আজ শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ ইং, ০৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ঢাকা-পায়রা রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প – বিস্ময়কর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

Published on 26 December 2016 | 3: 42 am

নাম ডিপি (ঢাকা-পায়রা) রেলওয়ে লিমিটেড। অথচ রেলপথ নির্মাণ বা এ ধরনের সমীক্ষা যাচাইয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোনো অভিজ্ঞতা নেই। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির বয়স মাত্র তিন বছর। আবার এর জন্মও হয়েছে ঢাকা-পায়রা রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পকে ঘিরে।

এছাড়া অবাক হলেও সত্য যে, শুরুতে এ প্রতিষ্ঠানটির মূলধন ছিল ১শ’ পাউন্ড বা কম-বেশি ১০ হাজার টাকা মাত্র।

এরকম একটি নামধারী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিতে যাচ্ছে ৬০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের ঢাকা-পায়রা রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের। ২০ ডিসেম্বর রেলপথ মন্ত্রণালয়ে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরও হয়ে গেছে।

এর তিন দিন পর যমুনা টিভির অনুসন্ধানে ডিপি রেলওয়ে লিমিটেডের এমন বেহাল চেহারা বেরিয়ে আসে। অনুসন্ধানীমূলক চাঞ্চল্যকর এ প্রতিবেদন সম্প্রচার হওয়ার সর্বত্র সমালোচনার ঝড় ওঠে।

সূত্র বলছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের এতবড় প্রকল্প নিয়ে নয়ছয় করার এখানেই শেষ নয়। প্রকল্পের প্রাক্কলিত দরের চিত্র নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। যেমন- ঢাকা-পায়রা রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের খরচ ধরা হয়েছে ৩ কোটি ১২ লাখ ডলার বা প্রায় ২৪৫ কোটি টাকা।

অথচ দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈদ্যুতিক সিঙ্গেল ট্র্যাকের লাইন, সিগন্যালিং ও অন্যান্য অবকাঠামোসহ প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে খরচ হয় সর্বোচ্চ ২৩ কোটি থেকে ৩১ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, অদক্ষতার কারণেও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। এর ফলে প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর সুযোগে অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়। প্রকল্প ব্যয়ও বেড়ে যায়। এখানে কী ঘটেছে বা ঘটতে যাচ্ছে তা এখনও স্পষ্ট নয়।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সমীক্ষা যাচাইয়ে সরকার টু সরকার পদ্ধতিতে নিয়োগ দেয়া হলে সেক্ষেত্রে কিছু বলার নেই। তবে এর বাইরে ঠিকাদার নিয়োগে বিধি অনুযায়ী প্রতিযোগিতার সুযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে তা মানা হয়েছে কিনা- তা খতিয়ে দেখতে হবে।

ডিপি রেলের সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করা কর্মকর্তা রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকঠামো) কাজী রফিকুল আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘এটি সাময়িক একটি সমঝোতা স্মারক মাত্র। যুক্তরাজ্যের ডিপি রেলওয়ে কোম্পানি এ সমঝোতা স্মারকের মধ্য দিয়ে শুধু প্রাথমিক সমীক্ষা করবে। ১৮ মাস সময়ের মধ্যে তারা সমীক্ষার কাজ শেষ করে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে প্রতিবেদন দেবে। সমীক্ষা কিংবা তাদের কাজে ত্রুটি পাওয়া গেলে এ স্মারক নিশ্চয় বাতিল হয়ে যাবে। তিনি বলেন, রেলওয়ের কোনো বাজেটই নেই এখানে। সমীক্ষার সব ব্যয়ও তারা করবে।

জানা যায়, ডিপি রেল লিমিটেডকে কার্যক্রমহীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এনডোলে। সেখানে বলা হয়েছে, এ প্রতিষ্ঠানটির ৫ জন সক্রিয় পরিচালক এবং সক্রিয় সচিব রয়েছে ১ জন। এনডোলে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য সরবরাহ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ক্রেডিট রেটিং সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে থাকে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় তথ্যাদি সংগ্রহ ও ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে এনডোলে। রেলপথ নির্মাণ কিংবা নির্মাণ প্রকল্পে সরঞ্জাম সাপ্লাইয়ের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই ডিপি রেলের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, নামমাত্র ভুঁইফোড় এ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করাই হচ্ছে মূলত পর্দার আড়ালে কমিশন বাণিজ্যের নামে বড় মাপের দুর্নীতি করা। এজন্য রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করেই এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়। তিনি জানান, প্রকল্পটিতে নির্মাণ ব্যয়ের ব্যবধান আকাশ-পাতাল।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর লন্ডনে কোম্পানিজ হাউসে লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয় ঢাকা-পায়রা রেল লিমিটেড (ডিপি রেল)। নিবন্ধন নম্বর ০৮৮২০৯৭৩। এ কোম্পানির মোট জনবল ১১ জন। এর মধ্যে একজন সচিব পর্যায়ে কর্মকর্তা, বাকিরা সবাই পরিচালক। পরিচালকদের মধ্যে আনিসুজ্জামান চৌধুরী (চাকরিতে যোগদান ২ এপ্রিল ২০১৬) নামে একজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত রয়েছেন।

এছাড়া ব্রিটিশ নাগরিকদের মধ্যে পরিচালক হিসেবে নাম আছেন চার্লস ককবার্ন, পিটার আইলস, ইয়ান ডার্বিশায়ার, ম্যাট স্টেইনার, ডরিয়ান বেকার, বিল রবার্টস, জুলিয়ান লিন্ডফিল্ড, টিম মিডোস স্মিথ, গ্রাহাম লরেন্স ও পল টুইডাল। ব্রিটেনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এদের কারোই ভালো কোনো ব্যবসায়িক বা পেশাদারিত্ব প্রোফাইল নেই।

প্রসঙ্গত, গত সপ্তাহে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে সমঝোতা স্মারক চুক্তিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষে রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী রফিকুল আলম স্বাক্ষর করেন। এ সময় রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশবিষয়ক বাণিজ্য দূত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভাগের ছায়ামন্ত্রী রুশনারা আলী, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফিরোজ সালাহ উদ্দিন, ব্রিটিশ হাইকমিশনার অ্যালিসন ব্লেক, বাংলাদেশ রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেনসহ রেলওয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ডিপি রেলের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের আগে নৌ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিব অশোক মাধব রায় যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা থেকে পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছিলাম। ওই মন্ত্রণালয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমওইউ স্বাক্ষর করেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডিপি রেল কোম্পানি রেলপথ মন্ত্রণালয় নিয়োগ দিয়েছে। ওই কোম্পানি সম্পর্কে আমার বেশি কিছু জানা নেই।

সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরকারী রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকঠামো) কাজী রফিকুল আলম যুগান্তরকে আরও বলেন, যুক্তরাজ্যের ডিপি রেলওয়ের অনেকগুলো কোম্পানি রয়েছে। সব ক’টি কোম্পানি মিলে তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ও লোকবল আছে। তিনি জানান, ২৮০ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করবে বিশ্বের এক নম্বর কোম্পানি চীনের সিআরসি কোম্পানি। আর ইঞ্জিন, বগিসহ সব সরঞ্জাম সাপ্লাই দেবে ডিপি রেলওয়ে। মূল কথা হচ্ছে, এটি চূড়ান্ত স্মারক নয়, অনভিজ্ঞতার প্রমাণ পেলে যে কোনো সময় এ কোম্পানি বাতিল বলে গণ্য করা হবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ডিপি রেলের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ২০২৪ সাল নাগাদ রেলপথ নির্মাণের কাজ শেষ হবে। চলতি বছরের ৯ আগস্ট এনইসি সম্মেলন কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই রেললাইন নির্মাণের প্রস্তাব করে রেলপথ মন্ত্রণালয়।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন