আজ রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ ইং, ১০ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



অভূতপূর্ব অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক জয় বাংলাদেশ ২২০ ও ২৯৬ * ইংল্যান্ড ২৪৪ ও ১৬৪ * বাংলাদেশ ১০৮ রানে জয়ী

Published on 31 October 2016 | 3: 34 am

চোখের পলকে স্টাম্পগুলো উঠে এলো এক একজনের হাতে। মিরপুরের বিকেল তখন সোনা রঙে রাঙানো। ‘আহা, কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে’! টেস্টের দু’দিন বাকি থাকতে বাংলাদেশ জয়ী। অসম্ভবকে সম্ভব করার জিয়ন কাঠি যে মেহেদী হাসান মিরাজ। আচমকা আবারও মাঠের মধ্যে ঢুকে পড়লেন মুশফিকুর রহিমরা। সবাই গোল হয়ে দাঁড়ালেন। ঐতিহাসিক জয় নিয়ে মুশফিক কিছু একটা বলার পর ঘুরে ঘুরে নাচতে শুরু করলেন টাইগাররা। ‘গোল বৃত্তের’ মাঝখানে ঢুকে গেলেন মুমিনুল হক ও তাইজুল ইসলাম। উৎসবের মধ্যমণি তখন মেহেদী হাসান মিরাজ। ইংল্যান্ড যখন নয় উইকেট হারিয়েছে, তখন থেকেই গ্যালারিতে দর্শকরা স্যালুট দিয়ে দাঁড়িয়ে। কাকে স্যালুট জানালেন দর্শকরা? সেটা তারাও জানেন না হয়তো! এটা তো সাকিব আল হাসানের আবিষ্কার। তার কিছুক্ষণ আগেই বেন স্টোকসকে বোল্ড করে ড্রেসিংরুমের দিকে স্যালুট দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সাকিব। সেটারই অনুকরণ গ্যালারিতে। মিরপুরের সূর্য তখন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। ফ্লাডলাইটের আলো জ্বলেছে। পশ্চিমের সিঁদুর রাঙানো আলোর চাইতে টাইগারদের জয়টাই বেশি উজ্জ্বল হয়ে থাকল মিরপুরে। চট্টগ্রামে মুঠো থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল জয়। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অধরা সেই স্বপ্ন ধরা দিল শেষতক। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের নায়ক সদ্য ১৯ পেরোনো মেহেদী হাসান মিরাজ। ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজের ছয়ের সঙ্গে সাকিবের চার উইকেটে ইংলিশরা অলআউট ১৬৪ রানে। ২৭৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে তৃতীয়দিনেই ১০৮ রানে হারল অ্যালিস্টার কুকের দল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও জিম্বাবুয়ের পর তৃতীয় কোনো দেশের বিপক্ষে এটাই বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। ক্রিকেটের জনকদের তিনদিনে হারিয়ে নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় যোগ করল টাইগাররা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক প্রথম টেস্ট জয়ে দুই ম্যাচের সিরিজ হল ১-১। তৃতীয়দিনের শেষ সেশনে বাংলাদেশ ১০ উইকেট নিয়ে কুকদের সিরিজ জিততে দিল না।
স্টিভেন ফিনকে এলবিডব্লু দেয়ার সঙ্গেই দু’পাশ থেকে উইকেট তুলে নেয়া শেষ মেহেদী-সাকিবদের। এরই মধ্যে রিভিউ চেয়ে বসলেন ফিন। ইংল্যান্ডের দুটি রিভিউ যে আগেই শেষ। খেয়ালই নেই ফিনের! এ ম্যাচ জিততে হলে ইংল্যান্ডকে রেকর্ড গড়তে হতো। এশিয়ার মাটিতে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ ২০৯ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড ছিল। সেটাও ঢাকায় বাংলাদেশের বিপক্ষে। কাল বাংলাদেশ ২৯৬ রানে অলআউট হওয়ার পর ইংল্যান্ডের লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৭৩ রান। তখনই স্বাগতিকরা জয় দেখতে শুরু করে। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টেস্টে অষ্টম জয় পেল বাংলাদেশ। এর আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুটি এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পাঁচটি টেস্ট জিতেছে টাইগাররা। ম্যাচ ও সিরিজসেরা হয়ে অভিষেকটা স্মরণীয় করে রাখলেন মিরাজ। দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে এই অফ-স্পিনার নিয়েছেন ১২ উইকেট। দুই টেস্ট মিলিয়ে ১৯টি! দীর্ঘ ১৫ মাস পর টেস্ট খেলতে নেমে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এমন অবিস্মরণীয় জয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ অলআউট হয় ২২০ রানে। দ্বিতীয় ইনিংসে করে ২৯৬। ইংল্যান্ড ২৪৪ এবং ১৬৪ রানে অলআউট হয়।

বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অ্যালিস্টার কুক ও বেন ডাকেট দারুণ শুরু করেছিলেন। ২৩ ওভারেই কোনো উইকেট না হারিয়ে ১০০ রান তুলে ফেলেন তারা। বাংলাদেশ শিবিরে কিছুটা ভয় ধরে গেলেও সাহস হারাননি মুশফিকরা। কিন্তু কালই যে তাদের অলআউট করা সম্ভব হবে, সেটা ভাবতে পারেনি স্বাগতিকরা। মুশফিক বলেন, ‘বিশ্বাস ছিল একটি উইকেট নিতে পারলে তাদের আবার চাপে ফেলা যাবে। কিন্তু আজই (কাল) অলআউট করতে পারব, এতটা ভাবিনি।’ কাল বাংলাদেশ সফরে ওপেনিংয়ে ইংল্যান্ড সবচেয়ে ভালো জুটি গড়েছে মাহমুদউল্লাহর কল্যাণে। মেহেদী হাসানের বলে স্লিপে মাহমুদউল্লাহ ক্যাচ না ছাড়লে ১২ রানেই ফিরতে পারতেন ডাকেট। পরে সেই মেহেদীর বলেই যখন বোল্ড হয়েছেন, তখন তার রান ৫৬। তৃতীয় সেশনের প্রথম বলটাই ডাকেটের ব্যাট-প্যাড ফাঁকি দিয়ে স্টাম্প ভেঙে দেয়। দু’হাত পাখির ডানার মতো ছড়িয়ে যেন উড়তে থাকেন মিরাজ। পরের ওভারেই জো রুটকে ফিরিয়ে দেন সাকিব। এরপর আবার মেহেদী পরপর দুই ওভারে দুই উইকেট নিলে ইংল্যান্ডের স্কোর ১০০/০ থেকে নিমিষেই ১২৪/৪ হয়ে যায়। বাংলাদেশের পথের কাঁটা তখনও অধিনায়ক কুক। ব্যক্তিগত ৪৮ রানের সময়ই সাকিবের বলে এলবিডব্লু দেন আম্পায়ার। কিন্তু রিভিউ-ভাগ্যে বেঁচে যান কুক। তাকে ফেরানোর জন্য মিরাজের বলে আরও একবার রিভিউ নিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেখানেও বেঁচে যান ইংলিশ অধিনায়ক। বাধা সরিয়েছেন মিরাজ। তাকে ফেরাতে অবশ্য মুমিনুলের কৃতিত্বও ছিল অনেক। সিলি-পয়েন্টে তার দারুণ ক্যাচটি নেন মুমিনুলই।
পাঁচ উইকেট তুলে নেয়ার পরও বাংলাদেশ ভাবতে পারেনি তৃতীয়দিনেই তাদের অলআউট করা যাবে। ইংল্যান্ডের লেজের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে একটা ভয় ছিল স্বাগতিকদের। এ লেজের ব্যাটসম্যানরাই তো প্রথম ইনিংসে দলকে লিড এনে দিয়েছেন। লেজ ছাঁটতে সাকিব সব সময়ই পারদর্শী। কালও নিলেন সেই গুরুদায়িত্বটা। কুকের পর পথের কাঁটা ছিলেন বেয়ারস্টো ও বেন স্টোকস। বেয়ারস্টোকে ফিরিয়েছেন মিরাজ। পুরো সফরে আতংক ছড়ানো স্টোকস তখন আক্রমণাত্মক মেজাজে ব্যাট করেছেন। ২০ রানের সময় আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে এলবিডব্লু হওয়ার পরও রিভিউতে বেঁচে যান। পাঁচ রান পরে সেই সাকিবের বলে বোল্ড স্টোকস। পরের তিন বলের ব্যবধানে রশিদ ও আনসারিও বিদায় নিলে ইংল্যান্ডের স্কোর ১৬১/৯। শেষ উইকেটটি যেন তোলা ছিল মিরাজের জন্যই। ফিনকে এলবিডব্লু করে মিরাজ তখন একটি স্টাম্প তুলে নিয়ে ভোঁ দৌড়।
এর আগে বাংলাদেশের বড় লিডের পেছনে ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে ভাগ্যও কিছুটা কাজ করেছে। চারবার জীবন পেয়েছেন তিন ব্যাটসম্যান ইমরুল কায়েস, সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম। সকালে মঈন আলীর বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যান ইমরুল। এ সময় ৭৪ রানে ব্যাট করছিলেন বাঁ-হাতি ওপেনার। লাফিয়ে উঠা বল ব্যাটের কানায় লেগে যায় জো রুটের কাছে। কিন্তু ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা ফিল্ডার বল হাতে জমাতে পারেননি। এর আগে জাফর আনসারির বলে লেগ-স্লিপে অ্যালিস্টার কুককে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যান তিনি। তখন তার রান ছিল ৬৭। পরে জাফর আনসারির বলে স্টিভেন ফিনকে ক্যাচ দিয়েও বেঁচে যান মুশফিকুর। বাংলাদেশ অধিনায়কের রান তখন ৬। ইংল্যান্ডের বাঁ-হাতি স্পিনার আনসারির বলে চারের পর ছক্কা হাঁকানোর চেষ্টায় সহজ ক্যাচ দেন সাকিব। ডিপ মিডউইকেটে বেন ডাকেটের অবিশ্বাস্য ব্যর্থতায় ২৩ রানে জীবন পান তিনি। আগের দিনের তিন উইকেট নিয়ে খেলতে নেমে কাল বাংলাদেশ আরও ১৪৪ রান যোগ করতে পেরেছে ইমরুল-সাকিবের কারণে। ইমরুল শেষ পর্যন্ত ৭৮ রানে মঈন আলীর শিকার হয়েছেন। আর সাকিব ফিরেছেন ৪১ রান করে। ৫০তম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে মুশফিক করলেন ৯ রান। কাল অবশ্য বাংলাদেশের লেজের ব্যাটসম্যানরা বেশ কিছু রান যোগ করেছেন। শুভাগত হোমের ২৮ বলে অপরাজিত ২৫ এবং শেষ ব্যাটসম্যান রাব্বির ৭ রানে ২৯৬ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন