আজ সোমবার, ১৮ জুন ২০১৮ ইং, ০৪ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



দিয়াজ এখন ছবির মানুষ

Published on 22 November 2016 | 3: 02 am

দিয়াজ এখন ছবির মানুষ। তবে তার মৃত্যুর ঘটনাটি সাজানো কিনা সে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তার সহযোদ্ধা, স্বজন, এমনকি পুলিশের মধ্যেও। কী করে পরিপাটি অবস্থায় বিছানার ওপর দুই পা রেখে সিলিং এ ঝুলে আত্মহত্যা করা যায় তা নিয়ে নানা জল্পনাকল্পনাও শুরু হয়েছে। এটি আসলে আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এ নিয়েও চলছে নানা আলোচনা। এ ঘটনার জেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসম্পাদক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্মসাধারণ সম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর অস্বাভাবিক এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গতকাল সারাদিন শহর ও ক্যাম্পাস জুড়ে ছিল নানা আলোচনা। ছাত্রলীগের এক পক্ষের দাবি চবির কলা ভবন ও শেখ হাসিনা হলের দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্মাণ কাজের ৯৫ কোটি টাকার টেন্ডার নিয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বের নির্মম শিকার দিয়াজ। জানা গেছে, রোববার রাতে নিজ বাসার সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় পুলিশ দিয়াজের লাশ উদ্ধার করে। খাট থেকে সিলিং ফ্যানের উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি, তবে দিয়াজের উচ্চতা ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি। এছাড়া তার পা বালিশে ঠেকানোসহ হাঁটুর অংশ বাঁকানো ছিল। রোববার দিবাগত রাত ১২টা ২৫ মিনিটে সিলিং ফ্যান থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ নামানো হয়। রাতেই লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পুলিশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। মরদেহ নেয়ার সময় উপস্থিত নেতাকর্মীদের তোপের মুখে রাত ১টার দিকে দিয়াজের শরীরের তিন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আফসানা বিলকিস। তবে ময়নাতদন্তের আগে নিশ্চিতভাবে এগুলো আঘাতের চিহ্ন কিনাতা বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, গলার উভয় পাশে আঁচড়ের চিহ্ন আছে। তবে বাম পাশে আঁচড়ের পরিমাণ বেশি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মশিউদ্দৌজা রেজা ।

দিয়াজের মরদেহ উদ্ধারের সময় থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, তার (দিয়াজ) শারীরিক যে অবস্থা দেখা গেছে তাতে আত্মহত্যার কোনও প্রভাব চোখে পড়েনি। তাছাড়া পরনে বাইরের পোশাক পরা ছিল। এতে ধারণা করা হচ্ছে, তাকে বাইরে বা ঘরে খুন করে ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে কেউ। তবে ঘরের দরজা কীভাবে ভেতর থেকে বন্ধ রাখা হলো সে বিষয়েও ধন্দে পড়েছেন তারা। দিয়াজের লাশ উদ্ধারের সময় ঘরের পেছন দিকে একটি মই পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। ওই মই বেয়েই আততায়ী ঘরে প্রবেশ করেছে বলে পুলিশের ধারণা। এদিকে গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় দিয়াজের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তার ময়নাতদন্ত করেন ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক ডা. জহিরুল ইসলাম। দুপুর ১২টায় তিনি ময়নাতদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ডা. জহিরুল ইসলাম জানান, দুইএক দিনের মধ্যে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়া যাবে।

দিয়াজের পরিবারের সদস্যরা এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছেন। দিয়াজের মামা রাশেদ বিন আমিন ও বোনের স্বামী সরওয়ার আলম বলেন, কিছুদিন আগে দিয়াজের বাসায় যারা হামলা চালিয়েছে তারাই পরিকল্পিতভাবে তাকে খুন করে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দিয়েছে। তারা আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিবিরের সঙ্গে প্রগতিশীল সংগঠন বিশেষ করে ছাত্রলীগের অতীতেও সংঘর্ষ হয়েছে কিন্তু ছাত্রলীগ নেতাদের বাসায় হামলা, লুট, ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটেনি।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের পাঠাগার বিষয়ক সম্পাদক আবু বকর তোহা বলেন, ‘আমার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বাসায় একা থাকতেন। টেন্ডার সিন্ডিকেটরাই আমার ভাইকে হত্য করেছে।’

সহসভাপতি মো. মামুন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সামান্য একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েকদিন আগে দিয়াজসহ আমাদের চারজনের বাসায় হামলা হয়েছে। তারপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহকারী প্রক্টরসহ ছাত্রলীগ সভাপতি টিপু ও তার গ্রুপের নেতাকর্মীদের হুমকি পেয়ে আসছি।’ এটি একটি হত্যাকাণ্ড বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। অপর সহসভাপতি নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত টেন্ডার সিন্ডিকেটের হাতেই খুন হয়েছে দিয়াজ। কি অভাব ছিল দিয়াজের যে কারণে তাকে তাকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হবে। এটি পরিকল্পিত হত্যকাণ্ড।’

গতকাল সোমবার দুপুরে ২ নং গেট এলাকার বাসায় ভগ্নীপতি মোহাম্মদ সরোয়ার আলম সাংবাদিকদের অভিযোগ করে বলেন, ‘দিয়াজকে যেখানে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় তা অস্বাভাবিক অবস্থায় ছিল। তার ঝুলন্ত মরদেহ খাটের সাথে লাগোয়া ছিল। তার দুই হাতে ও পায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তার ঘাড়েও আছড়ানোর চিহ্ন রয়েছে। এটি আত্মহত্যা হতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে কোন কক্ষের জানালায় পর্দা থাকে। কিন্তু পাশের রুমের জানালায় একটি কার্পেট ঝুলে থাকতে দেখা যায়। দিয়াজের রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকলেও বারান্দার দরজা খোলা ছিল। কিন্তু পুলিশ আসার পর এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর পাশের রুমের বারান্দার গ্রিলের অবস্থা নড়বড়ে হয়ে গেছে। এতেই বোঝা যায় এটি সম্পূর্ণ পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।’

তিনি আরো অভিযোগ করেন, ‘দিয়াজ আমাকে বেশ কয়েকদিন আগে ২৫ লক্ষ টাকার একটি চেক পেয়েছে বলে ফোনে জানায়। সেই চেকটি টেন্ডার সংক্রান্ত। তবে কে দিয়েছে তা জানায়নি। তার মৃত্যুর পর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও ২৫ লক্ষ টাকার চেকটি পাওয়া যাচ্ছে না।’ দিয়াজ বাসায় একা থাকতেন জানিয়ে তিনি বলেন, গত ২৯ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আলমগীর টিপুর অনুসারীরা ব্যাপক হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এরপর থেকে ওই বাসায় তার মা ও বোন কেউ থাকে না। দিয়াজকে বারবার নিষেধ করা হয়েছিল এই বাসায় থাকতে। কিন্তু সে সব সময় বলত আমি কি করেছি? আমার কোন দোষ নেই, তাই আমার কিছু হবে না। ওই সময় তার বাসায় ভাঙচুর চালানোর ঘটনায় মামলা করতে গিয়ে দিয়াজের মা হেনস্তার শিকারও হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ভাঙচুরের পর প্রশাসন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এরপর এই বাসার সামনে বেশ কয়েকবার মহড়া দিয়েছিল টেন্ডার সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। এই দ্বন্দ্বে তাকে হত্যা করা হতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজের এই ভগ্নিপতি বলেন, আমরা সুষ্ঠু ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাব বলে আশা করছি না। তাই আমরা সুরতহালের প্রতিবেদনটি ঘটনাস্থলে সবার সামনে পড়িয়ে নিয়েছি এবং ভিডিও করে রেখেছি। এটাই আমাদের একমাত্র সম্বল। দাফনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমরা আদালতে মামলা করব। পুলিশের প্রতি আমাদের আস্থা নেই।

এদিকে দিয়াজের মৃত্যুর খবরে শোকে ফেটে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতারা। জনপ্রিয় এ ছাত্রনেতার মৃত্যুকে বিশ্বাস করতে পারছেন না কেউ। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তারা। বিদ্যুৎ আহমেদ নামের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যায়ের সাবেক এক নেতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেন ‘শনিবার রাতে সুবর্ণজয়ন্তীতে দিয়াজের সাথে আমার দেখা। মন খারাপ কেন জানতে চাইলে সে বলে, না ভাই কিছু না। এটাই শেষ দেখা বিশ্বাস করতে পারছি না।’ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সাধারন সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম শোক প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেন, ‘সহকর্মীর মৃত্যুর খবরে দাঁত কেলিয়ে যারা ছবি দেয়, তারা আর যাই হোক ছাত্রলীগ হতে পারে না।’

দিয়াজের মৃত্যুর খবরে শোক প্রকাশ করেছে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদ। সাধারন সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা শোকাহত। দিয়াজের মত একটি ছেলে এমন কাজ করেছে বলে বিশ্বাস হচ্ছে না।’ এটি হত্যাকাণ্ড কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার পরে কোন ধরনের অসংগতি পাওয়া গেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা টেন্ডার দ্বন্দ্বে চবি ছাত্রলীগের মধ্যে দুটি পক্ষের সৃষ্টি হয়। এর একটি পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন বর্তমান সভাপতি আলমগীর টিপু এবং নেপথ্যে থেকে আরেকটি পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসম্পাদক দিয়াজ ইরফান। তারা উভয়ই নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী।

সংক্ষেপে দিয়াজ ইরফান চৌধুরী

দিয়াজ ইরফান চৌধুরী। ২০০৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বাণিজ্য বিভাগ থেকে জিপিএ ৫ এবং ২০০৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৭০ অর্জন করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের অধীনে ব্যাংকিং বিভাগে ভর্তি হন। প্রথম শ্রেনীতে বিবিএ ও এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করে ২০১৩১৪ শিক্ষাবর্ষে (রোল নং০৪) ব্যাংকিং বিভাগে এম.ফিল. কোর্সে ভর্তি হন।

বাবা গত হয়েছেন অনেকদিন হলো। মা চবির প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা। পড়াশোনার পাশাপাশি দিয়াজ ছিলেন একজন ভাল বিতার্কিক। রাজনীতির মাঠেও ছিল তার সমান পদচারণা। সংযুক্ত ছিলেন বিভিন্ন সমাজ উন্নয়ন মূলক সংগঠনের সঙ্গে। মৌলবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকার কারণে ২০১১ সালের ২৫  জুন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক পদে মনোনয়ন পান তিনি। সর্বশেষ চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের ঘোষিত কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক পদে মনোনয়ন দেয়া হয় তাকে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকায় চারতলা একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন দিয়াজ ও তার পরিবারের সদস্যরা। রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঝুলন্ত অবস্থায় দিয়াজের লাশ পাওয়া যায়।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন