আজ রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ ইং, ১০ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



নাসিরনগর হামলায় পুলিশ প্রতিবেদন – নেপথ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ১৮ নেতা

Published on 15 November 2016 | 3: 35 am

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ হামলার নেপথ্যে সরকারি দল ও বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের কমপক্ষে ১৮ নেতা জড়িত।

মূলত তাদের ইন্ধনেই একের পর এক পরিকল্পিত এসব হামলার ঘটনা ঘটে। প্রভাবশালী একটি মহলের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের ওই নেতাদের সুসম্পর্ক থাকায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। পুলিশ ও প্রশাসনের দূরদর্শিতার অভাব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের কারণে নাসিরনগরের ঘটনা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এক্ষেত্রে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের গাফিলতি ছিল।

নাসিরনগরে হামলার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।

সোমবার দুপুরে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. শাখাওয়াত হোসেন পুলিশ সদর দফতরে ১৩২ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে আর না ঘটে সেজন্য ২২ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসনকে দলীয় লেজুড়বৃত্তি ছেড়ে স্বাধীনভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলার কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি ও তদন্ত কমিটির প্রধান মো. শাখাওয়াত হোসেন সোমবার বলেন, বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় পুলিশের পক্ষ থেকে সতর্কতার সঙ্গে তদন্তকাজ পরিচালনা করা হয়েছে। তদন্তকালীন সময়ে কমিটির পক্ষ থেকে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতা থেকে শুরু করে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে।

একই সঙ্গে নাসিরনগরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তাদের বক্তব্যসহ ১৩২ পাতার ওই তদন্ত প্রতিবেদন সোমবার পুলিশ সদর দফতরে জমা দেয়া হয়েছে বলে তিনি যুগান্তরকে নিশ্চিত করেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে প্রতিবেদনের সঙ্গে ২২ দফা সুপারিশ করা হয়েছে বলেও জানান ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সংখ্যালুদের বাড়িঘরে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা তদন্তে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় বিরোধ কিংবা কোন্দলের বিষয়টি এসেছে কিনা এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যান অতিরিক্ত ডিআইজি ও তদন্ত কমিটির প্রধান মো. শাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘এটি তাদের তদন্তের বিষয় ছিল না। তারপরও তদন্ত করতে গিয়ে কি কারণে এবং কাদের ইন্ধনে এমন ঘটনা ঘটেছে তার কিছু তথ্য এসেছে, যা গণমধ্যমে প্রকাশ করা ঠিক হবে না।’

তবে পুলিশ সদর দফতরের একটি সূত্র বলছে, তদন্ত প্রতিবেদনে ন্যক্কারজনক ওই ঘটনার নেপথ্যে ক্ষমতাসীন দল ও বিএনপির স্থানীয় অন্তত ১৮ নেতার নাম এসেছে। এর মধ্যে নাসিরনগর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হাশেম, চাপরতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি হাজী সুরুজ আলী, হরিপুর ইনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ফারুক মিয়া, উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান সরকার, হরিণবেড় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ফারুক আহমেদ ও তার ভাই কাপ্পান, হরিপুর বাজারের আল আমিন সাইবার ক্যাফের মালিক স্থানীয় বেনু মিয়ার ছেলে জাহাঙ্গীর অন্যতম। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নাসিরনগর উপজেলার সহসভাপতি জামাল উদ্দিন, ইউনিয়ন যুবদলের সহসভাপতি বিল্লাল হোসেনের নামও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তারা হামলা ও ভাংচুরে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন বলে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। এক্ষেত্রে তারা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক এবং ক্ষমতাসীন দলের জেলা সভাপতি ও সংসদ সদস্য উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর বিরোধের বিষয়টিকে কাজে লাগিয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৯ অক্টোবর জাহাঙ্গীর আলমের মালিকানাধীন সাইবার ক্যাফে থেকে রসরাজের ফেসবুক পোস্টটি প্রিন্ট করা হয়। পরে ওই পোস্টটি ফটোস্ট্যাট করে এলাকায় প্রচার করেন জাহাঙ্গীর ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ফারুক আহমেদের ভাই কাপ্তান। একই সঙ্গে রসরাজকে ধরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ অফিসে ফারুক আহমেদের কাছে নিয়ে আসা হয়। পরে ফারুক আহমেদ রসরাজকে পুলিশের হাতে তুলে দেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এ ঘটনার প্রতিবাদে হরিণবেড় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ফারুক আহমেদ ও তার ভাই কাপ্তান এলাকায় মাইকিং করে প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেন। আর এখান থেকেই সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়িয়ে দেয়া হয়। পরে অবশ্য জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নাসিরনগর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হাশেম, চাপরতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি হাজী সুরুজ আলী, হরিপুর ইনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ফারুক মিয়াকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃত এসব আওয়ামী লীগ নেতা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হকের ঘনিষ্ঠ বলে এলাকায় পরিচিত।

প্রতিবেদনে গত কয়েক বছরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বেশ কয়েকটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় জড়িতরা বিচারের মুখোমুখি না হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক বছরে এসব ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন থানায় ১১টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। প্রতিবেদনে ওইসব মামলার আসামিদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক এবং ক্ষমতাসীন দলের জেলা সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর বিরোধের বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে কিনা তা নিশ্চিত করে বলেননি তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা।

সোমবার পুলিশ সদর দফতরে দেয়া প্রতিবেদনে আরও যেসব সুপারিশ করা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- যে কোনো সভা-সমাবেশের অনুমতি দেয়ার আগে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্কতা অবলম্বন করা, সভা-সমাবেশের ক্ষেত্রে আইনশৃংখলা বাহিনীকে আরও সতর্ক থাকা, এলাকার বিভিন্ন ধর্ম ও গোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গে পুলিশ এবং প্রশাসনের সেতুবন্ধন ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বৃদ্ধি, মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে টিভি এবং পত্র-পত্রিকায় প্রয়োজনীয় অনুষ্ঠানাদিসহ জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার করা।

রসরাজ দাস নামে এক যুবকের ফেসবুক থেকে আপত্তিকর ছবির সূত্র ধরে ৩০ অক্টোবর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা এবং ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। আগুন দেয়া হয় কয়েকটি বাড়িতে। পরে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় স্থানীয় কাজল দত্ত ও নির্মল চৌধুরী বাদী হয়ে পৃথক দুটি মামলা করেন। এসব মামলায় অন্তত ১২শ’ জনকে আসামি করা হয়। ইতিমধ্যে এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে পুলিশ ৭৮ জনকে গ্রেফতার করেছে।

এদিকে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উঠায় রসরাজ দাস দুঃখ প্রকাশ করেন এবং তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য কেউ আপত্তিকর ওই ছবি আপলোড করেছে বলেও দাবি করেছেন। ইতিমধ্যেই পুলিশ ওই মোবাইল ফোন সেটটি জব্ধ করেছে। আপত্তিকর ওই ছবি রসরাজের মোবাইল ফোন থেকে আপলোড করা হয়েছে কিনা এবং তিনি অন্য কারও ছবি লাইক কিংবা শেয়ার করেছেন কিনা তা খতিয়ে দেখতে মোবাইল ফোনটির ফরেনসিক পরীক্ষা করা হচ্ছে।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন