আজ শনিবার, ২৩ জুন ২০১৮ ইং, ০৯ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ



দেখে এলাম জেগে উঠা সন্দ্বীপের নতুন চর এবং সন্দ্বীপের মানুষের অসহনীয় যাতায়ত সংকট।

Published on 20 October 2016 | 3: 06 pm

 সংকট নিরসনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি
অধ্যাপক আ. ম. ম. আব্দুর রহিম

“সুজলা সুফলা সাগর মেখলা হে মোর জন্মভূমি”-,
পঙ্তিটি সন্দ্বীপ প্রিয় সন্দ্বীপের কোন এক কবির সন্দ্বীপ প্রীতির অনন্য নিদর্শন।
আজ সন্দ্বীপের যাতায়ত সংকট সম্পর্কে লিখবো ভাবছি। প্রিয় সন্দ্বীপ কে নিয়ে ইতিপূর্বে কয়েকবার লিখেছি। দৈনিক আজাদী, পূর্বকোণ, কর্ণফুলি, চট্টগ্রাম মঞ্চ সহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় লিখা উঠেছে। সন্দ্বীপ কে নিয়ে লিখেছি কয়েকটি কবিতা যা বিভিন্ন গ্রন্থে উঠেছে।
সন্দ্বীপের যাতায়াত সমস্যা, সন্দ্বীপের ইতিহাস ঐতিহ্য, সন্দ্বীপের গৌরবময় অতীত সম্পর্কে লিখেছি। সে দু’হাজার হতে অদ্যাবধি। দৈনিক পূর্বকোণে ২০ শে জুন ২০০৫ ইং সোমবার “সমসময়” এর পাতায় আমার একটি লিখা ছাপানো হয়, “ সন্দ্বীপ একটি দূরতম জনপদ” শিরোনামে। লিখাটির সূচনায় পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক কয়েকটি লাইন সংযুক্ত করেন যেমন, “চট্টগ্রাম জেলার একটি উপজেলা সন্দ্বীপ, যেন দূরতম জনপদ কারন যোগযোগ ও অন্যান্য আধুনিক সুযোগ সুবিধা যথাযথ ব্যবস্থার অভাবে এই নূতন সহস্রাব্দে এসেও সন্দ্বীপ যেন এক পৌরানিক দ্বীপ হয়ে রইল। সন্দ্বীপের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সু প্রাচীন ও গৌরবময়। সে সব ঐতিহ্যের বয়ান করে বর্তমান সন্দ্বীপের বিচ্ছিন্নতার বেদনা, সমস্যা তুলে ধরেছেন সন্দ্বীপের সন্তান অধ্যাপক আ, ম, ম, আব্দুর রহিম”। আমার এই লিখাটি ছাপানোর জন্য সম্পাদক কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ঐ লিখাই সন্দ্বীপের মানুষের সুখ দুঃখের কাহিনী, নদী ভাঙ্গন, ক্রসবাধের প্রয়োজনীয়তা, রাস্তাঘাট নির্মাণ, আইন শৃঙ্খলার উন্নতি, বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নতি, নদীতে ভেঙ্গে যাওয়া জনপদ সমূহের বর্ণনা, যাতায়তের সংকট ইত্যাদি বিষয়ে বর্ণনা করেছিলাম। পরিশেষে ক্রসবাধ নির্মাণের উপর গুরুত্ব আরোপ করে লিখার সমাপ্তি টানি। উল্লেখ্য ঐ লিখা পত্রিকাটি আমি এখনো সংরক্ষণ করে রেখেছি।

সন্দ্বীপ আমার জন্মস্থান। বাল্য, কৈশোর, ও তারুণ্যের উচ্ছ্বল দিন সমূহে সতের বছর সন্দ্বীপের ঐতিহাসিক গ্রাম মগধরায় কাটিয়েছি। ধীর্ঘদিন ধরে সন্দ্বীপে থাকিনা। দীর্ঘ ৩২ বৎসর হাটহাজারীস্থ ফতেয়াবাদ ডিগ্রি কলেজে অধ্যাপনা করছি। কিছুদিন পরে অবসরে যাব। বয়স বর্তমানে ৬০ এর কোটায়, তারপর ও সন্দ্বীপের কথা মনে হলে যেন আনন্দে ভীষন উদ্বেলিত হয়ে পড়ি। সন্দ্বীপে যাওয়ার জন্য বিশেষভাবে তাড়া অনুভব করি। আজ আমার কাছে আনন্দ লাগে সেদিন আমি যে যে বিষয়ের উল্লেখ করে পত্রিকায় লিখেছিলাম তার অনেক গুলি পূরণ হয়েছে। আমার ঘরের কোনে কারেন্টের পিলার লেগেছে, কারেন্ট কখন পাব জানিনা। রাস্তা ঘাটের উন্নতি হয়েছে যথেষ্ট, তবে মান সম্পন্ন নয়। নির্মাণের পর রাস্তার ইট বালি খসে পড়ে যাচ্ছে। ঠিকাদারদের পেট ভরেছে। প্রশাসনের কোন তদারকি নেই। ক্রসবাঁধ নির্মাণের ফাইল হিমাগারে বন্দী। বহিঃ যাতায়াত ব্যবস্থার চরম অবনতি, পূর্বে যা ছিল এখন তাও নেই। ষ্টীমার সার্ভিস প্রায় বন্ধ বললে চলে। পশ্চিম দিকে একেবারে নেই, পূর্বদিকে সপ্তাহে একদিন। ঘাটে একটি ফিটনেসবিহীন জাহাজ বেঁধে রাখা হয়েছে, যা ক্ষুদ্রাকৃতির, লোক দেখানোর জন্য।

সন্দ্বীপে আসা যাওয়া কি দুর্বিসহ কষ্টকর তা ভোক্তভুগী ছাড়া আর কেউ জানেনা। সন্দ্বীপের চার লাখ মানুষ পানিবন্দী। কি দুঃসহ অবস্থা না সন্দ্বীপের মানুষের! ইচ্ছে করলে সন্দ্বীপের মানুষ মূল ভু-খন্ডে আসা যাওয়া করতে পারেনা। এ যেন নির্বাসিত এক কালোপানির দেশ। সন্দ্বীপের মানুষের বহি যাতায়াত সুবিধার জন্য কুমিরা ও গুপ্তছড়া ঘাটে জেঠি নির্মাণ করা হলো। বলা হলো এ ঘাটে দ্’ুশিফটে জাহাজ দেয়া হবে, আরো অনেক কিছু। সন্দ্বীপের মানুষের হাজার বছরের দুর্ভোগের অবসান হবে। পত্রিকার পাতায় এ খবর দেখে আমরা খুশি হলাম সেদিন।

১৯৭৪ সালে কুমিরা ঘাটে এক মর্মান্তিক লঞ্চ ডুবিতে কয়েক’শ লোকের জীবন অবসান হয়। এর পূর্বে ১৯৫৬ সনে “বাদুরা জাহাজ” ডুবিতে বঙ্গোপ সাগরে কয়েক’শ লোকের সলিল সমাধি ঘটে। অন্যভাবে প্রতি বছর কত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে তার ইয়ত্তা নেই। আমার ব্যক্তিগত জীবনে কয়েকবার লঞ্চ ডুবি, নৌকার ডুবির সম্মুখীন হই। আল্লাহর অপার কৃপায় রক্ষা পাই। অবশেষে শত শত মানুষের জীবনের বিনিময়ে কুমিরা ঘাটে স্টীমার সার্ভিস চালু হয়। যা বিগত পনের বিশ বৎসর চালু ছিল। এখন হতে আট দশ বৎসর পূর্বে হঠাৎ করে স্টীমার তুলে দিয়ে ট্রলার সার্ভিস চালু করা হলো। মাইট ভাঙ্গা ঘাট একেবারে বন্ধ করে দেয়া হলো। এরপর হতে স্পীড বোট চলছে। প্রতি যাত্রী হতে তিনশত টাকা করে মজার ব্যবসা, মানুষের কষ্টের কথা কেউ স্মরণ করেনা। স্পীড বোট বছরে তিন চার মাস চলতে পারে বিশেষ করে শীত মৌসুমে ভালো আবহাওয়ায়। বাকি নয় মাস দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় যাত্রী পারাপার হবে কিভাবে? তখন যাত্রীদের একমাত্র সম্বল মালের ট্রলার, সার্ভিস বোট। সপ্তাহে একদিন সদরঘাট হতে স্টীমার আসে, তাতে আবার যাত্রী হয়না। মানুষের সেকি দুর্বিসহ অবস্থা!

ইহা যেন দ্বীপের মানুষের প্রতি একপ্রকারের প্রহসন। অথচ সন্দ্বীপের মাননীয় এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র সহ আমাদের উপযুক্ত জন প্রতিনিধি রয়েছেন। তারপরও জন দুর্ভোগের কোনো প্রতিকার নাই। তাদের কাছে সন্দ্বীপ বাসির পক্ষে বিনীত আবেদন থাকছে কুমিরা ঘাট দিয়ে জাহাজ চালুর জন্য আপনারা সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করুন। আমরা জানি কিছু কূটবুদ্ধি, স্বার্থান্বেষী মহল নিজ স্বার্থ হাছিলের জন্যে এ ব্যবস্থা চালু করেছে। তাদের দাবী হলো তারা জেলা পরিষদের ঘাট ইজারা নিয়েছে, ঘাট তাদের কথামতে চলবে। স্টীমার সার্ভিস চলবেনা। স্পীড বোট ব্যবস্থা চলবে। মানুষের কষ্ট তাদের কাছে কিছু নয়।

এ বিষয়ে মাননীয় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের স্বহৃদয়তা প্রত্যাশা করছি। নৌ পরিবহণ মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্বাহী নির্দেশ কামনা করছি।

যদি স্টীমার না দেয়া হয় তাহলে বি,আই,ডব্লিউ, টি, সি কুমিরা ঘাটে জেটি নির্মাণ করল কেন?

আমাদের সাফ জওয়াব অনতিবিলম্বে স্টীমার সার্ভিস চালু করা হউক। জেলা পরিষদের ঘাট দিয়ে গরু, ছাগল, ধান-চাল, তরী তরকারী পার করা হউক, ইহাতে আমাদের কোন আপত্তি নেই। তবে বি, আই, ডব্লিউ, টি,সি জেটি দিয়ে অবশ্যই জাহাজের যাত্রীরা চলাচল করবে। এ পথে জাহাজ চলবে, জাহাজ চলতে হবে। আমাদের নেত্রীবৃন্দের কাছে জোড় দাবী, সাংবিধানিক ভাবে আপনারা জনগনেরর দায়ীত্ব নিয়েছেন সুতরাং হাই কোর্টের রীট আদেশ জনগণ বুঝবেনা, জনগণ আপনাদের ক্ষমতা দিয়েছে সে ক্ষমতা আপনারা জনকল্যাণে প্রয়োগ করুন। প্রয়োজনে মিটিং মিছিল মানববন্ধন ও সাংবাদিক সম্মেলন করুন।

আইন মানুষে তৈরী করে। প্রয়োজনে জনস্বার্থে আইনের পরিবর্তন হতে পারে। এ বিষয়টি প্রয়োজনে সংসদে মাননীয় সাংসদকে সংসদে তোলার আকুল আহ্বান করছি। প্রতিদিন মানুষ ডুবে মরবে আর কিছু লোক টাকার কুমির বনে যাবে, সন্দ্বীপের মানুষ মাছের পেটে ঢুকে যাবে এ হতে পারেনা। আমরা শুনেছি এর সাথে কিছু রাঘব বোয়াল জড়িতে রয়েছে খুবই সূক্ষ্মভাবে।

আমাদের বর্তমান দুর্ভাগ্য সন্দ্বীপের সাবেক সাংসদ সর্বজনাব সৈয়দ আবদুল মজিদ উকিল, এ. কে. এম. রফিকুল্লাহ চৌধুরী, প্রকৌশলী এম ওবাইদুল হক, এ্যাডভোকেট শামসুল হুদা, দ্বীপবন্ধু মুস্তাফিজুর রহমানের মত নেতা আজ নেই। না হয় এত দুর্ভোগ কেন? সে ব্রিটিশ আমলে স্টীমার সার্ভিস চালু হয়েছিল সন্দ্বীপের মানুষের অনেক কষ্টের বিনিময়ে। আজ তা বন্ধ কেন? তাহলে কি একটি ঐতিহ্যের অপমৃত্যু হলো?

পাকিস্তানের শাসনামলে সন্দ্বীপে হেলিকপ্টার সার্ভিস চালু ছিলো, আজ স্বাধীন বাংলাদেশে সেখানে কাঠের ট্রলার, বিপদ সংকূল স্পীড বোট হবে কেন? এতো মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা ছাড়া আর কিছু নয়। এ অবস্থার অবসান হউক। বর্তমান সাংসদ মাহফুজুর রহমান মিতার কাছে সন্দ্বীপের মানুষের অনেক প্রত্যাশা। মানুষ তাকে দল মতের উর্ধ্বে মনে করে। তাঁর পিতাকে মানুষ শ্রদ্ধা করে, কর্মের জন্য, সন্দ্বীপ প্রীতির জন্য। তিনি সে সুযোগ্য পিতার সুুযোগ্য সন্তান।

আমি গত রমজানের ছুটিতে ২০১৬ সালের জুন মাসে পরিবার পরিজন নিয়ে সন্দ্বীপে গিয়েছিলাম। আবহাওয়া খারাপ, স্পীড বোটে কিভাবে যাব? পরে খবর পেলাম সোমবার, বৃহস্পতিবার, সপ্তাহে দুদিন সদর ঘাট হতে গুপ্তছড়া ঘাটে স্টীমার ছাড়ে। মনে সাহষ হলো, আমি সোমবারে স্টীমারে করে সন্দ্বীপে গেলাম, যাত্রী খুবই কম উর্ধ্বে একশত বিশজন। নিরাপদে ইনশাল্লাহ বাড়িতে পৌঁঁছলাম।

এবার আরো কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আসি, যা আমি আমার লিখার শিরোনামে উল্লেখ করেছি।
আমি বাড়ীর প্রয়োজনীয় কাজাদি সেরে একদিন সন্দ্বীপের পশ্চিমে জেগে উঠা চর দেখতে গেলাম। অবশ্য এটি আমার দীর্ঘদিনের ইচ্ছে। শুনেছি ভেঙ্গে যাওয়া সন্দ্বীপ আবার জেগে উঠেছে। প্রথিমধ্যে সন্দ্বীপ কলেজের সহকারী অধ্যাপক আব্দুর রহিমের সাথে সেন্ট্রেল হাসপাতালে দেখা হলো। দেখলাম আনন্দ পাঠশালা, উত্তরণ পাঠাগার, আমার মনে হলো এসব জনগণের কল্যাণে আসছে, এসব কর্ম অবশ্যই সৃজনশীল। এসবের মুল্যায়ন হওয়া উচিৎ। এখানে আরো দেখা হলো কবি নীলাঞ্জন বিদ্যুৎ, নাট্যকার মাষ্টার আবুল কাশেম শিল্পী, উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব শাহজাহান বি, এ প্রমুখের সাথে। তাদের সাথে আলাপ চারিতায় খুবই ভালো লেগেছে। আরো অনেকের সাথে দেখা করার ইচ্ছা ছিল সময়ের অভাবে সম্ভব হয় নাই।

পরিশেষে সন্দ্বীপের পশ্চিমে চর দেখতে গেলাম। আমার সাথে ছিল আমার ভাগিনা মগধরা হাই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক ফেরদাউসুল আলম। সন্দ্বীপের পশ্চিম প্রান্তে গেলাম, লোকজনের সাথে আলাপ হলো, পশ্চিমে বিশাল চর জেগে উঠেছে, সবার মনে খুশি, মানুষ আল্লাহের কাছে শুকরানা গুজার করছে, ঘর ছাড়ার ভয় কেটে গেছে, তারা আজ ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছে।

দেখলাম তারা খুবই আনন্দিত, অতীতের দুঃখ গ্লানির কথা তারা ভুলে গেছে। দক্ষিণে ঠেংগার চড় হতে উত্তরে উড়ির চড়, মাঝখানে বিশাল ভূ-খন্ড, যেখানে একসময় ছিল মোহাম্মদপুর, ইজ্জতপুর, রহমতপুর, নয়া বস্তি, হরিশপুর ভাটির সময় জেগে উঠে। মনে হয় হাতিয়া দ্বীপের সাথে সন্দ্বীপ লেগে যাবে। এককালে পঁয়ষট্টি মৌজার সন্দ্বীপ পরগনা আবার জেগে উঠবে। বাংলাদেশের আয়তন বাড়বে। দেশের জন্য কৃষি ও মৎস ক্ষেত্রে বিরাট বিপ্লব ডেকে আনবে।

সন্দ্বীপ হতে পারে দৃষ্টি নন্দন পর্যটন কেন্দ্র। আর একটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়, সন্দ্বীপের পশ্চিম দিকে ভাঙ্গন রোধ হলেও দক্ষিণ পূর্ব দিকে ভাংছে। ছোয়াখালী ঘাটের চর এলাকা হতে বালি উত্তোলন করার জন্য এ রকম হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন ও গ্রাম প্রশাসনের এসব দেখা উচিৎ ছিল। নদীর ভাঙ্গন রোধে ব্যবস্থার না নিলে সমূহ ক্ষতি হতে পারে। কাছা রাস্তা ও খাল সমূহ ব্যবহার অনুপযোগী। এসবের সংস্কার প্রয়োজন।

এ মূহুর্তে সন্দ্বীপ কোম্পানীগঞ্জ সড়ক নির্মাণ সহজ হবে, প্রয়োজন তদারকি ও উদ্যোগের। প্রয়োজন আমাদের স্থানীয় ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের, বিশেষজ্ঞ মহলের সমন্বিত উদ্যোগে। সরকার এ বিষয়ে নেদারল্যান্ডের পানি বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগিয়ে জেগে উঠা ভূমি দ্রুত উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া এ মূহুর্তে জরুরি। না হয় স্রোতে চরের গতি পরিবর্তন হলে এ মহা সম্পদ হতে জাতি বঞ্চিত হতে পারে। এখানে আরো উল্লেখ করতে হয় অক্টোবরে প্রথম সপ্তাহে বিশেষ প্রয়োজনে আমি সন্দ্বীপে আবার গেলাম। যাওয়ার কোন ভাল বাহন নাই, আছে স্পীড বোট, সার্ভিস বোট।

পরিশেষে স্পীড বোটে উঠলাম। অর্ধেক পথ অতিক্রম করার পর বোটের একটি পাখা বিকল হয়ে যায়। যাত্রীদের চোখে মুখে মৃত্যুর অন্ধকারের ছায়া। একটি পাখা দিয়ে কোন প্রকারে কিনারে ভিড়ল। মনে হলো আবার মৃত্যু হতে বাচলাম। সন্দ্বীপের যাওয়ার পর আবহাওয়া আবার খারাপ, সমুদ্রে তিন নম্বর সিগনেল উঠেছে, খেয়া পারাপার একেবারে বন্ধ।

দীর্ঘ এক সপ্তাহ চট্টগ্রামে আসার কোন যানবাহন নাই। স্পীড বোট সহ সব কিছু বন্ধ। যদি স্টীমার থাকত তাহলে মানুষের এই দুর্ভোগ হত না কারণ তিন নম্বর সিগনালেও স্টীমার ছাড়ে। এখানে স্টীমার সার্ভিস চালুর যথার্থতা, সার্থকতা। স্পীডবোটে ক্ষণিকে আনন্দ শিহরণ লাগে, আবার ক্ষণিকে মৃত্যুর দুঃসংবাদ দুর্ভোগ বয়ে আনে। এ ব্যবস্থা কোনভাবে মেনে নেওয়া যাইনা। লক্ষ লক্ষ লোকের যাতায়ত ব্যবস্থা গোষ্ঠি বিশেসে সার্থ হাছিলের জন্য হতে পারেনা, এর স্থায়ীত্ব, নিরাপত্তা, নিশ্চয়তা অবশ্যই থাকতে হবে। আর এখানে রাষ্ট্রের তদারকি, হস্তক্ষেপ থাকা খুবই বাঞ্চনীয়। স্টীমার সার্ভিসের বিকল্প নেই, যাত্রীদের দীর্ঘ স্থায়ী কল্যাণে ও নিরাপত্তার জন্য অবশ্যই স্টীমার সার্ভিস চালু করতে হবে। আমরা চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্ভূক্ত, চট্টগ্রামের বাসিন্দা।

জনগণের উপর চট্টগ্রামের মানুষ হিসাবে সুবিচার করা হউক। চট্টগ্রামের ডিসি মহোদয়, মাননীয় মেয়র, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সহ এলাকার সুধিজন এ অবহেলিত গণ মানুষের যাতায়ত সংকটের নিরসনে গুরুত্ব পূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেয়র মহোদয়ের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা বিরাট।

এবার পূর্বের প্রসঙ্গে আসি।
সন্দ্বীপে সাত আট দিন থাকার পর অবশেষে প্রগ্রাম করলাম পরের সোমবার স্টীমারে করে চট্টগ্রামে আসব। হ্যাঁ, সোমবারে যথারীতি সন্দ্বীপ হতে রওনা দিলেম। ঘাটে এসে দেখলাম স্টীমার পৌঁছতে আরো দুই ঘন্টা লাগবে। একটু সামান্য বাতাস ছিল তারপরও সাহষ করে স্পীডবোটে উঠে গেলাম। ভয় লাগছিলো, তাই সাথে করে আরো একজন লোক নিয়ে আসলাম। ইয়া আল্লাহ! স্পীড বোটে উঠার পর মনে হচ্ছিলো প্রতি মূহুর্তে স্পীডবোট ডুবে যাচ্চে। প্রতিটি ঢেউয়ের সাথে ধাক্কায় স্পীডবোট বিকল হওয়ার অবস্থা। বহু দোয়া দরুদ পড়ে পনের মিনিট স্থলে ত্রিশ মিনিটি লাগল। অবশেষে আমরা কুলে এসে পৌঁছলাম। এরপর আবহাওয়া আরো খারাপ অতপর স্পীডবোট বন্ধ করে দেওয়া হলো। সেদিন স্পীডবোটে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাড়িয়েছিলাম। সে দুঃসহ অনুভূতি কখনো ভুলার নয়।

বর্তমানে শুনলাম স্টীমার সার্ভিস সপ্তাহে একদিন করা হয়েছে। ইহার কারণ কি? কারণ আর কিছু নয়, ঘাট ব্যবসায়ীদের মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা। দেখানো হচ্ছে স্টীমারে লোক হয়না, আসলে লোক না হওয়ার জন্য স্পীডবোট দায়ী। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়, সরকার, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সহ সবার প্রতি দ্বীপ বাসিদের আকুল আবেদন সন্দ্বীপের মানুষের যাতায়তের দুঃখ নিরসনে, গরীব মানুষদের পকেটের ঘামের টাকা আর লুট না করে অনতি বিলম্বে পূর্বদিকে স্টীমার সার্ভিস চালু করা হউক দু’শিফটে। লঞ্চ, স্পীডবোট বন্ধ করা হউক।

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর যোগ্যতা বলে অনেক দুঃসাহসী কাজ করতে পারে। তার নির্বাহী ক্ষমতা বলে এ বিষয়ে আমি দ্বীপের পাঁচ লক্ষ মানুষের পক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য সবিনয়ে আবেদন করছি। সন্দ্বীপের মানুষ আপনাকে চিরদিন স্বরণ করবে, দোয়া করবে। বিবেকের তাড়নায় এ লিখা। সেদিন স্পীডবোটে যে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলাম সে কথা মনে পড়লে আমি ভয়ে আতংক গ্রস্থ হয়ে পড়ি। সন্দ্বীপের কিছু নিবেদিত প্রাণ সুশীল সমাজের ব্যক্তি স্টীমার সার্ভিস চালু করাতে নিরলস ভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। দুবৃর্ত্তদের কালো টাকার কাছে তারা হার মেনেছেন। এদের মধ্যে মরহুম শামসুল আলম, ডাক্তার রফিকুল ইসলাম, মোশাররফ হোসেন, জসিম উদ্দিন এর নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।

এইতো সেদিন পত্রিকায় দেখলাম দেশের একটি ছোট্ট ছেলে শীচর্যন্দু বিশ্বাস আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখে পায়রা সেতু নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর সদয় সম্মতি লাভ করেছে। জনগণের দুঃখ আমাদের প্রধানমন্ত্রী বুঝেন এজন্য তাকে ধন্যবাদ। সন্দ্বীপের মানুষ হাজার বছর ধরে যাতায়ত সংকটে ভুগছে। হাজার হাজার মানুষের সলিল সমাধি হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস এ সমস্যা একমাত্র সমাধান হতে পারে আামদের প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী নির্দেশে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আরো আহ্বান থাকবে সন্দ্বীপ কোম্পানীগঞ্জ বঙ্গবন্ধু সড়ক নির্মাণ করে সন্দ্বীপ কে মূল ভূ-কন্ডের সাথে সংযুক্ত করা হউক।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী সাড়া দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করছেন, সুতরাং সন্দ্বীপ কোম্পনীগঞ্জ বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন কিছু নয়। কঠিন হলো প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে বিষয়টি যথাযথ ভাবে উপস্থাপন করা। সন্দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেছে হাজারো সোনার মানুষ। কবি আবদুল হাকিম, কমরেড মোজাফফর আহমদ, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, স্বাধীনতার পদক ধারি কবি বেলাল মোহাম্মদ, বিপ্লবী লাল মোহন শেন, মোহাম্মদ ওয়ালী গান্ধী, মাওলানা ওয়াজি উল্লাহ আরো কত বিদগ্ধ বিদ্যান, পন্ডিত, শিক্ষাবিদ। একাত্তরের পঁচিশে মার্চের কালো রাত্রে আবুল কাশেম সন্দ্বীপের কন্ঠে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল আমাদের মহান স্বাধীনতার ঘোষণার কথা। সন্দ্বীপের দামাল ছেলেরা সেদিন মাতৃভূমি স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বন্দুক কাঁধে তুলে নিয়েছিল।

পরিশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবিনয়ে আবারো অনুরোধ থাকবে “সন্দ্বীপ কোম্পানীগঞ্জ বঙ্গবন্ধু সড়ক” অনতি বিলম্বে চালু করা হউক এবং কুমিরা ঘাট হতে মানুষ পারাপারে নৌকা, সাম্পান, ট্রলার, স্পীডবোট বন্ধ করে দিয়ে দু’শিফটে জাহাজ সার্ভিস পুনঃ চালু করা হউক।

প্রয়োজনে হেলিকপ্টার সার্ভিস চালু করা হউক। আমাদের প্রত্যশা সন্দ্বীপের সাবেক এম,পি দ্বীপবন্ধু মুস্তাফিজুর রহমানের সুযোগ্য পুত্র বর্তমান এম,পি জনাব মাহফুজুর রহমান মিতা বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী সহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের বরাবরে উপস্থাপন করে সমস্যার সমাধানে সফল ভূমিকা পালন করবেন। এ ঘাটে বহু মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। তাদের পরিবার পরিজন আজ পথের ভিখারী, আর যাতে কোন মানুষের অপমৃত্যু না হয়।

আমরা শুনেছি কিছুদিন আগে আমাদের সাংসদ মহোদয় এ ঘাটে ঝুকিপূর্ণ যাত্রায় অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন। এর আগে তার পরিবারের কয়েকজন আত্মীয়ের সন্দ্বীপ চ্যানেলে সলীল সমাধি হয়েছে।

সুতরাং এ বিষয়ে তারও দুঃখ কম নেই বলে আমি মনে করি। আমার বিশ্বাস মাননীয় সাংসদ সন্দ্বীপের মানুষের যাতায়ত সংকটের আসু সমাধান কল্পে পুনরায় জাহাজ ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নেবেন। এ প্রত্যাশাই সুশীল সমাজ, মন্ত্রণালয়, প্রশাসন, উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুহ্তারামা শেখ হাসিনার নেক দৃষ্টি কামনা করে লিখার ইতি টানছি।

লেখক পরিচিতি :
আ,ম,ম, আব্দুর রহিম  (কবি ও প্রাবন্ধিক)
সহকরী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ।
সাবেক অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) ফতেয়াবাদ ডিগ্রি কলেজ।
হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।
মোবাইল ঃ ০১৮১৯-৬৪৮৩৯৮


এখানে খুজুন


আরও পড়ুন