আজ রবিবার, ২৭ মে ২০১৮ ইং, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



৪৮ বছরে ও বাস্তবায়িত হয়নি মহা পরিকল্পনা : মাত্র ২০ ভাগ শিক্ষার্থী চবির আবাসন সুবিধা পাচ্ছে

Published on 25 October 2016 | 2: 48 am

দেশের অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যলয়, পাহাড়ে ঘেরা সবুজে মোড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাহীন কটেজে অর্ধাহার আর অপরিচ্ছন্ন বসবাস। শহরের ভাড়া বাসায় ব্যয়বহুলতার যন্ত্রণা। শহরতলি থেকে ২২ কিলোমিটার দূরের যাত্রায় শাটল ট্রেন ও সড়ক পথের সীমাহীন দুর্ভোগ। এই হলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৫ হাজার অনাবাসিক শিক্ষার্থীর বসবাসের বিড়ম্বনার চিত্র।
১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠার সময় এ বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ৪৮ বছরেও চবি শিক্ষার্থীদের জন্য নিশ্চিত করা হয়নি আবাসন সুবিধা। আজও প্রায় ৮০ ভাগ শিক্ষার্থীর কপালেই জোটেনি আবাসিক হলে থাকার সুযোগ। এর ফলে প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকার অপরিচ্ছন্ন ও বসবাসের অনুপযোগী কটেজ অথবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২২ মাইল দূরে শহরে অত্যন্ত ব্যয়বহুল বাড়ি ভাড়া করে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিরও সম্মুখীন হচ্ছেন।
বর্তমানে চবিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৪ হাজার। শিক্ষার্থীদের আবাসিক চাহিদা মেটানোর জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২টি হল রয়েছে। ছাত্রী হলগুলোতে দুর্ভোগের চিত্র ভয়াবহ। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নানা অপতৎপরতার কারণে ছাত্র হলগুলো ফাঁকা হচ্ছে। এই সুযোগে বহিরাগতদের হলে ভেড়াচ্ছে ক্ষমতাসীন সংগঠন। এ ছাড়া পুরোনো জরাজীর্ণ বিল্ডিং, খাবারের নিম্নমানসহ বহু সমস্যায় জর্জরিত আবাসিক হলগুলো। ছাত্রদের ৮টি এবং ছাত্রীদের ৮টি ছাত্র হলের মধ্যে বঙ্গবন্ধু হল ও ছাত্রীদের শেখ হাসিনা হল উদ্বোধন হলে ও এখনো সেই হল দুটিতে ছাত্র ছাত্রীদের উঠানো হয়নি। বর্তমানে বিশবিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৪ হাজার। এর মধ্যে আবাসিক হল গুলোতে সিট সংখ্যা ৪,৪১৮টি। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সিট বাণিজ্য ও ছাত্র রাজনীতির প্রভাবেব কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখন হলে থাকতে চায় না। এতে হলগুলোর অনেক সিটই ফাঁকা পড়ে আছে। আবার কেউ কেউ একাধিক সিট দখল করে আছে।
ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নামে দখলকৃত রুমগুলোতে মদের আসর, রাতের ডিজে পার্টি বসে নিয়মিত। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের মিটিংসহ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধ্য করার কারণে অনেক ছাত্র হল ছেড়ে দিচ্ছে। প্রশাসন বরাবরের মতো নীরব। হলের অপরিচ্ছন্ন ডাইনিং, খাবারের নিম্নমান, পানির সমস্যা, নোংরা বাথরুম, লোডশিডিং শিক্ষার্থীদের জীবনকে করেছে দুর্বিষহ। ছাত্র হলে নিয়মিত মদ, গাঁজার আসর বসে: চবির ৮টি হলের মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে শাহজালালে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী থাকে। ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নিয়মিত কর্মসূচির কাছে জিম্মি শিক্ষার্থীরা। এসব হলের বেশির ভাগ সিটই ছাত্রসংগঠনের দখলে।
গত বছর বরাদ্দ ছাড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আমানত, সোহরাওয়ার্দী হলে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনকে উঠিয়ে দেয় প্রশাসন। এতে আগে থেকে বরাদ্দ পাওয়া অনেক আবাসিক শিক্ষার্থী তার সিট হারিয়েছে। এরপর আর নতুন কোনো সিট বরাদ্দ দেয়নি হল প্রশাসন। এ ছাড়া হলগুলোতে নিয়মিত মদ, গাঁজার আসর, বগি ভিত্তিক চবি ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের বিভিন্ন গ্রুপের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয় ডিজে পার্টি। প্রতিযোগিতা চলে কোন গ্রুপ কার থেকে বড় করে পার্টির আয়োজন করতে পারলো। এ ছাড়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর অন্য আরেকটি সংগঠন অভিযোগ করে প্রায় লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। এসবের হাত থেকে রেহায় পায় না সাংবাদিকরাও। ফলে হলগুলোয় পড়ার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের থাকার প্রবণতা কমে আসছে।
অন্যদিকে ছাত্রীদের ৪টি হলের ভিন্ন চিত্র। সিঙ্গেল বেডে ডাবলিং কখনও তিনজনের গাদাগাদি বসবাস। সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র হলের মতো ছাত্রী হলগুলোতেও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের  প্রভাব পড়তে দেখা গিয়েছে। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নারী নেত্রীরা এ হলগুলোতে কতৃত্ব করছে। শিক্ষার্থীদের আসন নির্ধারণ, রদবদল, কখনও কখনও জোরপূর্বক সাংগঠনিক মিটিংয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ আছে। ছাত্রীরা না যেতে চাইলে তাদেরকে মানসিকভাবে টর্চার করা হয় বলে জানা যায়।
জরাজীর্ণ হল: চবির বেশির ভাগ হল অনেক পুরনো। ছাত্র হলগুলোর মধ্যে আলাওল ও এফ রহমান হলের অবস্থা খুবই নাজুক। কয়েকবার ভূমিকম্পে ফাটল ধরেছে এসব হলের দেয়ালে। কোনো হলে ছাদের প্লাস্টার খসে নিচে পড়তে দেখা যায়। ফাটল ধরা ঝুঁকিপূর্ণ ভাবেই হলে রাত পার করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। তবে এসব হল সংস্করণের ব্যাপারে নেই কোনো পদক্ষেপ।
খাবারের মান গেছে ফাও খাওয়ার তলে : রাজনৈতিক সমস্যা জর্জরিত চবি আবাসিক হলগুলোর খাবার মান খুবই খারাপ। অপরিচ্ছিন ডাইনিং মাঝে মাঝেই পাওয়া যায় খাবারের ভিতর ময়লা, পাথর, সিগারেটের খোসার মতো জিনিস। ছাত্র হলে খাবারের মান যেমন তেমন ছাত্রী হলে আরও নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। হলে অবস্থান করা শিক্ষার্থীরা সঠিক আবাসিক সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে না। অনেক কক্ষের তৈজসপত্র ভাঙ্গা পড়ে আছে। এগুলো মেরামতের ক্ষেত্রে নজর নেই হল কতৃপক্ষের।
নামে মাত্র হল কমন রুম, নেই বিনোদনের যথেষ্ট সরঞ্জাম, এ ছাড়া রিডিং রুমে রয়েছে বইয়ের সল্পতা, বেশির ভাগ ছাত্রই রিডিংরুমে পছন্দমতো বই খুঁজে পায় না। ফলে রিডিংরুম বিমুখ হয়ে পড়ছে সাধারণ ছাত্ররা। এ ছাড়া টিভিরুমের চেয়ারের সল্পতা, অপরিষ্কার বাথরুম, টয়লেট হলের পরিবেশকে ব্যাহত করছে। তবে ডাইনিংয়ের নিম্নমানের খাবার সরবরাহের ব্যাপারে ডাইনিং ম্যানেজারদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের ‘ফাউ’ খাওয়ায় খাবারের মানকে আরও খারাপ করেছে। তারা বলেন, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা বেশির ভাগই বাকি খেয়ে টাকা পরিশোধ করে না। এতে খাবারের মান বাড়ানো যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সোহরাওয়ার্দী হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, হলে থাকাটা আসলেই অনেক কষ্টের হয়ে পড়েছে। প্রায় সময় বিদ্যুৎ, পানি থাকে না। আবার এটা নিয়মিত রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক সমস্যা তো আছেই। এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন দেখছি না। যার ফলে হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে আসছে।
আবাসিক শিক্ষকদের অবহেলা: বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের সমস্যার মূলে রয়েছে আবাসিক শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা। আবাসিক শিক্ষকরা হলে আসেন না। আসলেও হল প্রভোস্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চলে যান। এ ছাড়া হলে ছাত্রদের সাথে দূরত্ব বজায় রাখেন। যার ফলে শিক্ষার্থীদের চাহিদা আদায়ের জন্য কর্মচারীদের নিকট দৌড়ঝাঁপ করতে হয়। এ ছাড়া হলগুলোতে আবাসিক শিক্ষকদের যাতায়াত কম থাকায় রাজনৈতিক নেতাদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাড়তি সুবিধা পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা শরণাপন্ন হচ্ছে নেতাদের নিকট। আবার অনেকে নতুন করে নামা লেখাচ্ছে রাজনীতিতে। এসব ব্যাপারে চবি প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি প্রভোস্ট কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর ড. সুলতান আহমেদ সোনালী নিউজ টুয়েন্টিফোরকে বলেন, আবাসিক হলগুলোতে আসন বরাদ্দ না হওয়ায় কিছু জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে আমরা চেষ্টা করছি। খুব তাড়াতাড়ি হলগুলোতে বরাদ্দ দেয়ার। এর মধ্যে কিছু হলে বরাদ্দের আবেদনের নেয়া হচ্ছে। হলগুলোতে ছাত্র সংগঠনের অধিক প্রভাবের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ আমরা মানছি কিছু সমস্যা তৈরি হচ্ছে তবে বরাদ্দ হলে খুব দ্রুতই এ সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।


Advertisement

আরও পড়ুন