আজ শুক্রবার, ২২ জুন ২০১৮ ইং, ০৮ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



বাংলাদেশের মূল সংবিধানের ৯৮নং পৃষ্ঠায় বাবার সেই স্বাক্ষর আমাদেরকে আজীবন মাথা উঁচু করে কথা বলার সাহস যোগাচ্ছে

Published on 27 October 2016 | 7: 49 am

:: সারওয়ার হাসান জামীল (সামীম) ::
আমার পিতা মরহুম এম. ওবাইদুল হক সাবেক সংসদ সদস্য সন্দ্বীপ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আপাদমস্তক একজন ভিন্ন প্রকৃতি মানুষ ছিলেন। বাংলাদেশের অন্য দশজন মানুষের সাথে তার কথাবার্তা, আচার আচরণ এবং চালচলনে কোনরূপ মিল ছিলনা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এক ধরনের ভিন্ন স্বকীয়তা নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। এ ধরনের ক্ষনজন্মা চরিত্রের একজন লোকের সন্তান হয়ে দু-কলম কিছু লিখা কিন্তু খুব সহজ কাজ নয়। তবুও দূর থেকে বা কাছ থেকে আমি আমার বাবাকে যতটুকু দেখেছি বা জেনেছি তা অত্যন্ত সংক্ষেপে পাঠকদেরকে অবহিত করার জন্য বাবার জীবনালোখ্য সংক্ষেপে লিখার চেষ্টা করছি।
ইতিহাসের স্বর্ণালী সব অধ্যায়ের ধারক প্রিয় জন্মভূমি সন্দ্বীপকে আলোকিত করার জন্য যে ক’জন আলোকিত মানুষ আজীবন নিরালস কাজ করে গেছেন, তাদের মধ্যে আমার প্রাণ প্রিয় পিতা এম. ওবাইদুল হক ছিলেন অগ্রগন্য। সারাজীবন সংগ্রাম করা আমার পিতা তার জ্ঞান-গরিমা, কর্মোদ্দীপনা আর সাহসিকতা দিয়ে সন্দ্বীপ তথা দেশের জন্য অনেক অনেক অবদান রেখে গেছেন। উচ্চাসীন হয়ে আছেন সন্দ্বীপের জনপদে সাধারণ মানুষের মনিকোঠায়। তিনি পরম সাহসিকতায় নিজেকে জড়িত করেছিলেন বাংলাভাষা আন্দোলনে, আর ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে, যুদ্ধ পরবর্তী বিধ্বস্ত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সমাজসেবা এবং রাজনীতিতে। তার এসব অবদান অক্ষয়-অম্লান হয়ে থাকবে চিরদিন।
আমার পিতা ইংরেজী ১৯২৯ সালের ১লা ফেরুয়ারী সন্দ্বীপের গাছুয়া ইউনিয়নের হেদন আলী সওদাগরের  বাড়ীতে (বর্তমানে ওয়াছেক মোক্তারের বাড়ীতে) বাবা মৌলভী আবদুল খালেক ও মা জান্নাতুর নূর এর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। দুই ভাই আর তিন বোনের মধ্যে বাবা ছিলেন সবার বড়। আমার দাদা ভাই ছিলেন অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির মানুষ। অপরদিকে আমার বাবা ছিলেন ঠিক তার বিপরীত চরিত্রের। বাবা ছোট বেলা থেকে আমৃত্যু পর্যন্ত অত্যন্ত সাহসী আর দূরন্ত প্রকৃতির ছিলেন।
বাবার শিক্ষাজীবন শুরু হয় সন্দ্বীপের সন্তোষপুর পাইমারী স্কুল থেকে। গাছুয়ায় জন্মগ্রহণ করলেও পরিবার বড় হয়ে যাওয়ায় আমার বড় দাদা গাছুয়া-সন্তোষপুর সীমানায় সন্তোষপুরে নূতন একটা বাড়ী তৈরী করে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। চতুর্থ শ্রেনী পর্যন্ত বাবা সন্তোষপুর প্রাইমারি স্কুলে লেখাপড়া করেন। পরে মুছাপুর এম.ই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন। ঐ স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেনী পর্যন্ত পড়াশুনা করে পরবর্তীতে কাঠগড় গোলাম নবী হাইস্কুলে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৪৪ সালে কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। সে বছর পুরো সন্দ্বীপ থেকে একমাত্র আমার পিতাই প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

এই কৃতিত্বের জন্য তিনি মোহামেডান স্পেশাল স্কলারশীপ অর্জন করেন। লেখাপড়া করে অনেক বড় হবার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সে সময় সারা বাংলা জুড়ে প্রচন্ড দূর্ভিক্ষের কারনে দুঃসহ পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাত্র ১২ টাকা বেতনে কাঠগড় সিনিয়র মাদ্রাসায় ইংরেজী শিক্ষক হিসাবে চাকরি নেন।

এ পরিস্থিতিতে মাত্র ৫ মাস চাকরি করার পর তিনি সন্দ্বীপ রেশনিং অফিসে ক্লার্ক পদে যোগ দেন। এই চাকরিতে যোগ দিতে ঘটে আরেক বিপত্তি। বাবার বয়স খুব অল্প ছিল বিধায় তাকে চাকরিতে নিতে না চাইলেও নির্বাচনী পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করায় এবং তৎকালীন সময়ে সন্দ্বীপের স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব নূরুল আহাদ মোকতারের চেষ্টায় বাবা ঐ চাকরিতে যোগ দিতে সক্ষম হন। কিন্তু এই চাকরিতেও বাবা বেশিদিন টিকতে পারলেন না। বড় মানুষ হবার তীব্র আকাঙ্খা ও বাসনায় মাত্র ৭ মাস চাকরি করে সন্দ্বীপ এর মায়া ত্যাগ করে সুদূর ঢাকার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। ঢাকায় গিয়ে অনেক কষ্টে তিনি “আহসান উল্লাহ্ স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং” (বর্তমানে বুয়েট) এ ভর্তি হন। ইঞ্জিনিয়ারিং এ ডিপ্লোমা পরীক্ষা শেষের পরপরই তিনি ঢাকা ডেভেলপমেন্ট ডিভিশন-১ এ সার্ভেয়ার পদে যোগ দেন। পরে চট্টগ্রামে একই পদে বদলী হয়ে চলে আসেন। চট্টগ্রামে চলে আসার পর বাবার ডিপ্লোমা পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয় এবং কৃতিত্ত্বের সাথে ডিপ্লোমা ডিগ্রী অর্জন করেন।

এরপর বাবা সিএন্ডবি ’তে (বর্তমানে গণপূর্ত বিভাগ) বিল্ডিং ডিভিশনে শিক্ষানবীশ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন। নিজের মেধা, যোগ্যতা ও কর্মতৎপরতার স্বাক্ষর রেখে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি উক্ত প্রতিষ্ঠানের সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে পদোন্নতি পান। এ পদে থাকাকালীন সময়ে তিনি চট্টগ্রামের উল্লেখযোগ্য স্থাপনা নির্মানে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। তার সুনিপুন তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রাম শহরের দেওয়ান বাজারস্থ সিএন্ডবি কলোনী, ডি.আই.জি অফিস, এফ.আই.ডি.সি প্লান্ট, কালুরঘাট ও বায়েজীদ বোস্তামী শিল্প এলাকা, দেওয়ানহাট ও মনসুরাবাদ এলাকার উন্নয়ন সাধিত হয়।

১৯৫৮ সালে সামরিক সরকার জেনারেল আইয়ুব খানের আমলে মার্শাল’ল জারি হবার পর “হাউজিং এন্ড সেটেলমেন্ট” নামক একটি নুতন বিভাগ চালু করা হয়। এটি মূলত ভারত থেকে আসা রিফিউজিদের বসত বাড়ীর ব্যবস্থা করার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ সময় বাবাকে এক প্রকার জোর করে ঐ বিভাগে ন্যস্ত করা হয়। তার অগাধ পরিশ্রমী কর্মকান্ডের কারনে তাকে হালিশহর এলাকা অধিগ্রহন করে তাতে রিফিউজী ভবন নির্মান ও এলাকার রাস্তাঘাট নির্মানের দায়িত্ব দেয়া হয়।

আজকের আধুনিক হালিশহরের গোড়াপত্তন হয় আমার বাবার হাত ধরেই। সন্দ্বীপের এই কৃতি সন্তানের হাত ধরেই স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নূতন করে হালিশহরে বাবার সাহায্য সহযোগীতায় সন্দ্বীপের লোকজনদের বসতি করার যাত্রা শুরু হওয়ার সুবাদে হালিশহর আজ সন্দ্বীপবাসী অধ্যূষিত এলাকায় পরিনত হয়েছে।
পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে বাবা এক্সিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার পদে পদোন্নতি পেয়ে ঢাকার মিরপুরস্থ হাউজিং সেটেলমেন্ট অফিসে বদলি হন। ঢাকায় বদলি হয়ে তিনি সেখানে যোগ না দিয়ে সরকারী চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহন করেন। ঐ বছরের আগষ্ঠ মাসে তিনি তার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ুয়া সমপাঠী বন্ধুদেরকে নিয়ে গড়া পাকিস্থানের প্রথম সিরামিক কারখানা “পাকিস্তান সিরামিক ইন্ডাষ্ট্রীজ লিঃ” স্পন্সর ডাইরেক্টর হিসাবে একজন অংশিদার হন এবং অপারেটিভ ডাইরেক্টর পদে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাবা ঐ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদে জড়িত ছিলেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে “পিপলস্ সিরামিক ইন্ডাষ্ট্রীজ লিঃ” রাখা হয়। এই প্রতিষ্ঠানটিকে বিদেশী পণ্যের সাথে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকা এবং পণ্যের গুনগত মান ঠিক রাখার জন্য আমার বাবা অমানুষিক পরিশ্রম করে গেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় আজ বাংলাদেশে অনেকগুলো আন্তর্জাতিক মানের সিরামিক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

চট্টগ্রাম শহরের ষ্ট্রান্ড রোডে “এস.জামীল ব্রাদার্স” নামে একটি সল্ট ইন্ডাষ্ট্রীজ ও প্রতিষ্ঠা করেন। সরকারী চাকুরীতে থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে বাবা চট্টগ্রামস্থ নাসিরাবাদ মহিলা কলেজ, সরকারী কমার্স কলেজ ও সিটি কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজেও বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। অবসর সময়ে আমার বাবা নিজে মানুষের ব্যক্তিগত বিল্ডিং এর ডিজাইন এবং নির্মান কাজে নিয়োজিত থাকতেন। এইভাবে চট্টগ্রাম শহরে প্রচুর ব্যক্তিগত বাড়ি-ঘর তার তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়। পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী ডঃ ইউনুস সাহেবদের বাসটিও আমার বাবার হাতের গড়া।
এতসব কর্মকান্ডের পরেও সন্দ্বীপের উন্নয়নে আমার বাবার মত অগ্রনী ভূমিকা আর কেউ পালন করতে সক্ষম হননি। এম.পি. থাকাকালীন সময়ে (১৯৭২-১৯৭৫) ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম সাধিত হয়। সন্দ্বীপের সকল জনগন তা স্বীকার করেন। বাবা নিজে একজন প্রকৌশলী ছিলেন  বলে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সন্দ্বীপের রাস্তাঘাটের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। ভাঙ্গন কবলিত সন্দ্বীপের জন্য ক্রসড্যাম স্কীম তিনিই প্রথম সরকারের কাছে পেশ করেন।

ক্রসড্যামের ব্যাপারে তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে এত বেশী ধর্না দিয়েছিলেন যার কারনে বাবাকে দেখামাত্র বঙ্গবন্ধু সবাইকে বলতেন “ওবাইদ আমার ক্রসড্যাম এম.পি”। যা বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও অবগত আছেন। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে জননেত্রী শেখ হাসিনা সন্দ্বীপ গিয়েছিলেন অনেকগুলো উন্নয়নমূলক প্রকল্প উদ্ধোধন করতে। আমিও তখন ব্যক্তিগত ভাবে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করার জন্য সন্দ্বীপ উপজেলা কমপ্লেক্সের রেষ্ট হাউজে গিয়েছিলাম। পরিচয় দেয়ার সাথে সাথে উনি কমপ্লেক্সে চট্টগ্রামের সকল নেতৃস্থানীয় নেতাদেরকে বললেন “ও হচ্ছে আমাদের ক্রসড্যাম এম.পি’র ছেলে। আমার বাবা ওর বাবাকে ক্রসড্যাম এম.পি হিসাবে ডাকতেন”।

এ প্রসঙ্গ বলতে গিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা আমার বাবা সম্বন্ধে অনেক কথাই উপস্থিত নেতৃবৃন্দের সামনে অকপটে বলে গেছেন। নেত্রী যখন বাবা সম্বন্ধে সবাইকে বলে যাচ্ছিলেন আমি তখন আবেগে অনেকটা আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম। নিজেকে তখন অনেক ভাগ্যবান বলে মনে হচ্ছিল।

আজ কুমিরা-গুপ্তছড়া ফেরী ঘাটে যে জাহাজ চলাচল করছে সেই ফেরী ঘাটে ১৯৭৪ সনে বড় ধরনের এক লঞ্চ দূর্ঘটনায় সন্দ্বীপের অনেক নামিদামী লোকের প্রাণ হানি ঘটেছিল। এটার মর্ম উপলদ্ধি করে আমার বাবা ১৯৭৪ সনেই মহান মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে মুক্তি বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী (তৎকালীন নৌ-মন্ত্রী) সাহেবকে এক প্রকার জোর করে কুমিরা-গুপ্তছড়া-মাইটভাঙ্গা ঘাটে ষ্টীমার সার্ভিস চালু করেছিলেন। সংসদ সদস্য থাকাকালীন অতি অল্প সময়ে তিনি সন্দ্বীপে ৩টি হাইস্কুল ও ৪৭ টি সরকারী প্রাইমারী স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। সন্দ্বীপের এতিমখানা সমূহে কারিগরি শিক্ষা চালু করেন। সন্দ্বীপের গাছুয়ায় তিনি বিশাল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জমি বিনামূল্যে সরকারকে প্রদান করেন। যা বর্তমানে সন্দ্বীপ উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স নামে পরিচিত। হাসপাতালের পার্শ্বেই ১৯৬৫ সনে চট্টগ্রাম শহরের নিজের আবাসিক বাড়ী বিক্রির টাকা থেকে প্রায় দ’ুলক্ষ টাকা খরচ করে সন্দ্বীপের বুকে প্রথমবারের মত দ্বিতল ভবনের একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। যার নাম এ. কে. (আবদুল খালেক) একাডেমী গাছুয়া। স্কুল ভবনটিকে তিনি আমার দাদার নামে উৎসর্গ করেন।

সন্দ্বীপের ইতিহাসে সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়নে তিনি মাইলফলক হয়ে থাকবেন। তার সময়ে পুরো সন্দ্বীপে ৯১টি কালভার্ট নির্মিত হয়। তিনি ঢাকায় গিয়ে মন্ত্রীদের সাথে ঝগড়া করে সন্দ্বীপের উন্নয়নের জন্য বরাদ্ধ নিয়ে আসতেন। যুদ্ধ বিধ্বস্থ দেশ, ভঙ্গুর অর্থনীতি, চারিদিকে শুধু অভাব আর অভাব। তার মাঝেও আমার বাবা দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না।

ঐতিহাসিক কার্গিল হাই স্কুল ও সাউথ সন্দ্বীপ হাই স্কুলের উন্নয়নে বাবা ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। বাবা চট্টগ্রামস্থ সন্দ্বীপ এসোসিয়েশন ও সন্দ্বীপ এডুকেশন সোসাইটির দীর্ঘদিন সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক হিসাবেও জড়িত ছিলেন। সন্দ্বীপ এসোসিয়েশনের যেটুকু মূল্যবান সম্পত্তি আজ অব্দি হয়েছে সেটি ক্রয় করতে বাবা বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। রাজনীতি সচেতন হওয়া সত্ত্বেও ছাত্রাবস্থায় বাবা সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হননি। সন্দ্বীপের অনেকই হয়ত জানেন না আমার বাবা এম. ওবাইদুল হক একজন গর্বিত ভাষা সৈনিক ছিলেন। আহাসানউল্লা ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে (বর্তমানে বুয়েট) অধ্যয়নের সময় ভাষা আন্দোলনের শুরুর দিকে মিটিং মিছিলে নিয়মিত অংশ নিতেন। মিছিলে যোগদানের কারনে গ্রেপ্তার হয়ে সে সময় এক রাত হাজত বাসও করেন। ছাত্র রাজনীতিতে কোন পদ না থাকলেও বাবা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দেন।
তার সাহসী ভূমিকার কারনে বঙ্গবন্ধু তাকে খুব পছন্দ করতেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাবা আওয়ামী লীগ থেকে সন্দ্বীপ আসনে বিপুল ভোটে প্রথম সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্ধীদের নির্বাচনী জামানত পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশ স্বাধীন করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে প্রাণপ্রিয় স্ত্রী আর সন্তানদেরকে পাকিস্তানী হায়নাদের মুখে রেখে এবং নিজের গড়া বিশাল শিল্প প্রতিষ্ঠানের মায়া না করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের লক্ষ্যে জীবন বাজি রেখে ভারতে চলে যান এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বলিষ্ঠ সাংগঠনিক ভূমিকার কারনে সমগ্র সন্দ্বীপে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তান হানাদারদের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। তার সাহসী নেতৃত্বে সন্দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষন ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমার বাবার ভূমিকা চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে বাবা সন্দ্বীপ থেকে আবারো বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। রাজনীতির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার বাবা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী ছিলেন। যতবার সামরিক সরকার এই দেশে অন্যায় ভাবে ক্ষমতা দখল করেছে, ততবারই সামরিক জান্তারা বাবার সামনে নানা ধরনের লোভ লালসার জাল বিস্তৃত করেছিল, কিন্তু কখনো তিনি নিজের রাজনৈতিক আদর্শ আর ধ্যান ধারনা থেকে বিচ্যুত হননি। দুই দুই বার (১৯৭৬ ও ১৯৮৬) বিনা অপরাধে দীর্ঘদিন জেল খেটেছেন।

এখানে আরো উল্লেখ্য আমার বাবা বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান অনুমোদনের একজন অমর স্বাক্ষরকারী। বাংলাদেশের মূল সংবিধানের ৯৮নং পৃষ্ঠায় আমার বাবার সেই মহান স্বাক্ষর আমাদেরকে আজীবন মাথা উঁচু করে কথা বলার সাহস যোগাচ্ছে। আমার বাবা আমাদের গর্ব, আমাদের সুস্থ চিন্তুা চেতনার কেন্দ্রবিন্দু। আমরা গর্বিত। মহান সৃষ্টি কর্তা আমাদের সকল ভাইবোনকে তার ঔরসে জন্মগ্রহণ করার এক দূর্লভ সুযোগ করে দিয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে আমার বাবা একজন কাজ পাগল মানুষ ছিলেন, বিশ্রাম উনার কাছে হারাম ছিল। চারিত্রিক ভাবে তিনি প্রচন্ড রকমের বদমেজাজী ছিলেন। এ দুনিয়ার বুকে এক মহান সৃষ্টিকর্তা ছাড়া বাবা আর কোন কিছুকেই ভয় পেতেন না। তবে তার অন্তরটা ছিল আকাশের মত বিশাল। সন্দ্বীপ নিয়ে তার চিন্তা ছিল সুদূর প্রসারী। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে তিনি ভালবাসতেন কারন তিনি কখনই দলীয় পরিচয়ে তার প্রিয় সন্দ্বীপবাসীকে দেখেননি। পুরো সন্দ্বীপের উত্তর থেকে দক্ষিণ. পূর্ব থেকে পশ্চিম সকল গ্রামের উন্নয়ন ছিল তার কাছে সমানভাবে চিন্তনীয়। সন্দ্বীপের উন্নয়নে তিনি ছিলেন আপোষহীন।
ব্যক্তি জীবনে আমরা ১২ ভাইবোন ছিলাম। বাবার অক্লান্ত পরিশ্রম আর মেধার সম্মেলন ঘটিয়ে বিশাল সম্পদের অধিকারী হলেও উনি আমাদের প্রতিটি ভাই-বোনকে শুধু লেখা পড়ার দিকে ধাবিত করেছেন। নিজে সহজ জীবন যাপন করতেন, আমাদের ভাইবোনদেরকেও তিনি সহজ জীবন যাপন চলনে অভ্যস্থ করেছেন। সবাইকে অর্থের মোহ থেকে লক্ষ মাইল দূরে রেখেছেন বিধায় আমার কোন ভাইবোনের অর্থের প্রতি কোনরূপ মোহ নেই। সবাই লিখাপড়া শেষ করে আজ নিজ নিজ ক্ষেত্রে সু-প্রতিষ্ঠিত এবং আমার বেশির ভাগ ভাইবোনই বিদেশে লিখা পড়া করে বিদেশেই সু-প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় জীবন যাপন করছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কালির্ফোনিয়ায় স্থায়ী ভাবে বসবাসরত আমার ছোট ভাই সারওয়ার এহসান জামীল সম্প্রতি চট্টগ্রামস্থিত ও.আর.নিজাম রোডে তার একটি বিলাস বহুল ফ্লাট বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে সন্তেুাষপুর গ্রামে আমার মরহুম ছোট ভাই এর নামে “আহসান জামীল টেকনিক্যাল সেন্টার” কারিগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মানে হাত দিয়েছে।
উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত আমার সেই পিতা ২০১২ সালের ১৭ আগষ্ট ২৭ রমজান দিবাগত রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরকালে বাবা যেন জান্নাতবাসী হন সবার কাছে এ দোয়া কামনায়।

লেখক : সারওয়ার হাসান জামীল (সামীম), মরহুমের পুত্র।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন