আজ বৃহঃপতিবার, ২১ জুন ২০১৮ ইং, ০৭ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



নব্য জেএমবির আমির ও তাভেলা হত্যা – পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পুলিশ-র‌্যাবের

Published on 27 October 2016 | 3: 51 am

নব্য জেএমবির আমির ও ইতালির নাগরিক তাভেলা সিজার হত্যার তদন্ত নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে পুলিশ ও র‌্যাব। গত শুক্রবার র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সম্প্রতি আশুলিয়ায় তাদের অভিযানের সময় নিহত আবদুর রহমান ওরফে সারোয়ার জাহানই নব্য জেএমবির প্রধান বা আমির ছিল। তার সাংগঠনিক নাম আবু ইব্রাহিম আল হানিফ। সে গুলশানে ইতালির নাগরিক হত্যা ও হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় তাণ্ডবসহ ২৪টি হত্যা-হামলায় নেতৃত্ব দেয়। এদিকে, গতকাল বুধবার পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) দাবি করে, সারোয়ার জাহান ছিল নব্য জেএমবির তৃতীয় সারির নেতা। তাভেলা হত্যায় জঙ্গিগোষ্ঠী নয়, বরং যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, তারাই জড়িত। তাদের মধ্যে ৭ জন বিএনপি নেতা রয়েছেন। সংবেদনশীল দুটি ইস্যুতে পুলিশ ও র‌্যাবের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যে সংস্থা দুটির সমন্বয়হীনতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, তদন্ত শেষে তাভেলা সিজার হত্যা মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। আলামত ও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ওই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এখন মামলাটির বিচার চলছে। নব্য জেএমবির কে প্রধান ও কে উপপ্রধান সেটি মুখ্য বিষয় নয়, তারা প্রত্যেকেই জঙ্গি, প্রত্যেকেই অপরাধী।

গত শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ জানান, আশুলিয়ায় ৮ অক্টোবর অভিযানের সময় ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে নিহত আবদুর রহমানই নব্য জেএমবির প্রধান শায়খ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ। তার মূল নাম সারোয়ার জাহান। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এ জঙ্গির নেতৃত্বে অন্তত ২৪টি হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে গুলশানের হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁ এবং ঢাকা ও রংপুরে দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনাও রয়েছে।

গত ২৮ জুন তাভেলা হত্যায় বিএনপি নেতা এমএ কাইয়ুমসহ সাতজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত মঙ্গলবার এ মামলায় বিচার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ওই অভিযোগপত্রে জঙ্গিদের কোনো প্রসঙ্গ আসেনি। এ ছাড়া ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের আস্তানায় পুলিশের অভিযানে নিহত তামিম চৌধুরীকে নব্য জেএমবির প্রধান সমন্বয়ক বলে দাবি করে আসছে ডিবি।

এসব বিষয় নিয়ে গতকাল সকালে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সিটিটিসির প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, তাভেলা সিজার হত্যা মামলা বিচারাধীন থাকায় এটি নিয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। তবে ডিবি একটি পরীক্ষিত ও স্বীকৃত তদন্ত সংস্থা। প্রতি মাসেই তাদের দু’-একটি মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে, সাজা হচ্ছে। সাজার হারের ভিত্তিতেও যদি দেখা হয়, অন্যান্য ইউনিটের তুলনায় ডিবির তদন্তের মান অনেক ভালো। তিনি বলেন, ফৌজদারি তদন্ত পরিচালিত হয় সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। এটি কোনো রচনাকর্ম বা সৃজনশীল কাজ নয়। তথ্য-প্রমাণে যেটি আসে সেটিই করা হয়। তাভেলা হত্যায় যাদের সম্পৃক্ততা বেরিয়ে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। মনিরুল বলেন, এ মামলায় অভিযুক্ত এমএ কাইয়ুম দেশের বাইরে থাকায় তাকে গ্রেফতার করা যায়নি। দেশে এলে তাকে গ্রেফতার করা হবে।

তাভেলা সিজার হত্যায় জেএমবি জড়িত_ র‌্যাব মহাপরিচালকের এমন বক্তব্যের কারণে আসামিরা আদালতে কোনো সুবিধা পাবেন কি-না_ এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল বলেন, সে সময় দেশের বাইরে থাকার কারণে তিনি ওই বক্তব্য শোনেননি। তবে তার ধারণা, র‌্যাব মহাপরিচালক তেমন কথা বলেননি।

নব্য জেএমবির আবদুর রহমান ওরফে সারোয়ার প্রসঙ্গে সিটিটিসি প্রধান বলেন, তদন্তে আবদুর রহমানের নাম এসেছে। তবে সে মূলত তামিম চৌধুরীর সহযোগীদের পরের ধাপের নেতা বলে তথ্য ছিল। সে জেএমবির প্রধান এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ তাদের কাছে নেই। র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনে তামিম চৌধুরী ও সারোয়ারের মধ্যে যোগাযোগের কিছু ‘তথ্য-প্রমাণ’ দেখানো হয়। এ প্রসঙ্গে মনিরুল বলেন, তামিম নব্য জেএমবির নেতা হিসেবে তার ঠিক পরের সারির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। সারোয়ার যে পর্যায়ের নেতা ছিল, তাতে সরাসরি তামিমের সঙ্গে তার যোগাযোগ খুব কম ছিল। হয়ত কখনও কখনও বৈঠকে তাদের দেখা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের আস্তানায় অভিযানের সময় সারোয়ারের সঙ্গে তামিম চৌধুরী যোগাযোগ করেছিল কি-না_ এ প্রশ্নে মনিরুল বলেন, তামিমের আস্তানা ঘিরে ফেলা হয় সকাল ৬টায়। কাউন্টার টেররিজমের প্রথম দলটি যায় সোয়া ৬টার দিকে। তার আগে ঘিরে ফেলার কোনো ঘটনা ঘটেনি। অন্য কোনো সংস্থা বা অন্য কোনো ইউনিট ঘিরে থাকতে পারে। তার পরে তামিম খুব বেশি যোগাযোগের সুযোগ পায়নি। তবে তানভীর কাদেরী ও মেজর (অব.) জাহিদের সঙ্গে কিছুটা যোগাযোগ করেছে বলে কিছু তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।

বর্তমানে নব্য জেএমবির প্রধান কে জানতে চাইলে সিটিটিসি প্রধান বলেন, সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের একজন বা দু’জন নেতা, যারা দ্বিতীয় সারিতে ছিল এবং এখনও ধরা পড়েনি, সম্ভবত তারাই এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে। বরখাস্ত মেজর জিয়ার সঙ্গে নব্য জেএমবির সম্পর্ক নেই বলেই তদন্তে জানা গেছে। সে আনসার আল ইসলামের সঙ্গে জড়িত। তামিমের পর মারজান নব্য জেএমবির সমন্বয় করছে কি-না এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, নব্য জেএমবিতে পুরনো জেএমবির কিছু নেতাকর্মী যোগ দিলেও তাদের মধ্যে একটা ঠাণ্ডা লড়াই রয়েছে। তাই পুরনো জেএমবির কোনো নেতাকে তারা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়নি। আরেক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, আনসার আল ইসলামকে নিষিদ্ধ করার জন্য এরই মধ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেটি সরকারের বিবেচনাধীন। নব্য জেএমবির ব্যাপারেও চিন্তা করা হচ্ছে।

বর্তমানে নব্য জেএমবির মাত্র ২১ সদস্যের পলাতক থাকার কথা বলেছিল র‌্যাব। এ বিষয়ে মনিরুল বলেন, পুলিশ নিজের তালিকামতো কাজ করে। এ সংগঠনের ঠিক কত সদস্য রয়েছে তার সুনির্দিষ্ট তালিকা পুলিশের কাছে নেই।

অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলামের এমন বক্তব্যের পর গতকাল যোগাযোগ করা হলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য নেই। সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব মহাপরিচালক নিজেই বিস্তারিত বলেছেন। সেখানে পর্যাপ্ত দালিলিক প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়েছে। ওইসব দলিলপত্রে দেখা যায়, নব্য জেএমবির শূরা সদস্যরাই সারোয়ার জাহানকে আমির নির্বাচিত করেছে। এটি র‌্যাবের বক্তব্য নয়, দলিলপত্রের তথ্য।


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন