আজ শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ ইং, ০৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



ইসলামের দৃষ্টিতে শেয়ার বাজার

Published on 23 October 2016 | 3: 16 am

বর্তমানে শেয়ার বাজার বা তথাকথিত পুজিবাজার এর অবস্থা নাজুক। গ্রামের জমিজমা বেঁচে বা বাবার সমগ্র জীবনের জমানো টাকা অথবা ভাইয়ের বিদেশ থেকে পাঠানো ঘাম ঝরানো টাকা পুজিবাজারে খাটিয়ে ধরা খেয়ে ৯০% মুসলিমের দেশে তরুনরা আজ দিশেহারা। ইসলাম পূর্ণ জীবন ব্যাবস্থা হওয়ার পরও মুসলিমরা ইসলাম থেকে অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা না নিয়ে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদীদের দেয়া ঘুনে ধরা পুঁজিবাদি অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা (capitalism) নিয়েছে। শেয়ারকেলেংকারী নতুন কিছু না, ১৯৯৬ সালেও এ ধরণের ঘটনায় সরকার তদন্ত-কমিটি (!) গঠন করে অপরাধীদের চিহ্নিত করেছিলো কিন্তু শাস্তি দিতে পারে নি। আমরা জানি এবারও এই বস্তাপঁচা গনতান্ত্রিক ব্যাবস্থার মাধ্যমে রাঘব বোয়াল দুর্নীতিবাজরা ধরাছোয়ার বাইরে থাকবে এবং ৩০ লক্ষ্য পুঁজিহারা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ২ টাকার ক্ষতিপুরণও হবে না। পুঁজিবাজারে ধ্বসেরপিছনে বেশ কিছু বড় বড় কোম্পানি দায়ী। সবচেয়ে বড় কথা এই পুঁজিবাদি ব্যাবস্থার স্বরূপটাই এ রকম। বড় কোম্পানি গুলো অকল্পনীয় লাভবান হবে এবং ক্ষুদ্র-বিনিয়োগকারীরা (small-investor) তাদের পুঁজি হারাবে, এটাই নিয়ম। পুঁজিবাদী ব্যাবস্থার শেয়ারবাজার যে “হারাম” (পুঁজিবাদী ব্যাবস্থা নিজেই হারাম) তা বোঝার আগে ইসলামে কোম্পানি বলতে কি বোঝায় এবং কি কি ধরনের কোম্পানি হালাল তা জানার দরকার।

ইসলামী শরীয়াহ কোম্পানি (আশ-শারিকা, company) মানে হল লাভের উদ্দেশ্যে আর্থিক কাজের জন্য দুই বা ততোধিক পক্ষ্যের মধ্যে চুক্তি (contract)। চুক্তি বলতে অবশ্যই “প্রস্তাব” (offer) এবং “গ্রহন” (acceptance) থাকাটা জরুরী। চুক্তির অংশীদারিত্ব বলতে আসলে এমন কিছুর ব্যাপারে সম্মতি যাতে উভয়ের নিজের ইচ্ছামত ব্যাবহারের ক্ষমতা থাকে (right of disposal over property) এবং অর্জিত জিনিষের অংশ সবাই পাবে। তাহলে অংশীদারিত্ব দুই ধরনের– ১) সম্পত্তির অংশীদারিত্ব (partnership of properties) এবং ২) চুক্তির অংশীদারিত্ব(partnership of contract) বা কোম্পানি (company) – যা ক্রমবর্ধমান সম্পত্তির মালিকানার ব্যাপারে আলোচনার বিষয়বস্তু।

ইসলামী শরীয়াহ চুক্তির অংশীদারীত্ত বা কোম্পানি ৫ ধরনের:

১) আল-ইনান (Company of equal / সমতার কোম্পানি) – দুই জন ব্যক্তি তাদের সম্পত্তি নিয়ে এ ধরনের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে। সমস্ত সম্পত্তি একত্রে একটি অস্তিত্বে পরিণত হয় এবং দুজনের নিজের ইচ্ছামত ব্যাবহারের ক্ষমতা থাকে (right of disposal)। দুজনই কাজের ক্ষেত্রে লাভের অংশ পাবে। পণ্যদ্রব্য কে প্রচলিত অর্থের সমমান মূল্যায়ন করতে হবে। বিনিয়গকারী সম্পত্তি অবশ্যই সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট হতে হবে এবং তা ঋণগ্রস্ত (property of debt) হতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে কোন অংশীদারী সে নিজের জন্য প্রতিনিধিরূপে কাউকে প্রেরণ করতে পারবে না। লাভ তারা নিজেদের মধ্যে নিজেদের ইচ্ছামত ভাগ করতে পারবে তবে তা আগে থেকেই নির্ধারিত করে রাখতে হবে (এটা বিনিয়গের (share) আনুপাতিক হারে হতে পারে বা অন্যকিছু)। কিন্তু লোকসানের ভাগ হবে বিনিয়োগের আনুপাতিক হারে।

২) আল-আব্দান (The company of bodies / শ্রমের কোম্পানি) – দুই বা ততোধিক ব্যাক্তি এ ধরনের কোম্পানিতে শ্রম দিয়ে বিনিয়োগ করে, অর্থ বা সম্পত্তি নয়। তারা মেধা বা শারীরিক শ্রম এর বিনিময়ে যা অর্জন করে তা তারা নিজেদের মধ্যে যেকোনো অনুপাতে ভাগ করে নেয়, তবে তা কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় নির্ধারণ করে নিতে হবে। অংশীদাররা (partner) সবসময় একই পেশার হতে হবে তা জরুরী নয়। কোম্পানিতে তারা নির্দিষ্ট কাজ তাদের মধ্যে ভাগ করে নিতে পারে, তবে কাজ গুলো হালাল হতে হবে। একজনের কাজ হারাম হলে কোম্পানি হারাম হয়ে যাবে। তারা যদি একসাথে কোনো ফ্যাক্টরিতে কাজ করে তবে তাদের একজন বাকিদের সবার পক্ষ থেকে বেতন নিতে পারবে। একই ভাবে তারা যদি অন্য কারো কাছে তাদের পন্য বিক্রি করে তবে ক্রেতা তাদের একজনের কাছে সমস্ত মূল্য পরিশোধ করতে পারবে। তাদের একজন কাজ করলেও সবাই লাভের অংশীদার হবেন কারণ কাজটি করে দেওয়া সবার পক্ষ্য থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া। তারা নিজের জন্য কাউকে প্রতিনিধিস্বরূপ নিয়োগ দিতে পারবে না। তবে কোম্পানির জন্য তারা বা তাদের একজন কোম্পানির পক্ষ থেকে কাউকে ভাড়া করতে পারবে।

৩) আল-মুদারাবা ( The company of body and capital / শ্রম ও অর্থের সমন্নয়ের কোম্পানি) – একজনের পুঁজি বা অর্থ এবং আরেকজনের শ্রম এর সমন্নয়ের কোম্পানি কে আল-মুদারাবা কোম্পানি বলে। এখানে লাভ তারা নিজেদের মধ্যে নির্ধারণ করে ভাগ করে নেয়। কিন্তু ক্ষতি সর্বদাই তার উপর বর্তাবে, যে অর্থ দিয়ে বিনিয়োগ করেছে। কারণ শ্রমিকের ক্ষতি তো সেটাই যে শ্রম সে বৃথা খরচ করলো। আল-মুদারাবা তখনই পূর্ণ হবে যখন অর্থ বা সম্পত্তি শ্রমিকের (মুদারিবের) হাতে যায় এবং সে এটা তার নিজের মত করে খাটাতে পারে (right of disposal of property), তবে তা কোম্পানির স্বার্থে এবং সে ততোটুকুই ব্যাবহার বা খরচ করতে পারবে যতটুকুর অনুমতি সে তার পার্টনার এর কাছ থেকে পাবে। যে অর্থ বা সম্পত্তি বিনিয়োগ করা হয়েছে সেটা অবশ্যই সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট হতে হবে এবং মুদারিবের অংশও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিতে হবে। যে অর্থ বা সম্পত্তি বিনিয়োগ করে সে মুদারিবের সাথে শ্রম দিতে পারবে না এবং সে তার নিজের ইচ্ছামত সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারবে না (no right of disposal of property)।

৪) আল-উজোহ (The company of faces / খ্যাতি বা দক্ষতা বা বিশ্বাসের কোম্পানি) – আল-আব্দান এবং আল-মুদারাবার সমন্বয়ের কোম্পানি হচ্ছে আল-উজোহ। এ ধরণের কোম্পানিতে দুজনের শ্রমের সাথে একজনের অর্থ বা সম্পত্তি বিনিয়োগ করা হয়। তারা নিজেদের মধ্যে যেকোনো অংশে লাভ করে নিতে পারে যা আগে থেকে নির্ধারিত। মুদারিবগণ নিজেদের মধ্যে দক্ষতা বা খ্যাতির উপর ভিত্তিকরে লাভ ভাগ করতে পারে। মুদারিবগণ তাদের খ্যাতি বা বিশ্বাসের কারণে যে পণ্য কিনে মালিক হয় তা তারা নিজেদের মধ্যে অর্ধেক, একতৃতীয়াংশ বা এরকম করে ভাগ করতে পারে। এবং তারা যখন বিক্রি করে লাভ অর্জন করে তখন তারা নিজেদের মধ্যে অর্ধেক, একতৃতীয়াংশ বা এরকম করে ভাগ করতে পারে (যা মালিকানার অংশীদারীত্বের অনুপাতে নয়), কিন্তু ক্ষতি হবে মালিকানার অংশীদারীত্বের অনুপাতে (নিজেদের ইচ্ছামত নয় বা লাভের অনুপাতে নয়)। এখানে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে “উজোহ” বা খ্যাতি’র যে ব্যাপার বলা হচ্ছে তা কোন উচ্চ বংশ বা সম্মান বা গণ্য-মান্য ব্যাক্তি বলে কথা না, এটা বিশ্বাসের কারণে। একজন মন্ত্রী কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর হতে পারে কিন্তু সে কোম্পানির জন্য কোনো পণ্যের মূল্য দিতে প্রস্তুত নয়, এই প্রতিষ্ঠান ইসলামে হারাম। এখানে মন্ত্রীকে রাখা হয়েছে শুধুমাত্র তার ফেসভেলুর জন্য এবং সে কোম্পানির প্রতি দুর্নীতির ক্ষেত্রে দুর্বল থাকে। সে এই কোম্পানির লাভ নিতে পারবে না।

৫) আল-মুফাওয়াদা (The company of negotiation ) – এই কোম্পানিটি আসলে উপরে বর্ণিত ৪ ধরণের কোম্পানির সমন্বয়।

জয়েন্ট স্টক কোম্পানি বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি বা শেয়ার কোম্পানির বাস্তবতা: এ ধরণের কোম্পানি কিছু পার্টনারদের দ্বারা গঠিত যারা সর্বপ্রথম প্রাথমিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে (এরাই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা) এবং যাদের সর্বসাধারণ চিনে না। প্রাথমিক চুক্তি কোম্পানির সূত্রপাত ঘটায় একটি সম্মতির মাধ্যমে যা কিছু সাধারণ লক্ষে পৌছার জন্য কাজ করে। কোম্পানিতে যে কেউ একটি শেয়ার কিনে (অর্থের বিনিময়ে) প্রবেশ করে (subscription) অন্য কেউ রাজি হোক আর নাই হোক। Subscription দুই ধরণের হয় – ১) শেয়ার কিছু প্রতিষ্ঠাতাদের জন্য সংরক্ষিত থাকে এবং সর্বসাধারণের কাছে উন্মুক্ত নয়। একটি সংবিধান লিখা হয় যাতে শর্তাবলি লিপিবদ্ধ করা হয় যা দ্বারা কোম্পানি পরিচালিত হয়। যারা সংবিধানে স্বাক্ষর করেন তারা সবাই কোম্পানির পার্টনার। ২) কিছু ব্যাক্তি মিলে একটি কোম্পানি দাড় করায় এবং শেয়ার সর্বসাধারণের জন্য বাজারে ছেড়ে দেয়া হয়। প্রত্যেক শেয়ারহোল্ডার একটি মিটিং এ মিলিত হয় এবং সংবিধান রচিত হয় যা দ্বারা কোম্পানি পরিচালিত হবে এবং তারা ভোটের মাধ্যমে তাদের বোর্ড অফ ডিরেক্টর নির্বাচিত করে। ২য় ধরণের শেয়ার কোম্পানি বেশি প্রচলিত। উভয় প্রকার কোম্পানিতেই একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায় যে subscription না করা পর্যন্ত কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই বলা যায় কোম্পানির চুক্তি আসলে সম্পত্তির চুক্তি। এখানে কোন ব্যাক্তিত্বের কোন মূল্য নেই। ব্যাক্তি ছাড়াই সম্পত্তিগুলো চুক্তিবদ্ধ হয়। একজন শেয়ারহোল্ডারের বা পার্টনারের কোন ক্ষমতাই নাই। যার ক্ষমতা আছে সে হল এমডি যিনি সব কর্মকাণ্ড করেন, দেখেন, বুঝে নেন ইত্যাদি। এমডি নির্বাচিত হন বোর্ড অফ ডিরেক্টরদের দ্বারা, আর বোর্ড অফ ডিরেক্টরগণ নির্বাচিত হন সাধারণ সভার মাধ্যমে যেখানে প্রত্যেক শেয়ারহল্ডারের ভোটের অধিকার আছে, তবে তা তার শেয়ারের সমান। যার একটি শেয়ার তার একটি ভোট, যার একশতটি শেয়ার, তার একশতটি ভোট। তাহলে বলা যায় আসল পার্টনার হল শেয়ার বা ক্যাপিটাল (সম্পত্তি), ব্যাক্তি নয়। শেয়ার কোম্পানি কে আজীবন অস্তিত্বের অধিকারী ধরা হয় কারণ কোনো শেয়ারহোল্ডারের মৃত্যু হলে কোম্পানি বিলুপ্ত (dissolve) হয় না। পার্টনাররা ক্ষতির দিকে কোনো ধরণের সীমিত না। একজন পার্টনারের তার শেয়ার হাতবদল করার অধিকার আছে, তাই সে এটা বিক্রি করে বা অন্য কাউকে শরীক করে, বাকি সকল শেয়ারহোল্ডারের অনুমতি থাক বা নাই থাক। প্রত্যেক বিনিয়গকারীরা শেয়ার কিনে মুদ্রা, বন্ড বা সিকিউরিটির বিনিময়ে – সোজাকথা মূলধন। কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারের কাছে শেয়ারের প্রকৃত মূল্যের (nominal value) জন্য দায়বদ্ধ। কোম্পানি যদি দেউলিয়া হয়ে যায় তাহলে শুধুমাত্র তার মূলধন দিতে বাধ্য। তাই বলা যায় স্টক বা শেয়ার হল কোম্পানির অবিচ্ছেদ্য অংশ কিন্তু মূলধনের অংশ নয়। স্টক কে ধরা যায় শেয়ারের রেজিস্ট্রেশন পেপার তার দাম সবসময় একই থাকে না, কোম্পানির লাভলোকসানের সাথে পরিবর্তিত হয়। লাভ বা লোকসান প্রত্যেক বছর একই রকম ও হবে, তাও না। তাই বলা যায়, “স্টক” কোম্পানির প্রতিষ্ঠিত-লগ্নে বিনিয়োগকৃত মূলধনকে প্রতিনিধিত্ব করে না বরং কোন নির্দিষ্ট সময়ে কোম্পানি বিক্রি করে দেয়ার মুহূর্তের মূলধন কে বোঝায়। স্টক হল কাগজের নোটের মত যার দাম উঠানামা করে স্টক মার্কেট উঠানামার সাথে, কিংবা কোম্পানির লাভলোকসানের সাথে, অথবা মার্কেটের মূর্খ (!) ক্রেতাদের চাহিদার (demand of people) উপর (ঠিক পণ্যের মত)।

যেসব কারণে স্টক কোম্পানি বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিকে ইসলামী শারীয়াহ হারাম করেছে:

১) জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে দুই বা ততোধিক ব্যাক্তি মূলধন বিনিয়োগ করে লাভের উদ্দেশ্যে একটি প্রকল্প হাতে নিতে একটি সম্মতিতে (contract) পৌঁছায়। তারা (প্রতিষ্ঠাতারা) আসলে অংশিদারীত্বের শর্তাবলীর উপর ভিত্তি করে একটি সম্মতিতে আসে। এখানে স্পষ্টতই দুটি পৃথক “পক্ষ্য”র (party) অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ইসলামে অবশ্যই আলাদা দুটি পক্ষ্য থাকা বাধ্যতামূলক যেখানে এক পক্ষ্য প্রস্তাব করবে এবং আরেক পক্ষ্য গ্রহন করবে যা ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। এ ধরণের কোম্পানিতে বরং একটি পক্ষ্যই থাকে যারা কিছু শর্তাবলিতে একটি মতৈক্যে পৌঁছায়। যেকেউ শেয়ার কিনতে পারে যখন তখন অন্য শেয়ারহোল্ডারদের জানানোর প্রয়োজন হয় না, যা ইসলামের দৃষ্টিতে “চুক্তি”র শর্ত পুরণ করে না। তাছাড়া চুক্তিতে কোন ধরণের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কথা বলা থাকে না, বরং প্রতিষ্ঠাতারা বা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শুধুমাত্র একটি প্রকল্প বা ব্যাবসা শুরু করতে বিনিয়োগের কথা উল্লেখ থাকে। ইসলামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একটি কোম্পানির মূল লক্ষ্য, শুধুমাত্র মূলধন বিনিয়োগ করা নয়। তাই বলা যায় ইসলামে এ ধরণের কোম্পানি অগ্রহণযোগ্য (বাতিল)। অনেকসময় কোম্পানিতে কাজের কথা বলা থাকলেও কে বা কারা আসলে কাজ করবে তা উল্লেখ থাকে না। কোম্পানিতে Disposing Person (বাদান) থাকা আবশ্যিক। Disposing Person বা “বাদান” হল সেই ব্যক্তি যে কোম্পানি চালানো বা রক্ষণাবেক্ষণ এর জন্য সরাসরি দায়ী থাকবে। স্টক কোম্পানিতে এ ধরণের ব্যাক্তি থাকে না, যারা দায়িত্ব নেয় তারা বোর্ড অফ ডিরেক্টর, কিন্তু বোর্ড অফ ডিরেক্টর বিনিয়োগকারীদের দ্বারা নির্বাচিত। এখানে আসলে বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি হিসেবে বোর্ড অফ ডিরেক্টর ধরা যায় না কারণ বিনিয়োগকারীদেররা তাদের শেয়ারের সমপরিমাণ ভোট দিতে পারে, যার ১টা শেয়ার সে ১টা ভোট, যার ১০০টা শেয়ার তার ১০০টা ভোট, তাই বলা যায় বোর্ড অফ ডিরেক্টর বিনিয়োগকারীদের “মূলধনে”র প্রতিনিধি, বিনিয়োগকারীদের নয়।

২) ইসলামে কোম্পানি হল এক ধরণের চুক্তি যার ভিত্তি “মূলধনের উপর কর্তৃত্বের” (contract over disposal of property)। প্রত্যেক বিনিয়গকারীর বা শেয়ারহোল্ডারের Disposal over property (মূলধনের উপর কর্তৃত্বের) অধিকার থাকে, সে কর্তৃত্ব খাটায় অন্যান্য শেয়ারহোল্ডারের অনুমতি নিয়ে। কিন্তু স্টক কোম্পানিতে বিনিয়গকারীর বা শেয়ারহোল্ডারের Disposal over property থাকে না। বরং তা থাকে corporate personality নামক একটি কাল্পনিক আইনগত সত্ত্বার হাতে। এটা বলা ভুল হবে যে কোম্পানির Disposal বা প্রশাসনিক কাজ কোম্পানির ডিরেক্টররা করে থাকে যারা পার্টনার বা শেয়ারহোল্ডারদের প্রতিনিধিত্ব করে, কারণ আগেই আলোচনা করা হয়েছে ডিরেক্টর  পার্টনার নয় বরং পার্টনারদের “মূলধন”এর প্রতিনিধিত্ব করে।

৩) পুঁজিবাদী ব্যাবস্থায় স্টক কোম্পানি চিরস্থায়ী, কিন্তু ইসলামে এটা অসম্ভব। কারণ কোন পার্টনার মৃত্যু বরণ করলে অথবা পাগল বা অক্ষম হয়ে যায় তাহলে কোম্পানি ভেঙ্গে যায়। কিন্তু স্টক কোম্পানিতে কোন বিনিইয়োগকারী মৃত্যুবরণ করলে কোম্পানি কোন খোজ-খবর তো দূরে থাক, কোম্পানী তার আপন গতিতে চলতে থাকে।

এছাড়াও স্টক কোম্পানি ইসলামে হারাম হওয়ার অনেক কারণ আছে, যেমন: স্টক কোম্পানি সুদি ব্যাংক এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শেয়ার বাজারে যখন ধ্বস নামে, তখন সরকার বা রিজার্ভ ব্যাংক অবিনিময়যোগ্য কাগুজে মুদ্রা ছাপিয়ে বাজার চাঙ্গা করার চেষ্টা করে যা ইসলাম সমর্থন করে না, বরং ইসলামে মুদ্রার ভিত্তি হল ধাতব মুদ্রা, যেমন – সোনা, রুপা ইত্যাদি। শেয়ার বাজার হল মিথ্যা ভাওতাবাজির বাজার, যেখানে দুর্নীতি-অনিয়মই যেন নিয়ম। তাছাড়া পুজিবাজারে সুদ-ঘুষ-চাঁদাবাজি-দুর্নীতির কালো টাকা বিনিয়োগ করা যায়, যা ইসলামে হারাম।

ইসলামে একটি সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা আছে এবং ইসলামে ব্যাবসাকে হালাল করা হয়েছে কিছু নির্দিষ্ট সীমারেখা দিয়ে, যেখানে টাকা কিছু মানুষের হাতে ঘুরপাক খাবে না। শেয়ার বাজার গুটিকয়েক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করে। শেয়ার বাজার যে হারাম তা বোঝার জন্য যেমন অর্থনীতিবিদ হওয়ার দরকার নাই, ঠিক তেমনি মাদ্রাসার ডিগ্রিও দরকার নাই। মুসলিমদের উচিৎ পুঁজিবাদী ব্যাবস্থা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে ইসলামী ব্যবস্থার পূর্ণ বাস্তবায়ন করা। খিলাফত রাষ্ট্রে শাসকশ্রেণীর যেমন থাকবে কড়া জবাবদিহিতা ঠিক তেমনি থাকবে অর্থনৈতিক ভারসাম্য।

যেসব বই, ব্লগ বা কলামের সাহায্য নেয়া হয়েছে:

১) ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা – শায়ক তাকিউদ্দিন আন-নাবাহানি
২) http://www.islamicsystem.blogspot.com
৩) কিছু জাতীয় দৈনিক পত্রিকা


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন