আজ সোমবার, ১৮ জুন ২০১৮ ইং, ০৪ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



প্রবাস জীবন

Published on 10 December 2016 | 11: 02 am

মাসুম মোক্তাদের মাওলা // আমিরাত থেকে ::
প্রবাসে টাকা আছে তবে সুখ যে নেই তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। সবার ধারনা প্রবাস মানেই হল সুখ আর সুখ। বাস্তব সত্য হল আমরা নামে মাত্র শুধু বেঁচে থাকি তবে বেঁচে থাকার স্বাদ আমাদের ভাগ্যে নেই। প্রবাসীরা কিছু স্বদেশী মানুষের কাছে নিতান্তই খেলনার বস্তু হয়ে থাকে। আসা থেকে যাওয়া পর্যন্ত তারা একটা এটিএম বুথ হয়ে থাকে। অথচ একজন প্রবাসী দেশে যাওয়ার জন্য যা করে থাকে তা বলে কারো তিরস্কার পাত্র হতে রাজি নয় আমি।
তারপর অভিজ্ঞতার সঞ্চারের জন্য না বলেও পার পাওয়া যায়না। কিছু কিছু মানুষ তো প্রবাসী স্বজনদের কোন খোজ খবর নেয় তো না বরং আসার সময় হলে এই সেই লাগে, আর আসলে তার বিনিময়ে টাকা দেবার প্রতিশ্রুতি তো থাকেই। বছর পাঁচেক প্রবাস নামক কারাগার ভোগ করার পর যে ব্যক্তিটি দেশে যায় তার স্মৃতি বিজড়িত মুখ গুলোর দেখা কবে পাবে তার প্রতীক্ষার প্রহর গুনে। আর কিছু লোভী স্বজনরা অপেক্ষা করে তার কাঙ্ক্ষিত বস্তুটির। তার সাথে আছে এক ঝাঁক বিড়ম্বনা।
এক নিকৃষ্ট শ্রেণীর মানুষ আছে যারা বিশাল প্রত্যাশা নিয়ে বসে থাকে। একটু কম বেশি হলে সেটি নিয়ে মনোমালিন্যে কৃপণতা করতে এতটুকু কৃপণ নয়। ধুয়ে মুছে কিভাবে খাবে তার জন্য বিশাল ভয়ংকর ছক তো ঘুমানোর আগেই কষে তারপর ঘুমাই। প্রবাসীরা কখনো ছোট মনের মানুষ হয়না। তাদের মন সব সময় বিশালাকার হয়ে থাকে। কারণ তারা বুঝে নাদানদের একটু খুশি করে সে অনেক আনন্দ পায়।
“টাকা পয়সা তারা বাঁচলে অনেক কামাতে পারে” এটা প্রবাসীদের অঘোষিত স্লোগান। জীবনের অনেক কিছু ত্যাগ করেছে তার জন্য আফসোস প্রবাসীদের করার সময় থাকেনা কিন্তু ত্যাগের বিনিময়ে স্বজনের মুখের হাসি আর তাদের অনুভূতিতে যে আনন্দ প্রবাসীরা পায় তা নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সেরা আনন্দ। আর এই আনন্দের জন্য তাদের জীবন-যৌবন, মায়া-মমতা সব কোন শর্ত আর স্বার্থ ছাড়াই ত্যাগ করে বছরের পর বছর পরে থাকে লাখো হাজার মূহুর্ত দুরে।
হিতে বিপরীত আছে, অনেক প্রবাসী আছে যাদের না আছে কর্ম জীবনে সুখ? না আছে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনের সুখ? এমন অনেক সংবাদ পেয়েছি যারা জীবনে তিল পরিমাণ সুখ না পেয়ে হয়তো নিজেই নিজের জীবন কেড়ে নিতে। একজন প্রবাসী তার পারিবারিক সুখ হতে বঞ্চিত হওয়া মানে হল তার জীবন থেকে সে নিজে হারিয়ে যাওয়ার মতোই। কেননা একজন লোক একটানা বছরের পর বছর একই কাজ একই সময় ধরে করে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই, তাদের রিফ্রেশমেন্ট তো অবশ্যই প্রয়োজন। কিভাবে তারা তাদের রিফ্রেশ করে? ফোনালাপ, ভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কিছু মধুর কণ্ঠ কিংবা মধুর কিছু শব্দ সারাদিনের ক্লান্তি কাটিয়ে দিয়ে পরের দিনের কাজের প্রেরণা নিয়ে আসতে পারে। এতটুকু কি আমরা যারা প্রবাসী আছি তারা কি প্রাপ্য না?
একজন প্রবাসী তার পরিবারের জন্য যে কোন কিছুই করতে পারে, কি করতে পারে, যা তার পরিবার কখনোই জানতে চাইবে না, বা জানতে চাইলেও জানবে না। পরিবারের জন্য কোন কষ্টই কষ্ট না।
প্রসঙ্গক্রমে একটা বাস্তব উদাহরণ দি, আমি নিজে একবার কাজের সংকটে পরি, তখন আমি যে শহরে কাজ করি তা থেকে দূরে একটা গ্রাম্য এলাকায় কাজের সন্ধানে বের হয়। পরিচিত একটি আঙ্কেলের শরণাপন্ন হয় কাজের জন্য। তার হাতে কিছু চাষাবাদই কাজ থাকে যা আমি জীবনে কখনোই করিনি। কাজের অভিজ্ঞতা তো দূরের কথা। সেখানে মানুষ ফজরের আজানের আগ থেকে কাজ শুরু করে দেয়, সকাল আট কিংবা সাড়ে আটটায় ত্রিশ মিনিটের একটা বিরতি থাকে। তারপর টানা দুপুর ১২ টা পর্যন্ত যখন তাপমাত্রা ৪৮-৫২ ডিগ্রীর উপরে থাকে। এরপর দুপুর ২:৩০ পর্যন্ত বিরতি এর ভেতরে কেউ কেউ অতিরিক্ত কাজ করে যদি কারো টাকার প্রয়োজন হয় এই দুইঘন্টা ত্রিশ মিনিটের বিরতিতে । কেউ কেউ এই ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের ভেতরে রান্নাবান্না, গোসল, কাপড় কাচা ঘুমানো সব করতে হয়। একটু না ঘুমালে তো দিনের বাকি অংশের কাজ করা অসম্ভব প্রায়। তারপর সন্ধ্যা মাগরিব এর আযান পর্যন্ত টানা কাজ। যার ভেতরে একটু ক্লান্তির বা ঝিড়িয়ে পানি খাওয়ার জন্য একটু বেশি সময় নিলে এর বকা তো আছেই। ওখানেই আমিও কঠিন পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে কাজে যোগদান করি।
আমার প্রসঙ্গ টেনে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। ওখানে সবার বয়সে ছোট আমিই ছিলাম তারপর সবাই আমাকে আপনি বলে সম্বোধন করতো। যেখানে একে অন্যকে গালি ছাড়া কথাই বলেনা। কাজের যথেষ্ট সহযোগিতা করতো। যেখানে কাজের প্রতিযোগিতা হয় কার আগে যার যার নির্দিষ্ট কাজ শেষ করবে।
যাইহোক এক রাতে নিজের কাজ সেরে সন্ধ্যার একটু পরে ঐসব মানুষের সাথে একটু মিশতে চেষ্টা করলাম। সন্ধ্যায় তাদের কাছে যাওয়ার পর, তারা নিজেরা কখনো চা পান করেনা পয়সার অপচয় ভেবে, আমার জন্য চা করলো। চা পান করতে করতে সবার সাথে একে একে দেখা করতে করতে একজন মুরব্বিকে দেখলাম শুধু চিনি দিয়ে ভাত খেতে। আমাকে দেখে একটু বিব্রতবোধ করলো। আমি তা কাটাতে বলে ফেললাম ভালোই তো, এই মাছ মাংস আর কতো? আমিও কাল চিনি দিয়ে ভাত খাবো। আমি এই বলে চলে আসি। হঠাৎ সেই মুরব্বি আমাকে ডেকে বললো তার কাছে যাওয়ার জন্য। তিনি আমাকে ফ্রিজ খুলে সে যে রান্না করেছে তা দেখাল। আর বলল এই তরকারী তিনি আরও দুদিন আগে রান্না করেছে। শুধু দিনে এইগুলো খায়, কাজ করে একটু ভালো করে খেতে না পারলে সেই কাজ করতে পারেনা। আর প্রতি বেলায় ভালো খেতে চাইলে তার একটা কাজ বাকি আছে সেটি করতে পারবেনা।
আগ্রহের সহিত জানতে চাইলাম কি কাজ?
সদ্য তার মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, মেয়ের শশুড় বাড়ির পক্ষে থেকে তাদের দাবি ছিল বিয়েতে ৫ ভরি অলঙ্কার দেয়ার । একটু আধটু যা জমিয়েছে তা দিয়ে মেয়ের জন্য ৩ ভরি অলঙ্কার আর বিয়ের খরচ করতে সব শেষ।
জানতে চাইলাম কত বছরের সম্বল ছিল?
উত্তরে তিনি ২২ বছর বললেন। নিজের পরিবার নিজ হাতে গড়েছেন। নিজের বিয়ে, ঘড়-বাড়ি তারপর সন্তানদের লালন পালন, পড়ালেখার খরচ, মেয়ে বড় হয়েছে তার বিয়ে দেয়া। মাসিক যা ইনকাম তা দিয়ে পরিবার খুবই স্বাচ্ছন্দ্যে চলে। এখন মেয়ে ফোন করে তার বাবাকে বলল শশুড় বাড়ীর লোকে নাকি একটু বাঁকা বাঁকা কথা বলে বাকি অলঙ্কার এর জন্য। দিয়ে দিলে মেয়ের খুশি। তাই সেই বাড়তি কিছু টাকার জন্য নিজের সাথে প্রতারণা করে চলছে।
কথা গুলো শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। শুধুমাত্র মেয়ের খুশির জন্য একজন প্রবাসী বাবার কাছে এই পরিশ্রম আর কষ্ট কিছুই ছিল না। যে নিজেই রুজি করে অথচ নিজের পেটকে দেয়না মেয়ের একটু খুশির জন্য। মেয়ের শশুড় বাড়ীর লোক তো জানেনা মেয়ের বাবা কি করে? শুধু জানে বিদেশ থাকে আর বিদেশ মানে শুধু টাকা টাকা আর টাকা। তাই মেয়ের উপর একটু জোর করে বাকি স্বর্ণগুলো আদায়। কিন্তু এটা চিন্তা করেনি একটা মানুষ তার মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন কত টাকাই না খরচ হয়েছে একটু সময় দিয় সেই মানুষকে আর এই স্বর্ণগুলো দিয়ে কি হবে? কে কোন বাবা না চাই নিজের মেয়েকে সাজিয়ে না রাখতে? আমরা আছি কিছু আছি এমন মানুষ যারা নিজেই অন্যকে খুব কষ্ট দিয়ে দি, কতটা কষ্ট দিয়ে দি তা হয়তো নিজে কখনোই আন্দাজ লাগাতে পারবোনা ।
কারণ আমাদের বিবেকবোধ মরে গেছে। প্রবাস জীবনের সুখ হলেও এমন দুঃখ হলেও এমন।
 


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন