আজ শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ ইং, ০৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ওবাইদুল হক এবং সন্দ্বীপের প্রাতস্মরণীয়রা

Published on 10 November 2016 | 12: 25 pm

:: কানাই চক্রবর্তী ::
এ কথা ঠিক আমরা যখন সন্দ্বীপকে অন্যের কাছে উপস্থাপন করি তখন এই দ্বীপে জন্মগ্রহণ করা অনেক খ্যতিমান ব্যক্তির নাম উল্লেখ করি। এদের মধ্যে দিলাল রাজা, কমরেড মুজাফফর আহমেদ, রাজ কুমার চক্রবর্তী, বিপ্লবী লাল মোহন সেন, মধ্যযুগের কবি মীন নাথ, আবদুল হাকিম, আমাদের কালের কবি বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাসেম সন্দ্বীপি, শাহ বাঙ্গালী, এমনকি মুস্তাফিজুর রহমানের কথাও বলি।
অধুনাকালে সন্দ্বীপে জন্মগ্রহণকারী অনেক সচিব, শিল্পপতি, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ অনেকের নামও উচ্চারিত হয়। আমরা গদগদভাবে তাদেরকে এমন ভাবে তুলে ধরি যাতে অন্যদের মধ্যে এই ধারণাটি স্পষ্ট হয় ‘সন্দ্বীপ একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হলেও এবং মূল ধারা থেকে পিছিয়ে থাকলেও দ্বীপ হিসেবে (স্থান) সন্দ্বীপ একেবারে ফেলনা নয়। অনেক জ্ঞানী গুণির জন্মস্থান সন্দ্বীপ। আরো সোজাভাবে বলা যায় তারা যেন আমাদেরকে চরের মানুষ মনে না করেন।
বলতে দ্বিধা নেই আমিও এরকম প্রতিক্রিয়া মাঝেমধ্যে ব্যক্ত করি। পশ্চিমবঙ্গে একবার দেশের বাড়ি সন্দ্বীপ বলার পর যখন কেউ চিনতে পারছিলনা তখন আমি বলি ‘তোমাদের কাকাবাবু কমরেড মুজাফফর আহমেদের জন্মস্থান ছিল সন্দ্বীপ।’ এ কথায় এলোপ্যাথিক ডোজের মত কাজ হয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যে আমার খাতির যত্ন বেড়ে গিয়েছিল। শুধু তাই নয় সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সচিবালয়ে সন্দ্বীপে জন্ম নেয়া সাতজন সচিব ছিলেন এবং এখনও তিন বা চারজন আছেন। সুযোগ পেলেই কিন্তু অন্যদের কাছে এ তথ্যটি তুলে ধরি। এ ধরনের আচরণ বা মনোবৃত্তি কিন্তু অস্বাভাবিক নয়। আপাত দৃষ্টিতে সন্দ্বীপ বা জন্মস্থানের প্রতি সম্মান জানানো হয়। এছাড়াও অপরাপর স্থানের লোকজনও এ ধরনের কথা বলে থাকে । তবে আমার কাছে কেন জানি মনে হয় আমরা (সবাই নয়) স্বার্থপরের মত এসব নামগুলো ব্যবহার করি। অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতি অন্যদের শুধু সমীহ এবং সম্মান আদায় করার জন্য। এই যে আমি কমরেড সাহেবের নামটা বললাম এটা কি তাকে শ্রদ্ধা জানানো, নাকি অন্যদের মধ্যে আমার অবস্থানটা ঠিক ঠাক রাখা? হয়তো দুটোই। কথা আছে না অন্যকে সম্মান জানানোর মধ্য দিয়ে নিজেকে সম্মান জানানো হয় ।
তবে স্বার্থপরের মত নাম ব্যবহার নিয়ে আমার যুক্তিটা হলো আসলে আমরা যার নামটা উচ্চারণ করলাম মনের দিক থেকে তাকে আমরা কতটুকু শ্রদ্ধা করি কিংবা তার সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি। উত্তরাধিকার সূত্রেও আমরা অনেকের নাম জানি কিন্তু তাদের কি কর্মকান্ড ছিল, কেন তারা এতবছর পরেও স্মরণীয় তার মর্মমূলে কী আমরা স্পর্শ করি। তাদের জন্মদিনে কিংবা মৃত্যুর দিনে কোন আলোচনা করি ? তারা যে কারণে প্রাতস্মরণীয় সেই কারণগুলোর প্রতি কি আমাদের বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধা আছে? যদি থাকে সেটিই বা আমরা কিভাবে ব্যক্ত করি।
এই বিষয়টিকে অবশ্য অন্যভাবে দেখা যেতে পারে। বিশ্বাস কিংবা শ্রদ্ধা আছে কিনা তা না খুঁজেও উদার
দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদের স্ব-স্ব কাজের প্রতি সম্মান জানানো যেতে পারে। তারমানে কমরেডদের আদর্শ আমি বিশ্বাস করি আর না করি আমি তাকে সম্মান জানাবো, বেলাল মোহাম্মদের কবিতা আমার ভালো লাগুক বা না লাগুক কিংবা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপনে তার অবদান আমি মানি বা না মানি কিংবা লালমোহন সেনের মত অসাম্প্রদায়িকতা বিশ্বাস না করে সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী হয়েও তাঁকে সম্মান জানাবো ইত্যাদি। তবে আমার বিশ্বাস যারা উপরে উল্লেখিত নামগুলো উচ্চারণ করেন তারা কমবেশী তাদেরকে শ্রদ্ধাও করেন। এদের কোন না কোন দিক নিশ্চয় আমাদেরকে আকৃষ্ট করে ।
এখন কথা হচ্ছে শ্রদ্ধাই হোক কিংবা আমাদের নিজেদের স্বার্থে এই নামগুলো উচ্চারিত হলেও সন্দ্বীপের আরো অনেক গুণি কিন্তু থেকে যাচ্ছেন বিস্মৃতির আড়ালে। তাদের কথা আমরা কেউ বলিনা। কোন অনুষ্ঠানেও না। অথচ শুধু সন্দ্বীপ নয় পুরো দেশের জন্যই রয়েছে তাদের অবদান । যদিও উপরে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে দুএকজন ছাড়া বাকীরা কেউ সন্দ্বীপের কোন উন্নয়ন কর্মকান্ডের জন্য প্রাতস্মরণীয় নয়। তাদের খ্যাতির উৎসে সন্দ্বীপবাসীরও কোন অবদান নেই। সময় এবং ইতিহাস তাদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। তারা নিজেদের যোগ্যতা এবং সততা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন বলে আমরা তাদের সম্মান করি। যেমন কমরেড মুজাফফর আহমেদ। তাঁর রাজনীতি দর্শন সাম্যবাদ কিংবা কমিউনিজম সন্দ্বীপবাসী কখনো ব্যাপক ভাবেতো দূরের কথা সামান্য সংখ্যক লোকেও গ্রহণ করেনি, তারপরেও সন্দ্বীপবাসী তাকে নিয়ে গর্বিত। কারণে অকারণে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় ।
বলছিলাম হারিয়ে যাওয়া অনেকগুলো নামের কথা। যারা এখন আর কেউ প্রাতস্মরণীয় নয় । তাদের নিয়ে কোন আলোচনা-সমালোচনা হয়না। জন্ম-মৃত্যুর দিন পালনতো অনেক দূর। এর মধ্যে অনেকে আছেন। এই লেখায় শুধু একজনের কথা বলবো। তিনি আমাদের ওবাইদুল হক। হক সাহেব নামে যিনি সর্বাধিক পরিচিত ।
এই হক সাহেব ’৭০-এর নির্বাচনে এমএনএ এবং সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে (৭৩) অনুষ্ঠিত প্রথম সংসদ নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বকারী দল আওয়ামী লীগের টিকেটে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। পচাত্তর পরবর্তী সময়ে তিনি আর একবার একই দলের টিকেটে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই নির্বাচনে সন্দ্বীপের মানুষ তাঁকে বিমূখ করে দেন। যতদুর মনে পড়ে তিনি অনেক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। তাঁর এই পরাজয়টা আমাকে এখনো বিমূঢ় করে। আমি একেবারেই উপলব্ধিতে আনতে পারিনা কেন সন্দ্বীপের মানুষ এমন একজন কর্মঠ এবং সৎ নেতাকে এভাবে ফিরিয়ে দিল। অনেকেই মনে করেন তার পরাজয়ের মধ্য দিয়েই সন্দ্বীপে বিরাজনীতিকরণ শুরু হয় ।
ওবাইদুল হক সাহেব হচ্ছেন, সন্দ্বীপের একমাত্র সংসদ সদস্য যার সাথে বাংলাদেশ সৃষ্টির সম্পর্ক আছে। তিনি ছিলেন আমাদের গৌরবের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে তিনি সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ছিলেন তিনি। জনশ্রুত আছে বঙ্গবন্ধু তাকে ‘ক্রসাঁধ’ নামেই সম্বোধন করতেন। দেখা হলেই বলতেন ‘এইতো আমার ক্রসবাঁধ এমপি এসে গেছে।’ এ ব্যাপারে বাবলু ভাই আলী হায়দার চৌধুরী (মুক্তিযোদ্ধা এবং বায়রা নেতা) অবশ্য আর একটি তথ্য দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু আদর করে উনাকে পাগল বলেও সম্বোধন করতেন। বাবলু ভাই তখন ছাত্র নেতা। বঙ্গবন্ধু উপস্থিত আছেন এমন একটি অনুষ্ঠানে তিনি ও হক সাহেব উপস্থিত ছিলেন। তখন বঙ্গবন্ধু ওযাইদুল হক সাহেবকে বলেন, ‘তোর মত আরো দুই চারটা পাগল পেলে সোনার বাংলা গড়তে পারতাম। ’
উল্লেখ্য, সত্তর দশক থেকেই সন্দ্বীপবাসীর প্রাণের দাবি ছিল ক্রসবাঁধ।নোয়াখালীর সাথে সন্দ্বীপের আড়াআড়িভাবে এই ক্রসবাঁধ নির্মিত হলে ভাঙ্গন থেকে রক্ষা পেতো সন্দ্বীপ। একমাত্র ওবাইদুল হক সাহেবেই এই প্রাণের দাবিকে প্রাদপ্রদীপে আনতে পেরেছিলেন। একথা বললে অতুক্তি হবেনা এই দাবিটির স্বপ্নদ্রষ্টাও ছিলেন ওবায়দুল হক।
বলা যায়, এটা ছিল তার ব্রেইন চাইল্ড। ষাট থেকে সত্তর দশক পর্যন্ত এবং আরো পরে নব্বই পর্যন্ত এই দাবি পূরনে নিজের শ্রম মেধা যোগ করেছিলেন তিনি। যদিও ক্রসবাঁধ নিয়ে যে স্বপ্ন তিনি সন্দ্বীপবাসীকে দেখিয়েছিলেন আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এই দাবিটিকে তিনি যে পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন পরবর্তীতে আর কোন যোগ্য নেতার অভাবে এগিয়ে নেয়াও সম্ভব হয়নি।
ওবাইদুল হকের হৃদয়ে শুধু সন্দ্বীপই ছিলনা। পুরো বাংলাদেশকেই তিনি তার জন্মস্থান বলেই বিশ্বাস করতেন। তা করতেন বলেই চুয়াত্তরের খাদ্য সংকটের সময় সন্দ্বীপের জন্য বরাদ্দ খাদ্য অপেক্ষাকৃত দুর্ভিক্ষ অঞ্চলে পাঠানোর জন্য বঙ্গবন্ধুর কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। আর এজন্যই সন্দ্বীপের একটি অংশ তাঁর কপালে এঁকে দিয়েছিলেন একটি বিশেষ বিশেষণে। যা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাকে বহন করতে হয়েছিল। অথচ ব্যাপারটার মধ্যে কত বড় মহত্ত্ব যে উদ্ভাসিত হয়েছিল তা কি আমরা কখনো বিচার করেছি ?
তার এই প্রস্তাব ছিল একজন দেশপ্রেমিকের প্রস্তাব। এরকম প্রস্তাব করার মত হৃদয় কতজন রাজনীতিবিদদের মধ্যে আছে? এই প্রস্তাব দিয়ে তিনি শুধু সম্মানিত হননি পুরো সন্দ্বীপকেই সম্মানিত করেছিলেন বলে আমি মনে করি।
প্রকৃত প্রস্তাব আমরা এই সৎ এবং দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদকে মনে রাখিনি। তা মনে রেখেছে সন্দ্বীপবাসী না তার
দল। তার জন্ম-মৃত্যুর দিনে কোন অনুষ্ঠান হয় না (পারিবারিকভাবে নিশ্চয় হয়) , তার দলের কোন কার্যালয়ে কোন
ছবি থাকেনা। নতুন প্রজন্মকে তাঁর সম্পর্কে ধারণা দেয়ার মত কেউ এগিয়ে আসে না। আর এসব করা হয়না বলেই
সন্দ্বীপের রাজনীতি নিয়ে এখন এত হাহাকার। তাকে বিমুখ করার অভিষাপ হিসেবে আজ এই রাজনৈতিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে কিনা তা ভেবে দেখার মতো বিষয়।কেননা প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে একটা কথা কিন্তু আছে ।
সবশেষ : অনেক দিন আগে শুনেছিলাম প্রয়াত এই সাংসদের স্মৃতি রক্ষায় তার পরিবার সন্দ্বীপে একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন। পরে এ সংক্রান্ত যে স্যুভেনির পেলাম তাতে দেখা যাচ্ছে সন্দ্বীপের সন্তোষপুর ইউনিয়নে আহসান জামীল টেকনিক্যাল সেন্টার নামে এই কারিগরি শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানটি এবছরের (২০১৬ ) বিজয়ের মাসে আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন করা হচ্ছে । এটি একটি মহৎ উদ্যোগ এবং সন্দ্বীপের জন্য নজির বিহীন কোন সন্দেহ নেই । কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি ওযাইদুল হকের নামে নয় , তাঁর প্রয়াত পুত্রের নামে। এতে অবশ্য ক্ষতি নেই । আহসান জামীলের নাম আসলেই ওযায়দুল হকের নাম আসবে । অনেকটা কান টানলে মাথা আসার মতই। তবে আরো ভাল লাগতো যদি প্রতিষ্ঠানটির নাম হতো–ওযায়দুল হক -আহসান জামীল টেকনিক্যাল সেন্টার ।
লেখক : কানাই চক্রবর্তী, উপ প্রধান প্রতিবেদক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস )


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন