আজ বৃহঃপতিবার, ২১ জুন ২০১৮ ইং, ০৭ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



বিএমএ নির্বাচন ।। এবারই সব প্রথম!

Published on 24 December 2016 | 4: 56 am

শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ছড়ানো বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রাম শাখার বহুল আলোচিত অনুষ্ঠিত হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। বিএমএর প্রায় ৩৮ বছরের নির্বাচনী ইতিহাসে এবারই প্রথম নিজেদের ঘরের বাইরে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। নগরীর জিইসি মোড়ে বিএমএ ভবনেই এতদিন এ নির্বাচন হত। শুধু নিরপেক্ষ ভেন্যু নয়, তাদের নির্বাচনী ইতিহাসে এবারই প্রথম ভোটকেন্দ্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত করার পাশাপাশি বসেছে সিসি ক্যামেরা। তাছাড়া র‌্যাবগোয়েন্দাসহ আইনশৃঙ্খলার বাহিনীর এত বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েনও এবারই প্রথম।

ভোটকেন্দ্রের বাইরে বহিরাগত কর্মীসমর্থকের এমন বহর! তাও প্রথম দেখেছেন চিকিৎসকরা। বিএমএর এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো এমন অনেক কিছুরই প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী চট্টগ্রামের চিকিৎসক সমাজ, সাথে নগরবাসীও।

এতবার ভোট দিলাম, কিন্তু এবারের মতো নির্বাচন এর আগে কখনো দেখিনি। কেন্দ্রের বাইরে হাজার হাজার বহিরাগতের অবস্থান, এত বিপুল সংখ্যক পুলিশ, এগুলো দেখে বিশ্বাসই করতে পারছি না এটি ডাক্তারদের নির্বাচন।’ ভোট দেয়ার পর কেন্দ্রে কথা হলে এমনই মন্তব্য প্রবীণ এক চিকিৎসকের।

কেন্দ্রের বাইরে পরিস্থিতিসহ একটি পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনের এমন হাল দেখে রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বিএমএর গতবারের নির্বাচন কমিশনে দায়িত্ব পালনকারী এক চিকিৎসক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, চিকিৎসকদের এমন বিতর্কিত নজির আগে কখনো ছিল না। এর জন্য অবশ্যই চিকিৎসকরা নিজেরাই দায়ী। তবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পেরেছেন বলে জানান চিকিৎসকরা।

এবারের মতো এমন বিতর্কিত ঘটনা অতীতে কোনো নির্বাচনে ঘটেনি বলে স্বীকার করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্যানেল। এর জন্য দুই পক্ষ একে অপরকে দুষছেন। নির্বাচনে পূর্ণাঙ্গ প্যানেলে জয় পেয়েছেন ডা. মুজিবফয়সল পরিষদ। এই প্যানেলের নির্বাচনী সমন্বয়ক ডা. মো. শরীফ নিজেও মনে করেন, এবারের বিএমএ নির্বাচনে যা হয়েছে, তা আগে কখনো ঘটেনি। সিসি ক্যামেরা, ম্যাজিস্ট্রেট ও এত বিপুল সংখ্যক পুলিশ এর আগে কোনো নির্বাচনে প্রয়োজন পড়েনি। কেন্দ্রের বাইরে হাজার হাজার বহিরাগতের শোডাউনও চিকিৎসকরা কখনো দেখেননি। কেউ এটি আশাও করেননি। ডাক্তারদের নির্বাচন ভদ্রসমাজের নির্বাচন, শিক্ষিত মানুষের নির্বাচন। এই নির্বাচনে ডাক্তারদের কাছ থেকে এমন আচরণ কখনো কাম্য নয় বলেও মন্তব্য বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার সদ্য প্রাক্তন এই সাধারণ সম্পাদকের।

একই অভিমত কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সদস্য পদে নির্বাচিত ডা. মোহাম্মদ সেলিমের। তিনি পরাজিত প্যানেল ডা. নাসিরমিনহাজ পরিষদের কোষাধ্যক্ষ প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনে এমন পরিস্থিতির জন্য বিজয়ী প্যানেলকে দোষারোপ করে তিনি বলেন, ডাক্তারদের এমন বিতর্কিত রাজনীতি কেউ আশা করে না। কিন্তু এবার সেটাই হয়েছে। এটি চিকিৎসক সমাজের জন্য খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।

এদিকে বিজয়ী প্যানেলের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অগ্রহণযোগ্য ও নোংরা রাজনীতির অভিযোগ করেছেন পরাজিত প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদ। তাঁর দাবি, তাদের হুমকিধমকি ও দাপটের কারণেই আমরা রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা জামায়াতবিএনপির সাথেও আঁতাত করেছে। যদিও ভোটের পরিবেশ ও ফলাফল নিয়ে তিনি ও তাঁর প্যানেল কোনো প্রশ্ন তুলেননি।

নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট দিতে পেরেছেন বলে জানান চমেক হাসপাতালের গাইনী বিভাগের প্রধান ডা. শাহানারা চৌধুরী। তবে এমন নির্বাচন আগে আর কখনো হয়নি বলেও জানান তিনি। একই কথা বিজয়ী প্যানেলের নির্বাচিত সদস্য ডা. প্রীতি বড়ুয়ারও।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে কেন্দ্রের ভেতরে কোনো অনিয়মের ঘটনা ঘটেনি। বাইরের পরিবেশ যাই হোক, ভেতরে ভোট নিয়ে কোনো পক্ষ থেকেই কোনো ধরনের প্রশ্ন ওঠেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্যের পাহারায় একপ্রকার উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

নির্বাচন ঘিরে ভোটকেন্দ্র ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও এর পার্শ্ববর্তী জামালখান এলাকাজুড়ে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভোটকেন্দ্র ও আশপাশের এলাকাজুড়ে সিএমপির তিনশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। এছাড়া দুপুরের পর যোগ দেয় র‌্যাবের সদস্যরাও। কেন্দ্রের বাইরের পাশাপাশি ভেতরেও অবস্থান নেয় বিপুল সংখ্যক পুলিশ। বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয় ১৯টি সিসি ক্যামেরা। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দীপক কুমার রায় কেন্দ্রে নিয়োজিত ছিলেন সকাল থেকেই।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও ক্ষণে ক্ষণে উত্তেজনা ছড়িয়েছে কেন্দ্রের বাইরে। ভোট কেন্দ্রের বাইরে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পক্ষেরই বিপুল সংখ্যক বহিরাগত সমর্থকবাহিনীর অবস্থান ছিল চোখে পড়ার মতো। মাথায় হলুদ টুপি পরে জামালখান থেকে প্রেসক্লাব হয়ে চেরাগী পাহাড় পর্যন্ত এলাকা দখল করতে দেখা যায় ডা. নাসিরডা. মিনহাজ প্যানেলের কর্মীসমর্থককে। গায়ে নীল টিশার্ট ও নীল টুপি পরে অবস্থান নিতে দেখা যায় ডা. মুজিবডা. ফয়সল প্যানেলের কর্মীসমর্থকদের। জামালখান থেকে গনি বেকারি সড়কে অবস্থান নেয় এই পক্ষের কর্মীরা। বাদ যায়নি জামালখানআসকারদিঘি সড়কও। মহানগর যুবলীগের এক নেতার নেতৃত্বে এই সড়কেও অবস্থান নেয় একটি অংশ।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা কেন্দ্রে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্যও একাধিকবার ভোটকেন্দ্র পরির্দশন করেন।

এদিকে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন দুটি এ নির্বাচন বয়কট করলেও তাদের অনেক চিকিৎসককে ভোটকেন্দ্রে দেখা গেছে। এই দুই সংগঠনের সদস্যদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ভোট দিয়েছেন। এরাই নির্বাচনের ফলে বড় ধরনের ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছেন।

জামায়াতের অধিকাংশ এবং বিএনপিপন্থী একটি অংশের ভোট পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বিজয়ী প্যানেলের নির্বাচনী সমন্বয়ক ডা. মো. শরীফ। তবে জামায়াতবিএনপি বিবেচনায় নয়, সকল পর্যায়ে সকল চিকিৎসকের কাছে ভোট চেয়েছেন বলে দাবি করেছেন নির্বাচিত প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. ফয়সল ইকবাল চৌধুরী।

উল্লেখ্য, নির্বাচনে মোট ৪ হাজার ৪৪২ ভোটারের মাঝে ৩ হাজার ২৪৬ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে শুরু হয় গণনা। রাত ১টায় আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ডা. আলাউদ্দিন মজুমদার। নির্বাচনে ডা. মুজিবডা. ফয়সল প্যানেল পূর্ণাঙ্গ প্যানেলে জয়লাভ করেছে বলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন তিনি।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন