আজ বুধবার, ২০ জুন ২০১৮ ইং, ০৬ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



‘অ বা-জি আঁরারে ইক্কিনি জাগা দি পারিবানে’ ।। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আকুতি

Published on 29 November 2016 | 4: 42 am

অ বাজি আঁরারে ইক্কিনি জাগা দি পারিবানে? আঁরার থাকিবার জাগা নাই’এমন আকুতি এখন মিয়ানমার থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের। নির্যাতিত ও আতংকিত রোহিঙ্গারা প্রায় প্রতিদিনই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে আর আশ্রয় প্রার্থনা করছে সীমান্ত এলাকায় অবৈধভাবে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের কাছে। গতকাল সোমবারও বেশ কিছু রোহিঙ্গা উখিয়ার কুতুপালংএ প্রবেশ করেছে। খাদ্য, বাসস্থান, বস্ত্র ও চিকিৎসা নিয়ে তারা ভয়াবহ দুর্ভোগে পড়েছে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার পর ৯ দিন পায়ে হেঁটে লুদাইং নাপ্পুরা এলাকার ছৈয়দুল আমিন স্ত্রী ও ৭ সন্তান নিয়ে গতকাল সোমবার দুপুরে কুতুপালং পৌঁছে শরণার্থী শিবিরের পাশ্ববর্তী আনরেজিস্টার্ড ক্যাম্প বা ‘রোহিঙ্গা টালে’ আশ্রয় নিয়েছেন। তাকে সপরিবারে আশ্রয় দিয়েছেন প্রায় ১০ বছর আগে বাংলাদেশে আসা আবু তৈয়ব। এমনিতে তিনি সপরিবারে গাদাগাদি করে থাকেন একটি ছোট্ট ঘরে। তার উপর ছৈয়দুল আমিনের ৯ সদস্যের পরিবারের থাকাখাওয়ার সংস্থান করতে গিয়ে তাদের ওঠেছে নাভিশ্বাস। ছৈয়দুল আমিন আহত অবস্থায় পরিবারপরিজন নিয়ে পালিয়ে এসেছেন এক কাপড়ে। তাদেরই মত গতকাল সোমবার দুপুরে অবিবাহিত দুই ভাইবোন নুরুল ইসলাম (১৮) ও ঝানু আরা (১৫) এসেছে লম্বাঘোনা এলাকা থেকে। তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে আরেক রোহিঙ্গা। আনরেজিস্ট্রার্ড রোহিঙ্গা ফাতেমার এক কক্ষের একটি ছোট্ট ঘরে আশ্রয় পেয়েছে চার পরিবারের ৮ জন রোহিঙ্গা। কেউই ঘুমাতে পারে না। থাকে কারাগারের মতোই গাদাগাদি করে। একদল ঘুমালে অন্য দল বসে থাকে। শীত বস্ত্র নিয়ে খুব কষ্টে সবাই।

নুরুল ইসলাম ও ঝানু আরার পিতা আবদুস সালামকে ধরে নিয়ে গিয়ে অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে গুলি করে হত্যা করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এ সময় নারীদের উপরও পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। তাদের মা এখন কোথায় সেই খবরও তারা জানে না। সবাই প্রাণ বাঁচাতে যে যেভাবে পারে পালিয়ে এসেছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্যরা লম্বাঘোনায় ঢুকে তাদের পিতা ছাড়াও আরো অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছে। কাউকে কাউকে ধরে নিয়ে গেছে। সবাই রয়েছে আতংকে। বাংলাদেশে আসার কাহিনী বিবৃত করে চোখের জল গড়িয়ে পড়ে ভাইবোনের। মিলিটারির আক্রমণের পর প্রাণ বাঁচাতে তারা ভাইবোন পালিয়ে প্রথমে জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে বিল, পাহাড় ও নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে।

মিয়ানমারের নাপ্পুরা এলাকার কামালের ছেলে সাদেক স্ত্রী সুফিয়া ও এক সন্তানকে নিয়ে এক কাপড়ে পালিয়ে এসে গত ১৫ দিন আগে কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে এসে আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয়দাতা গতকাল সোমবার বিকালে তাকে বের করে দিয়ে বলেছে অন্যত্র থাকতে। কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের এদিকসেদিক ঘুরে সাদেক তার পরিবারের জন্য গতরাত ৮টা পর্যন্ত আশ্রয়ের সন্ধান করছিল। কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে নতুন আসা রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে ফিরে আসার পথে এক পর্যায়ে সাদেক এই প্রতিবেদকের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে।

এভাবে আশ্রয়ের সন্ধানে এদিকওদিক ছুটতে দেখা যায় শরণার্থীদের। মিয়ানমারের জামবনিয়া থেকে পালিয়ে আসার পথে গত ১৫ দিন আগে বাংলাদেশ সীমান্তের ধানক্ষেতে এক মেয়ে সন্তান প্রসব করেন ছলিমা। তার ১০ বছরের ছেলে সন্তান কায়ছারকে ধরে নিয়ে গেছে মিলিটারি। এখনও সে নিখোঁজ। এরপর তারা সীমান্ত অতিক্রম করে ১০দিন আগে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। রয়েছে অপর রোহিঙ্গা আত্মীয়ের বাসায়। তাদের সাথে এসেছে নুর আহমদের স্ত্রী হামিদা খাতুন। তার স্বামীকেও মিলিটারিরা হত্যা করেছে। একই এলাকা থেকে আসা নুর জাহানের (৫৫) স্বামী নুর হামিদকে (৬০) গলাকেটে এবং পুত্র বশরকে (২০) গুলি করে হত্যা করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। খেয়ারিপ্যারাং নামক স্থান থেকে আসা হোছন এর পিতা আবদুস শুক্কুরকে এবং ভাবী মনোয়ারাকেও হত্যা করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। ওই এলাকায় ৫শ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার পর গত ২ দিন আগে তারা এসেছে বাংলাদেশে।

একইভাবে ছোট গজিবিল থেকে গত কয়েকদিন আগে পালিয়ে এসেছে ছৈয়দ করিমের কিশোর ছেলে এমরান (১৬)। তার দাদা হাজী ওলা মিয়া ও চাচা নুরুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এরপর প্রাণ বাঁচাতে জঙ্গলে থেকে গাছের লতাপাতা খেয়ে ক্ষিধে নিবারণ করে হেঁটে হেঁটে পালিয়ে এসেছে বাংলাদেশে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে পুড়িয়ে মেরে, গুলি করে ও জবাই করে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে ক্ষান্ত হচ্ছে না, নারীদের উপরও চালাচ্ছে গণধর্ষণসহ পাশবিক নির্যাতন। এই ধরনেরই গণধর্ষণের শিকার একজন অবিবাহিত ও আরেকজন বিবাহিত তরুণী রবিবার এসেছেন কুতুপালংএ। তারা বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন জানিয়ে শিবিরের জাহিদ আলমের স্ত্রী নুর ফাতেমা বলেনধর্ষিতাদের ডাক্তারি পরীক্ষা করা হয়েছে। দুইজনই গর্ভবর্তী হয়ে পড়েছে। তারা প্রায় এক মাস আগে ধর্ষণের শিকার হয় বলে জানান ফাতেমা। মিলিটারির এমন নির্যাতনে ইতোমধ্যে মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েছে গত ১০ দিন আগে বাংলাদেশে আসা হামিদার মেয়ে রোকেয়া। পিতৃহীন রোকেয়ার কাছে মিয়ানমার বাহিনীর নির্যাতনের কথা জানতে চাইলে তিনি শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। এভাবে গত এক মাসে শুধু কুতুপালংএ দশ সহ্রাধিক রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে বলে দাবি স্থানীয় রোহিঙ্গাদের।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটি ও সমন্বয় পরিষদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকরামুল কবির চৌধুরী বাবলু জানানএমনিতে শিবির ও শিবিরের বাইরে রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবন যাপন করছে, তার উপর নতুন রোহিঙ্গা এসে পরিস্থিতি হয়েছে আরো নাজুক। এখন তাদের খাদ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসা দরকার।

তিনি বলেনপাশাপাশি মিয়ানমারকেও চাপে রাখার কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে নতুন শরণার্থী ঠেকাতে হবে। আগের শরণার্থীদেরও ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে। মিয়ানমারকে বাধ্য করার জন্য যা দরকার তাই করতে হবে বাংলাদেশকে। কারণ শরণার্থী আসলে সমস্যা বাংলাদেশের, পশ্চিমাদের অথবা জাতিসংঘের নয়।

উল্লেখ্য, বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফে দুটি শরণার্থী শিবিরে প্রায় ৩৩ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এছাড়া অবৈধভাবে দমদমিয়া এলাকায় বসবাস করছে আরো অর্ধ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। তাছাড়া কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে আরো ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বসবাস করছে বলে অনুমান সংশ্লিষ্টদের।

রোহিঙ্গা বোঝাই ৮ নৌকা ফেরত

টেকনাফ প্রতিনিধি জানান, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে এখনো বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। রবিবার রাত হতে সোমবার (২৮ নভেম্বর) পর্যন্ত রোহিঙ্গা বোঝাই ৮টি নৌকার অনুপ্রবেশ ঠেকিয়ে দিয়েছে বিজিবি। প্রতিটি নৌকাতে ১০ থেকে ১৫ জন নারীপুরুষ ও শিশু ছিল বলে জানিয়েছেন বিজিবি টেকনাফ ২ ব্যাটলিয়ানের উপ অধিনায়ক মেজর আবু রাসেল সিদ্দিকী।

এ ছাড়া টেকনাফ নাইট্যং পাড়া সংলগ্ন নাফনদ হতে ২টি মাছ ধরার নৌকা নিয়ে গেছে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ। রবিবার দুপুরে নাইট্যং পাড়া সংলগ্ন নাফনদীর বাংলাদেশ অংশ থেকে জালসহ নৌকা দুটি নিয়ে যায়। নাইট্যং পাড়ার জাফর আলম ও অলি আহমদ জানান, নাফনদীতে জাল ফেলে নৌকা দুটি অন্যান্য মাছ ধরার নৌকার মত সেখানে ছিলো। এ সময় নৌকাতে কোন জেলে ছিলো না। মিয়ানমারের বিজিবি সদস্যরা নাফনদী থেকে নৌকা দুটি জালসহ নিয়ে যায়। বিষয়টি নাইট্যং পাড়ায় টহলরত বিজিবি সদস্যদের জানানো হয়েছে কিন্তু এখনো কোন প্রতিকার হয়নি বলেও জানান তারা।

আদালতে আবেদন

বিডিনিউজ জানায়, মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢুকতে বাধা না দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে আদালতে একটি আবেদন হয়েছে। তাতে সীমান্ত সাময়িক সময়ের জন্য খোলা রাখারও নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।

৫ লাখের বেশি শরণার্থীর ভার বহনের মধ্যে নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঢুকতে না দিতে সরকারের তৎপরতার মধ্যে হাই কোর্টে রিট আবেদনটি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবু ইয়াহিয়া দুলাল। বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর বেঞ্চে আবেদনটি উপস্থাপন করা হয়েছে জানিয়ে এই আইনজীবী সোমবার বলেন, আগামীকাল (আজ) এর উপর শুনানি হবে।

মিয়ানমারে সীমান্ত চৌকিতে জঙ্গি হামলার পর রাখাইন রাজ্যের সেনা অভিযানের মধ্যে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তে ছুটে এলেও বিজিবি তাদের ফেরত পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশে দশকের পর দশক আশ্রয় নিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়টি তুলে ধরে সরকার শরণার্থী সমস্যার সমাধান করতে মিয়ানমারকে চাপ দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে।

রোহিঙ্গাদের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশে বাধা দেওয়া কেন অমানবিক ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, আইনজীবী দুলালের রিট আবেদনে এই রুল চাওয়া হয়েছে। রুল শুনানি না হওয়া পর্যন্ত নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশে বাধা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

আবেদনে স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক, বিজিবির মহাপরিচালক ও কোস্টগার্ডের মহাপরিচালককে বিবাদী করা হয়েছে। রোহিঙ্গা নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরতে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে আইনজীবী দুলাল আবেদনে বলেছেন, আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা, সংহতির উন্নয়নে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশে জরুরিভিত্তিতে বার্মার নাফ নদীর সীমান্ত খোলা রেখে মুসলিম রিফিউজিদের অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া উচিৎ। এই আবেদনের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে লাখ লাখ বাংলাদেশির আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। ‘তখন প্রতিবেশী ভারত বাংলাদেশিদের ঢুকতে বাধা দেয়নি, বরং ওষুধ, খাবারসহ প্রয়োজনীয় প্রায় সব দিয়েছে। ঠিক এরকম মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য রোহিঙ্গাদের যারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে চায়, তাতে যেন কোনো প্রকার বাধা দেওয়া না হয়।’


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন