আজ শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব : শহীদ মেজর (ডাঃ) এ. কে. এম আসাদুল হক

Published on 28 November 2016 | 7: 06 am

আগামী ১ ডিসেম্বর সন্দ্বীপের কৃতি সন্তান ডা. (মেজর) এ কে এম আসাদুল হক এর ৮৮ তম জন্ম দিন। একাত্তরের শহীদ এই মহান চিকিৎসকের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ ইতি মধ্যে তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত লেখা সমূহ ও নানাবিধ তথ্য উপাত্ত  ‘সোনালী নিউজ’-এ ধারাবাহিক ভা্বে প্রকাশ করা হবে। আজ প্রকাশিত হল ৪র্থ পর্ব]

ছবি ও তথ্য দিয়ে সহযোগীতা করেছেন শহীদ ডা. (মেজর) এ কে এম আসাদুল হক  এর পুত্র  মেহবুবু আলী হক ও পুত্রবধূ সোমা হক  – সম্পাদক, সোনালী নিউজ

——————————————————————————————————————————–
:: মোহাম্মদ হারুনর রশীদ ::

চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপের ঐতিহ্যবাহী পরিবারের গর্বিত সন্তান শহীদ মেজর (ডাঃ) এ.কে.এম আসাদুল হক মুক্তিদুদ্ধে প্রথম দিকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে বর্বর পাক সেনাদের হাতে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণকারীদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন বিশেষজ্ঞ সার্জন (শল্য চিকিৎসক)। ১৯৭১ এ তিনি তৎকালীন Army Medical Corp এর অধীনে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অবস্থিত AFMSD (Armed Forces Medical Store Deport) এর অধিনায়ক পদে কর্মরত ছিলেন।
তিনি ছিলেন বাঙালি জাতিয়তায় প্রচ-ভাবে উদ্বুদ্ধ, সাহসী দেশপ্রেমিক। সেনাবাহিনীর কঠোর নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যেও তিনি বাঙালী জাতীয় স্বাতন্ত্র্যে ছিলেন আপোষহীন। পাঞ্জাবীদের বাঙালি বিদ্বেষ ও শোষণ তাকে পীড়া দিত। তিনি এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পিছপা হতেন না। তাই বার বার তিনি চাকুরীক্ষেত্রে ও প্রোমোশনে হয়রানীর শিকার হন। ১৯৭১ সালের প্রথম দিকের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি সমমনা বাঙালি সামরিক সেবামরিক কর্মকর্তা ও ব্যক্তিবগর্রে সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।
২৫ মার্চ গভীর রাতে পাক সেনারা চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অতর্কিত আক্রমণ শুরু করলে তিনি স্বপরিবারে সেনানিবাসের কোয়ার্টারে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরদিন ২৬শে মার্চ ভোরে ট্যাংকের কামান তাক করে তাঁকে এবং অন্যান্য সামরিক অফিসারদের স্বপরিবারে কোয়ার্টার হতে বন্দী করে তৎকালীন CMH এর পেছনে টিলার উপর অবস্থিত সংক্রামক ব্যধির Isolation Ward এ বন্দী করে রাখা হয়। পাক সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন মাহবুব নামের একজন পাঞ্জাবী অফিসারের তত্ত্বাবধানে শিবির পরিচালিত হত। এখানে বন্দী থাকা অবস্থায় পাকিস্তানীরা জানতে পারে যে তার সাথে স্বাধীনতাকামীদের পূর্ব থেকে যোগাযোগ ছিল। এ তথ্য জানার পর ১৭ এপ্রিল রাত ৮টায় তাকে আহাররত অবস্থা থেকে তুলে নিয়ে যায়। তাঁর সাথে একই সময় বন্দী কর্ণেল এস.আই চৌধুরী (CMH এর প্রধান) মেজর ডাঃ রহমান এবং ক্যাপ্টেন ইঞ্চিনিয়ার মাহমুদকে নিয়ে যায়। তারা আর কেউ ফিরে আসেন নাই। তার মরদেহও তার পরিবারের সদস্যরা দেখেননি। কবর কোথায় তাও জানেন না।
তাঁর শাহাদাত বরণের পর তাঁর স্ত্রী মোমেনা হক নাবালক তিন শিশুপুত্র ও কন্যাকে নিয়ে অত্যন্ত অসহায় হয়ে পড়েন। দুঃখ বেদনায় ধীরে ধীরে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং দীর্ঘদিন রোগ ভোগের পর ২০০২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী পরলোকগমন করেন। জীবিত থাকাবস্থায় তাকে কখনো বিশ^াস করানো যায়নি তার স্বামী বেঁচে নেই, শহীদ হয়েছেন। তার পারিবারিক সূত্রে জানা যায় শহীদ মেজর আসাদ ব্যক্তি জীবনে ছিলেন সৎ ও মিতব্যয়ী। চিকিৎসা পেশাকে তিনি ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। কর্মস্থলেতো নিষ্ঠাবান ছিলেনই, এর বাহিরে আর্ত-মানবতার সেবা করতে সদা তৎপর থাকতেন। ছুটিতে গ্রামের বাড়ী সন্দ্বীপ গেলে তার অধিকাংশ সময় কাটত গরীব, দুঃখী রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদানে। তার গ্রামে অবস্থানকালে দ্বীপাঞ্চলের চিকিৎসা সুবিধা বঞ্চিত রোগীদের কলরবে বাড়ীর উঠান মুখরিত হয়ে উঠত। শল্য চিকিৎসায় তার দক্ষতা জরুরী তাৎক্ষণিক অস্ত্রপচারে কাজে লাগাতেন।
১৯৭০ সালের ১১ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পরপর জরুরী ঔষধের বড় বড় চালান নিয়ে বিধ্বস্ত প্রায় সন্দ্বীপে তার নিজ গ্রাম সন্তোষপুরে গিয়ে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে অংশ নেন এবং অতি প্রয়োজনীয় জরুরী চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন। শহীদ ডাঃ আসাদ ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ১ম ব্যাচের ছাত্র। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইন্টার্নি চিকিৎসক। ২১ শে ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ সালে তিনি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন মর্মে পারিবারিক সূত্রে জানা যায়।
তাঁর স্ত্রী ২০০২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর মেয়ে ফরিদা ইসলাম ২০০৬ সালের  ৭ মে ইন্তেকাল করেন। তার স্বামী ডাঃ রফিকুল ইসলাম, দুই মেয়ে ডাক্তার ও এক ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। শহীদ মেজর ডাঃ আসাদের তিন পুত্রের মধ্যে বড় আহসানুল হক, বিএসসি, আমেরিকা প্রবাসী। দ্বিতীয় পুত্র মেহবুব আলি হক, ছোট ছেলে ইউসুফ আলি হক। তাঁরা চট্টগ্রামে বসবাস করছেন।
সর্বশেষ বর্তমান সরকারের প্রতি বাংলাদেশের এই কৃতি সন্তান শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ মেজর এ. কে. এম আসাদুল হক এর যথাযথ স্বীকৃতি সম্মান এবং তাঁর জন্য দেশের যে কোন স্থানে সিটি কর্পোরেশনের যে কোন একটি রাস্তার নাম অথবা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের নাম তাঁর নামে করে তরুণ প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় করে রাখার জন্য সরকার মহোদয়ের কাছে আকুল আহ্বান জানাচ্ছি।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা সন্তান পরিষদের নির্বাহী সদস্য, চট্টগ্রাম বিভাগ।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন