আজ রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ ইং, ১০ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা প্রতিবেদন না দিলে বন্ধ হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

Published on 19 December 2016 | 6: 55 am

আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা না দিলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হবে। বিচারের মুখোমুখি করা হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিদের। দু-এক দিনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এ বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আয়-ব্যয়ের হিসাব জমার ক্ষেত্রে চরম অনীহা দেখিয়ে আসছে। অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে নিরীক্ষার প্রয়োজনই মনে করে না প্রতিষ্ঠানগুলো। এ পরিস্থিতিতে ইউজিসি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান যুগান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় বেসরকারি হলেও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর আয়ের অর্থ ‘পাবলিক মানি’র (জনগণের অর্থ) মধ্যে পড়ে।

তাই এর আয়-ব্যয়ের হিসাব সরকারের কাছে অবশ্যই জমা দিতে হবে। কিন্তু অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই তাদের হিসাব নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী প্রতিবছর আর্থিক হিসাব সরকারের কাছে জমা দিতে হবে।

এটা অমান্য করলে কেবল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়াই নয়, বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্যদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। বিদ্যমান আইনে তাদের অর্থ বা কারাদণ্ড এমনকি উভয় দণ্ড দেয়ার বিধান আছে। আমরা প্রয়োজনে আইনের এসব ধারা প্রয়োগের সুপারিশ করব।’

জানা গেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারের কাছে হিসাব নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিলসংক্রান্ত আইন লংঘন করে চলেছে। দিন দিন আয় বাড়ছে। তারা নিজেদের ইচ্ছামতো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থ নিচ্ছে।

কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ন্যূনতম অর্থ কমিটির সভা পর্যন্ত করছে না। আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা (অডিট) করাচ্ছে না। কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের প্রয়োজনও মনে করে না। এভাবেই তারা বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লাগাম টেনে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউজিসি।

সম্প্রতি ইউজিসি থেকে এ ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। তাতে দেখা যায়, ৭৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৭টির নিরীক্ষা প্রতিবেদন হালনাগাদ আছে। ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো তথ্যই দেয়নি।

এর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো হচ্ছে চট্টগ্রামের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (ইউএসটিসি)। এ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘দুই যুগ আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইউএসটিসি। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টির হিসাব নিরীক্ষা করানো হয়েছে কিনা, সে তথ্য পর্যন্ত আমাদের জানা নেই। এ প্রতিষ্ঠানটি আজ পর্যন্ত কোনো নিরীক্ষা প্রতিবেদন ইউজিসিতে জমা দেয়নি। এ ধরনের কাজ আইনবিরোধী।’

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ৪৫ ধারা অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা করাতে হবে। এ প্রতিবেদন পরবর্তী আর্থিক বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে।

এ ধারার নির্দেশনা লংঘন করলে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ বাতিলের নির্দেশনা আছে। ৪৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেয়ার বিধান আছে এই অপরাধে।

কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইনের এ নির্দেশনাকে থোড়াই কেয়ার করছে বলে মনে করেন ইউজিসি কর্মকর্তারা। শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনই নয়, ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে এসেছে।

এ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনের ২৫৮ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়, ‘আর্থিক অডিট রিপোর্ট দাখিলযোগ্য ৮০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৩১টি রিপোর্ট প্রেরণ করেছে কমিশনে। এর মধ্যে ২০টি অডিট রিপোর্ট নিরীক্ষিত এবং ১১টি অনিরীক্ষিত।’

ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘এ প্রতিবেদন আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে হস্তান্তর করেছি। চলতি সংসদে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে।’

ইউজিসির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে কোনো সিএ ফার্মের মাধ্যমে হিসাব নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা। সিএ ফার্ম নিয়োগ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। যে কারণে প্রতিবেদন দাখিল করা প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়া অন্য কেউ সিএ ফার্ম চেয়েছে কিনা, তাও আমাদের জানা নেই।’

ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, চর্চা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজের পছন্দমতো তিনটি সিএ ফার্মের নাম প্রস্তাব করে থাকে। সেখান থেকে মন্ত্রণালয় একটি নিয়োগ দেয়। কিন্তু নিজস্ব ফার্মের প্রতিবেদনেও অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক ত্রুটি ধরা পড়ে।

সম্প্রতি নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব নিরীক্ষা করে সংশ্লিষ্ট সিএ ফার্ম হিসাবের ওপর আপত্তি দিয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয় সিএ ফার্মের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। ইউজিসির চেয়ারম্যান মন্তব্য করেন, এ ঘটনাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক প্রশাসনের নেতিবাচক দিকই প্রকাশ করে। যা উদ্বেগজনক।

জানা গেছে, আইনের ১৪, ২৫ ও ২৬ ধারা অনুযায়ী অর্থ কমিটি গঠন ও পরিচালনা করতে হবে। ৪১ ধারায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থের উৎস বলে দেয়া আছে। ৪৪ ধারায় তহবিল পরিচালনার বিষয় বলা আছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অর্থ কমিটির কোনো সভা করে না।

অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ করেনি। আবার যেখানে কোষাধ্যক্ষ আছে, সেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের লোকজন আছেন। মূলত দু’হাতে অর্থ লুটপাটের জন্যই এই চারটি ধারার লংঘন চলছে বলে অভিযোগ আছে।

ইউজিসির কর্মকর্তাদের মতে, ভাড়া বাড়িতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ফলে বছর বছর ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিটিং অ্যালাউন্স, রক্ষণাবেক্ষণ, নানা কেনাকাটা, বিদেশ ভ্রমণসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে ইউজিসি প্রশ্ন তুলে আসছে।
ইউজিসির প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৯৫টি। আরও তিনটি চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এর মধ্যে গত বছর দেশের ৮৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বমোট আয় ছিল প্রায় দুই হাজার ৭৯১ কোটি টাকা।

গড়ে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় আয় করেছে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা। অপরদিকে গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যয়ও করেছে প্রায় দুই হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। আয়-ব্যয় সমান দেখিয়েছে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়। আয়-ব্যয় কীভাবে সমান হয় তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন