আজ শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ ইং, ০৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



রিজার্ভ চুরি – জড়িত বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তা

Published on 11 December 2016 | 6: 55 am

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিতে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতাকারী কর্মকর্তাদের শনাক্ত করেছে অপরাধ তদন্ত সংস্থা সিআইডি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদও প্রায় শেষ। এখন গ্রেফতার ও আইনি ব্যবস্থা নেয়ার পালা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনা তদন্তের শেষ পর্যায়ে এসে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে সিআইডির তদন্ত দল। তারা বলছে, রিজার্ভে চুরির আগে চক্রটি অর্থ সরানোর যে পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করা হয় কয়েক ধাপে। এর পেছনে এমন কিছু লোক জড়িত, যারা বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধ্বংস করতে অনেকদিন ধরেই তৎপর ছিল। এই চক্রান্তের অংশ হিসেবেই বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে হাত দেয়া হয়। সিআইডি তদন্তকালে কিছু রাঘব বোয়ালের নামও জানতে পারে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সপক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত দলের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘চুরিতে সহায়তাকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকেই আছে। তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। তারা এমনভাবে কাজ করেছে যাতে সাইবার চক্র টাকাটা সরিয়ে নিতে পারে। এটা সরাসরি ক্রাইম। এর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের জড়িত ‘কালপ্রিট’সহ আন্তর্জাতিক চক্রটির বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে।’ ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে এমন কিছু কর্মকর্তা ছিলেন যারা ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংস করার জন্য দীর্ঘদিন থেকে অপতৎপরতা চালিয়ে আসছেন। তাদের বিরুদ্ধেও তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে।’

সিআইডির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের চক্রটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে অর্থ চুরিতে কিভাবে সহায়তা করেছে এবং কতজন জড়িত তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা দীর্ঘদিনের কৌশল হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে ফেলে। এতে করে তাদের সহযোগী হিসেবে বিদেশী চক্র সহজে অর্থ চুরি করতে পেরেছে।

সূত্র জানায়, তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পর্যায়ের ১২-১৩ জন কর্মকর্তার সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। যাদের মধ্যে কয়েকজনের নামও জানা গেছে। এই তালিকায় আছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের যুগ্ম পরিচালক ও মামলার বাদী জুবায়ের বিন হুদা, একই বিভাগের উপপরিচালক মিজানুর রহমান ভুঁইয়া, উপপরিচালক জিএম আবদুল্লাহ ছালেহীন, সহকারী পরিচালক শেখ রিয়াজ উদ্দিন, রফিক আহামদ মজুমদার, মইনুল ইসলাম ও পেমেন্ট অফিসার রেজাউল করিম। এরা সাইবার অপরাধী চক্রকে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন বলে জানা গেছে। বিদেশী সাইবার চক্রকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের চক্রটি রিজার্ভে হাত দেয়।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ছাড়াও দেশের বাইরের বিশেষ করে ফিলিপাইন ও শ্রীলংকার ২৩ নাগরিক এবং চিনের ২৩ জুয়াড়ির জড়িত থাকার তথ্য মিলেছে। তবে জুয়াড়িদের নাম-ঠিকানা এখনও বের করা সম্ভব হয়নি। তবে রিজাল ব্যাংকের কর্মকর্তাসহ ফিলিপাইনের ১৬ ও শ্রীলংকার ৭ জনের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

চুরির এই প্রক্রিয়ায় ৫ বিদেশী প্রতিষ্ঠানেরও সম্পৃক্ততা মিলেছে। সেগুলো হচ্ছে- ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (আরসিবিসি), ফিলিপাইনের ক্যাসিনো ইস্টার্ন হাওয়াই লেইজার কোম্পানি, মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান ফিলরিমে মানি সার্ভিস লিমিটেড, ব্ল–বেরি অ্যান্ড হোটেল ও শ্রীলঙ্কার বেসরকারি সংস্থা শালিকা ফাউন্ডেশন।

তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি প্রসঙ্গে সিআইডির তদন্ত দলের প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি (অর্গানাইজড ক্রাইম) মো. শাহ আলম বলেন, আমাদের এখন কিছু বলার সময় এসেছে। তদন্তে বেশ ভালো অগ্রগতি হয়েছে। দেশী-বিদেশী পুরো চক্রটিকে প্রায় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কার দায় কতটুকু সেটাও নির্ধারণ করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, কোয়ালিটি ইনভেস্টিগেশনের স্বার্থে আমরা কিছু সময় নিচ্ছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা কে প্রসেস করেছে, কার হিসাবে জমা হয়েছে, ওই হিসাব থেকে অন্য কার হিসেবে গেছে- সব তথ্য আমরা পেয়ে গেছি।

শনিবার রাজধানীর ইস্কাটন রোডের পুলিশ কনভেনশন হলে এক অনুষ্ঠান শেষে জানতে চাইলে শাহ আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘এযাবৎ সিআইডি ২৩ বিদেশীকে শনাক্ত করতে পেরেছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের জড়িত কর্মকর্তাদেরও শনাক্ত করা গেছে। এই চক্রটি সুইফট সার্ভারের সঙ্গে ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে হ্যাকারদের হাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গোপন তথ্য তুলে দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা এটা জেনে-বুঝেই করেছেন। যারা করেছে তারা তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি। তারা না জেনে এমনটি করেছেন সেটা মনে করার কোনো সুযোগ নেই।’

তদন্ত টিমের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়ী কর্মকর্তাদের গ্রেফতারের মতো যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ তাদের হাতে চলে এসেছে। চার্জশিটেও তাদের আসামি করা হবে। এই তালিকায় থাকা প্রায় ৩৫ কর্মকর্তার বিদেশ গমনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে ৩৫ জনের পাসপোর্ট জব্দ করেছি। তাদের বিদেশ গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছি। তবে তদন্ত শেষে যারা নির্দোষ হবেন, তাদের পাসপোর্ট ফেরত দেয়া হবে। যারা অপরাধী তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করবে সিআইডি। তার কাছে জানতে চাওয়া হবে বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভে চুরির বিষয়ে মামলা করতে কেন বিলম্ব করা হয়েছে। সরকারকে না জানিয়ে কেন গোপনে অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করেছে তারা।

এছাড়া চুরির আগে অনেক অপরিচিত দেশী-বিদেশী রহস্যজনক লোক বাংলাদেশ ব্যাংকে কেন ঢুকেছে, যাদের নাম খাতায় এন্ট্রি নেই। জানা গেছে, গভর্নরের মৌখিক অনুমোদনে তারা ব্যাংকে প্রবেশ করেছে। এমনকি গভর্নর ফোন করে এন্ট্রি ছাড়াই অনেককে ভেতরে ঢোকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এসব বিষয়ে ড. আতিউরের কাছ থেকে সন্তোষজনক জবাব না পেলে সিআইডির পক্ষ থেকে পরবর্তী আইনগত করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

তদন্ত নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত : সিআইডির তদন্ত নিয়ে ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, তাদের রিপোর্ট আমি দেখিনি। ফলে এ বিষয়ে আমার কিছু বলা ঠিক হবে না। আপনারাও দেখেন, সিআইডির তদন্ত রিপোর্টে কি আসছে।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, এটা এক ধরনের ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। নানা মাধ্যমে দেখেছি ও শুনছি- ফরাসউদ্দিনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের ৭ জন কর্মকর্তা জড়িত। সিআইডি বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫ কর্মকর্তা জড়িত। দুটো রিপোর্টই প্রকাশ করা উচিত।

সিআইডিসহ বিভিন্ন মাধ্যমের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে হ্যাকিংয়ের পরিকল্পনা করে আসছে দেশী-বিদেশী একটি চক্র। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ঘটনা সত্য হলে এটা অনেক ভয়ানক। এভাবে হ্যাকিংয়ের পরিকল্পনা করা হলে রিজার্ভ কেন, আরও অনেক ক্ষতি হতে পারে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এই হ্যাকিংয়ের সঙ্গে জড়িতরা আন্তর্জাতিক রাঘব বোয়াল। আমার ধারণা ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, চীন ও ভারত মিলে আন্তর্জাতিক গ্রুপ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ হ্যাক করেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অর্থনীতিবিদ শনিবার বলেন, ‘সরকার প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করলে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের নাম চলে আসে। সে কারণে রিপোর্ট প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে। সিআইডি ড. আতিউরের সম্পৃক্ততা পেয়েছে বলে দাবি করেন ওই অর্থনীতিবিদ।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় প্রতিবেদন দুটি প্রকাশ পেলে বোঝা যাবে এর পেছনে দেশী-বিদেশী আরও কোনো বৃহত্তর চক্র জড়িত আছে কিনা।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন