আজ শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ ইং, ০৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



সমাবেশ করতে না দেয়া অন্যায় অগণতান্ত্রিক

Published on 07 November 2016 | 3: 59 am

বিএনপিকে সমাবেশ করতে না দেয়ার বিষয়টি সরকারি জোট ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দল মেনে নিতে পারছে না। প্রধান সারির রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল নেতারা মনে করেন, এটি অন্যায় ও অগণতান্ত্রিক। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে অবশ্যই বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দেয়া উচিত।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যা হওয়ার কথা তার অনেক কিছুই হচ্ছে না। তাদের প্রশ্ন সরকারি দল ও তাদের শরিকরা সভা-সমাবেশ করতে পারলে অন্য দল কেন পারবে না।

বিষয়টি নিয়ে সুশীল সমাজের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি তীব্র সমালোচনা করেন। তারা মনে করেন, এটি মানুষের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। বিএনপির মতো একটি দলকে অবশ্যই সমাবেশের অনুমতি দেয়া উচিত। কেননা মানুষকে যদি গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেয়া না হয় তবে তারা অনিয়মতান্ত্রিকতার আশ্রয় নেবে।

তাদের মতে, কোনো সরকার সমালোচনা সহ্য করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেললে সেটি তখন আর জনগণের সরকার থাকে না। তারা মনে করেন, ৭ নভেম্বর নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে সেটা ভিন্ন বিষয়। এর সঙ্গে সমাবেশের অনুমতির বিষয়টি এক করে ফেলা উচিত হবে না। তাই আবেদন করার পরও বিএনপিকে অনুমতি না দেয়া অন্যায়।

তবে ক্ষমতাসীনরা মনে করেন, সমাবেশের নামে বিএনপি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই হয়তো তাদের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সভা-সমাবেশ করা প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সরকার সেই অধিকার পালনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে। আমরা বারবার বলে আসছি দেশে গণতন্ত্র নেই। সরকার কৌশলে বাকশাল কায়েম করছে। বিএনপির মতো একটি দলের সমাবেশের অনুমতি না দেয়া সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।

তিনি বলেন, বিরোধীদের সমালোচনা সহ্য করতে পারছে না সরকার। রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবীদেরও নানাভাবে কণ্ঠরোধ করছে। যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না তারা সব সময় জনগণকে ভয় পায়। সে কারণেই সরকার জনসমাবেশের অনুমতি দিচ্ছে না। খালেদা জিয়া বা বিএনপি যাতে জনগণের কাছে যেতে না পারেন, সেজন্য এই অপচেষ্টা করছে তারা। এতে গণতন্ত্র বিকাশের পরিবর্তে আরও সংকুচিত হয়ে পড়ছে, যা দেশের জন্য অশনি সংকেত।

ফখরুল বলেন, এ অবস্থা থেকে উত্তরণে জনগণকে জাগিয়ে তুলতে হবে। হারানো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও মানুষের হারানো অধিকার ফিরিয়ে আনতে সব রাজনৈতিক দলকে একই প্লাটফর্মে আসতে হবে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই।

এদিকে বিপরীত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ। রোববার তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর সংহতি দিবসের নামে বিএনপি ভাড়াটে সন্ত্রাসী নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে, এ জন্য হয়তো তাদের সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি। কারণ সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, বিএনপিকে সরকার ভয় পায় না, ভয় পায় আসলে জনগণ। কারণ তারা এর আগে পেট্রলবোমা মেরে জনগণকে হত্যা করেছে।

হাছান মাহমুদ বলেন, কোনো সমাবেশের অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা বিশৃঙ্খলা হওয়ার কোনো আশঙ্কা আছে কিনা খতিয়ে দেখে। এটা শুধু বিএনপির ক্ষেত্রে নয়, আওয়ামী লীগসহ অন্য দলগুলোর ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।

জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, হিংসা-বিদ্বেষের উপরে উঠে সহনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থাকা দরকার। যেখানে সব দল মিলে কাজ করবে। এ জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সব দলকে সহযোগিতা করতে হবে।

কেন অনুমতি দিচ্ছে না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, হয়তো অতীতে ক্ষমতাসীন দল কোনো আঘাত পেয়েছে এখন সুযোগ পেয়ে তারা প্রতিঘাত করছে। তবে তিনি মনে করেন, আঘাত-প্রতিঘাতের সংস্কৃতি পরিহার করে একটা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে; না হলে আমাদের গণতন্ত্র বিকশিত হবে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নবনির্বাচিত সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম প্রতিবেদককে বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে অবশ্যই বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দেয়া উচিত। কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যা হওয়ার কথা তার অনেক কিছুই হচ্ছে না; আবার যা হওয়ার কথা নয় তা হচ্ছে।

এদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, প্রত্যেকটি দল ও সংগঠনের সভা-সমাবেশ করা নিঃসন্দেহে মৌলিক অধিকার। আর বিএনপির মতো একটি দলকে অবশ্যই সমাবেশের অনুমতি দেয়া উচিত। মানুষকে যদি গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয়া না হয় তবে তারা অনিয়মতান্ত্রিকতার আশ্রয় নেবে, যা কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়।

তিনি মনে করেন, প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়নের অংশ হিসেবেই সরকার বিএনপিকে সমাবেশ করতে দিতে চাচ্ছে না। এটা উচিত নয়। সরকারের এ আচরণ গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।

বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, বিএনপিকে অবশ্যই সমাবেশের অনুমতি দেয়া উচিত। কিন্তু যেটা উচিত ও ন্যায়সঙ্গত সেটা আমাদের দেশে কদাচিৎ হয় না। বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দেবে না- এই অন্যায় আচরণই স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে।

তিনি যুগান্তরকে বলেন, সরকার সমালোচনা সহ্য করতে পারছে না। বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে তারা স্পষ্ট জানান দিচ্ছে যে, সমালোচনা ক্রমান্বয়ে সহ্য করা হবে না। এতে সমালোচনার জায়গাগুলো আস্তে আস্তে সংকুচিত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় তারা বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দিচ্ছে না, যা গণতন্ত্র বিকাশের পরিপন্থী।

শাহদীন মালিক আরও বলেন, সরকারের সব কাজই হচ্ছে সংকোচনের বহিঃপ্রকাশ। এনজিও আইনেও বলা হয়েছে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অশালীন বক্তব্য বা সমালোচনা করা যাবে না। এর ফলে গণতন্ত্র বিকাশ হওয়ার পরিবর্তে আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, রাজনৈতিক দলকে সভা সমাবেশ করতে না দেয়া গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থী। গণতন্ত্রের স্বার্থে, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড টেকসই করা ও প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি আরও বাড়ানোর জন্য গণমানুষের অধিকার নিশ্চিত করা উচিত। কোনো দলের সভা-সমাবেশে বাধা দেয়া ঠিক নয়। বাধা দেয়া হলে শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি বাড়বে না।

আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের জন্য তারা কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা ডিএমপির অনুমতি নিয়েছিল- এমন প্রশ্ন করে তিনি বলেন, যদি অনুমতি না নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় কাউন্সিল করতে পারে তবে অন্য দলের ক্ষেত্রে অনুমতি লাগবে কেন। অনুমতি চাইলেও কেন তা দেয়া হবে না। এটা অন্যায়।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যদি গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা না হয় কিংবা আইনশৃংখলা বাহিনী দিয়ে জোর করে নির্বাচনে কেন্দ্র দখলের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকতে চায় তবে এর পরিণতি ভালো হবে না।

বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের অনুমতির ব্যাপারটিই সঠিক নয়। কোনো দল সমাবেশ করতে চাইলে আইনশৃংখলা বাহিনীকে শুধু অবহিত করবে যাতে নিরাপত্তার বিষয়টি তারা নজর দেয়। সভা-সমাবেশের অনুমতির যে কথা বলা হচ্ছে সেটাই স্বৈরতান্ত্রিক। অবহিতের জায়গায় অনুমতির যে কথা বলা হচ্ছে এটা গণতান্ত্রিক নয়।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন