আজ শুক্রবার, ২৫ মে ২০১৮ ইং, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



আব্বা ছিলেন আমার কাছে একজন কিংবদন্তী

Published on 06 November 2016 | 11: 31 pm

:: ফেরদৌস জাহান (ডলি) ::

আমার আব্বা মরহুম এম.ওবাইদুল হক (প্রাক্তন সংসদ-সদস্য, প্রকৌশলী ও বিশিষ্ট সমাজ সেবক) এর উপর কিছু লেখার জন্য বড় ভাই সারওয়ার হাসান জামীল বললেন কিন্তু সময় দিলেন মাত্র কয়েক ঘন্টা। এত অল্প সময়ে উনার উপর লেখা আমার পক্ষে দুঃসাধ্য বিধায় আমি আমার লিখিত (আব্বার স্মরনে) সন্দ্বীপ ডেভলেপমেন্ট ফোরাম লিঃ এর প্রকাশিত দ্বীপরে চিঠি-৬ এর কিছু কথা তুলে ধরলাম।

আব্বা ছিলেন আমার কাছে একজন কিংবদন্তী। মাঝে মাঝে অহংকার করি উনার কন্যা হয়ে জন্মগ্রহণ করার জন্য। আবার মাঝে মাঝে অপদার্থ মনে করি নিজেকে উনার কোন গুন না পাওয়ার জন্য। তাই মনে করি তাঁর কন্যা হয়ে যদি তাঁর কথাগুলো সবাইকে জানাতে পারি, সেটা পড়ে কেউ যদি নিজেকে সেভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তখন নিজেকে সুযোগ্য কন্যা হিসাবে ধন্য মনে করবো।

আব্বা ১৯২৯ সালে সন্দ্বীপের প্রান্তিক অঞ্চল সন্তোষপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সাধারন আর দশটা পরিবারের সন্তানদের মধ্যে আব্বা ছিলেন ব্যতিক্রম। দাদা-দাদীর অতি আদরের বড় সন্তান হলেও সবসময় ছিলেন পরোপকারী, উদ্যোগী এবং সাহসী, আমাদের দেশের কুসংস্কার ও ফালতু লৌকিকতা উনি একদম পছন্দ করতেন না। স্বপ্ন দেখতেন কিভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং সমাজের জন্য কিছু করবেন। আমাদেরকে বলতেন “তোরা দামী কম্বলে শুয়ে ও লন্ডন/আমেরিকার মত দেশের স্বপ্ন দেখিসনা, আর আমি কাঁথায় শুলে লন্ডন/আমেরিকার মত দেশের স্বপ্ন দেখতাম।

হাজারো বাধা ডিঙ্গিয়ে উনি ১৯৪৪ সালে কাঠগর হাইস্কুল থেকে ১ম বিভাগ ও বৃত্তিসহ ম্যাট্রিক পাশ করেন। নানারকম আর্থিক ও পারিবারিক প্রতিকুলতার মধ্যে থেকেও ঢাকার আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হন।

ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে পূর্ব পাকিস্তানের গনপূর্ত বিভাগে যোগদান করেন। আজ চট্টগ্রামে অবস্থিত হালিশহর, শেরশাহ্ ও ফিরোজশাহ্ কলোনীর প্রতিটি ইট বালির সাথে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও মেধা জাড়িত ছিল। পরবর্তীতে নিজে স্বাধীনভাবে কিছু করার জন্য সরকারী চাকুরী ইস্তফা দিয়ে তার ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুদের সাথে গড়ে তোলেন এক ভিন্নধর্মী শিল্প প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান সিরামিক ইন্ডাষ্ট্রিজ লিঃ, যা পরবর্তীতে পিপলস্ সিরামিক ইন্ডাষ্ট্রিজ লিঃ নামে টঙ্গীতে অবস্থিত। আজকে বাংলাদেশে সিরামিক শিল্পে যে বিপ্লব ঘটেছে তার জন্য আব্বা ও তার বন্ধুদের বিশাল অবদান রয়েছে।  সন্দ্বীপের জন্য উনার ছিল প্রচন্ড ভালোবাসা। সন্দ্বীপের কেউ কখনো আমাদের বাসা থেকে খালি হাতে যাননি। উনি উনার সামর্থমত সবাইকে সাহায্য করতেন সেটা শারিরীক,মানসিক কিংবা আর্থিক।

আব্বা এমন এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেখানে ৯০% মানুষ স্বপ্ন দেখতেন কোনরকমে চাষবাস করে জীবিকা নির্বাহ করা, সমুদ্রে গিয়ে মাছ ধরা, নৌকার মাঝি হওয়া, অথবা জাহাজের একটা নলির ব্যবস্থা করে বিদেশে পাড়ি দেওয়া। মহিলারাও ছিল প্রচন্ড রকম কুসংস্কার ও অশিক্ষায় নিমজ্জিত। সেই রকম একটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেও আব্বার স্বপ্ন ছিল নিজেকে শিক্ষিত করার, গ্রামের ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করার। গ্রামের ছেলেরা সাধারন শিক্ষার পাশাপাশি যেন কারিগরী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের জন্য উন্নয়ন মূলক কাজ করে।

শিক্ষার প্রতি প্রচন্ড আগ্রহের কারনেই উনি সন্দ্বীপের এক জুনিয়র স্কুলকে হাই স্কুলে রূপান্তরিত করনে যা এ.কে. একাডেমী নামে আজ প্রতিষ্ঠিত। উনি আজীবন চেষ্ঠা করেছেন এটাকে সুন্দর ভাবে চালিয়ে নেবার।
উনি আমাদেরকেও চেষ্ঠা করতেন লেখাপড়া করানোর। উনি কখনো চাননি আমরা উনার অর্থ ও রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হই। যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবার গুলোতে অস্ত্রের মহড়া কিংবা কাঁচা পয়সার শব্দ শুনা যেতো তখন আমাদের পরিবার ছিলো সেইসব থেকে অনেক দূরে। সেই সময় আমাদের পরিবারকে অনেকে তাদের সন্তানদের  কাছে একটা আদর্শ পরিবারের মডেল হিসাবে উপস্থাপন করতো। আমাদের খাওয়ার টেবিলে আলোচনার বিষয় ছিল রাজনীতি ও সাংস্কৃতির বিষয় নিয়ে। সেই সময় আব্বাকে ভীষণ রাগী মনে করতাম। আমাদের ভীষণ রাগও হতো। কিন্তু এখন মনে করি হয়তো উনার কড়া শাসনের কারনেই আমরা ১১ ভইবোন এসবের উর্দ্ধে থেকে নিজ নিজ পায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। আমরা একজন শিল্পপতি বা রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হয়েও অনেক ধনসম্পদের মালিক হতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু আমরা আমাদের জীবনে এমন একজন আব্বা পেয়েছিলাম যাকে নিয়ে আমরা আমাদের জীবনকে অলংকৃত করেছি। আব্বার অনেক স্বপ্ন ছিল, যার সবটুকু হয়তো উনি পুরন করতে  পারেননি। কিছুটা উনার ব্যর্থতা, কিছুটা সহযোগীতার অভাব এবং কিছুটা উনার সহজসরল জীবনযাপনের জন্য। উনাকে কোন রোগব্যধি আক্রমন করতে পারেনি। কিন্তু উনার অনেক স্বপ্ন অপূর্নের ব্যর্থতায় ধীরে ধীরে অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়েন। জীবনের শেষ দিনে যখন উনার পার্শ্বে বসতাম তখন অনেক স্বপ্নের ব্যর্থতার কথা বলতেন। একদিন আমাকে বলেছিলেন “আমি খুব খুশী আমার ছেলেমেয়েরা আমার মতো হয়নি” ওরা অনেক শান্ত অনেক গুছানো, আমার মতো হলে কষ্ট হতো”।

আজ আমার মনে হচ্ছে আমরা উনার জীবিত অবস্থায় কোন কিছু করতে পারিনি কিন্তু উনারই আরেক সন্তান সারোয়ার এহসান জামীল সন্দ্বীপে প্রথম কারিগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উনার একটা স্বপ্ন পূরনের যাত্রা শুরু করেছেন। আরেক ভাই সারওয়ার হাসান জামীল এ.কে. একাডেমীর সভাপতি হিসাবে স্কুলটিকে নূতনভাবে সাজিয়ে তা পরিচালনা করে যাচ্ছেন।

আজ উনার কন্যা হয়ে সন্দ্বীপবাসীর কাছে আমার অনুরোধ উনাকে নিয়ে কোন লৌকিকতা না করে উনার অপূর্ন স্বপ্নগুলো যেন আপনাদের সহযোগীতায় আমরা পূর্ণ করতে পারি। উনার স্থাপিত প্রতিষ্ঠানগুলো বাঁচিয়ে রাখুন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত উনার স্কুল ও সন্দ্বীপবাসীর কথা ভুলতেন না।

আব্বা আমাদেরকে কোনরকম সেবা করার সুযোগ না দিয়ে বার্ধ্যকের কোনরকম কষ্ট না দিয়ে ২০১২ সালের ২৭শে রমজানের রাত্রে চলে গেছেন। উনার মৃত্যুর পর মনে হলো একজন কিংবদন্তীর বিদায় হলো।
আল্লাহ উনাকে জান্নাতবাসী করুন।

লেখক : মরহুম সংসদ সদস্য এম ওবাইদুল হকের কন্যা , প্রাক্তন সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ইউনিভার্সিটি উইথোস ফেডারেশন কলেজ, বর্তমানে কানাডা প্রবাসী ও আহসান জামীল ফাউন্ডেশন এর সদস্য।


Advertisement

আরও পড়ুন