আজ শুক্রবার, ২২ জুন ২০১৮ ইং, ০৮ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



বিমানে ভয়াবহ নিয়োগ দুর্নীতি

Published on 18 December 2016 | 7: 58 am

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে ভয়াবহ নিয়োগ দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি জুনিয়র সেলস অফিসার (জিএসও) পদে চূড়ান্ত নিয়োগ পাওয়া প্রার্থীদের কাগজপত্র যাচাইয়ে বেরিয়ে এসেছে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর নিয়োগ বাণিজ্যের তথ্য। ইতিমধ্যে চূড়ান্ত নিয়োগ পাওয়া ২ জনের চাকরি বাতিল করা হয়েছে। সন্দেহের তালিকায় থাকায় অন্তত ১০ জনকে এখনও নিয়োগপত্র দেয়া হয়নি।

অভিযোগ, বিমানের এপ্লয়মেন্ট, প্রশাসন ও মার্কেটিং শাখার অন্তত ১০ জন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার একটি সিন্ডিকেট ‘আন্ডারহ্যান্ড ডিলিং’ করে প্রার্থীদের নিয়োগ দেয়। সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন সুদীপ চক্রবর্তী, বেলায়েত হোসেন ও সফিউল বারী। বিমানের একজন প্রভাবশালী জেনারেল ম্যানেজার, একজন পর্ষদ সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের কর্মচারী মনির হোসেনের যোগসাজশে এই সিন্ডিকেট তাদের পছন্দের প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষায় পাস করিয়ে আনে। এক্ষেত্রে প্রতিটি নিয়োগের বিপরীতে ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা নিয়েছে সিন্ডিকেট।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমানের পরিচালক মার্কেটিং ড. সফিকুর রহমান বলেন, জুনিয়র সেলস অফিসার পদে চূড়ান্ত নিয়োগ পাওয়া দীলিপ চক্রবর্তী (রোল-১১৩৪১) নামে একজন প্রার্থীর নিয়োগ ইতিমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আবেদনের সময় জাল কাগজপত্র জমা দেয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। চূড়ান্ত নিয়োগ পেতে বিভিন্ন ধাপে কমপক্ষে ৪টি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। একজন অসাধু আবেদনকারী এতগুলো ধাপ পেরিয়ে কিভাবে চূড়ান্ত নিয়োগ পেলেন- এই প্রশ্নে ড. সফিকুর রহমান বলেন, এ নিয়ে শিগগিরই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। একই সঙ্গে চূড়ান্ত নিয়োগপ্রাপ্ত ১০০ জনের সবার সার্টিফিকেট যাচাই-বাছাই করা হবে। প্রয়োজনে এই নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলও করা হতে পারে।

জুনিয়র সেলস অফিসারসহ বিমানের মোট ৮টি শাখায় অস্থায়ী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্য পদগুলো হল- জুনিয়র কমার্শিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট, সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্ট, সিকিউরিটি গার্ড, ট্রাফিক হেলপার, গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিস্ট্যান্ট, জুনিয়র ট্রাফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট ও জুনিয়র ইলেকট্রিশিয়ান।

দুর্নীতির অভিযোগ আসার পর সংশ্লিষ্ট পদে লিখিত পরীক্ষায় পাস করা সব প্রার্থীর উত্তরপত্র দ্বিতীয় দফা নিরীক্ষা, জমা দেয়া সনদপত্র যাচাইয়ের দাবি করেন আবেদনকারীরা। এছাড়া প্রয়োজনে সব পরীক্ষা বাতিলেরও দাবি জানান তারা। এরপর প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে নিয়োগ পাওয়া অসংখ্য প্রার্থী জাল শিক্ষা ও জন্ম নিবন্ধন সনদ দিয়ে চাকরি পাওয়ার প্রমাণ পেয়েছে কর্তৃপক্ষ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডে থাকা একজন সদস্য বলেন, জুনিয়র সেলস অফিসার পদে চূড়ান্ত হওয়া ১০০ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩৮ জনকেই প্রভাবশালীদের তদবিরে নিয়োগ দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, তদবিরকারীরা এতটাই প্রভাবশালী যে, বাধ্য হয়ে নানা কৌশলে তাদের প্রার্থীদের পাস করাতে হয়েছে।

অভিযোগ আছে, মৌখিক পরীক্ষার বোর্ড তাদের সব কার্যক্রম শেষে ১০০ জনের চূড়ান্ত তালিকা প্রশাসন বিভাগে পাঠালেও ওই বিভাগের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট তা থেকে ৬ জনের নাম বাদ দিয়ে গোপনে অন্যদের নাম ঢুকিয়ে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে। কিন্তু যে ৬ জনকে বাদ দেয়া হয় তাদের সবাই তদবিরে মৌখিক পরীক্ষায় পাস করেছিল। এই খবর জানাজানি হলে এমপ্লয়মেন্ট বিভাগ ভুল হওয়ার কথা স্বীকার করে তা সংশোধন করে। সিন্ডিকেট এই ৬ জনের কাছ থেকেও মোটা অংকের টাকা নিয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

১৫ নভেম্বর ‘বিমানে নিয়োগ বাণিজ্য’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এতে প্রতি নিয়োগে ৫-১৫ লাখ টাকা ঘুষ, ৬ মাসে ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া, ছবি ছাড়া প্রবেশপত্র, একজনের পরীক্ষা দেয় অন্যজন- এসব তথ্যও উঠে আসে। রিপোর্টে বিমান পরিচালনা পর্ষদ চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল ইনামুল বারী তার বক্তব্যে বলেছিলেন, তিনিও শুনেছেন নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে নানা অনিয়ম হয়েছে। এপ্রিলে নিয়োগ সম্পন্ন করার জন্য বোর্ড থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এখনও নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি। তিনি বলেন, পরীক্ষা পদ্ধতিতে নিশ্চয়ই ত্র“টি ছিল। এ বিষয়ে শিগগিরই তদন্ত ও পর্ষদের সভা ডেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কিন্তু গত এক মাসেও রহস্যজনক কারণে কোনো ধরনের তদন্ত কমিটি গঠন হয়নি। উল্টো তড়িঘড়ি করে জুনিয়র সেলস অফিসার পদে মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হয়। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের নেয়া বিতর্কিত লিখিত পরীক্ষা বাতিলের অভিযোগ থাকলেও একটি পরীক্ষাও বাতিল করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসাদ্দিক আহম্মেদ বলেন, অভিযোগ আসার পর ঢাবি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মাধ্যমে পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়। তিনি বলেন, এখন থেকে বিমানের সব নিয়োগ পরীক্ষা মিলিটারি ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) ও ঢাবির আইবিএর মাধ্যমে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসব সংস্থাকে পাওয়া না গেলে বিমান কর্তৃপক্ষই পরীক্ষা নেবে বলে তিনি জানান।

জানা গেছে, পরিচালনা পর্ষদ থেকে এই নিয়োগ পরীক্ষা এমআইএসটি অথবা ঢাবি আইবিএর মাধ্যমে সম্পন্নের নির্দেশনা দিলেও প্রশাসন বিভাগ তা লংঘন করে তাদের মতো করে কাজ সেরেছে। অভিযোগ আছে, ঢাবির সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের একজন শিক্ষকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব রয়েছে বিমানের একজন প্রভাবশালী পর্ষদ সদস্যের। তিনি তার ঘনিষ্ঠভাজন বিমানের একজন জেনারেল ম্যানেজারকে দিয়ে এই বিতর্কিত লিখিত পরীক্ষা নিয়েছিলেন।

চক্রটি লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরির পর্ব থেকেই অনিয়মের আশ্রয় নেয়। ট্রাফিক হেলপার (লোডার) পদে এসএসসি পাস প্রার্থীর জন্য প্রশ্ন করা হয়েছে বিসিএস পরীক্ষার চেয়েও কঠিন। প্রশ্ন ফাঁস করে পছন্দের প্রার্থীদের হাতে পৌঁছে দেয়া, অন্যজনকে দিয়ে পরীক্ষার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এজন্য ছবি ছাড়া প্রবেশপত্র বিতরণ করা হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী অন্যের প্রবেশপত্র নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষার হলে অবাধে নকলের সুযোগ দেয়া হয়েছে। একই বেঞ্চে ৫ জন প্রার্থী বসে পরীক্ষা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এর আগে বাছাইয়ের নামে বিমানের এমপ্লয়মেন্ট শাখা থেকে কয়েক হাজার আবেদনপত্র বাতিল করে দেয়া হয়েছে। আবেদনপত্র যাতে ফেলে দেয়া না হয় এবং প্রবেশপত্র হাতে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্যও ঘুষ দিতে হয়েছে। এজন্য পাঁচ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে নিয়েছে চক্রটি। এই নিয়োগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, হোয়াটসআপ, টুইটারে গত দুই মাস ধরে সমালোচনার ঝড় বইছে।

জানা গেছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পরও বিমানের ট্রাফিক হেলপারের ৬০টি পদের বিপরীতে পাস করেছে মাত্র ৪৬ জন। যে শাখায় ঘুষের কারবার হয়নি সেখানে ১০০ প্রার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৩-৪ জন। কোনো কোনো শাখায় মাত্র ১ জন করে পাস করেছে। বিমানের নিয়োগ পরীক্ষায় এত কম সংখ্যক পাস করার ঘটনা নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন