আজ রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ ইং, ১০ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



বাঙালি অফিসারদের প্রতি অবাঙালি অফিসারদের বৈষম্যমূলক আচরণ সম্পর্কে বাবা খুবই সচেতন এবং প্রতিবাদী ছিলেন

Published on 30 November 2016 | 4: 29 pm

পহেলা ডিসেম্বর সন্দ্বীপের কৃতি সন্তান ডা. (মেজর) এ কে এম আসাদুল হক এর ৮৮ তম জন্ম দিন। একাত্তরের শহীদ এই মহান চিকিৎসকের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ ইতি মধ্যে তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত লেখা সমূহ ও নানাবিধ তথ্য উপাত্ত  ‘সোনালী নিউজ’-এ ধারাবাহিক ভা্বে প্রকাশ করা হবে। আজ প্রকাশিত হল  ৫ম পর্ব]

ছবি ও তথ্য দিয়ে সহযোগীতা করেছেন শহীদ ডা. (মেজর) এ কে এম আসাদুল হক  এর পুত্র  মেহবুবু আলী হক ও পুত্রবধূ সোমা হক  – সম্পাদক, সোনালী নিউজ

———————————————————————————————————————————

:: মেহবুব আলী হক ::

দেশপ্রেমিক, সাহসী যোদ্ধা, সুচিকিৎসক, সু-অভিভাবক এবং সর্বোপরি ভালো মানুষ, এসব কোন বিশেষণ আমার বাবার জন্য অতিশয়োক্তি নয়। আমার এই স্মৃতিচারণমূলক লেখার মাধ্যমেই পাঠক আমার বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করে নিতে পারবেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজেই বাবার কাজ কর্মে দেশপ্রেমের নমুনা উল্লেখ করার মত। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের রক্তঝরা দিনে ২৯ ফেব্রুয়ারীতে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সশস্ত্র বাহিনীর নির্বিচারে গুলিবর্ষণে নিহত ভাষাশহীদদের লাশগুলো এক পর্যায়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পড়ে থাকে। আমার বাবা তখন ইন্টার্নি চিকিৎসক। লাশগুলো যদি সশস্ত্র বাহিনীর হস্তগত হয় তাহলে হত্যাকান্ডের তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা হতে পারে। এই আশংকা থেকে বাবা তার সহকর্মীদের লাশগুলো লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করেন। যদিও তার এই চেষ্টা সফল হয় নি। তবুও তিনি শাষকগোষ্ঠির সশস্ত্র বাহিনীর রোষানলে পতিত হন। সশস্ত্র বাহিনী তার ডিএমসি হোস্টেল কক্ষ ঘেরাও করে ফেলে। তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। গভীর রাতে আশ্রয় নেন তার জেঠাত ভাই কমলাপুর নিবাসী মরহুম শামসুল হকের বাসায়। খবর পেয়ে পুলিশ সে বাসাও ঘেরাও করে ফেলে। কিন্তু বাবা কৌশলে টয়লেটের ভেতর দিয়ে পালিয়ে সে যাত্রাও রক্ষা পান। এ ঘটনা আমি শুনেছি আমার জেঠা শামসুল হকের মুুখ থেকে।
সামরিক বাহিনীতে যোগদানের পর থেকেই বাঙালি অফিসারদের প্রতি অবাঙালি অফিসারদের বৈষম্যমূলক আচরণ সম্পর্কে বাবা খুবই সচেতন এবং প্রতিবাদী ছিলেন। বাঙালি অফিসারবৃন্দের নানাবিধ সমস্যায় তিনি সবসময় পাশে থাকার চেষ্টা করতেন। পাশাপাশি দেশব্যাপী পশ্চিম পাকিস্তান বিরোধী গণ আন্দোলন সম্পর্কে বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বদেশ প্রেমের চেতনায় উদ্ভুদ্ধ করতেন। বিষয়টি পশ্চিম পাকিস্তানিদের নিকট অজানা ছিল না। বাবার এই অকৃতিম বাঙালি প্রীতির কারণে তার সামরিক পদোন্নতি অনেকবার আটকে দেয়া হয়েছিল।
১৯৬৮-১৯৬৯ এর দিকে বাবা পাকিস্তানে মুলতান সেনাবাহিনীতে কর্মরত। স্বপরিবারে আমরাও মুলতানে বাবার সাথে। বয়স হিসেবে তখন আমি বালক হলেও মুক্তিযুদ্ধ, বিশেষ করে আমার বাবাকে ঘিরে যাবতীয় স্মৃতি এখনও ছবির মত আমার চোখের সামনে জ¦লজ¦ল করছে। ৭ই মার্চ, ১৯৭১ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর সারাদেশ উত্তাল আন্দোলনে কেঁপেছে। এর পর বদলী হয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে এএফএমএসডি কমান্ডিং অফিসার হিসাবে যোগদান করেছেন। ২৪শে মার্চ, ১৯৭১ চারদিকে রটনা হয়েছে যে, যে কোন মুহুর্তে মার্শাল-ল’ জারি হতে পারে। এমতাবস্থায় বাঙালি সামরিক অফিসারবৃন্দ (মেজর, ক্যাপ্টেন, লাফটেন্যান্ট র‌্যাঙ্কের) একটি গোপন সভায় মিলিত হন। সভাটি অনুষ্ঠিত হয় মেজর জিয়াউর রহমানের (পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি) বাসভবনে। মেজর জিয়াউর রহমান তখন চট্টগ্রামের মূল সেনানিবাসের বাইরে ষোলশহর এলাকায় সেনানিবাসে কর্মরত। চট্টগ্রাম শহরের একটি হাউজিং সোসাইটিতে তার বাসভবন (বর্তমান প্রবর্তক সংঘের নিচে)। ঐ বাসার গোপন সভার বিস্তর আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়। যদি ২৫শে মার্চ মার্শাল ল’ জারী করা হয় বা বাঙালি হত্যার চেষ্টা করা হয় তবে সভায় উপস্থিত সব অফিসার মার্শাল ল’ জারীর বিরোধীতা করবে এবং বাঙালি হত্যার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। এজন্য যদি তাদেরকে কোর্ট মার্শালের সম্মুখীন হতে হয় তবুও তারা সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পিছ পা হবেন না। ঐ দিন বঙ্গবন্ধুর সাথে ইয়াহইয়ার সর্বশেষ বৈঠক ব্যর্থ হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামেও তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পথে পথে ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়। ফলে বাবা তার প্রাইভেট কারটি মেজর জিয়াউর রহমানের বাসায় রেখে সেনানিবাসের বাসায় ফেরত আসেন। পরবর্তীকালে বাবার হত্যার পর গাড়িটি ভষ্মিভূত অবস্থায় পাওয়া যায়।
২৬শে মার্চ, ১৯৭১। রাত ১২টা ১মিনিটে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনারা কোনরকম পূর্ব সংকেত ছাড়াই ঘুমন্ত বাঙালি সৈন্যদের উপর সশস্ত্র আক্রমন করে। তাৎক্ষণিকভাবে অগণিত বাঙালি সৈন্য শাহাদাত বরণ করেন। এই সংকটময় মুহুর্তে কতিপয় বাঙালি সামরিক কর্মকর্তার নেতৃত্বে বাঙালি সৈন্যরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে যুদ্ধ করতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তান আর্মির ট্যাংক বাহিনী সর্ব শক্তিতে বাঙালি সৈন্যেদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। ফলে আত্মসমর্পন ও পশ্চাদ অপসারণ ছাড়া বাঙালি সৈন্যদের আর কোন উপায় থাকে না। এই প্রতিরোধ যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি সৈন্যরা যাতে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সেনানিবাস থেকে বের হয়ে ষোলশহর সেনানিবাসে অবস্থানরত মেজর জিয়ার সাথে একত্রিত হতে পারে। এই সুযোগ সৃষ্টির জন্য লে. ক. এম আর চৌধুরী নিহত হওয়ার প্রাক্কালেই তৎকালীন ক্যাপ্টেন সুবেদ আলী ভূঁইয়াকে মেজর জিয়ার কাছে প্রেরণ করেন এবং চট্টগ্রাম সেনানিবাসে বর্তমান অবস্থা অবহিত করার দায়িত্ব দেন। কিন্তু ক্যাপ্টেন সুবেদ আলী ভূঁইয়া ষোলশহর সেনানিবাসে গিয়ে মেজর জিয়াউর রহমানকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হন এবং জানতে পারেন যে, মেজর জিয়া চট্টগ্রাম বন্দর পথের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন। সুবেদ আলী ভূঁইয়া তখন নিজের জীপ চালিয়ে আগ্রাবাদে গিয়ে মেজর জিয়াকে সংবাদ পৌঁছান ও তাকে ফিরে আসতে অনুরোধ করেন। কিছুক্ষণ আলোচনার পর মেজর জিয়া ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ফিরে এলে তিনি সুবেদ আলী ভূঁইয়া এবং তাদের অনুগত সৈন্যরা যুদ্ধ করে সেনানিবাসটি পাঞ্জাবী সৈন্যদের দখলমুক্ত করেন। এদিকে চট্টগ্রামের সেনানিবাসে ভোর ৬টায় বাঙালি অফিসারদের স্বপরিবারে সিএমএইচ মাঠে সমবেত করা হয়। আমার মা, আমি, আমার বোন ও দুই ভাইসহ ঐ মাঠে দাড়িয়ে আছি আর মৃত্যুর প্রহর গুণছি। পশ্চিম পাকিস্তানি কর্ণেল সিগরি (পাঞ্জাবী) মাঠে উপস্থিত বাঙালি সবাইকে মেশিনগানের গুলিতে হত্যা করার নির্দেশ দেন কিন্তু (পাঠান) ঐ নির্দেশের বিরোধীতা করেন এবং সবাইকে বন্দী করে রাখার প্রস্তাব দেন। দুইজনের মাঝে তীব্র বাদানুবাদ হয়। অবশেষে সিএমএইচের একটি সংক্রামক ব্যাধির ওয়ার্ড সম্পূর্ণ খালি করে আমাদের বন্দী করে রাখা হয়।
২৬শে মার্চ, ১৯৭১ থেকে ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ পর্যন্ত আমাদের সবাইকে এই ওয়ার্ডে সম্পূর্ণ বন্দী অবস্থায় রাখা হয়। ঠিকমত খাবার দেওয়া হতনা সেখানে। জীবন ধারণের সেকি দুঃসহ যন্ত্রনা!
১৭ এপ্রিল রাতে খাওয়ার জন্য আমরা সবাই বাবাসহ মাত্র বসেছি। কিন্তু তা আর তিনি খেতে পারেননি। কারণ তখনই বাবাসহ আরো চারজন অফিসারকে লেঃ কর্ণেল ডাঃ চৌধুরী (সিএমএইচের তৎকালীন প্রধান) মেজর ডাঃ রেজাউর রহমান এবং ইঞ্জিয়ার ক্যাপ্টেন মাহমুদকে লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরিহিত অবস্থায় পাঞ্জাবী সৈন্যরা বন্দুকের নল ঠেকিয়ে উঠিয়ে নিয়ে যায়। তখন আমাদের বলা হয়েছিল ব্রিগেড কমান্ডার তাদের ডেকেছেন। কিন্তু ঐ যে তাদের নিয়ে যাওয়া হল অদ্যাবধি আমার বাবাকে আর কোনদিন ফিরে পাইনি। লোকমুখে জানতে পেরেছি তাদের সবাইকে তখন ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করা হয়। তাদের লাশগুলোর পর্যন্ত কোন হদিস পাওয়া যায়নি। সামরিক বাহিনীর সদস্য হিসেবে বাবা যেমন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন, চিকিৎসক হিসেবেও তিনি অস্ত্র পাচারে দক্ষ ছিলেন। তিনি পাকিস্তানে কোয়েটা থেকে সার্জারীতে এফসিপিএস ডিগ্রী অর্জন করেছিলেন। একজন সফল শল্যচিকিৎসক হিসেবে স্বনামধন্য ছিলেন। সামরিক বাহিনীতে ক্লাসিফাইড সার্জন ছিলেন। গরীব, দুঃস্থ রোগীদের বিনামূল্যে সেবা দান করতেন। পীড়িতের মুখে হাসি দেখতে পেলেই তার নিজের মুখটা হাসিতে ভরে যেত। বাবাকে ঘিরেই ছিল আমাদের পরিবারের আনন্দ-বেদনার কাব্য। তিনি পরিবারের প্রতি অত্যন্ত দায়িত্বশীল ছিলেন। খুবই পত্মীবৎসল ছিলেন। সেজন্যই সম্ভবত বাবার মৃত্যুর পর আমার শ্রদ্ধাভাজন মা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। জীবদ্দশায় আর মানষিক সুস্থতা ফিরে পাননি। দীর্ঘদিন রোগ ভোগের পর তিনি বিগত ১২.০২.২০০২ সালে পরলোক গমন করেন। জীবিত থাকা অবস্থায় তাকে কখনো বিশ^াস করানো যায়নি যে আমার বাবা বেঁেচ নেই, শহীদ হয়েছেন। কারণ আমরা তার মৃতদেহ পায়নি।
আমার বাবা চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামে ১৯২৮ সালের ১লা ডিসেম্বর এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আলহাজ¦ মৌলভী সৈয়দ আহমেদ। তিনি কাটগড় হাই স্কুল সন্দ্বীপ হতে ১৯৪৪ সালে ম্যাট্রিক, চট্টগ্রাম কলেজ হতে ১৯৬৬ সালে আইএসসি এবং ১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্র। তিনি ১৯৫২ সালেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এএমসি কোরে যোগদান করেন। পরবর্তীতে পাকিস্তানের কোয়েটা হতে সার্জারীতে এফসিপিএস ডিগ্রী অর্জন করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সৎ ও মিতব্যয়ী। চিকিৎসা পেশাকে তিনি ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। কর্মস্থলেতো নিষ্ঠাবান ছিলেনই, এর বাহিরেও আর্ত-মানবতার সেবা করতে সদা তৎপর থাকতেন। ছুটিতে গ্রামের বাড়ী গেলে তার অধিকাংশ সময় কাটত গরীব, দুঃখী রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদানে। তার গ্রামের বাড়ীতে অবস্থানকালে দ্বীপাঞ্চলের চিকিৎসা সুবিধা বঞ্চিত রোগীদের কলরবে বাড়ীর উঠান মুখরিত হয়ে উঠত।
১৯৭০ সালের ১১ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পরপর জরুরী ঔষধের বড় বড় চালান নিয়ে বিধ্বস্ত প্রায় সন্দ্বীপে তার নিজ গ্রাম সন্তোষপুরে গিয়ে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ এবং জরুরী চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন। তার এই সব স্মৃতি আমাদের অন্ততে চির ভাস্বর হয়ে থাকবে।

লেখক : শহীদ ডা. (মেজর) এ কে এম আসাদুল হক  এর পুত্র, অবসরপ্রাপ্ত সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন