আজ শুক্রবার, ২২ জুন ২০১৮ ইং, ০৮ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



জমিদার রহিম বক্স ও তার পুত্র

Published on 21 October 2016 | 3: 41 pm

 

:: কে এম আজিজ উল্যা ::

সেই আমলের কথা। সে সময়‌ ছিল জমিদারী প্রথা। জমিদারদের উপরেই ন্যাস্ত ছিল সারা বাংলার শাসন ভার। তারা প্রজাদের থেকে খাজনা আদায় করে নিজেরাও চলত এবং ধার্য্যকৃত টাকা ইংরেজদের তহবিলে জমা দিতে হত।

মুহিনীপূরের জমিদার রহিম বক্স। ছোট কাল থেকেই তাঁর যথেষ্ঠ সুনাম শুনে আসছি,খ্যাতনামা একজন প্রজাবান্ধব জমিদার হিসাবে। তিনি প্রজাদের উপর কোন অত্যাচার করেছেন এমন কথা কারও মুখে কখনও শুনিনি। তিনি ধর্মীয় শিক্ষার জন্য ৩টি মক্তব এবং প্রজাদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য ২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তখনকার দিনে গ্রামে গন্জ্ঞে শিক্ষার আলো এইমাএ ক্ষীণ ভাবে জ্বলতেছিল। ভাগ্য ক্রমে এক ইংরেজ সাহেব মহিনীপুর গ্রাম পরিদর্শনে এসে রহিম বক্সের শিক্ষানুরাগী কর্মকান্ড দেখে তাঁকে তাৎক্ষনিক ১০০০টাকা পুরুস্কার দিলেন; স্কুল গুলি সরকারি করে দিলেন। স্কুলে তখন প্রধান শিক্ষকের বেতন ছিল ১০টাকা, সহকারি প্রধান পেত ৭টাকা, অন্যান্যদের বেতন ৫টাকা। এতে স্বাচ্ছন্দে-মনের আনন্দে চলে যেত তাদের সংসার। সারা বাংলায় জমিদার রহিম বক্সের নাম ছড়িয়ে পড়ল। তিনি গ্রমের প্রধানদের নিয়ে একটি কমিটিও করেছিলেন, যারা সর্বকাজে জমিদারকে সহায়তা করত।

জমিদারের ছিল ৩ কন্যা ও ১ পুত্র। কটোদ্রহ জমিদার তাঁর কন্যাদেরকে সুপাত্রে পাত্রস্থ করতে পেরে তিনি অত্যন্ত খুশী। একটা কথা বলতে হয়, ষোল আনা সুখী মনে হয় এ জগতে কেউ হতে পারেনা। তেমনি একটা দুঃখ জমিদারকে কুঁড়ে-কুঁড়ে খাচ্ছে। কাউকে বলতেও পারেনা, অথচ সইতেও পারছেনা। নিজ পুত্রকে তিনি মানুষ করতে পারেন নাই। পড়ালেখায় অত্যন্ত অনাগ্রহী ছেলেটি সবসময় বখাটে দুরন্ত পনা ছেলেদের সাথে সদা সর্বদা আড্ডা দিয়ে আসছে। তার চিন্তায় চিন্তায় জমিদার একেবারেই অসুস্থ হয়ে পরলেন। বন্দুদের শান্তনা, ডাক্তারদের চিকিৎসা, কিছুতেই তাঁর স্বাস্হের কোন উন্নতি হচ্ছেনা। ডাক্তারেরা তাঁর বন্ধুদের বলে দিলেন, তাঁকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আপনারা সেবা যত্ন করুন, যা খেতে চায়, খেতে দিন। এই বলে তারা বিদায় হল। জমিদারও বুঝতে পারলেন, অন্তিম সময় এসে গেছে। মেয়ে জামাই সবাই জমিদারকে দেখতে এলো। বাবা পুত্র সহ সবাইকে কাছে ডাকলেন। সকলের সামনে ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “বাবা আমি চলছি না ফেরার দেশে। তোমাকে শিক্ষা দিতে পারলাম না, ভাল ছেলেদের সাথেও তুমি চল নাই। আমার মৃত্যুর পর ওয়ারিশ সুএে তুমিই জমিদার হবে। জমিদারী কিভাবে চালাতে হয়, কিছুই শিখ নাই। এখন আমি তোমাকে ৩ টি মূল্যবান বুদ্ধি এবং উপদেশ দিয়ে যাচ্ছি, আগে আমার সাথে ওয়াদা কর, আমার দেওয়া বুদ্ধি মত তুমি চলবে কিনা” জওয়াব দিল, “বাবা আজ থেকে আমি অবশ্যই আপনার আদেশ মেনে চলব”। খুশী হয়ে বাবা বললেন, “বুদ্ধিগুলি মনোযোগ দিয়ে শুন এবং যদি মেনে চল তবে জমিদারী যিবেনা, প্রজারাও সুখে থাকবে, তুমিও কখনও বিপদে পরবে না।

১নং বুদ্ধি :- , খাওয়ার সময় প্রতি লোকমায় ‘মাথা’ ও ‘পাতা’ খাবে, তাতে জ্ঞান-বুদ্ধি তোমার অনেক বেড়ে যাবে।

২ নং বুদ্ধি :- ‘৩’ মাথার বুদ্ধি নিয়ে জমিদারী চালাবে।

৩ নংবুদ্ধি:- আমারজমিদারিএলাকাই ‘জলেএবংস্থলে’ অনেকসোনা-দানালুকিয়েআছে। তুমিযদিএগুলিউদ্ধারকরতেপার, তবেরাজকোষকখনওশূন্য হবেনা, প্রজারাও অত্যন্ত সুখে থাকবে।

পুত্র-সম প্রজাব্রিন্দকে শোক-সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে, ইংরেজ সরকার থেকে পুরস্কার প্রাপ্ত জমিদার রহিম বক্স চির দিনের জন্য চক্ষু মুদিলেন।

মুহূর্তে সারা এলাকাই এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল। হিন্দু-মুসলীম, নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো, মনে হয় কেহই বাদ ছিল না, জমিদারের বাড়িতে কান্নার বন্য বয়ে গেল। হাজারো লোকের ঢল।

কবর পাড়েই হবু জমিদের সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন-“আমার বাবার গঠিত কমিটির সদস্যবৃন্দ এবং আমার প্রিয় বন্ধু-বান্ধব যারা আছেন সবাই আগামী পরশু সকাল ৯ টায় বাবার বৈঠক-খানায় আসবেন। আপনাদের সাথে আলচনা করে যাহা করতে হয় করব।

মৃত্যুর ৩য় দিন : সকাল ৯ টা, যারা আসার, সবাই এসে গেল। অনেক বিলম্বে হবু জমিদার আসল, সবাইকে সালাম দিয়ে সে বাবার আসনের পাশে রাখা আর একটি চেয়ারে বসল। মেহমানরাও নিজ নিজ আসনে সবাই বসল।

পূত্র প্রথমে প্রবীনদের উদ্দেশে বলল, আপনারা আমার আব্বাকে অত্যন্ত আন্তরীকভাবে সহযোগীতা করেছেন বিধায় আমার আব্বা  ইংরেজ সরকার কর্তক সম্মানিত হয়েছেন। এজন্য আমি আপনাদের নিকট কৃতজ্ঞ । বাবা প্রবীন তাই তিনি প্রবীনদের নিয়ে একটা কমিটি করেছিলেন । সেই কমিটি থাকবে । তবে তা আজ থেকে হবে উপদেষ্টা পরিষদ । আমি নবীন , নভীনদের নিয়ে সেরুপ একটি কমিটি করব। তা হবে পরিচালনা পরিষদ । আমার যখন প্রয়োজন হয় তখনি আপনাদেরকে ডাকব । বাবার জন্য এবং জমিদারীর উন্নতির জন্য আপনারারা অনেক করেছেন । আমি আপনাদের নিকট কৃতজ্ঞ থাকব আজীবন। এখন আপনার বাড়ী গিয়ে বিশ্যাম করুন । আমি নবীনদের নিয়ে বসব । উপদেষ্টা প্রধান কিছু বলার জন্য দাড়ালে , জমিদার পূত্র থাকে বলার জন্য দিলেন।

প্র: আপনার বাবার মূত্যুতে আমরা অত্যন্ত শোকাহত । পুরু গ্রামবাসি এখনও কেঁদে মরেছে । আল্লাহ ওনাকে বেহেস্ত নছিব করুক।এখন আমি কেঁদে মরেছে । এখন আমি প্রস্তাব করতে চাই , আপনার বাবার আসনটি শূন্যপড়ে আছে উহাকে খালি রাখবেন না, ঐ আসনে এখনি আপনী বসে পড়ুন । এ প্রস্তাব সবাই দাড়িয়ে সমর্থন জানাল। জমিদার পূত্র আসনে বসায় শূন্য আসন পূর্ন হলো। প্রবীনেরা সবাই বিদায় নিল। নবীনেরা কাছাকাছি হয়ে বসল।

জমিদার পূত্র: প্রিয় বন্ধুগন আমার আব্বা আমাকে ওনার মুত্যুর মুহুর্তে ৩টি উপদেশ দিয়ে গেছেন। আপনারা ঐগুলি শনে নেন এবং আগামী পরশু সকাল ৯ টায় উহার ব্যাখ্যা শুনে, সেই হিসাবে আমি চলব। আশা করি উপদেশের মমার্থ ভালভাবে আমাকে বুঝায়ে দিবেন । উপদেশ গুলি সবাইকে শূনিয়ে দিয়ে আজকের জন্য সভাভঙ্গ  করে দিলেন।

২য় সভা: নিদ্ধারিত দিনের যথা সময়ে বন্ধুরা এসে গেল । তাদের মধ্য হতে ৯ জনকে নিয়ে একটি কার্যকরী পরিষদ গঠিত হল। সভাপতি বর্তমান জমিদারের উদ্দেশে উপদেশ গুলির ব্যাখ্যা পাঠ করে শুনাতে লাগলেন। ১নং উপদেশ-প্রতিলোকমআ মাথা আর পাতা খেতে বলেছেন। তাই আমরা আপনার জন্য একটা রুটিন করে এনেছি ১ম দিন- সনিবার–গরুর মাথা,দুপুর ও রাতে । মাংস ২ কেজি দেশী ধনিয়া ১০০ গ্রাম।

২য় দিন+৩য় দিন মহিষের মাথা : দুপুরের*২ এবং রাত*২+মাংস ১ কেজি

                   পাতা :বিলতি ধনিয়া পাতা +রুই মাছ ২ কেজি

৮র্থ দিন-ছাগলের মাথা : ২টা :১টা দুপুরের + ১টা রাতে

              পাতা : লেটুস+পূদিনা +থানকুনি পাতা খাবে

৫ম দিন – মোরগের মাথা : ৪ টা , ২টা দুপুরে+২টা রাতে  মোরগের মাংস এবং অন্যান্য তরকারি।

৬ষ্ঠ+৭ম দিন- মাঝারি ও একেবারে ছোট মাছের মাথা এবং মাছ+বিভিন্ন তরকারী।

জমিদার ১নং উপদেশের ব্যাখ্যা এবং রুটিন দেখে জমিদারত অত্যন্তখুশী।

২নং উপদেশ : ৩মাথার বুদ্ধি নিয়ে জমিদারী কাজ চালিয়ে নেওয়া । বস্তুত পক্ষে ৩ মাথা বিশিষ্ট কোন লোক নাই । আপনার বাবাবুঝতে চেয়েছিলেন ৩ টি রাস্তার মাথা যেখানে মিলিত হয়েছে সেই প্রসস্ত জায়গায় খোলা মেলা মুক্ত বাতাসে বসে মিটিং করলে আলোচনা আসা যাওয়ার পথে লোকেরা ও শুনবে, খরচ করে ঢোল-শহরত করে আর প্রচার করা লাগবে না । আমাদের প্রনীত আইন কানুন গুলি জেনে যাবে এবং সেভাবে চলবে।

জমিদার : এই ব্যাখ্যাটি খুব সুন্দর হয়েছে।

৩নং উপদেশ : আপনার এলাকায় জলে স্থলে সোনা -দানায় পরিপূর্ন। ইহাত অত্যান্ত সহজ কথা । এমন কোন বউ-ঝি নাই যার কাছে কিছু না কিছু স্বর্নালঙ্কার নাই । মেয়েরা অনেক সময় এগুলি নিয়ে পুকুরে নামে । কাপড়ের সাথে পেছাইয়ে কান-নাক থেকে অলংকার পানিতে পড়ে যায় । স্বর্ন ১০০ বছরও পানির বা মাটির ভীতরে ও পড়ে থাকলে এগুলির কিছুই হয় না, কাজেই জলে স্থলে প্রচুর সোনা দানা আছে আমরা বেঁচে থাকতে  আপনার রাজকোষে কোন ক্রমেই শূন্য হতে দিবনা । আপনি শূধু আমাদিগকে সহযোগিতা করবেন।

জমিদার : অবশ্যই  এমন নিঃশ্চিন্ত আশ্বাস পেয়ে বন্ধু দেরকে অথ্যার্ৎ কমিটির সদস্যদেরকে ‘কি’ দিয়ে ধন্যবাদ জানাবেন ভাষাও খুজে পাচ্ছেন না । যাহা হউক সবাইকে ধন্যবাদ জানাবেন ভাষাও খুজে পাচ্ছেন না । যাহা হউক সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে মিটিং শেষ করলেন।

কমিটির দেওয়া খাদ্য মেনু অনুযায়ী জমিদার ও তার পরিবাররের জন্য বাজার আসতে লাগল। আগের জমিদার বেঁচে থাকতে এসন সুস্বাদু খাদ্য কচিৎ-কদাচিৎপাওয়া যেত। এখন প্রতিদিন বিলাস বহুল খাদ্য খেয়ে সবাই আনন্দে আটখানা । অনেক সময় প্রান প্রিয় বন্ধুদেরকে দাওয়াত পত্র দিতেন। আনন্দ উল্লাসে নতুন জমিদারকে ৬ মাস অতিবাহিত হয়ে গেল। একদিন খুজান্তি এসে জমিদারকে বললেন, ‘কোন আয় নাই’খরচের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে । আগামী মাসে আপনার কর্মচারীদের বেতন দিতে সংকট সৃষ্টি হতে পারে।

এদিকে প্রাক্তন জমিদারের এক উপদেষ্টা জমিদারকে বলে গেলেন “বাবা, আপনার বন্ধুরা আপনার বাবার উপদেশ গুলির সম্পূর্ন ভুল ও অপব্যাখ্যা দিয়ে আপনাকে বিভ্রান্ত ও মহা বিপদে ফেলার মহা চক্রান্ত চালাচ্ছে”। (চলবে……………………………………………..)


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন