আজ বৃহঃপতিবার, ২১ জুন ২০১৮ ইং, ০৭ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



পাসপোর্টের সাবেক ডিজি মাবুদ – চার ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার সন্ধান

Published on 02 November 2016 | 5: 21 am

পাসপোর্ট ও বহিরাগমন অধিদফতরের সাবেক ডিজি (মহাপরিচালক) ও সাবেক অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক আবদুল মাবুদের কয়েকটি ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের অকাট্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। মাবুদ ও তার স্ত্রী নাসিমা খানের নামে চারটি ব্যাংকের একাধিক অ্যাকাউন্টে এসব অর্থের লেনদেন হয়। লেনদেনকৃত অর্থের একটি বড় অংশ স্থায়ী আমানত বা এফডিআর করা হয়েছে। এছাড়া এই দম্পতির নামে অন্তত ১৫টি ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল অংকের নগদ অর্থ জমা আছে।

সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থা পাসপোর্ট অধিদফতরের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান শুরু করে। এতে সাবেক ডিজি আবদুল মাবুদের ব্যাংক হিসাবসহ ব্যক্তিগত নানা তথ্য-উপাত্ত উঠে আসে, যা গোপনীয় প্রতিবেদন আকারে এরই মধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবগুলোর লেনদেন বিবরণী, অ্যাকাউন্ট ও এফডিআর নম্বরসহ বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করে পাঠানো হয়। উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র থেকে পাওয়া কয়েকটি ব্যাংক হিসাবের এ সংক্রান্ত লেনদেন বিবরণী (ট্রানজেকশন প্রোফাইল) যুগান্তরের কাছেও আসে, যা প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সাবেক এ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাব সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে তা তদন্তের দাবি রাখে। তিনি মনে করেন, দুদক বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারে।

ব্যাংকের নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আবদুল মাবুদ মূলত পাসপোর্ট অধিদফতরের ডিজি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তার কয়েকটি ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক অর্থের লেনদেন শুরু হয়। আবার পাসপোর্ট ডিজি’র পদ থেকে অবসর নেয়ার পর এই অস্বাভাবিক অর্থ প্রবাহে ভাটা পড়ে। একপর্যায়ে কয়েকটি ব্যাংক হিসাবের অর্থ তুলে নিয়ে সেগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়।

নিজের ও স্ত্রীর ব্যক্তিগত কয়েকটি ব্যাংক হিসাবে এত বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন সম্পর্কে জানতে চাইলে পাসপোর্ট অধিদফতরের সাবেক ডিজি আবদুল মাবুদ মঙ্গলবার বলেন, ‘আপনারা যেসব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আমার টাকা জমা থাকার কথা বলছেন তা সঠিক নয়। ওইসব অ্যাকাউন্টও আমার নয়। কেউ ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমার সুনাম ক্ষুণ্ণ করতে এসব তথ্য প্রচার করে থাকতে পারে।’

এদিকে আবদুল মাবুদের ব্যক্তিগত একটি অ্যাকাউন্টের সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য মঙ্গলবার পক্ষ থেকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গুলশান (উত্তর) শাখায় যোগাযোগ করা হয়। কাগজপত্র দেখে ব্যাংক কর্মকর্তারা অ্যাকাউন্টের সঠিকতা নিশ্চিত করেন। অবশ্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা আবদুল মাবুদের অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত হালনাগাদ কোনো তথ্য জানাতে অস্বীকৃতি জানান। তবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গুলশান শাখার ম্যানেজার (অপারেশন ও সার্ভিস) হালিমা আক্তার প্রতিবেদকের কাছে আবদুল মাবুদের অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখে বলেন, ‘এত গোপনীয় কাগজপত্র আপনারা কোথায় পেলেন। এগুলো তো হেড অফিসের কপি। আপনাদের হাতে গেল কীভাবে?’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ব্যাংকের নীতি অনুযায়ী আমাদের সম্মানিত গ্রাহকের অ্যাকাউন্টের কোনো তথ্য আইনশৃংখলা কর্তৃপক্ষ ছাড়া বাইরের কাউকে দেয়া হয় না।

সূত্র জানায়, আবদুল মাবুদ বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিসের প্রথম ব্যাচের কর্মকর্তা। ১৯৭৩ সালে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এলে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। অবসরে থাকার সময় তিনি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যালয় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে যাতায়াত শুরু করেন। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি আবার চাকরি ফিরে পান। এরপর অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদায় তাকে চাকরি থেকে অবসর দেয়া হয়। সরকারের গুডবুকে নাম থাকায় তাকে টানা ৫ বছরের জন্য পাসপোর্ট ও বহিরাগমন অধিদফতরের মহাপরিচালক করা হয়।

২০০৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিনি মহাপরিচালক হিসেবে পাসপোর্ট অধিদফতরে যোগ দেন। পূর্ণ ৫ বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর তিনি অবসরে যান। আবদুল মাবুদ বর্তমানে একটি বেসরকারি ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া সম্প্রতি ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি ইংরেজি দৈনিকের মালিকানার সঙ্গেও তিনি যুক্ত আছেন।

উচ্চ পর্যায়ের একটি গোয়েন্দা সূত্রে আসা আবদুল মাবুদের ব্যাংকিং সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পাসপোর্টের ডিজি হিসেবে যোগ দেয়ার আগে স্ত্রীসহ তার নামে মাত্র তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল। এর মধ্যে ২০০৬ সালে খোলা এবি (আরব বাংলাদেশ) ব্যাংকের ধানমণ্ডি শাখায় তার নামে ১৫ লাখ ও ২০০৭ সালে এক লাখ ৩০ হাজার টাকার দুটি এফডিআর ছিল। এছাড়া ২০০৮ সালে নিজের ও স্ত্রী নাসিমা খানের নামে ছিল ১১ লাখ ৭৮ হাজার এবং ১৩ লাখ টাকার দুটি এফডিআর।

কিন্তু ২০০৯ সালে পাসপোর্ট অধিদফতরে ডিজি হিসেবে যোগ দেয়ার পর থেকেই একাধিক ব্যাংকে মাবুদ ও তার স্ত্রীর নামে অ্যাকাউন্ট খোলা শুরু হয়। এর মধ্যে ২০০৯ সালেই এবি ব্যাংকের ধানমণ্ডি শাখায় তার নিজের ও স্ত্রীর নামে যথাক্রমে ৩০ লাখ ও ৬ লাখ ৩৬ হাজার ৯৮ টাকা জমা পড়ে। পরের বছর ২০১০ সালে এবি ব্যাংকের ওই শাখাতেই আরও ১৫ লাখ টাকার এফডিআর করা হয়।

এখানেই শেষ নয়, গোয়েন্দা অনুসন্ধানে মাবুদ ও তার স্ত্রীর নামে এবি ব্যাংকের ধানমণ্ডি শাখাতেই এ রকম অন্তত ১৬টি এফডিআর বা স্থায়ী আমানতের সন্ধান পাওয়া যায়। এগুলোতে পৃথক অংকের অর্থ বিভিন্ন মেয়াদি আমানত হিসাবে জমা আছে। এর মধ্যে মাবুদ ও তার স্ত্রীর নামে চারটি এফডিআরে (নম্বর ৩৩৬২৬৮৪, ৩৩৬২৬৮৫, ৩৩৭২৩০৬, ৩৩৮৬৭১০) জমা আছে ২৫ লাখ টাকা। এই চারটি এফডিআর পাসপোর্ট মহাপরিচালক হওয়ার পর ২০১২ সালে খোলা হয়। এছাড়া ২০১৩ সালে এবি ব্যাংকের একই শাখায় আরও ১০ লাখ (এফডিআর নম্বর ৩৩৮৬৯৪৪) এবং ২০১৪ সালে ১২ লাখ টাকার এফডিআর (নম্বর ৩৪৬২৪৩২) খোলা হয়।

মহাপরিচালক হওয়ার পর ২০১২ সালের পহেলা এপ্রিল বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের নর্থ গুলশান শাখায় আবদুল মাবুদ একটি ব্যক্তিগত হিসাব (নম্বর ০১৬৮৭০৭০৮০১) খোলেন। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, এই অ্যাকাউন্ট খোলার পরপরই অজ্ঞাত সূত্র থেকে কোটি কোটি টাকা জমা হতে শুরু করে। অ্যাকাউন্টটি খোলার মাত্র ৩ বছরের মাথায় ২০১৫ সালে জমার পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ কোটি টাকা। মোট ৪৮টি লেনদেনের মাধ্যমে এই টাকা জমা হয়। এরপর এই অ্যাকাউন্ট থেকে গত বছর ২৩ এপ্রিল তিনি ৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা উত্তোলন করেন।

ব্যাংকের নথিপত্রে দেখা যায়, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার সময় ওপেনিং ফরমে আবদুল মাবুদের পেশা হিসেবে উল্লেখ আছে সরকারি চাকরি। পদবি হচ্ছে পাসপোর্ট ও বহির্গমন অধিদফতরের মহাপরিচালক। আন্তর্জাতিক ডেবিট কার্ডের জন্য এই অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। এই অ্যাকাউন্টের নমিনি হন তার স্ত্রী নাসিমা খান। ব্যাংকের ফরমে মাসিক আয় হিসেবে লেখা হয় ৮০ হাজার টাকা। অথচ ওপেনিং ব্যালেন্স হিসেবে জমা হয় ৫ হাজার ডলার।

এ সংক্রান্ত গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এবি ব্যাংকের কাকরাইল শাখায় মাবুদ ও তার স্ত্রীর নামে আরও একটি যৌথ হিসাব রয়েছে। এই হিসাবে জমা আছে ৫৭ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। এছাড়া আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ধানমণ্ডি শাখায় মাবুদের একটি ব্যক্তিগত হিসাবে ৫ লাখ এবং আরেকটি হিসাবে ১৪ লাখ টাকা রয়েছে। মাবুদ ও তার স্ত্রী নামে ইস্টার্ন ব্যাংকের মিরপুর শাখাতেও একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। সেখানে বর্তমান স্থিতির পরিমাণ ৩ লাখ টাকা।

এদিকে আবদুল মাবুদের গ্রামের বাড়ি যশোরের শার্শা থানা , শার্শা উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে নিজামপুর ইউনিয়নের কন্দপপুর গ্রামে তিনি এসপি মাবুদ নামেই বেশি পরিচিত। তার পিতার নাম আসের উদ্দিন মুন্সি। ৫ ভাইবোনের মধ্যে আবদুল মাবুদ সবার বড়। তার তিন ভাই আবদুল অহেদ, আবদুল আজিজ ও আবদুল ছাত্তার অর্থনৈতিকভাবে তেমন সচ্ছল নন। গ্রামেই কৃষিকাজ ও ছোটখাটো ব্যবসা করেন তারা। গ্রামের বাড়িতে মাবুদের সম্পদ বলতে আছে ৩ বিঘা কৃষিজমি ও একটি আধা পাকা বাড়ি।

স্থানীয়রা জানান, এসপি মাবুদ এলাকায় তেমন একটা যান না। তিনি ঢাকাতেই থাকেন। এলাকা থেকে ঢাকায় কেউ এলে তিনি সাধ্যমতো সাহায্য সহযোগিতা করেন। এলাকায় কিছু উন্নয়নমূলক কাজও করেছেন। নিজেকে আওয়ামী রাজনীতির সমর্থক বলে পরিচয় দিলেও আবদুল মাবুদ স্থানীয় রাজনীতিতে সরাসরি সক্রিয় নন। তবে আওয়ামী লীগের দলীয় উচ্চপর্যায়ে ভালো যোগাযোগ থাকায় গত ইউপি নির্বাচনে স্থানীয় প্রার্থী মনোনয়নে তিনি কয়েকজনের পক্ষে সুপারিশ করেন। এর মধ্যে মাত্র একজন নৌকা প্রতীক নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এর বাইরে স্থানীয়রা তেমন কিছুই জানেন না।

আবদুল মাবুদ আরও যা বললেন
পাসপোর্টের মহাপরিচালক থাকাকালীন একাধিক ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আবদুল মাবুদ মঙ্গলবার তেজগাঁও বিমানবন্দর সড়কে তার পত্রিকা অফিসে বসে প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি পাসপোর্ট অফিস থেকে চলে এসেছি। তাই পাসপোর্ট সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে মন্তব্য করব না।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ৮ কোটি টাকার লেনদেন সম্পর্কে তিনি বলেন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডে তার কোনো অ্যাকাউন্ট নেই। এছাড়া এবি ব্যাংকের কাকরাইল শাখা বা ইস্টার্ন ব্যাংকের মিরপুর শাখায় তার কোনো অ্যাকাউন্ট আছে কিনা তা এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। তিনি বলেন, ডিজি হিসেবে পাসপোর্ট অধিদফতরে দায়িত্ব পালনের সময় সুনামের সঙ্গেই দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করেছেন। এখন ব্যাংকে টাকা-পয়সার কথাবার্তা বলে তার কষ্টার্জিত সুনাম ক্ষুণ্ণের চেষ্টা হচ্ছে।

এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, সরকারি কর্মকর্তা হোন বা যেই হোন না কেন তার ব্যাংক হিসাবে বৈধ আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ লেনদেন স্বাভাবিকভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। তদন্তে তার অর্থসম্পদের বৈধতা প্রমাণিত হলে তিনি দায়মুক্তি পাবেন। অন্যথায় আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়াটাই হবে যুক্তিযুক্ত।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন