আজ শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ ইং, ০৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



গত ২৭ বছরে চবিতে ২১ হত্যা কান্ড

Published on 22 November 2016 | 3: 16 am

মহিউদ্দিন টিপু ::

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিট হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) অবস্থান। কিন্তু শিবির এবং ছাত্রলীগের  আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সন্ত্রাস, সংঘর্ষ আর খুনোখুনিতে সুনামের ঐতিহ্য হারাচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয়।

গত ২৭ বছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়েছে ২১টি। এর মধ্যে শুধুমাত্র ২০১৪ সালে হত্যাকান্ড ঘটেছে দুটি। সর্বশেষ গত রবিবার চবির সাবেক ছাত্র কেন্দ্রীয ছাত্রলীগের সহ সম্পাদক দিয়াজ ইরফান এর ঝুলন্ত লাশ নিজ কক্ষ থেকে উধ্বার করে পুলিশ। একে আত্মহত্যা বলা হলেও তা মানতে নারাজ দিয়াজের পরিবার ও সহপাটিরা। 

প্রতিটি হত্যাকান্ডের পর হলে হলে অভিযান, গ্রেফতার, মামলা এবং একাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও গত ২৭ বছরে বিচার হয়নি কোন হত্যাকান্ডের। বিচার পায়নি পড়তে এসে লাশ হয়ে যাওয়া নিহতের স্বজনরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি।

হত্যাকান্ডের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ যোগ হয়েছে সংস্কৃত ও পালি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র তাপস সরকার। সবে মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলো সে। ছাত্রলীগ নেতাদের সহযোগীতায় মাত্র ২০ দিন আগে হলে সিট পেয়েছিলো তাপস সরকার। এটাই তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ালো। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হলে সিট পাওয়ার মাত্র ২০ দিনের মধ্যে দুপুরে গুলিবিদ্ধ লাশ হয়ে গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায় ফিরতে হলো তাপস সরকারকে। নিজেদের রাজত্ব বিস্তারে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের বলি হতে হলো তাকে। এক সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াত শিবিরের আধিপত্যের কারনে একের পর এক হত্যাকান্ড সংগঠিত হলেও বর্তমান সরকারের পুরো সময়ে শিবির চবিতে পুরোপুরি কোনঠাসা। এই অবস্থায় শিবিরের বদলে ছাত্রলীগ নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ২০১৪ সালে চবিতে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপ কমপক্ষে ১০ বার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। এই বিরোধের জের ধরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে নিজ দলের কর্মী হত্যাকান্ডের প্রথম উদাহারন সৃষ্টি করেছে ছাত্রলীগ।

এর আগের সব হত্যাকান্ড ঘটেছে জামায়াত শিবির ও ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গত ২৭ বছরের সংঘর্ষ ও হত্যাকান্ডের পরিসংখ্যান অনুসন্ধান করে জানা যায়, ১৯৯০ সালের ২৩ ডিসেম্বর স্বৈরাচার পতনের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষকদের আনন্দ মিছিল বের হয়। ওই আনন্দ মিছিল চলার সময় জামায়াত শিবিরের সশস্ত্র হামলায় নিহত হন ছাত্র মৈত্রীর নেতা ফারুকুজ্জামান ফারুক। এর আগে ১৯৮৮ সালের এপ্রিল মাসে শিবিরকর্মীদের হামলায় নিহত হন পরিসংখ্যান বিভাগ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আমিনুল ইসলাম।

১৯৯৪ সালের ১৮ মে নগরীর বালুচরা এলাকায় শিবিরের সন্ত্রাসীরা গুলি চালায় চবির শিক্ষক-ছাত্র বহনকারী বাসে। গুলিতে নিহত হন চবি শিক্ষক আহমদ নবীর ছেলে ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) শিক্ষার্থী মুশফিক সালেহীন। একই বছরের ২০ আগস্ট চট্টগ্রাম পুরাতন রেল স্টেশন এলাকায় শিবিরকর্মীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে ২২ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় চমেক হাসপাতালে মারা যান চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী সঞ্জয় তলাপাত্র।

১৯৯৭ সালে চবি ক্যাম্পাসের মোজাম্মেল কটেজ নামের ছাত্রদের আবাসিক বাসস্থানে হামলা চালায় শিবির কর্মীরা। এই হামলায় ছাত্রলীগ কর্মী সন্দেহে আবৃত্তিকার বকুলকে নৃশংসভাবে হত্যা করে শিবিরকর্মীরা।

১৯৯৮ সালের ৬ মে শাহ আমানত হলে জামায়াত শিবিরের হামলায় নিহত হন ভর্তি পরীক্ষার্থী আইয়ূব আলী। একই বছরের ২৪ মে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষ হয়। এ সময় অসতর্কাবস্থায় নিজ গুলিতে প্রাণ হারান ছাত্রলীগ কর্মী এবং পরিসংখ্যান বিভাগের স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষের ছাত্র সাইফুর রহমান।

১৯৯৪ সালের ২৭ অক্টোবর শিবিরের হামলায় নিহত হন চবি ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল হুদা মুছা। ১৯৯৯ সালের ১৫ মে একটি তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে ছাত্র শিবির কর্মী জোবায়েরকে ফরেস্ট্রি ছাত্রাবাসের পিছনে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে ছাত্রলীগ কর্মীরা। একই বছর ১৯ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী হল দখল নিয়ে ছাত্রলীগ ও শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় মাহমুদুল হাসান ও মো. রহিমুদ্দিন নামে ছাত্র শিবিরের দুই কর্মী নিহত হয়।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯ ডিসেম্বর হাটহাজারীর ছড়ারকূল এলাকায় শিবিরের হামলায় চবি ছাত্রলীগের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি আলী মতুর্জা চৌধুরী নিহত হন।

২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগ-ছাত্রশ িবিরের মধ্যে সংঘর্ষে ছাত্রলীগের হাতে নিহত হয় মাসুদ বিন হাবিব ও মুজাহিদ নামে ছাত্রশিবিরের দু’নেতা। ২০১০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগরীর ষোলশহর রেল স্টেশনে দুষ্কৃতকারীদের হাতে নিহত হয় মহিউদ্দিন মাসুম এবং ২৯ মার্চ ফতেয়াবাদ এলাকায় রেল লাইনের পাশে হারুন অর রশিদ নামে এক শিক্ষার্থীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। দু’জনই ছাত্রশিবিরের কর্মী ছিল বলে দাবি করে ছাত্রশিবির। একই বছরের ১৬ এপ্রিল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেল স্টেশন চত্বরে গ্রামবাসীর হামলায় নিহত হয় আসাদুজ্জামান আসাদ নামে এক ছাত্রলীগ কর্মী।

এ ছাড়া ১৯৮৮ সালে আইনুল হক নামে শিবিরের এক কর্মী নিখোঁজ হন। পরে ছাত্রলীগ নেতারা তাকে হত্যা করে লাশ গুম করেছেন অভিযোগ করে থানায় মামলা করে শিবির। তবে শেষ পর্যন্ত গুম হয়ে যাওয়া এই শিবির কর্মীর আর সন্ধান পাওয়া যায়নি। ২০১৪ সালটি শুরু হয়েছিলো হত্যাকাণ্ড দিয়ে। এই বছরের জানুয়ারী ও ডিসেম্বরে দুটি হত্যাকান্ড সংগঠিত হলো চবিতে।

এই বছরের ১২ জানুয়ারি ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির নিয়ন্ত্রিত শাহ আমানত হলে হামলা চালায়। এ সময় ছাত্রলীগের হাতে নিহত হয় শিবিরের শাহ আমানত হলের সাধারণ সম্পাদক এবং মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মামুন হোসেন। ১৪ ডিসেম্বর দুপুরে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলো ছাত্রলীগ কর্মী তাপস সরকার।

রোববার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেইট এলাকার নিজ বাসা থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ- সম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের আগের কমিটির সহ- সভাপতি ছিলেন। দিয়াজ ইরফান চৌধুরী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিন্যান্স বিষয়ে এমবিএ ডিগ্রি লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের রাজনীতিতে তিনি সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন