আজ বুধবার, ১৮ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৩ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতা, স্বাধীনতা থেকে বিজয়

Published on 15 December 2016 | 2: 17 am

** মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন **

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। বিজয়ের দিন ১৬ই ডিসেম্বর। এ বিজয় কী? এ বিজয় পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে বিজয়। এ বিজয় পাকিস্তানী শাসন শোষনের বিরুদ্ধে বিজয়। এ বিজয় ধর্ম নিরপেক্ষতার বিজয়। এ বিজয় বাঙালী বাংলাদেশীদের বিজয়। এ বিজয় পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বিজয়। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস, দীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা এ বিজয় লাভ করি।

বাংলাদেশের বিজয় দিবসের সাথে বাঙালি জাতির রক্তাত্ব সংগ্রামের ইতিহাস জড়িত। ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল দীর্ঘ নয় মাস পর ১৬ ডিসেম্বর তার পরিসমাপ্তি ঘটে বিজয়ের মাধ্যমে। এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আরো পুরোনো। প্রায় দুশ বছরের ইংরেজ শাসনের পর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান অর্জনের মধ্যে বর্তমান বাংলাদেশ অংশের মানুষের যে স্বপ্নসাধ ছিল তা পাকিস্তানী শাসন, শোষন ও নির্যাতনের ফলে প্রায় নিঃশেষিত হয়ে যায়।

পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের শুরুতেই ১৯৪৮ সালে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠেছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসিদের প্রাণের দাবী মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দেওয়ার জন্য ১৯৫২ সালে ভাষার আন্দোলন ও আত্মত্যাগ স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের সাধারণ নির্বাচনে  নিরংকুশ বিজয়ের মাধ্যমে স্বাধীকার আন্দোলন বৃহত্তর আঙ্গীকে রূপ লাভ করে। তখন বিচ্ছিন্নবাদী আন্দোলনের অপবাদের নামে শুরু হয় দমননীতি। ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন ও ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত আইয়ুব খানের শাসন শোষন ও দমননীতির ফলে ১৯৬৯ সালে শুরু হয় গণঅভ্যূত্থান। আইয়ুব খান ক্ষমতা ত্যাগ করে সেনা শাসক ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা দিলেও আসল সমস্যার সমাধান হয় নি।

অনুষ্ঠিত হল ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন যে নির্বাচনে আওয়ামীলীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেও ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হলো না। তার ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ এদেশের অবিসংবাদিত নেতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে ( বর্তমান সরোওয়ার্দী উদ্যান) ‘‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’’ বলে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরার আহবান জানান। এ দিনে ইয়াহিয়া খান আপোষরফার নামে কালক্ষেপন করে পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশে সৈন্য ও গোলাবারুদ বৃদ্ধি করতে থাকে এবং ২৫শে মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী এদেশের  নিরস্ত্র সাধারণ জনগনের উপর ঝাঁপিয়ে পরে ও গণ্যহত্যা শুরু  করে । যার ফলশ্রুতিতে  এদেশের জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।

পঁচিশে মার্চ রাতের অতর্কিত আক্রমনে বিপর্যস্ত জাতির স্বাধীনতা ঘোষিত হল ছাব্বিশে মার্চে। পূর্ব পাকিস্তানীরা বিদ্রোহের মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণা করে সংগঠিত করল মুক্তি বাহিনী। এতে সামরিক বাহিনী, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, ছাত্র , যুবক, ও বিভিন্ন পেশার মানুষ সবাই সংগঠিত হয়ে, দেশকে শত্রু মুক্ত করতে একত্রিত হল। মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানী হানাদার  বাহিনীর অতর্কিত আক্রমন প্রতিহত করতে লাগল। তারুন্যের শক্তি নিয়ে আবাল বৃদ্ধ বনিতা কৃষক শ্রমিক ছাত্রজনতা সামরিক বেসামরিক ও মা বোনেরা মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য এদেশ জয় করবে, এদেশ শত্রু মুক্ত করবে। স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনবে। মা মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করবে। পাকিস্তানী  হানাদার বাহিনী বাঙালীদের নির্বিচারে হত্যা করতে লাগল, গ্রামের পর গ্রাম জ¦ালিয়ে দিল। এককোটি মানুষ শরনার্থী হিসেবে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নিল। মুক্তি বাহিনী দেশের  ভিতরে ও সীমান্তে শত্রুর  বিরুদ্ধে আক্রমন করতে লাগল। মুক্তি বাহিনী ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আরো সংগঠিত হয়ে গেরিলা যুদ্ধের রীতি অনুসরন করে শত্রুদের বিপর্যস্ত করে। বিশাল পাকিস্তানী পাক বাহিনী আধুনিক অস্ত্রসস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিনেও মু্িক্তবাহিনীকে মোকাবেলায় সক্ষম হচ্ছিল না । দেশের মধ্যে মুষ্টিমেয় রাজাকার আল বদর বাদে আবাল বৃদ্ধ বনিতা যে যার অবস্থান থেকে মুক্তিবাহিনীর সাহায্যে এগিয়ে আসে যাতে এদেশ শত্রু মুক্ত হয় এবং বিজয় লাভ করে। যার ফলে মুক্তি যোদ্ধাদের মনোবল দৃঢ় এতে থাকে।

র্দীঘ নয়মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকে মুক্তি সংগ্রাম চরমরূপ লাভ করে । মুক্তি বাহিনীর আক্রমন ব্যাপকতর হতে থাকে। যুদ্ধের এ পর্যায়ে মুক্তিবাহিনীর সাহায্যে এগিয়ে আসে ভারতীয় মিত্র বাহিনী। ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তি বাহিনী তথা মিত্র বাহিনী একপর্যায়ে হানাদারবাহিনীকে পরাস্ত করে থাকে। ৩ ডিসেম্বর এর পরে যৌথ বাহিনীর আক্রমনে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ৫ টা ১ মিনিটে ঢাকার রেসকোর্স ময়দান বর্তমান সোহরায়ার্দী উদ্যানে মিত্র বাহিনীর কাছে বিনা শর্তে পাকিস্তানী বাহিনী আত্বসমর্পন করতে বাধ্য হয়। জয় হলো বাংলা দেশের সংগ্রামী তথা স্বাধীনতাকামী মানুষের। কৃষকশ্রমিক সমগ্র জনতার। জয় হলো মুক্তিবাহিনীর, আকাশে উড়ল রক্তে রাঙানো লাল সবুজ পতাকা। এভাবে বিশে^র মানচিত্রে জন্ম নিল স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশের। বাংলাদেশের মানুষের র্দীঘ দিনের স্বাধীকার আন্দোলন স্বাধীনতার ঘোষনা ও নয় মাসের রক্তাক্ত সংগ্রামের অবসান ঘটিয়ে ষোলই ডিসেম্বর জাতির ইতিহাসে একটি অনন্য দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এভাবে স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতা স্বাধীনতা থেকে বিজয় অর্জিত হয়েছে। সারা বিশ্বে বাংলাদেশ ও জাতীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ষোলই ডিসেম্বর জাতি পেল বীরের মর্যাদা। জাতিকে দিয়েছে স্বাধীনতার লাল সবুজ পতাকা। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ ভৌগলিক বিজয় আমাদের এক বিড়ল সম্মান।  এ বিজয় অর্থনৈতিক বিজয় না হলেও স্বাধীনতা হিসেবে বিশে^র কাছে এক স্বাধীন জাতি হিসেবে উপস্থাপিত করেছে। স্বাধীনতার স্বাদ কি তা বিজয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। প্রতিবার বিজয় দিবস আসে ষোলই ডিসেম্বরে। এ বিজয়ের জন্য যারা জীবন দিলেছিলেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আবারো বলছি এ বিজয়কে সম্মান করতে হবে, ধরে রাখতে হবে, আমদের জন্য, আমাদের পরবর্তী প্রজম্মের জন্য। বিজয় হোক মেহনতী মানুষের বিজয় হোক এ বাংলার শোষিত মানুষের।

বিজয় দিবসে শহীদের স্বরন, স্মৃতিচারণ, আলোচনা সভা ও অন্যান্য আনন্দ উৎসব পালন হয়। তবে বিজয় দিবস শুধু  আনন্দ উৎসবের দিন নয়। এটি ত্যাগেরও দিন। এই প্রকৃত সত্য উপলবিদ্ধ করতে হবে, শহীদদের আতœত্যাগ স্বরন করতে হবে এবং এ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতিকে উন্নতির শির্ষে নিয়ে যেতে হবে। তবেই এ বিজয়ের সার্থকতা নির্ভর করবে। অর্জিত হয়েছে ভৌগলিক বিজয়। অর্জিত হবে অর্থনৈতিক বিজয়।

লেখকঃ ব্যাংকার, ঢাকা ব্যাংক লিঃ


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন