আজ শুক্রবার, ২২ জুন ২০১৮ ইং, ০৮ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



মিশন পরিচালিত হয় ‘সেফ হোম’ থেকে – মুক্তমনাদের হত্যায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিম

Published on 14 November 2016 | 4: 08 am

দেশে একের পর এক মুক্তমনা লেখক, প্রকাশক ও ব্লগার হত্যার আগে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) বাসা ভাড়া নিয়ে ‘অপারেশনাল হাউস’ বা ‘সেফ হোম’ তৈরি করে।

ওই বাসাতেই ‘স্লিপার সেলের’ সদস্যদের দীর্ঘ সময় প্রশিক্ষণ দিয়ে হত্যার মিশন বাস্তবায়ন করা হয়। গোপন আস্তানা ‘সেফ হোম’কে এবিটি মার্কাজও বলে থাকে। ‘টার্গেট ব্যক্তি’কে হত্যার আগে তাদের গতিবিধির ওপর নজরদারি করত এবিটির ‘ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের’ সদস্যরা।

‘সেফ হোমে’ তাদেরও নিয়মিত যাতায়াত ছিল। মুক্তমনাদের হত্যার ‘মাস্টারমাইন্ড’ এবিটির সামরিক শাখার প্রধান মেজর (বরখাস্ত) সৈয়দ জিয়াউল হককেও ‘টার্গেট ব্যক্তি’র গতিবিধির রিপোর্টও দিত তারা।

‘স্লিপার সেলের’ সমন্বয়কারী দু’জন হাদী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকেও ‘টার্গেট ব্যক্তি’র গতিবিধির যাবতীয় সরবরাহ করত এ উইংয়ের সদস্যরা। এমনকি কাকে হত্যা করা যাবে, এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত তারা।

তাদের সরবরাহ করা রিপোর্টের ভিত্তিতেই বিভিন্ন ব্যক্তিকে হত্যার সিদ্ধান্ত দিত এবিটির ‘মুফতি বোর্ড’। পরে এ সিদ্ধান্ত সামরিক শাখার হাদীদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করত মেজর জিয়া।

বিভিন্ন সময় মুক্তমনা লেখক, প্রকাশক, ব্লগার এবং সমকামী অধিকার কর্মীদের হত্যার ঘটনাগুলোর তদন্তে এমন তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। শুক্রবার গ্রেফতার হওয়া এবিটির ‘ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের’ সদস্য খায়রুল ইসলামও মুক্তমনাদের হত্যার বিষয়ে গুরত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।

তাকে পাঁচদিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রোববার ছিল রিমান্ডের প্রথম দিন।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি) মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, মুক্তমনাদের হত্যার আগে এবিটি রাজধানীর কোনো এলাকায় বাসা করে গোপন আস্তানা গড়ে তোলে। ওই আস্তানাগুলোতেই ‘স্লিপার সেলের’ সদস্যদের প্রশিক্ষণ শেষে হত্যার মিশন বাস্তবায়ন করা হতো। এসব বাসাকে তারা ‘মার্কাজ’ বলে থাকে।

খায়রুলকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে যুক্ত একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা, ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয় হত্যা, সমকামী অধিকার কর্মী জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু মাহবুব তনয় হত্যার বিষয়ে অনেক তথ্য দিচ্ছে।

এবিটির দাওয়াতি শাখার মাধ্যমে ২০১৩ সালে সে এবিটিতে যোগ দেয়। এবিটিতে যোগ দেয়ার আগে সে চট্টগ্রামে তার ভাই ও বোনের সঙ্গে থাকত। সে চট্টগ্রামের এমএ সালাম হাইস্কুল, ফৌজদারহাট কলেজিয়েট স্কুল ও পাহাড়তলীর কলেজে পড়ালেখা করেছে।

চট্টগ্রামেই মেজর জিয়ার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে। জিয়ার নির্দেশেই সে ঢাকায় আসে। আইটি বিষয়ে পারদর্শী হওয়ায় তাকে ‘ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ উইংয়ের পাঁচ সদস্যের বিষয়ে সে তথ্য দিয়েছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

এ উইং হত্যার জন্য সম্ভাব্য ব্যক্তিদের লিস্ট তৈরি করে অনলাইন ও অন্যান্য মাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। তারপর তা ‘মুফতি বোর্ড’ বা ‘শরিয়াহ বোর্ডের’ সামনে উপস্থাপন করা হয়। ওই বোর্ডে তিন থেকে চারজন সদস্য রয়েছে।

তারা বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে ‘মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের’ রায় দেয়। তারপর এ নির্দেশ সামরিক কমান্ডার জিয়া হয়ে চলে আসে দু’জন হাদীর কাছে। তারা দু’জন ‘স্লিপার সেল’ সদস্যের মাধ্যমে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে।

ব্লগার, লেখক-প্রকাশক হত্যার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র বলছে, এবিটির ‘ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের’ সদস্য খায়রুলসহ টিএসসি থেকে খিলগাঁওয়ে নিলয়ের বাসা পর্যন্ত ব্লগার নিলয়কে অনুসরণ করত। বিষয়টি নিলয় বুঝতে পেরে বাসা পরিবর্তন করে। কয়েকদিন তারা নিলয়কে খুঁজে পাচ্ছিল না।

পরে আবার টিএসসি থেকে অনুসরণ করে নিলয়ের নতুন বাসা খুঁজে পায় তারা। পরে ওই বাসায় অপারেশন চালিয়ে ‘স্লিপার সেলের’ সদস্যরা হত্যার মিশন বাস্তবায়ন করে। অপারেশনে অংশ নেয়া পাঁচ সদস্যের ‘সেফ হোম’ ছিল কমলাপুরে।

অপরদিকে প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা ও আহমেদুর রশীদ টুটুলসহ তিনজনকে হত্যাচেষ্টার আগে মহাখালী ও টঙ্গীর বর্ণমালা রোডে সেফ হোম গড়ে তোলা হয়েছিল। সেফ হোমেই আলাদা আলাদা মিশনের জন্য পাঁচ সদস্যের আলাদা ‘স্লিপার সেল’ তৈরি করে সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এবিটির দাওয়াতি শাখার মাধ্যমে এসব সদস্য সংগ্রহ করা হয়।

ডিবি সূত্র জানায়, তদন্তে ‘মুফতি বোর্ডের’ সদস্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একজনের নাম মাওলানা ওসমান গনি। সে রাজধানীর একটি মাদ্রাসার শিক্ষক ছিল। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

বিভিন্ন হত্যার মিশন বাস্তবায়নকারী দু’জন হাদীর মধ্যে মুকুল রানা ওরফে শরিফুল ইসলাম ডিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে। সেলিম ওরফে ইকবাল ওরফে মামুন নামে অপর হাদীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। এ দু’জন হাদীর মাধ্যমেই মুক্তমনাদের হত্যার মিশন বাস্তবায়ন করেছে জিয়া।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন