আজ শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



স্মরণ : মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মেজর (ডা.) এ. কে. এম আসাদুল হক

Published on 27 November 2016 | 7: 27 am

[ আগামী ১ ডিসেম্বর সন্দ্বীপের কৃতি সন্তান ডা. (মেজর) এ কে এম আসাদুল হক এর ৮৮ তম জন্ম দিন। একাত্তরের শহীদ এই মহান চিকিৎসকের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ ইতি মধ্যে তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত লেখা সমূহ সোনালী নিউজে ধারাবাহিক ভা্বে প্রকাশ করা হবে। আজ প্রকাশিত হল ২য় পর্ব]   – সম্পাদক, সোনালী নিউজ

————————————————————————–——————————-

:: মেহবুব আলি হক ::

স্মৃতিচারণ করা কখনও সুখকর, কখনও বেদনার। এ মুহূর্তে বেদনাময় স্মৃতিচারণ করার জন্য যাঁকে নিয়ে লিখতে বসেছি, তিনি হলেন একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন নির্ভীক, সাহসী, মানবদরদী ও দেশপ্রেমিক শহীদ। তিনি আমার পিতাযিনি আজ শুধুই স্মৃতি সুদীর্ঘ ৪৩ বছর যাঁর আদর্শ বুকে ধারণ করে চলেছিআমরণ চলব।

১৯৭০ সাল, আমি তখন বেশ ছোট, কিছু কিছু বিষয় বুঝতে শিখেছি। যে সময় পাকিস্তানের মুলতানে আমার বাবা শহীদ মেজর (ডা.) .কে.এম আসাদুল হক, এএমসি, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৪৮ ফিল্ড এ্যাম্বুলেন্সে সেকেন্ডইনকমান্ড পদে কর্মরত ছিলেন। তখন থেকেই দেখেছি, তিনি ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবোধে প্রচণ্ডভাবে উদ্বুদ্ধ। সেনাবাহিনীর কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যেও তিনি নিজ বাঙালি জাতীয় স্বাতন্ত্রে ছিলেন আপসহীন। পাঞ্জাবীদের বাঙালি বিদ্বেষ ও শোষণ তাঁকে ব্যথিত করত। তিনি এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পিছপা হতেন না। তাই বারংবার তিনি চাকরিক্ষেত্রেও প্রমোশনে হয়রানির শিকার হন। তাঁর প্রমোশন আটকে দেয়া হতো। আমরা বড় হওয়ার পর আম্মার কাছে শুনেছি ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের Aftabad cantt. এ কর্মরত থাকা অবস্থায় আর্মি অফিসারস ক্লাবে জনৈক, সিনিয়র পাঞ্জাবী অফিসার, কোন এক ব্যাপারে বিদ্বেষপূর্ণভাবে “All Benglaees are bastards” বলায়, তিনি কোমর থেকে বেল্ট খুলে ঐ অফিসারকে আঘাত করেছিলেন। এ জন্য তাঁর পদোন্নতি আটকে গিয়েছিল।

সেপ্টেম্বর ১৯৭০এ বাবা চট্টগ্রাম সেনানিবাসে আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল স্টোর ডিপো (A.F.M.S.D) এর কমান্ডিং অফিসার পদে বদলী হন। ঐ সময়টা ছিল বাঙালিদের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য, কারণ ঐ সময় অসহযোগ আন্দোলন চলছিল এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের লড়াইয়ের প্রস্তুতি তীব্রতর হতে শুরু করেছে। তিনি বুঝতে পারছিলেন বাঙালিদের উপর অত্যাচারের কালো ছায়া নেমে আসছে। এ পরিস্থিতিতে তিনিসহ সমমনা অন্যান্য বাঙালি অফিসাররা বাঙালিদের অসহযোগ আন্দোলনের ব্যাপারে গোপনে গোপনে আলাপআলোচনা শুরু করেন। এই জাতীয় অনেক বৈঠকে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ যখন বাংলাদেশের বিস্ফোরন অবস্থা, তখন চট্টগ্রাম সেনানিবাসের শীর্ষ পদে বাঙালি অফিসারদের রাখা নিরাপদ মনে না করায় একজন পাঞ্জাবী অফিসারকে “স্টেশন কমান্ডার’ হিসেবে প্রেরণ করে বাঙালি স্টেশন কমান্ডারকে ঢাকায় ফেরত পাঠানো হয়। তখন আমার বাবাসহ অন্যান্য বাঙালি অফিসাররা পরিষ্কার বুঝতে পারেন যে, ভয়াবহ কিছু একটা দুইএকদিনের মধ্যে ঘটতে যাচ্ছে। তাঁরা বাঙালি অফিসার ও জাওয়ানদের সতর্ক থাকতে এবং অস্ত্র গোলাবারুদ জমা না দিয়ে নিজ দায়িত্বে রাখতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন অবশেষে এলো সেই ভয়াবহ ২৬ মার্চ। মধ্যরাত থেকে প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা কোনরকম পূর্ব সংকেত ছাড়াই ঘুমন্ত বাঙালি সৈন্যদের উপর সশস্ত্র আক্রমণ করে। তাৎক্ষণিকভাবে অগণিত বাঙালি সৈনিক সাহাদাতবরণ করেন। এই সংকটময় মুহূর্তে কতিপয় বাঙালি অফিসার ও সৈনিক প্রতিরোধ গড়ে তুলে। কিন্তু ট্যাংক বাহিনীর আক্রমণে তারা টিকতে না পেরে ভোরের দিকে কিছু আত্মসমর্পণ করেন কিছু পশ্চাৎ অপসারণ করে পাহাড় ডিঙিয়ে চট্টগ্রাম শহরের দিকে চলে যায়। এদিকে বাবাসহ অধিকাংশ বাঙালি অফিসার প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগেই ট্যাংকের কামান তাক করে সবাইকে পরিবারসহ রাইফেলের মুখে গ্রেফতার করে প্রথমে অফিসার কলোনির একেকটি বাসায় কয়েকটি পরিবার একত্রে বন্দী করে রাখা হয়। পরে সি.এম.এইচ. এর পেছনে টিলার উপর অবস্থিত টিনশেড সংক্রামক ব্যাধির Isolation Ward এ ১৫/১৬টি সামরিক অফিসারদের পরিবারসহ গাদাগাদি করে বন্দি করে রাখা হয়। সে সময় আমাদের সারাদিনের জন্য কিছু আটা ও কাঁচা বুটের ডাল খাওয়ার জন্য দেয়া হত।

এরপর একদিন ১৭ এপ্রিল রাত ৮ টায় বাবাসহ আমরা খাবার খেতে মাত্র বসেছি, কিন্তু তা আর বাবা খেতে পারেননি। কারণ তখন বাবাকে লুঙ্গি, গেঞ্জি পরিহিত অবস্থায় পাকিস্তানী সৈন্যরা বন্দুকের নল উঁচিয়ে বাহিরে নিয়ে যায়, তার সাথে আরো তিনজন অফিসার সি.এম.এইচ এর তাৎকালীন প্রধান লে. কর্নেল (ডা.) চৌধুরী, মেজর (ডা.) রেজাউর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার ক্যাপ্টেন মাহমুদকে নিয়ে যায়। আমাদের তখন বলা হয়েছিল ব্রিগেড কমান্ডার তাদের ডেকেছেন, কিন্তু ঐ যে তাদের নিয়ে যাওয়া হল অদ্যবধি আমরা বাবাকে আর কোনদিন পাইনি। লোকমুখে শুনেছি তাদের সবাইকে ব্রাশ ফায়ার করে তখনই হত্যা করা হয়। তাদের লাশগুলোর কোন হদিস পাওয়া যায়নি।

সামরিক বাহিনীর সদস্য হিসেবে বাবা যেমন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন, চিকিৎসক হিসেবেও তিনি অস্ত্রোপচারে দক্ষ ছিলেন। তিনি পাকিস্তানের কোয়েটা থেকে সার্জারিতে এফসিপিএস (FCPS) ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। একজন সফল শল্য চিকিৎসক হিসেবে স্বনামধন্য ছিলেন। সামরিক বাহিনীতে classified surgeon ছিলেন। গরীব দুস্থ রোগীদের বিনামূল্যে সেবাদান করতেন। পীড়িতদের মুখে হাসি দেখতে পেলেই তাঁর নিজের মুখটা হাসিতে ভরে যেত। বাবাকে ঘিরেই ছিল আমাদের আনন্দ বেদনার কাব্য, তিনি পরিবারের প্রতি অত্যন্ত দায়িত্বশীল ছিলেন, খুবই পত্মীবৎসল ছিলেন। সেজন্যই সম্ভবত বাবার মৃত্যুর পর আমার স্নেহময়ী মা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন, জীবদ্দশায় আর মানসিক সুস্থতা ফিরে পাননি। দীর্ঘদিন রোগভোগের পর তিনিও বিগত ১৩০২০২ সালে পরলোক গমন করেন। জীবিত অবস্থায় তাকে কখনো বিশ্বাস করানো যায় নি যে আমার আব্বা বেঁচে নেই, শহীদ হয়েছেন, কারণ আমরা তাঁর মৃতদেহ পাই নি।

আমার বাবা চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামে ১৯২৮ সালের ১ ডিসেম্বর একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম আলহাজ্ব মৌলভী সৈয়দ আহমেদ। তিনি কাঠঘর হাইস্কুল সন্দ্বীপ থেকে ১৯৪৪ সালে মেট্রিক, চট্টগ্রাম কলেজ হতে ১৯৪৬ সালে আইএসসি এবং ১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হতে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্র। তিনি ১৯৫২ সালেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এএমসি কোরে যোগদান করেন। পরবর্তীতে পাকিস্তানের কোয়েটা হতে সার্জারিতে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন সৎ ও মিতব্যয়ী। চিকিৎসা পেশাকে তিনি ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। কর্মস্থলে তো নিষ্ঠাবান ছিলেন এর বাইরেও আর্ত মানবতার সেবা করতে সদা তৎপর থাকতেন, ছুটিতে গ্রামের বাড়ি গেলে তার অধিকাংশ সময় কাটতো গরিব দুঃখী রোগীর সেবা প্রদানে। তার গ্রামের বাড়ি অবস্থানকালে দীপাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত রোগীদের কলরবে বাড়ির উঠান মুখোরিত হয়ে উঠত। ১৯৭০ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর পর জরুরি ওষুধের বড় বড় চালান নিয়ে বিধ্বস্ত প্রায় সন্দ্বীপে তার নিজ গ্রাম সন্তোষপুরে গিয়ে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন। তার এই সব স্মৃতি আমাদের অন্তরে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশের রক্তাক্ত পতাকা আর জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। মাঝে মধ্যে চিন্তা করি আমরা কি হারালাম? কি পেলাম? বছরের পর বছর দেশের কত শত অগণিত শহীদ পরিবার নীরবে মানসিক কষ্ট নিয়ে দিন কাটাচ্ছে? তার খবর কে রাখে? বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শাসকবর্গ, আমলাদের আমন্ত্রণ। কিন্তু এসব অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে কাদের বসার কথা? তারা তো কখনও খোঁজ নেন না কীভাবে সেইসব পরিবারের সদস্যদের দিন কাটছে? কী সমস্যা রয়েছে তাঁদের? দেশের সব শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের বিবেকবান মানুষের কাছে প্রশ্ন রাখি, বাঙালিদের যে বৃহত্তর স্বার্থে আমার বাবার মত আরো লাখ লাখ মানুষ অকাতরে জীবনদান করে শহীদ হয়েছেনসেই সব স্বপ্নগুলো কি বাংলাদেশে আজও বাস্তবায়িত হয়েছে? ব্যক্তিগতভাবে যখন ভাবি, যে সম্পদ আমরা হারিয়েছি তা কি কোনদিন ফিরে পাব? পাব না জানি। তবুও বাবার প্রাণের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনসার্বভৌম স্বদেশ পেয়েছি। এর চেয়ে বড় সম্পদ, বড় গৌরব আর কি হতে পারে? তিনি বেঁচে আছেন আমার মধ্যে, আমার বোন ও ভাইদের মধ্যে, বেঁচে আছেন অগণিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে আর জাতির ইতিহাসের মধ্যে। এখন শহীদদের সন্তান হিসেবে এটাই আমাদের সান্ত্বনা ও একমাত্র পাওয়া স্বাধীন দেশের পবিত্র মাটিতে আমরা যেন আত্মমর্যাদা নিয়ে পৃথিবীর বুকের মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। এর জন্য আর রক্ত না দিতে হয়। এখন আমাদের সরকারের কাছে একটাই আবেদনআমার বাবার স্মৃতি রক্ষার্থে যেন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়।

[লেখক- শহীদ মেজর (ডা.) এ. কে. এম আসাদুল হকের সন্তান, সোনালী ব্যাংকের সাবেক উর্ধতন কর্মকর্তা]

লেখাটি ১৯ ডিসেম্বর ২০১৩ সালে দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত হয়েছে।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন