আজ বুধবার, ২০ জুন ২০১৮ ইং, ০৬ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



চাইর ডাকাইতে বন্দর হাই ফেলার : মহিউদ্দিন

Published on 10 November 2016 | 2: 59 am

চট্টগ্রাম বন্দর ৫ জন ডাকাতের হাতে জিম্মি’ হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। এসময় তিনি বলেন, ৫ জন ব্যক্তি বসে বসে বন্দরকে লুটপাট করে খাবে তা হবে না। এটা আমরা হতে দিব না। বন্দর তো তাদের বাপের সম্পদ নয়। বন্দর নিয়ে কোন ষড়যন্ত্র মেনে নেয়া হবে না। এ সময় তিনি লুটেরাদের লাঠি দিয়ে প্রতিহত করারও আহবান জানান।

গতকাল বুধবার সকালে বন্দরের ৫ নম্বর জেটি গেটে অনুষ্ঠিত শ্রমিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন সাবেক এই মেয়র। তিনি ২৮ মিনিটের দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। ডক শ্রমিক, মার্চেন্ট শ্রমিক, স্টিভিডরিং স্টাফ ও ল্যাসিংআনল্যাসিং শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথে ডক বন্দর শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়ন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সার্কুলার অনুযায়ী কর্মরত অপারেটরদের বন্দরের শ্রম শাখায় অন্তর্ভুক্ত করাসহ বিভিন্ন দাবিতে এ সমাবেশ আয়োজন করে ‘ডক বন্দর শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন’। উল্লেখ্য, শুরুতে ‘৫ জন লুটেরার হাতে বন্দর জিম্মি’ বললেও মহিউদ্দিন চৌধুরী ৪ জনের নাম সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ করেন তার বক্তব্যে। এরা হচ্ছেননগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন, বন্দরপতেঙ্গার সাংসদ এম এ লতিফ, পটিয়ার সাংসদ সামশুল হক চৌধুরী এবং বার্থ অপারেটর সাইফ পাওয়ার টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন।

এ সময় আঞ্চলিক ভাষায় মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘চাইর জনে হাই ফালার বন্দর হিয়ান। আঁরার নাছিরা উগ্‌ঘা আছে। লতিফ আছে। বিচ্ছু সমশু আছে। আর তরফদার। (চার জনে বন্দরটা খেয়ে ফেলছে। আমাদের নাছির একটা আছে। লতিফ আছে। সামশুল আছে। আর তরফদার)। বিচ্ছু সমশু, তার কাজ কি? সে সংসদীয় কমিটির নেতা (নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সাবেক সদস্য) লুটপাট করে খেয়ে ফেলছে। এভাবেই চলছে।

মহিউদ্দিন চৌধুরী শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, আন্দোলন করলেই দাবি আদায় হবে, অনেককে শ্রমিক নেতা বানিয়েছি। তারা আজ আসেনি। আপনারা এসেছেন। তারা খাবে আপনারা খাবেন না, সেটা হতে পারে না। আন্দোলন করতে হবে। ‘লতিফ ডাকাইত। বিচ্ছু (সামশুল হক) ডাকাইত। সাইফ ডাকাইত, নাছিরও ডাকাইতর ভাই, বড় ভাই। নাছির মেয়র হয়েছেন, বন্দর খাওয়ার জন্য নয়। বন্দর কারো বাবার সম্পত্তি নয়।

এসময় তিনি বলেন, কিছু নেতা বাণিজ্য করে খায়, আর কেউ খায় না। যারা পায় না তারা অসহায়। সভা ডেকে তাদের উদ্ধৃত করে কিছু দাবি দাওয়া করলাম এতে লাভ হয় না। একটা সীমা আছে।

মহিউদ্দিন চৌধুরী শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, এখানে সমবেত হয়েছেন পেটের তাগিদে। কেউ ভিক্ষুক নন। আপনারা কাজ করেন পয়সা পাবেনএটাই মূল কথা। কিন্তু কাজ করেন, পয়সা পান না। হাজির হন, কাজ নেই। এ অবস্থায় চলছে। তিনি বলেন, যারা কাজ করবেন না, বেতন পাবেন, বোনাস পাবেন, অতিরিক্ত পাবেন। আর যারা সারা জীবন মাথায় লোড (ভার) নিয়ে কাজ করবেন তাদের কিছু দেয়া হবে না। এটাই চলছে।

এ সময় আঞ্চলিক ভাষায় মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আর আঁরা নেতা অল আছি দি বাজি, খালি আইয়েরে, মিটিং দেয়ারে কিছু এক্কান গইজ্জ্যুম। কনঅ একখান পারমিট পাইর না চাইয়ুম। এনে চলের এরি। (আর আমরা নেতারা আছি, শুধু এসে, সভা করে বলাকিছু একটা করব। বলে, একটা পারমিট পাই কি না দেখব। এভাবেই চলছে।

শ্রমিকদের মজুরি না পাওয়ার বিষয়টি ‘নিয়ন্ত্রিত’ দাবি করে মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ওরা কি করে, নিজস্ব কিছু লোক ঢুকায়। ওরা হাজিরা দেয়, কাজ করে না, পয়সা পায়। আপনারা কাজ করলেন, পয়সা পেলেন না। শূন্য হাতে চলে গেলেন।

তিনি আরো বলেন, ধান্ধাবাজরাই এ বন্দরে ধান্ধা করে চলেছে। যে হারে আপনারা যারা কাজ করছেন, সে হারে বেতন পান না। দেশের আয়টা রাজস্ব খাতে যাবে। লুটপাট করে তারা খেয়ে ফেলছে। রাজস্ব খাতেও যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ফলে সরকারের একটা দৃষ্টিভঙ্গি হলো, চট্টগ্রাম বন্দরে লোক কাজ করে না। আমরা কাজ করছি। কিন্তু কাজের যে ডাটা, কত হাজার টন মাল উঠানামা করে কত কন্টেইনার যায়। তার একটা রেকর্ড তো আছেই। কিন্তু বছরের পর কত টাকা আয় হয় তা জানা নাই।

তারাই লুটপাট করে খাবে। তারা বার্থ অপারেটর করেছে। ওখানেই জাহাজ ভিড়বে, অন্য কোথাও জাহাজ ভিড়তে পারবে না। এটা কোন্‌ রকম আইন? আর আমি এসে বললে বলবে, মহিউদ্দিন চৌধুরী শ্রমিকদের উত্তেজিত করছে।

তিনি আরো বলেন, উত্তেজিত আমি করি না। আমি বলব নাবন্দর বন্ধ রাখুন। বন্দর বন্ধ রাখলে খাব কি? হ্যাঁ, অত্যাচার করলে, আমি জোর করে কেড়ে নেব।

ঐক্যবদ্ধ না হওয়ায় শ্রমিকরা ন্যায্যা পাওনা থেকে বঞ্চিত দাবি করে মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় দেয়ার পরও পাহারাদাররা পয়সা পায় না। পাহারাদারদের যেন আগামী এক মাসের মধ্যে কাজ দেয়া হয়।

সমাবেশে শ্রমিক নেতরা বন্দরে শ্রমিক বান্দব পরিবেশ সৃষ্টি, পর্যাপ্ত বিশ্রামাগার, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, শৌচাগার নির্মাণসহ বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি জানান। সমাবেশ থেকে অভিযোগ করা হয়, স্বার্থন্বেষী একটি মহল শ্রমিকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন এবং বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত করছে বলেও অভিযোগ করেন বক্তারা।

বক্তারা আরো বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে শ্রমিক বান্ধব পরিবেশ নেই। এমনকি নিরাপত্তাও নেই। এক কথায় চট্টগ্রাম বন্দর অরক্ষিত। এখানে শ্রমিকদের জন্য বিশ্রামাগার নেই, পর্যাপ্ত পানি নেই, শৌচাগারও নেই। এই অবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দরে এক শ্রেণির লুটেরাদের অনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন চলছে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে এবং রাজস্ব আদায় বিঘ্নিত হচ্ছে।

সমাবেশে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিকরা ন্যায্য পাওনার কথা বললে কর্তৃপক্ষ উদাসীন থাকেন। শ্রমিকদের মাথা গোজার ঠাঁই নেই। অথচ বন্দরের শত শত একর ভূমি বেদখল হয়ে গেছে।

শ্রমিক নেতা আবদুল আহাদের সভাপতিত্বে ও হাজী মো: হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত শ্রমিক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হাজী জহুর আহমদ, শ্রমিক নেতা ইসকান্দর মিয়া, মীর নওশাদ, হাজী মো: নাছির, মনোয়ার আলী, মো: সোহেল, মো: নাছির প্রমুখ। এতে উপস্থিত ছিলেন থানা আওয়ামী লীগের মো: হারুন অর রশিদ, আবু তাহের, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের হাসান মুরাদ, আবদুল মান্নান, শফিউল আলম, মো: ইলিয়াছ, শ্রমিক নেতা আবুল হাসেন আবু, মো: জসিম উদ্দিন, মো: মনির হোসেন, মো: আইয়ুব দোভাষ, এয়ার আহমদ, বকুল, মো: জানে আলম, মো: জাহেদ, হুমায়ন কবির, আশরাফুল হক, আবদুল আজিম, ছাত্রলীগের ইমরান আহমেদ ইমু, হুমায়ন কবির রানা প্রমুখ।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের নভেম্বরে ‘বন্দর রক্ষা পরিষদ’ এর ব্যনারে ‘চট্টগ্রাম বন্দর বাঁচাও, সাইফ পাওয়ার টেক হঠাও’ আন্দোলনের সময় বন্দরের ‘ঘুষের টাকা মন্ত্রী ও সংসদীয় কমিটি পায়’ বলে অভিযোগ করেছিলেন মহিউদ্দিন। তখন মহিউদ্দিন ‘ব্যক্তিস্বার্থে’ বন্দর রক্ষার আন্দোলন করছেন বলেও অভিযোগ করেছিলেন সাংসদ সামশুল হক চৌধুরী।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন