আজ বৃহঃপতিবার, ২১ জুন ২০১৮ ইং, ০৭ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



একটি ভালো সূরতের ক্ষতিকর আয়োজন৷

Published on 10 November 2016 | 2: 53 am

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের পূত-পবিত্র চরিত্র অবলম্বনে মুভি বা নাটক তৈরীর শরয়ী দৃষ্টিকোণ৷

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৃষ্টিকুলের সর্বশ্রেষ্ঠ মহা-মানব৷ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ.

“(হে রাসূল!) আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী৷”

(সূরা আল-ক্বলম- ৪)

রাসূলুল্লাহ সা,এর তুলনা কেবল তিনিই৷ দুনিয়ার সমস্ত মানুষ মিলেও রাসূলুল্লাহ সা,এর দূরতম তুলনা, দৃষ্টান্ত কিংবা সাদৃশ্য অবলম্বন সম্ভব নয়৷ অনুরূপ সাহাবায়ে কেরামেরও কোনো তুলনা নেই৷ কেননা সাহাবায়ে কেরাম আমাদের ঈমানের মাপকাঠি, আদর্শের নিক্তি, সত্যের মডেল৷ আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন-

وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُواْ كَمَا آمَنَ النَّاسُ قَالُواْ أَنُؤْمِنُ كَمَا آمَنَ السُّفَهَاء أَلا إِنَّهُمْ هُمُ السُّفَهَاء وَلَـكِن لاَّ يَعْلَمُونَ

“আর যখন তাদেরকে বলা হয়, লোকেরা (রসূলুল্লাহ্ সল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবাগণ) যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও তাদের মত ঈমান আনো। তখন তারা বলে, আমরা কী বোকা লোকদের মত ঈমান আনব? সাবধান! প্রকৃতপক্ষে তারাই বোকা, কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না”

–(সূরা বাকারাহ: আয়াত ১৩)

রাসূলুল্লাহ সা, ইরশাদ করেন-

خَيْرُ أُمَّتِي قَرْنِي ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ)رواه البخاري 

“আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম তারা যারা আমার যুগে রয়েছে। অতঃপর তাদরে পরবর্তী যুগের উম্মাত (তথা তাবেয়ীগনের যুগ) অতঃপর তাদের পরবর্তী যুগের উম্মাত।” (অর্থাৎ, তাবয়ে তাবেয়ীনের যুগ)

(বুখারী- ৩৬৫০, মুসলিম- ২৫৩৫)

তাবেয়ীদের থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত আলিম-উলামা, ওলী-আউলিয়ার সমষ্টি মিলেও একজন সাধারণ সাহাবীর মর্যাদার অধিকারী হওয়াও সম্ভব নয়৷ যে চোখ দিয়ে রাসূলকে দেখেছেন, সেই চোখ অবশ্যই আর কারো সমকক্ষ হতে পারে না৷ তাছাড়া পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহ তাআলা সাহাবায়ে কেরামের প্রশংসা করেছেন৷ তাঁদের উপর সন্তুষ্টির স্বীকৃতি দিয়েছেন৷ আল্লাহ আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

وَالسَّابِقُونَ الأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللّهُ عَنْهُمْ وَرَضُواْ عَنْهُ

“মুহাজির ও আনসারদের অগ্রগামী দল আর যারা সৎভাবে তাদের অনুসরণ করছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট……..।”

-(সুরা তওবা: আয়াত- ১০০)

 

তাই সর্বশ্রেষ্ঠ মহা-মানব রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভূমিকায় একজন কাফির কিংবা ফাসিককে দাঁড় করানো, সোনালী যুগের সোনার মানুষ, নবী-রাসূলগণের পর দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মানুষ সাহাবায়ে কেরামের চরিত্রে কয়েকজন কাফির কিংবা ফাসিককে দিয়ে অভিনয় করানো, সতী-সাধ্বী, পূণ্যাত্মা মহিলা সাহাবীয়াদের ভূমিকায় চরিত্রহীনা অসৎ মহিলাদের দাঁড় করানো মূলত তাঁদের চরিত্র নিয়ে উপহাস এবং ঠাট্টা-বিদ্রূপের শামিল৷ যা মারাত্মক গোনাহের কাজ এবং সংশ্লিষ্টদের জন্যে ইহ ও পরকালীন করুণ পরিণতির কারণ৷

যে সমস্ত কারণে নাবী-রাসূল বা সাহাবায়ে কেরামের চরিত্র অবলম্বন করে মুভি-নাটক তৈরী করা নাজায়েয:

১. কাফির, ফাসিক ও চরিত্রহীন লোকেরা যখন নাবী-রাসূল কিংবা সাহাবা চরিত্রে অভিনয় করবে, তখন অবশ্যই তাঁদের মর্যাদাহানি ঘটবে৷ এরকম মুভি তৈরী করা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মর্যাদাবানদের মর্যাদা নিয়ে খেল-তামাশারই নামান্তর, যা চরম গর্হিত এবং নিকৃষ্টতর কাজ৷

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-

وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ لاَ تَعْتَذِرُواْ قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ إِن نَّعْفُ عَن طَآئِفَةٍ مِّنكُمْ نُعَذِّبْ طَآئِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُواْ مُجْرِمِينَ

“আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর তবে তারা বলবে আমরাতো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন : তোমরা কি আল্লাহর সাথে তার হুকুম আহকামের সাথে এবং তার রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে, ছলনা করো না, তোমরা যে কাফের হয়ে গেছ, ঈমান প্রকাশ করার পর।”

(সুরা আত-তাওবাহ: ৬৫-৬৬)

২. এরকম মুভি নির্মাণ তাঁদের মর্যাদার উপর যুলুম করার নামান্তর৷ যেমন, যুলুম বলা হয়-

الظلم هو: وضع الشيء في غير موضعه المختص به.
(مفردات ألفاظ القرآن للراغب الأصفهاني- ٥٣٧).
অর্থাৎ “কোনো জিনিসকে তার নির্ধারিত স্থানে না রাখা৷”

(মুফরাদাত)

এরকম নাটক বা মুভিতে রাসূল সা, বা সাহাবায়ে কেরামের পূত-পবিত্র চরিত্রকে পেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মাধ্যমে প্রকাশ ঘটানো হয়, যারা সাধারণত কাফির, ফাসিক, চরিত্রহীন এবং লম্পট কিসিমের হয়ে থাকে৷ এখানে সর্বোত্তম ও পবিত্রতম চরিত্রসমূহকে নিকৃষ্ট চরিত্রের অধিকারীদের দ্বারা প্রকাশ ঘটানো হচ্ছে, যা স্পষ্টত যুলুম এবং নাজায়েয৷ আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন-

إِنَّا أَعْتَدْنَا لِلظَّالِمِينَ نَارًا أَحَاطَ بِهِمْ سُرَادِقُهَا

“আমি জালেমদের জন্যে অগ্নি প্রস্তুত করে রেখেছি, যার বেষ্টনী তাদের কে পরিবেষ্টন করে থাকবে।”

(সূরা আল-কাহফ ২৯)

৩. এরকম নাটক বা মুভিতে সাধারণত দু’দলে ভাগ করে অভিনয় করানো হয়৷ একপক্ষ মুসলিম, অপরপক্ষ কাফির৷ কাফিরদের ভূমিকায় যে দল থাকে, তারা হয়ত বাস্তবেই কাফির হবে, নতুবা মুসলিম হবে৷ কাফির হোক বা মুসলিম; অভিনয়ে যখন তারা মুসলিম বাহিনীর প্রতিপক্ষের ভূমিকায় আসবে, তখন তারা পুরোদস্তুর আবু জাহল, আবু লাহাব বা অন্য কাফির যারা মুসলমানদের জাত-শত্রুর ভূমিকায় আবির্ভূত হবে৷ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামকে ইচ্ছেমতো কটুক্তি করবে, গালাগাল করবে, যা মারাত্মক কুফুরী কাজ৷ অভিনয়ের স্বার্থেই হোক, ইচ্ছাকৃত বা আন্তরিকভাবেই না হোক; ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম চরিত্রের অধিকারী মহান ব্যক্তিত্বদের ব্যাপারে কটু কথা বের হওয়াই বদবখতির কারণ৷

৪. যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা সাহাবায়ে কেরামের ভূমিকায় অভিনয় করে, তারা যদি মুসলিমও হয়, কিন্তু তাদের মাঝে তাকওয়া, পরহেযগারীর লেশমাত্রও নেই৷ এমতাবস্থায় তাদের কাছ থেকে এমন আচরণ সংঘটিত হয় বা হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা নাবী-রাসূল বা সাহাবায়ে কেরামের শানের সম্পূর্ণ বিপরীত৷ তাঁদের মর্যাদার সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানানও অসঙ্গতিপূর্ণ৷ এহেন পরিস্থিতিতে দর্শকদের মধ্যে তাঁদের ব্যাপারে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হয় বা হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে৷ যার দায়ভার সম্পূর্ণই মুভি নির্মাতা এবং এর প্রচারে সংশ্লিষ্ট সবার উপর বর্তাবে৷

৫. এজাতীয় মুভি বা নাটকে পূণ্যাত্মা মহিলা সাহাবিয়াদের ভূমিকায় যে সমস্ত নারীদের অভিনয়ে আনা হয়, তারা খোলামেলাভাবেই সবার সামনে আসে৷ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ফরয বিধান পর্দার হুকুমকে তারা সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে অভিনয় করে৷ এর কারণে মানুষ পরিষ্কার একথা বুঝে নেবে যে, সোনালী যুগের সেই সমস্ত মহিলা সাহাবিয়াদের মাঝে পর্দার রীতি ছিলো না৷ এবং পুরুষ সাহাবী ও মহিলা সাহাবিয়া মুভির মতোই খোলামেলা চলতেন (নাউযুবিল্লাহ), যা সম্পূর্ণ কুরআন-হাদীস বিরোধী অবাস্তব ধারণা৷ যার ফলশ্রুতিতে এখনকার মহিলারা পর্দা পালনে অনীহা প্রদর্শন করবে৷ মুখে না হলেও কার্যক্ষেত্রে ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ বিধানকে অস্বীকার করা হয় এজাতীয় মুভির মাধ্যমে৷

৬. দর্শক যখন নাটক বা মুভিতে সাহাবায়ে কেরামের চরিত্রে কিছু মানুষকে অভিনয় করতে দেখবে, এরপর যখনই তাঁদের কথা ভাববে, নাটকে অভিনয়কারী সংশ্লিষ্ট লোকটির কথাই দর্শকের কল্পনার চোখে ভাসবে৷ অথচ একজন সাহাবীর তুলনা তো দুনিয়ার অন্য সমস্ত মুসলমানের সমষ্টিতেও হবে না৷ এখানে কল্পনাতেও সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদাহানি ঘটছে৷

৭. যদি মেনেও নেয়া যায় যে, এজাতীয় মুভি সিরিজের মাধ্যমে ইসলামের উপকার হচ্ছে, দ্বীন প্রচারের কাজ হচ্ছে৷ ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে প্র্যাক্টিকালি জানতে পারছে৷ কিন্তু খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে যে, এই পদ্ধতি অবলম্বন করে কিন্তু আপনি/আমি দ্বীন প্রচার করতে বাধ্য নই৷ কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও পূণ্যাত্মা সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা রক্ষা করতে ও শরীয়তের বিধানাবলীর সংরক্ষণ করতে আমরা বাধ্য৷ শরীয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ উসূল হচ্ছে-

درء المفاسد مقدم على جلب المصالح
“ফাসাদ-অপকার প্রতিহত করা উপকার আনয়নের উপর প্রাধান্য প্রাপ্ত।”

তাই এখানে অনেক অপকারের তুলনায় সামান্য উপকার নিতান্তই গৌণ৷

দেখুন,

এজাতীয় মুভি বা নাটক নির্মাণ নাজায়েয হওয়ার জন্যে উপরে বিবৃত একটিমাত্র কারণই যথেষ্ট৷ অথচ এখানে সাতটি কারণ বিবৃত হয়েছে৷ এই সাত কারণেই যে সীমাবদ্ধ থাকবে, তাও কিন্তু নয়৷ এজাতীয় মুভি নির্মাণের অবৈধতার আরও কারণ রয়েছে৷ যেমন: এজাতীয় নাটক বা মুভি নির্মাণ নাজায়েয হওয়ার ব্যাপারে সমসাময়িক হকপন্থী সমস্ত উলামায়ে কেরামের একমত হওয়া, সীরাতে রাসূল সা, ও সীরাতে সাহাবা পাঠে অনীহা সৃষ্টি হওয়া, সীরাতের পাঠক হ্রাস পাওয়া৷ অথচ উম্মতের ইসলাহ ও ঘুমন্ত ঈমানী চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রধান হাতিয়ারই হচ্ছে, সীরাতে রাসূল ও সীরাতে সাহাবা৷ তাই সীরাত পাঠের সীমাহীন অপরিহার্যতার কথা বলে বোঝাবার মতো না থাকলেও সীরাত পাঠ থেকে বিমুখ হওয়ার সব চটকদার আয়োজন আমাদের সামনে বিদ্যমান৷ ইসলামের ইতিহাস সম্বলিত নাটক বা মুভি নির্মাণও হচ্ছে, একটি ভালো সূরতের ক্ষতিকর আয়োজন৷

[জিয়া রাহমান]


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন