আজ শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮ ইং, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে স্তন ক্যান্সার জয় করা সম্ভব ।। সচেতনতায় ব্যাংকক হসপিটাল ও চমেক হাসপাতালের সমঝোতা স্মারক সই

Published on 31 October 2016 | 3: 04 am

স্তন ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হলেই মৃত্যু, এমন ধারণা ঠিক নয়। এ রোগ অবশ্যই জয় করা সম্ভব। এই ক্যান্সার জয়ের অসংখ্য প্রমাণ আছে। আমি নিজেও এর প্রমাণ।’ কথাগুলো বলছিলেন সানসাইন গ্রামার স্কুল এন্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ সাফিয়া গাজী রহমান। স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর এই দুরারোগ্য রোগ জয়ের গল্প বলতে গিয়ে আবেগেআপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, ‘সবার ধারণা স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে আর নিস্তার নেই, জীবনের আশা নেই। কিন্তু আমি এই রোগে আক্রান্ত হলেও এর সাথে যুদ্ধ করেছি।

যুদ্ধে জয়ী হয়েছি। ফল স্বরূপ আজও বেঁচে আছি। আজ সবখানে দাড়িঁয়ে গৌরবের সাথে বলতে পারিআমি একজন ক্যান্সার যোদ্ধা।’ সাফিয়া গাজী রহমান বলেন, ‘আমি শিক্ষিত ছিলাম। কিন্তু এ রোগ নিয়ে সচেতন ছিলাম না। তাই আক্রান্ত হলেও বুঝতে পারিনি। সব কিশোরীনারীর প্রতি আমার অনুরোধ, এ রোগ নিয়ে নিজেকে সচেতন হতে হবে সবার আগে। নিজেকেই পরীক্ষানিরীক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনে মহিলা চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে হবে। মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে সনাক্ত করা গেলে এ রোগ অবশ্যই জয় করা সম্ভব। আমি নিজেই যার প্রমাণ।’

গতকাল দুপুরে নগরীর একটি হোটেলে স্তন ক্যানসার বিষয়ে সচেতনতায় ব্যাংকক হসপিটাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের একটি সমঝোতা স্মারক সই অনুষ্ঠানে নিজের ক্যান্সার জয়ের এ গল্প শোনান সাফিয়া গাজী রহমান। আর এই গল্পের মাধ্যমেই স্তন ক্যান্সার নিয়ে নারীদের এখন থেকেই সচেতন হওয়ার আহবান জানান এই ক্যান্সার যোদ্ধা। আর প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত করাটাই এ রোগের জন্য অতি জরুরি বলে অভিমত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ বক্তারা।

সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে চমেক হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহায়তায় বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ লাখ নারীকে স্তন ক্যানসার বিষয়ে সচেতন করবে ব্যাংকক হসপিটাল। চমেক হাসপাতালের পক্ষে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন এবং ব্যাংকক হসপিটালের পক্ষে প্রফেসর ড. সুপাকর্ন রোজানানিন ও ড. নীলাঞ্জন সেন স্মারকে সই করেন। এসময় অন্যান্যের মাঝে দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক, চিত্রশিল্পী ঢালী আল মামুন, চিত্রশিল্পী দিলারা বেগম জলি, ইক্যুইটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মইনুল ইসলাম মাহমুদ, চমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. দিদারুল ইসলাম, চমেক হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. আশরাফ আলী, সার্জারি বিভাগের সাবেক প্রধান প্রফেসর ডা. ওমর ফারুক ইউসুফ, গাইনী বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. শাহানারা চৌধুরী, প্রফেসর খন্দকার এ কে আজাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

স্মারক সই অনুষ্ঠানে চমেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘স্তন ক্যান্সার সারা বিশ্বের জন্য একটি আতংকজনক রোগ। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ব্যাংকক হসপিটালকে আন্তরিক ধন্যবাদ, স্তন ক্যান্সার সচেতনতায় তারা আমাদের এই হাসপাতালটিকে (চমেক হাসপাতাল) বেছে নিয়েছেন।’ ব্যাংকক হসপিটালের পক্ষে ড. নীলাঞ্জন সেন বলেন, ‘স্তন ক্যান্সার যত দ্রুত সনাক্ত করা যায় ততই রোগীর জন্য ভালো। এটি সনাক্তে দেরি হয়ে গেলে মারাত্মক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। তাই এই রোগে সচেতনতার বিকল্প নেই। আমরা সবাইকে নিয়ে এই সচেতনতার কাজটি করতে চাই। সবাইকে সচেতন করতে চাই।’ চমেক হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. আশরাফ আলী বলেন, ‘চিকিৎসা এ রোগের জন্য সফলতা নয়। এ রোগের সফলতা হলো শুরুতেই সনাক্ত করতে পারা। প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত করতে পারলে এ ক্যান্সার অবশ্যই জয় করা সম্ভব।’

চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই এ রোগ থেকে মুক্ত থাকার সর্বোত্তম উপায় উল্লেখ করে দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, ‘আতঙ্কের বিষয় যেএ রোগ শুধু নারীদের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। পুরুষদেরও আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তাই শুধু নারীদের নয় এ নিয়ে সচেতন হতে হবে পুরুষকেও। অবশ্য এ রোগে আক্রান্ত হলেই মৃত্যু অবধারিতএমন ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের সামনে সাফিয়া গাজী রহমানই এর প্রমাণ।’ ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতা মূলক যে কোন তথ্য মানুষ জানতে চায় উল্লেখ করে এম এ মালেক বলেন, ‘আমাদের পত্রিকা এ সম্পর্কিত তথ্যখবর পরিবেশনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে। এরপরও এ নিয়ে কোন বিস্তারিত তথ্য থাকলে তা আপনারা সরবরাহ করুন। পত্রিকায় সে সব ছাপিয়ে আরো বেশি সচেতনতা সৃষ্টিতে আমরা ভূমিকা রাখতে চাই।’

স্তন ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন চিত্রশিল্পী ঢালী আল মামুন। ব্যাংকক হসপিটালের সিনিয়র মেডিকেল কোঅর্ডিনেটর ডা. মোহাম্মদ তানভীর হাবিবের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেনপ্রফেসর ডা. শাহানারা চৌধুরী, প্রফেসর ওমর ফারুক ইউসুফ, প্রফেসর খন্দকার এ কে আজাদ, ডা. ফারাহ চৌধুরী প্রমুখ। এর আগে একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজন করা হয় সংবাদ সম্মেলনের। সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকক হসপিটালের রালফ ক্রুয়ার, পাভিনা পালাদশ্রিচুয়ে, প্রায়ুরাপাট শ্রিরাত, ফয়সাল আনোয়ার প্যাট্রিক, ডা. শক্তি রঞ্জন পাল, প্রফেসর সুপাকর্ন রোজানানিন, ডা. ফারাহ চৌধুরী, ডা. নীলাঞ্জন সেন এবং চমেক হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সাবেক প্রধান ডা. ওমর ফারুক ইউসুফ প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।

লিখিত বক্তব্যে ব্যাংকক হসপিটালের সিনিয়র মেডিকেল কোঅর্ডিনেটর ডা. মোহাম্মদ তানভীর হাবিব সংবাদ সম্মেলনে জানান, ‘স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং ও সচেতনতা’ প্রকল্পের আওতায় নারীদের প্রাথমিক অবস্থায় স্তন ক্যানসার সনাক্তকরণ এবং গড় আয়ু বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করা হবে। এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করায় উৎসাহ প্রদান, স্তন পরীক্ষার নির্দেশাবলি তৈরি এবং উচ্চ ও মধ্যম ঝুঁকির রোগী সনাক্তকরণ। উন্নত দেশে স্তন ক্যানসার সনাক্তে ম্যামোগ্রাম বেছে নেওয়া হয়। এ পদ্ধতি তুলনামূলক ব্যয়বহুল ও সহজলভ্য নয়।

তিনি বলেন, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী নারী ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্তন ক্যানসারে ভোগেন, প্রায় ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যারিয়ারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছেপ্রতি বছর ১৪ হাজার ৮২২ জন স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং এতে মৃত্যুহার ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ।

ডা. তানভীর বলেন, ব্যাংকক হসপিটাল চমেক হাসপাতালের মাধ্যমে ৫ লাখ নারীকে স্তন ক্যানসার সচেতন করার লক্ষ্যে এ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিনামূল্যে এ সেবা দেওয়া হবে। বিশেষ করে হাসপাতালে আসা বহির্বিভাগের রোগী, তৈরি পোশাকশিল্প, বস্তির নারীদের সচেতন করতে প্রচারাভিযান চালানো হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডাক্তার ও সেবিকাকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও নিয়োগ দেওয়া হবে বলেও জানান ডা. তানভীর। চমেক হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সাবেক প্রধান ডা. ওমর ফারুক ইউসুফ বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে ক্যান্সার ধরা পড়লে সারানো যায়। সরকার পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। চমেক ও ব্যাংকক হসপিটালের যৌথ উদ্যোগে স্তন ক্যান্সার নিয়ে গৃহীত প্রকল্প নিয়ে আমরা আশাবাদী। নারীদের জন্যে মরণব্যাধি হিসেবে পরিচিত এ ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যে সচেতনতামূলক লড়াই তা সফল হবে যদি গণমাধ্যম এ বিষয়ে প্রচার করে। তখন সংশ্লিষ্টরা জানবেন চমেক হাসপাতালে স্তন ক্যান্সার সম্পর্কিত দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে। ডা. ফারাহ চৌধুরী বলেন, লজ্জা, ভয় ও অর্থনৈতিক কারণে সমস্যা বুঝতে পেরেও অনেকে ডাক্তারের কাছে যান না। তখন ক্যানসার বাসা বাঁধে, ছড়িয়ে পড়ে। যত দ্রুত আমরা স্তন ক্যান্সার শনাক্ত করতে পারবো ততই জীবন রক্ষা করা সম্ভব। ডা. শক্তিরঞ্জন পাল বলেন, যেকোনো ক্যান্সার যত দ্রুত সনাক্ত হবে তত আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা বেশি। নারীদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সারই বড় সমস্যা। লাজুক হওয়ায় অনেকে স্তনে চাকা, গোটা বা অস্বাভাবিক কিছু উপলব্ধি করার পরও ডাক্তারের কাছে যান না। তাই নারী চিকিৎসকের মাধ্যমে চমেক হাসপাতালে স্তন ক্যান্সার পরীক্ষা এবং নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষার পদ্ধতি শিখিয়ে দেওয়ার আমাদের এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশাবাদী।

 


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন