আজ সোমবার, ১৮ জুন ২০১৮ ইং, ০৪ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



চন্দ্রাবতী শিশুসাহিত্য সম্মেলনে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ।। শিশুদের মননশীলতা বিকাশের জন্য প্রয়োজন বই

Published on 05 November 2016 | 4: 48 am

প্রত্যেক শিশুর মাঝে সৃষ্টিশীল সত্তা আছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট লেখক ও শিক্ষাবিদ এমিরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তিনি বলেন, শিশুদের মাঝে যে সৃষ্টিশীল মনন আছে তা পরিচর্যার মাধ্যমেই বিকাশ হতে পারে। শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির মুক্তমঞ্চে দুই দিনব্যাপী চন্দ্রাবতী শিশু সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন। তার আগে সারাদেশ থেকে আসা নবীনপ্রবীণ কবি, গল্পকার, ছড়াকার, চিত্রশিল্পী, আবৃত্তিকার, প্রকাশকদের সাথে নিয়ে বেলুন উড়িয়ে তিনি সম্মেলনের উদ্বোধন করেন।

১৮১৮ সালে ‘দিগদর্শন’ নামে একটি সাময়িকী প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলা শিশু সাহিত্য প্রকাশনার যে শুভারম্ভ হয়েছিল, তার দ্বিশতবর্ষ পূর্তিকে সামনে রেখে চন্দ্রাবতী একাডেমি ২০০ বই প্রকাশসহ দুই বছরব্যাপী এক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। গতকাল থেকে দুই দিনব্যাপী শিশু সাহিত্য সম্মেলনের মাধ্যমে এই অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন হয়। সম্মেলনে ২০০ বইয়ের মধ্যে প্রকাশিত ২০ টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। সারাদেশ থেকে আসা নবীনপ্রবীণ কবি, গল্পকার, ছড়াকার, চিত্রশিল্পী, আবৃত্তিকার, প্রকাশকদের অংশগ্রহণে প্রাণের মেলায় পরিণত হয় এই শিশুসাহিত্য সম্মেলন।

গতকাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম, ফারুক হোসেন, জাহীদ রেজা নূর ও এবি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান চৌধুরী। আবৃত্তিশিল্পী আয়েশা হক শিমুর সঞ্চালনায় এ পর্বে স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক কামরুজ্জামান কাজল। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সম্মেলনের চেয়ারম্যান শিশু সাহিত্যিক রাশেদ রউফ অনুষ্ঠানে স্বনামধন্য লেখক শাহজাহান কিবরিয়া, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন ও কবি আবুল মোমেনের হাতে চন্দ্রাবতী একাডেমি শিশু সাহিত্য পুরস্কার তুলে দেন প্রধান অতিথি। শাহজাহান কিবরিয়ার পক্ষে পুরস্কার নেন কবি সুজন বড়ুয়া। পুরস্কার প্রাপ্তদের জীবনী পড়েন বাচিক শিল্পী রণজিৎ রক্ষিত, অঞ্চল চৌধুরী, মুজাহিদুল ইসলাম। উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করে অভ্যুদয় সংগীতাঙ্গন। শিশু সাহিত্যের সেকাল ও একাল নিয়ে প্রফেসর আনিসুজ্জামান তার বক্তব্য উপস্থাপন করে আরো বলেন, শিশুসাহিত্যে রায় চৌধুরী পরিবারের সময়ই সেরা। দক্ষিণারঞ্জন, রবীন্দ্রনাথ, অবনী, সুনির্মল বসু, বুদ্ধদেব বসু, বন্দে আলী মিয়া, শওকত ওসমান, ফররুখ, আহসান হাবীবসহ অনেকে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেন বাংলা শিশুসাহিত্যে। এখন বাংলাদেশে শিশু সাহিত্যের স্ফুরণ দেখছি। বাংলা সাহিত্যে শিশু সাহিত্যের ধারা কখনোই শুকিয়ে যায় নি। তবে সেরা সময় ছিল বিংম শতাব্দীর গোড়ার দিকে। শিশুদের শিল্পী মনের বৈশিষ্ট্য বিকাশের জন্য প্রয়োজন বই। মননশীলতা বিকাশের জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে। তিনি চন্দ্রাবতী একাডেমি শিশু সাহিত্য পুরস্কার ২০১৬ প্রাপ্ত তিন কীর্তিমান ব্যক্তিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন পুরষ্কারের মর্যাদা অর্থের মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। পুরষ্কারের মান বিচার করা হয়, কারা পাচ্ছেন তাদের উপর। সেদিক থেকে চন্দ্রাবতী একাডেমি সাধুবাদ পাওয়ার দাবি রাখে। পাশাপাশি এ ধরনের সম্মেলনের আয়োজন শিশু সাহিত্য চর্চা ও বিকাশে নতুন প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন বলেন, শিশুদের কল্পনার জগৎ অসাধারণ জগৎ। তাকে বইয়ের ভারে পীড়িত করা উচিত নয়। শিশুদের কল্পনার জগৎকে বাড়াতে হবে। তাদের উপযুক্ত পরিবেশ হারিয়ে যাচ্ছে। চন্দ্রাবতী একাডেমি শিশু সাহিত্য সম্মেলন করে নতুন দিক উন্মোচিত করলো। আশা রাখছি তাদের এ উদ্যোগ আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।

কবি আবুল মোমেন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এরকম যেন গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্প। আমরা যেভাবে শৈশব কাটিয়েছি আজকে শিশুরা সে রকম শৈশব পাচ্ছে না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ‘শিশু নির্জীব প্রকল্পে’ পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা সবাই পরীক্ষার্থীতে পরিণত হচ্ছে। ধনীগরিব সব শিশুই বঞ্চিত। শিশুরা অ্যাপার্টমেন্টে বন্দি, স্কুল হচ্ছে কারাগার। তাদের চিন্তা শক্তি কীভাবে খর্ব করা যায়, তারই চেষ্টা চলছে যেন। শিশুর ডানা ছেঁটে দিচ্ছি। সহযোগিতা ছেঁটে প্রতিযোগিতার ডানা থাকলে ভারসাম্য থাকার কথা নয। এখনকার শিশুদের স্মৃতি থাকছে না। তারা শুধু ছুটছে। তিনি আরো বলেন, শিশুরা বন্দি জীবন যাপনের ফলে তাদের সবকিছু বন্দি হয়ে আছে। সাহিত্য থেকে দূরে থাকার ফলে তাদের কাজে সাহিত্যের কোন ‘রেফারেন্স’ থাকে না।

কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, আমাদের যা কিছু সুন্দর অর্জন, তা শিশুদের জন্য নিবেদিত হোক। বর্তমানের বিরুদ্ধ সময়ে বিপথগামী হওয়ার হাত থেকে আমাদের প্রজন্মকে রক্ষা করতে পারে সাহিত্য ও সংস্কৃতি। তিনি আরো বলেন, আমি শিশুদের জন্য ৩০টি বই রচনা করেছি। শিশুতোষ পত্রিকা ধান শালিকের দেশ সম্পাদনা করেছি। আমার এই কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে চন্দ্রাবতী একাডেমি।

শিশু সাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম বলেন, আমাদের খ্যাতিমান সাহিত্যিকরা দায়িত্ব নিয়ে ছোটদের জন্য লিখে গেছেন, বাণিজ্যের জন্য নয়। শিশু সাহিত্যিকদের মধ্যে কোন হীনমন্যতা নেই। তিনি বলেন, বই আগে তালপাতায় লেখা ছিল। এখন বইয়ের ফরম্যাটে পাচ্ছি। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশে বইয়ের ফরম্যাট পরিবর্তন হবে। তবে বই বাঁচবে, মরবে না।

শিশু সাহিত্যিক ফারুক হোসেন বলেন, মেধাবী সাহিত্যিকরাই শিশুসাহিত্য রচনা করেন। দায়িত্বশীল কাজ। যদিও শিশুসাহিত্য এখনো অবহেলিত।

জাহীদ রেজা নূর বলেন, আপনার সন্তানের হাতে বই তুলে দিন, এখনো সময় আছে। চোখ দিয়ে দেখার পাশাপাশি হৃদয় দিয়ে দেখতে হবে। তিনি বলেন, শিশুসাহিত্য শুধু ছোটদের সাহিত্য নয়। এটি বড়দেরও সাহিত্য এবং পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য। চন্দ্রাবতী একাডেমি বাংলা শিশুসাহিত্য প্রকাশনার ২০০ বছর শীর্ষক আলোচনার উদ্যোগ মাইলফলক হয়ে থাকবে।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে সম্মেলনের চেয়ারম্যান শিশু সাহিত্যিক রাশেদ রউফ বলেন রাজধানীর বাইরে এই প্রথম চন্দ্রাবতী একাডেমি চট্টগ্রামে শিশু সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করছে এ জন্য স্বাগত জানাই।

দ্বিতীয় পর্বে ছিল স্বরচিত কবিতা পাঠ ও আলোচনা। কবি আসলাম সানীর সভাপতিত্বে এতে আলোচনা করেন কবি ওমর কায়সার। সবশেষে ছিল আবৃত্তি। অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ও বোধন আবৃত্তি পরিষদের শিশু ইউনিট।

আজকের অনুষ্ঠান : আজ দ্বিতীয় দিন ৫ নভেম্বর শনিবার সকাল ১০ টায় থাকবে স্বরচিত লেখা পাঠ। এতে সভাপতিত্ব করবেন শিশুসাহিত্যিক সনজীব বড়ুয়া এবং আলোচক থাকবেন কথাসাহিত্যিক রফিকুর রশীদ। সকাল ১১ টায় থাকবে ‘শিশুসাহিত্যের প্রকাশনার ২০০ বছর শীর্ষক’ সেমিনার। শিক্ষাবিদ ড. মাহবুবুল হকের সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ পাঠ করবেন সাহিত্যিক আলী ইমাম। আলোচনায় অংশ নেবেন শিশু সাহিত্যিক সুবল কুমার বনিক, শিশু সাহিত্যিক সুজন বড়ুয়া, কথা সাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী ও প্রাবন্ধিক গবেষক আহমাদ মাযহার। বিকেল ৩ টায় থাকবে স্বরচিত লেখা পাঠ। এতে সভাপতিত্ব করবেন শিশুসাহিত্যিক আনজীর লিটন এবং আলোচক থাকবেন কবি ও ছড়াশিল্পী তপংকর চক্রবর্তী। বিকেল সাড়ে ৪ টায় শিশুকিশোর সমাবেশ ও সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন বরেণ্য শিক্ষাবিদ ড. আনিসুজ্জামান। চন্দ্রাবতী একাডেমির উপদেষ্টা কথা সাহিত্যিক মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন শিল্পী রফিকুন নবী, এবি ব্যাংক লি. এর প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম আহমেদ চৌধুরী, কথা সাহিত্যিক বিপ্রদাশ বড়ুয়া ও কবি মারুফুল ইসলাম।

 

 


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন