আজ বুধবার, ২০ জুন ২০১৮ ইং, ০৬ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



একটি বাংলাদেশ, তুমি জাগ্রত জনতা

Published on 15 December 2016 | 2: 33 am

:: অধ্যাপক আয়েশা পারভীন চৌধুরী ::

“একটি বাংলাদেশ, তুমি জাগ্রত জনতা” এই দেশ ও দেশের মানুষের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন কোন আনন্দ দিনের ঘটনা ও ইতিহাস নয়। যে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে এই দেশের সাত কোটি মানুষকে সেই ক্ষতি পূরণ কখনো সম্ভব নয়। এই ক্ষতির ক্ষত নিয়ে এদেশের মানুষ আজো বেঁচে আছে, আজীবন বেঁচে থাকবে। এই ক্ষতি বাংলার মানুষের আজন্ম প্রেরণার উৎস। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে মননে বাংলাদেশ একটি অবাক বিস্ময়। প্রতিটি দিন প্রতিটি ক্ষণ দেশের মাটি-পানি-বাতাস শহীদের রক্তের রং এ ও গন্ধে নতুন নতুন দিনের সূচনা করে। প্রতিটি দিন নতুন শপথে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ়প্রত্যয়ে যাত্রা করে। আজ বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা লাভে এগিয়ে যাচ্ছে। একটি যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের কাঠামোগত উন্নয়নের সাথে সাথে জনসাধারণের সার্বিক উন্নয়নে এদেশের প্রতিটি মানুষের ভূমিকা উল্লেখ্যযোগ্য। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার হতে চলেছে। এরই মধ্যে অনেক সরকার এদেশের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করেছে। মাঝখানে কয়েক বছর সামরিক বাহিনীও এদেশের শাসনভার গ্রহণ করেছিল। তবে এই কথা সত্য প্রতিটি সরকারই স্বাধীনতার সূর্য সন্তানদের যথাযথ মর্যাদা দিয়েই এগিয়ে গেছে। তবু কোথায় যেন ত্রুটি থেকে গেছে। আমাদের দেশের পত্র-পত্রিকাগুলো প্রতিদিন সকালে যে সমস্ত সংবাদ প্রচার করে চলছে তাতে সূর্য সন্তানদের আসল উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হয় না। রাজনৈতিক কারণে অথবা প্রতিহিংসার ফলে খুনের বদলে খুন লেগে আছে। নির্যাতনের একটি হাতিয়ার হিসেবে নারীকে ব্যবহার করে পাক-সেনারা বিশ^-দরবারে নিন্দিত ও সমালোচিত হলেও আজো এদেশের কতিপয় ঘৃণ্য কাপুরুষের হাতে নারীর সম্ভ্রমহানীর ঘটনা নিত্যনৈমিক্তিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন নানান দূর্ঘটনা ও হানাহানি বলে দেয় আজো আমরা সুসংহত জাতিতে পরিণত হতে পারিনি। তাইতো আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সকলের একতাবদ্ধ প্রচেষ্ঠা একান্ত জরুরী। দেশের উন্নয়নে এক দেশ এক জাতির মনমানসিকতায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
১৯৭১ এর মুক্তির এ সংগ্রাম ছিল অসম আর্থিক বণ্টন ব্যবস্থা ও অপ-কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও নাগরিকদের জন্য সামাজিক ন্যায় বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই ছিল এর প্রধান লক্ষ্য। ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে যে বৈষম্যের সূচনা হয় তা ছিল অমানবিক। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক দিক থেকে এদেশের মানুষকে বঞ্চিত করার ফলে জনরোষের সৃষ্টি হয়। ৭০ এর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বরং ২৫ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানী সশস্ত্রবাহিনী এদেশের দোসরদের সহযোগিতায় বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। যুদ্ধের সময় বাংলাদেশিদের ওপর পাকিস্তানিদের নির্যাতন দেখে তৎকালীন ব্রিটিশ রাজনৈতিক রেগ প্রেনটিস ১৯৭১ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ সফরের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে তার জোরালো বক্তব্য দেন। বাংলাদেশিদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের নিন্দা জানাতে বিভিন্ন সরকার, সংসদ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিসহ সবাইকে এগিয়ে আসার আহবান জানান। বিশে^র সকল সরকার ও জনগণকে বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাঙ্খার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাতে বলেন কারণ তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সংকট নিরসনে বাংলাদেশকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদানের কোন বিকল্প ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে সমর্থন দিয়ে যে সমস্ত দেশ এগিয়ে এসেছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভারত। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দ্রিরা গান্ধীর সক্রিয় ও জোরালো সমর্থনে এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পূর্ণতা লাভ করে। তাছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সরকার প্রধানরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে অকুন্ঠ সমর্থন করে পাকিস্তান সরকারকে নিন্দা জানান। বিশেষ করে গণহত্যা ও নারী নির্যাতনের নির্মম ইতিহাসকে বিশ^ দরবারে প্রচারের ক্ষেত্রে দেশীয় শিল্পী-কুলাকুশলীদের পাশাপাশি বিদেশী শিল্পীদের সরাসরি সম্প্রচার উল্লেখযোগ্য ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সামরিক, বেসামরিক, সাধারণ জনগণ, আবালবৃদ্ধবনিতা, নারী-পুরুষের সম সহযোগিতায় এই যুদ্ধে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীকে পরাজয়ের গ্লানী নিয়ে দেশ ছাড়তে হয়। ডিসেম্বর মাস আমাদের গৌরবের মাস। বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা একটি গৌরবময় মাস। এই মাসেই দেশের মানুষ নয় (৯) মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করে। এ মাসেই বাঙালি জাতি বিজয়ের বেশে বিশ^ দরবারে নিজের নামটি তুলে ধরে। সময়ের পরিক্রমায় আমরা ৪৬ তম বিজয় দিবস উদযাপন করতে প্রস্তুত, কিন্তু আমাদের অনেকেই হয়ত জানে না, একমাত্র বাঙালি জাতিই বিজয় দিবস উদযাপন করে থাকে। পৃথিবীর যে সমস্ত দেশ যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছে তারা স্বাধীনতা দিবস পালন করে থাকে। কিন্তু কোন নির্দিষ্ট বিজয় দিবস পালন করে না। একমাত্র বাংলাদেশের সৌভাগ্যবান বাঙালি জাতিই পৃথিবীর ইতিহাসে বিজয় দিবস পালন করে থাকে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে সম্মিলিত মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনা হয়। যে স্বাধীনতা সূর্য পলাশীর আ¤্রকাননে অস্ত গিয়েছিল সেই স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে ৩০ লক্ষ মানুষ ও ৩ লক্ষ মা-বোনকে চরম মূল্য দিতে হয়। প্রায় ২০০ বছর ইংরেজ শাসন ও ২৪ বছরের পাকিস্তানী শাসন অর্থাৎ মোট ২২৪ বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে এই জাতি বিজয়ের বার্তা বয়ে আনে। এই বিজয় কোন সাধারণ ঘটনা নয়। কোন দানে এই বিজয় অর্জন হয়নি। বাংলার দামাল ছেলেদের অদম্য সাহস ও শক্তিই সেই বিজয়কে ত্বরান্বিত করে। সর্বোপরি বাংলার আপামর জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনই পাকিস্তানী সৈন্যদের পিছনে হটিয়ে দেয়। ১৯৭২ সালে ২২ জানুয়ারী প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাঙ্গালির প্রাণের দিবস এই দিনটিকে জাতীয় দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
২৫ মার্চ নিরস্ত্র বাঙালির উপর অস্ত্রের ভাষা প্রয়োগ করার মাধ্যমেই পাকিস্তানীদের নৈতিক পরাজয় ঘটে। নির্বাচনে পরাজয় ও প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক পরাজয় ঘটে। পরবর্তীতে বিশ^ নেতৃবৃন্দের নিন্দার মাধ্যমে পাকিস্তান সরকারের কূটনৈতিক পরাজয় ঘটে। সর্বোপরি আমাদের সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্ঠা, নৈতিক অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধে মরণপণ লড়াই ও অপরিসীম আত্মত্যাগই আমাদের বিজয় ত্বরান্বিত হয়েছে। পৃথিবীর অনেক জাতি যুদ্ধ করে, অনেক জীবন ও রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। কিন্তু জাতির বিবেক বলে পরিচিত বুদ্ধিজীবিদের এমন নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা ইতিহাসে বিরল। বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামে এসব বুদ্ধিজীবি নিজেদের মেধা, মনন ও লেখনীর মাধ্যমে স্বাধীনতার সংগঠকদের প্রেরণা জুগিয়েছেন। পথ দেখিয়েছেন মুক্তির। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন তাঁর সেই ডাকে সাড়া দিয়ে এদেশের বুদ্ধিজীবিরা প্রতিদিন মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বিপ্ত করেছেন।  স্বর্ণাক্ষরে লেখা বিজয় দিবসে আমরা আমাদের শহীদ বুদ্ধিজীবিদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। মেধা, মনন, জ্ঞানে আমরা যতটুকু সমৃদ্ধ হওয়ার অঙ্গীকার ছিল ততটুকু অর্জন হয়নি বলে পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্ট বেশ ভাল হলেও বিশ^বিদ্যালয় পরীক্ষার এসব শিক্ষার্থীর ফলাফল আমাদের অদক্ষতার পরিচয় দেয়। গোল্ডেন পাওয়া শিক্ষার্থীদের বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল আমাদের বর্তমান বুদ্ধিজীবি ও নীতিনির্ধারণকারীদের গবেষণামূলক নীতি নির্ধারণকে বার বার প্রশ্নবিদ্ধ করছে। স্বাধীন দেশ, স্বাধীন জাতি ও স্বাধীন মনমানসিকতায় আমাদের এই ভূখন্ডকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সকলকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। যে দেশকে ভালোবাসতে পারে না সে নিজেকে ভালবাসতে পারে না। যে নিজেকে ভালোবাসতে পারে না সে অন্যের ভালোবাসায় নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে না। তাই বিজয়ের মাসে এই দেশের প্রতিটি ধুলো বালি যেন পবিত্র ও নির্মল থাকে এই প্রতিজ্ঞায় নিজেকে আবদ্ধ করার শপথ নিতে হবে।
লেখকঃ কলামিস্ট ও শিক্ষক, ইংরেজী বিভাগ, ডাঃ ফজলুল-হাজেরা ডিগ্রী কলেজ, চট্টগ্রাম


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন