বৈঠকেই দুটি প্রকল্পে সম্মতির বিষয়টি জানা গেছে।

সূত্র জানায়, সর্বশেষ সম্মতি পাওয়া প্রকল্প দুটির একটি হচ্ছে- বিভিন্ন পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে অতিরিক্ত ১ লাখ শিক্ষার্থীর পড়ালেখার ব্যবস্থা করা। এটি বাস্তবায়নে ভারতীয় ঋণ থেকে ব্যয় করা হবে ২৪ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার। ২০ জুন সম্মতি চেয়ে ভারতের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল ইআরডি।

অপরটি হচ্ছে জেলা পর্যায়ে আইটি পার্ক (১২টি) প্রতিষ্ঠা। এই প্রকল্পে ১৯ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার চেয়ে ২১ জুলাই প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। প্রথম ধাপে অনুমোদন পাওয়া ৪ প্রকল্প হচ্ছে- বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) জন্য বাস ক্রয়, বিআরটিসির জন্য একতলা ও দ্বিতল এসি ও নন-এসি বাস ক্রয়, সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপের জন্য নতুন ক্যারেজ ওয়ার্কশপ নির্মাণ ও ফিজিবিলিটিজ স্টাডি এবং আশুগঞ্জ নৌবন্দর-সরাইল-ধরখার-আখাউরা স্থলবন্দর চার লেন হাইওয়ে প্রকল্প।

১ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপে সম্মতি পাওয়া ৫ প্রকল্প হচ্ছে- খুলনা-দর্শনা জংশন সেকশন ডাবল লাইন করা, পার্বতীপুর-কাউনিয়া রেললাইন মিটার গেজ লাইন থেকে ডুয়েল গেজ লাইনে উন্নীত করা, বড়পুকুরিয়া-বগুড়া-কালিয়াকৈর ৪০০ কেভি লাইন প্রজেক্ট, মংলায় ইন্ডিয়ার ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য যন্ত্রপাতি ক্রয়।

সূত্র জানায়, গত জুনে ঢাকা সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নতুন করে ২০০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার ঘোষণা দেন। এর আগে ২০১০ সালে প্রথম দফায় ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেয়। ভারতের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ওই ঋণের ২০ কোটি ডলার পরে অনুদান হিসেবে ঘোষণা করেন। এর আওতায় ১৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর মধ্যে ৭ প্রকল্পের বাস্তবায়ন শেষ হয়েছে।

অন্যদিকে তৃতীয় এলওসি নেয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে ইআরডি। এরই মধ্যে ভারত আরও একটি লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) বা ঋণ দেয়ার আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রস্তুতি শুরু করেছে সংস্থাটি। এজন্য নতুন ঋণের জন্য আটটি প্রকল্প চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এতে প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয় ১১৭ কোটি ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী (প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে) এর পরিমাণ প্রায় নয় হাজার ৩৬০ কোটি টাকা।

ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর করার কথা রয়েছে। এজন্য নতুন ঋণের আওতায় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে এ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। নতুন ঋণের তালিকায় রয়েছে ২০ কোটি ডলারের বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প, ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয়ে আশুগঞ্জ নৌরুট খনন, পায়রা বন্দরের বহুমুখী টার্মিনাল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ কোটি ডলার, ৫০ কোটি ডলার ব্যয়ে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত ডুয়েল গেজ রেল নির্মাণ, স্থলবন্দরের শুল্ক স্টেশনের আধুনিকায়ন, ঈশ্বরদীতে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে তিন কোটি ডলার এবং প্রায় ৫ কোটি ডলার ব্যয়ে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন প্রকল্প।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন