আজ বুধবার, ২০ জুন ২০১৮ ইং, ০৬ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



আরভি মীন সন্ধানী উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী ।। আগামী মাসে শুরু হচ্ছে মৎস্য ভাণ্ডারের তথ্য সংগ্রহে জরিপ

Published on 20 November 2016 | 3: 16 am

প্রায় সত্তর কোটি টাকা ব্যয়ে আমদানিকৃত অত্যাধুনিক জরিপ জাহাজ ‘আরভি মীন সন্ধানী’ কেবল বিশাল এবং বিস্তৃত বঙ্গোপসাগরের মৎস্য ভান্ডারেরই তথ্য উপাত্ত নয়, একই সাথে তেল গ্যাস, শামুক ঝিনুক শেওলাসহ সামুদ্রিক সম্পদের তথ্য ও উপাত্তও সংগ্রহ করবে। জাহাজটিতে স্থাপিত অত্যাধুনিক সনার (soner) যন্ত্রটি দিয়ে সাগরের ১৬শ’ মিটার গভীরের সব তথ্য পাওয়া যাবে। জানা যাবে মাছের মজুদ। আগামী মাস থেকেই এই জাহাজ দিয়েই বঙ্গোপসাগরের বিশাল মৎস্য ভান্ডারের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহে জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। আর এর মাধ্যমে ১৬ বছরেরও বেশি সময় পর বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত এলাকার তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। যা ব্লু ইকোনমি বাস্তবায়নে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলেও আশা করা হচ্ছে। গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আরভি মীন সন্ধানীর উদ্বোধন করেন।

এসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এই জাহাজটি আমাদের প্রত্যাশার ব্লু ইকোনমি বাস্তবায়ন এবং বিশাল সমুদ্র এলাকার জীববৈচিত্রের জরিপ কাজ এবং মৎস্য সম্পদের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে। এ উপলক্ষে সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তর পতেঙ্গার বোট ক্লাবে এক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সকালে চট্টগ্রাম বিভাগের জনগণের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উন্নয়ন ও সন্ত্রাসবিরোধী মতবিনিময় করেন। এই সভা চলাকালীন সময়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় থাকা জরিপ জাহাজ আরভি মিন সন্ধানীর কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।

সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের পদস্থ একজন কর্মকর্তা গতকাল দৈনিক আজাদীর সাথে আলাপকালে বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্র সীমা বর্তমানে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। এই বিশাল এলাকার মাছ এবং সম্পদের উপর কেবলমাত্র বাংলাদেশের একচ্ছত্র অধিকার। এর বাইরে মহীসোপানের দুইশ’ নটিক্যাল মাইল এলাকা উন্মুক্ত। এখানেও বাংলাদেশ মাছ শিকার করতে পারে। দেশে মিঠা পানির মাছ রয়েছে ২৫০ প্রজাতির। অথচ বঙ্গোপসাগরে রয়েছে প্রায় ৪৭৫ প্রজাতির মাছ। এরমধ্যে প্রতি বছর গড়ে প্রায় সত্তর লাখ টন মাছ শিকার করা হয়। বর্তমানে দেড় শতাধিক বড় জাহাজের পাশাপাশি হাজার হাজার ছোট ট্রলার ও নৌকা মাছ শিকার করে থাকে। যা দেশের আমিষের বড় অংশের যোগান দিয়ে আসছে।

সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের উক্ত কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ষাটের দশকে জাপানের সহায়তায় বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে জরিপ কাজ পরিচালিত হয়েছিল। এতে সামুদ্রিক মৎসের প্রজাতি, পরিমাণ, মজুদ এবং আহরণের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত পাওয়া গিয়েছিল। দেশ স্বাধীন হলে রাশিয়া সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। ওই প্রতিষ্ঠান উপকূলীয় এলাকায় জরিপ কার্যক্রম চালায়। এতে ৪৭৫টি সামুদ্রিক মাছ, ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি ও ৪টি মৎস্য বিচরণ কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে আরভি ড. ফ্রিটজফ নানস্যান বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় চিংড়ি ও মৎস্য মজুদের পরিমাণ নির্ণয় করেন। পাশাপাশি এসব জায়গা থেকে বার্ষিক আহরণযোগ্য মাছের পরিমাণও ওই জরিপে উল্লেখ করা হয়েছিল। ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (এফএও) সহায়তায় ‘আরভি অনুসন্ধানী’ ও ‘এমভি মাছরাঙ্গা’ দিয়ে জরিপ পরিচালনা করা হয়। তবে এই জরিপের ফলাফলও আগের মতোই পাওয়া যায়। ২০০০ সালে এমভি মাছরাঙ্গা অকেজো হয়ে পড়ায় আর কোন জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। এতে করে বিশাল মৎস্য ভান্ডারের সাম্প্রতিক তথ্য উপাত্ত সবই অজানা রয়ে গেছে।

এই অবস্থায় সমুদ্রের প্রানীজ এবং অপ্রানীজ সম্পদের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য ৬৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে সংগ্রহ করা হয় অত্যাধুনিক সার্ভে জাহাজ ‘আরভি মীন সন্ধানী’। ৩৭ দশমিক ৮ মিটার দৈর্ঘের ৯.২ মিটার প্রস্থের জাহাজটির ড্রাফট হচ্ছে ৪.৬ মিটার। জাহাজটিতে ১৪শ’ হর্স পাওয়ারের একটি ইঞ্জিন রয়েছে। যা দিয়ে জাহাজটি ঘন্টায় ১০ থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল বেগে চলাচল করতে পারবে। জাহাজটিতে রয়েছে অত্যাধুনিক সনার। যা দিয়ে এটি সাগরের ১৬ শ’ মিটার বা প্রায় ৫ হাজার ২৫০ ফুট গভীরের বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত রেকর্ড করে সরবরাহ করবে। এর মধ্যে শুধু মাছের মজুদ বা অবস্থানই নয়, একই সাথে এখান থেকে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্তে গ্যাস এবং তেলসহ বিভিন্ন সম্পদের ব্যাপারেও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। জাহাজটি কেবল সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরেরই নয়, একই সাথে পেট্রোবাংলাও গভীর সমুদ্রে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতে পারবে বলে উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন ‘আরভি মীন সন্ধানী’ দিয়ে আগামী ২৫ বছর সাগরে জরিপ এবং প্রয়োজনীয় গবেষণার কাজ করা সম্ভব হবে।

এদিকে গতকাল বোট ক্লাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা ১৯৭৪ সালে সমুদ্র আইন করে গিয়েছিলেন। মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করে সমুদ্রসীমা নির্দিষ্ট করে একটি চুক্তিও করে গিয়েছিলেন। আর ভারতের সঙ্গে সীমানা নির্দিষ্টকরণের বিষয়ে আলোচনা শুরু করলেও ৭৫’র ১৫ আগস্টের কালরাত্রিতে তিনি সপরিবারে নিহত হলে আলোচনা সেখানেই থেমে যায়। ষড়যন্ত্রের মধ্যে দিয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছিল তারা বাংলাদেশের এসব সমস্যা সমাধানের কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করে নাই। তিনি বলেন, এমনকি বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রসীমায় আমাদের যে অধিকার রয়েছে সেগুলো নিয়েও কখনও পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে আলোচনা বা আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরেনি বিগত সরকারগুলো। দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আমরা এটি নিয়ে আবার কাজ শুরু করি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জাতিসংঘ ১৯৮২ সালে আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা আইন করে এবং আমরা ক্ষমতায় এসেই সেই আইনকে অনুসমর্থন করি। একই সঙ্গে জাতিসংঘে আমাদের সমুদ্রসীমা নির্দিষ্ট করার বিষয়টি তুলে ধরি। অনেক কাজ এগিয়ে নিয়ে গেলেও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আসতে না পারায় বিএনপিজামায়াত জোট আবারও সেই কাজকে ফেলে রাখে।

তিনি বলেন, ২০০৮ সালে আমরা আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে উদ্যোগ গ্রহণ করি। এরপর গোপনীয়তার সঙ্গে আমরা তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক আদালতে যাই এবং সমুদ্র আদালতের রায়ে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হই।

অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছায়েদুল হক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আনিসুর রহমান ভিডিও কনফারেন্সে বক্তৃতা করেন। সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আহসানুল কবির এবং বাংলাদেশ বেতারের উপস্থাপিকা মেহবুবা ই ফাতেমার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও বিএডিসির চেয়ারম্যান দিলদার আহমেদ, সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ আরিফ আজাদ, যুগ্ম সচিব তৌফিকুল আরিফ, পরিচালক নাসিরউদ্দিন হুমায়ন, শেখ মোস্তাফিজুর রহমান, ক্যাপ্টেন মাসুক হাসান, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বিশেষজ্ঞ ড. পল পেনি ছাড়াও বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং কোস্টগার্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন